আর্কিমিডিসের সেই বিখ্যাত গল্প

কোনো ভারী জিনিস মাটির ওপর দিয়ে টেনে বা বয়ে নেওয়া কতই না কষ্টকর! কিন্তু জিনিসটি যদি পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া যায়, তবে তা খুব সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। বাংলাদেশে বিরাট বিরাট কাঠের গুঁড়ি নদীর পানিতে কতক ডুবিয়ে-ভাসিয়ে সামান্য একগাছা দড়ি বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোট একখানা ডিঙি ও একটি মাত্র লোকই এ কাজের পক্ষে যথেষ্ট। অথচ অত বড় কাঠের গুঁড়ি মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিতে ১০-১২ জন জওয়ান লোকের দরকার, সন্দেহ নেই।

এ অসাধ্য সাধন করার পেছনে বিজ্ঞানের যে নিয়মটি রয়েছে তা আবিষ্কার করেছেন আর্কিমিডিস। নিয়মটি এ রকম: যখন কোনো কঠিন পদার্থ কোনো তরল পদার্থে ডোবানো হয়, তখন কঠিন পদার্থটির ওজনের কিছু অংশ কমে গেছে বলে মনে হয়। কঠিন পদার্থটির যে আয়তন, সে ঠিক ততটা পরিমাণ তরল পদার্থ সরিয়ে দেবে। এই পরিমাণ তরল পদার্থের যে ওজন, মনে হবে পদার্থটি যেন সেই পরিমাণ ওজন হারিয়ে হালকা হয়ে গেছে।

এখানে কিন্তু পদার্থ সত্যি সত্যি কোনো ওজন হারায় না। তরল পদার্থে ডোবানোর ফলে সেটিকে হালকা মনে হওয়ার কারণ হলো, তরল পদার্থের ওপরের দিকের চাপ, যাকে বলা হয় ঊর্ধ্বচাপ। যেকোনো তরল পদার্থই ওপরে, নিচে এবং পাশাপাশি চাপ দিয়ে থাকে এবং এই চাপের জন্য ভারী জিনিস পানিতে বা অন্য কোনো তরল পদার্থে ডোবালে তা হালকা মনে হয়।

এ সূত্রটি আবিষ্কারের পেছনে একটি সুন্দর গল্প আছে। গল্পটি হচ্ছে: এখন থেকে দুই হাজার বছর আগের কথা। ইতালির সাইরাকিউজের রাজা হিরো স্যাকরাকে দিয়েছেন একটি সোনার মুকুট বানাতে। মুকুটটি বানানো হলো। ভারি সুন্দর দেখতে। কিন্তু রাজার কেন যেন সন্দেহ হলো, খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি হয়েছে তো মুকুটটি? সোনা চুরি করে খানিকটা খাদ মিশিয়ে দেয়নি তো স্যাকরা? পণ্ডিত হিসেবে আর্কিমিডিসের খুব নাম।

রাজা তাঁরই ওপর ভার দিলেন মুকুটে কোনো খাদ মেশানো আছে কি না, তা বের করার জন্য। মুকুটটি কিন্তু ভাঙা চলবে না।

কী করে সমস্যার সমাধান করবেন—আর্কিমিডিসের শুধু এই ভাবনা। ভাবতে ভাবতে একদিন স্নানঘরে ঢুকছেন। চৌবাচ্চাভর্তি পানি। স্নান করার জন্য চৌবাচ্চায় নেমেছেন আর্কিমিডিস, অমনি বেশ খনিকটা পানি উপচে পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হলো, তাঁর নিজের শরীরের ওজনও যেন খানিকটা কমে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে মুকুট-সমস্যার একটি সমাধান মনে এসে গেল আর্কিমিডিসের। খাঁটি সোনার মুকুট যতটা পানি সরাতে পারবে, সোনায় খাদ মেশানো মুকুট সে পরিমাণ পানি সরাতে পারবে না; অর্থাত্ পানির মধ্যে ডোবালে খাঁটি সোনার যে ওজন হবে, খাদ মেশালে তা হবে না।

সুতরাং সহজ একটি পরীক্ষা করেই মুকুট খাঁটি সোনার কি না, বোঝা যেতে পারে। এক লাফে চৌবাচ্চা ছেড়ে তিনি সোজা ছুটলেন রাজার কাছে। চেঁচিয়ে বলতে বলতে যাচ্ছেন, ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ (আমি পেয়ে গেছি! আমি পেয়ে গেছি!)

এরই নাম ‘প্লাবতা সূত্র’। এই সূত্র আবিষ্কারের এই হলো ইতিহাস।

সংগ্রহে: অরিন সুলতানা