করোনাকালে বৈশ্বিক পড়াশোনা
করোনাকালে বৈশ্বিক পড়াশোনা

করোনাভাইরাস পুরো পৃথিবীকে স্থবির করে দিয়েছে। গত শতাব্দীর ১৯১৮-২০—এই দুই বছরও স্প্যানিশ ফ্লু প্রায় থমকে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীকে। তারপর এই ১০০ বছরে একযোগে প্রায় পুরো পৃথিবী থমকে যাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এর ভেতর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিক্ষাব্যবস্থায়। বাংলাদেশসহ প্রায় পুরো পৃথিবীর সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে। এপ্রিলে শুরু হতে যাওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি এখনো। পিএসসি হবে না, বাতিল হয়ে গেছে জেএসসি। বর্ষ সমাপনী পরীক্ষা হবে কি না, সেটা নিয়ে এখনো দ্বিধা আছে। নতুন সংক্রমণের হার, মৃত্যুর সংখ্যা এখনো কমতে শুরু করেনি, এখনো পরীক্ষাধীন আছে কার্যকরী টিকা আবিষ্কার। তবু পৃথিবী আস্তে আস্তে ফিরতে শুরু করেছে তার পুরোনো রূপে।

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা সবচেয়ে ভয়াল থাবা দিয়েছে ইউরোপ আর উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায়। এ বছরের মার্চের গোড়া থেকে এখন পর্যন্ত বন্ধ সেখানকার সব শিক্ষা কার্যক্রম। তুলনামূলকভাবে কেবল ইউরোপেই এখন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেকটা কম। সেপ্টেম্বর থেকে চালু নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে যাচ্ছে তারা। মজার ব্যাপার হলো ইউরোপে এ বছর করোনার কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি মাধ্যমিক (ও লেভেল) ও উচ্চমাধ্যমিক (এ লেভেল) পর্যায়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষা না দিয়েই ইতিমধ্যে সবাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল পেয়ে গেছে। মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করে ফেলেছে, এ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে তারা কোন কলেজে যাবে আর উচ্চমাধ্যমিক শেষ করা শিক্ষার্থীরা জেনে গেছেন, এ মাসের শেষ সাপ্তাহ থেকে তাঁরা কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে স্নাতক শুরু করতে যাচ্ছেন। যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে যাওয়ার কথা, তাঁদের পরীক্ষা অনলাইনে হয়ে অনলাইনে কনভোকেশনও হয়ে গেছে গত মাসে। করোনাভাইরাস তাঁদের ঠিক সময়ে যা শেষ বা শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেটাতে অন্তত প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এটা শুরুতেই জেনে রাখা ভালো, এমনিতেই ইউরোপসহ উন্নত প্রায় কোনো দেশেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কোনো পরীক্ষা হয় না। আজকের এ লেখায় আমরা সেটাই জানার চেষ্টা করব, কীভাবে পরীক্ষা না দিয়েই ফলাফল হয়ে গেল এবং কীভাবে সেখানে পরীক্ষা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইউরোপে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত সব ক্লাস হয়েছে। সেখানে বর্ষ সমাপনী পরীক্ষাগুলো চলে বছরের জুন–জুলাই মাসজুড়ে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যেহেতু এবার কোনো পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই এ বছর প্রতিটি স্কুলের প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষকই শিক্ষার্থীরা সে বিষয়ে কী গ্রেড পাবে, তা নির্ধারণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ক্লাস পারফরম্যান্স ও হোমওয়ার্ককে বিবেচনায় নিয়েছেন তাঁরা। অর্থাৎ স্কুলের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক যদি মনে করেন, একজন শিক্ষার্থী এ গ্রেড পাওয়ার যোগ্য, তাকে এ গ্রেড দিয়েছেন, সি গ্রেড পাওয়ার যোগ্যকে দিয়েছেন সি। শিক্ষকের দেওয়া গ্রেডই চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু কোনো পরীক্ষা হয়নি, তাই শিক্ষকের দেওয়া গ্রেড পরিবর্তনের আর সুযোগও ছিল না। যদিও গত মাসের মাঝামাঝি যখন ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল, তখন অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছে যে তারা কাঙ্ক্ষিত গ্রেড থেকে এবার কম গ্রেড পেয়েছে। যারা এমন মনে করেছে, তাদের জন্য তাদের গ্রেড পুনর্মূল্যায়নে আবেদন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

যদিও স্কুল পাসের ফলাফল কে কোন কলেজে পড়বে, সেটায় কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ, আমাদের দেশের মতো পছন্দমতো কলেজ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না সেখানে। যে যে এলাকায় বসবাস করে, সেখানকার নির্ধারিত কলেজেই তাকে পড়তে হবে। এক এলাকায় থেকে অন্য এলাকার কলেজে ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্কুল নির্বাচনেও একই নিয়ম।

কলেজের হিসাব না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের পর তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয় আছে। আছে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, র‌্যাঙ্কিং, পছন্দের বিষয়। সেটা কীভাবে কোনো ‘টেস্ট’ না নিয়েই করে থাকে তারা?

default-image
বিজ্ঞাপন

মজার ব্যাপার হলো, এই সেপ্টেম্বর থেকে যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হতে যাচ্ছে, তাঁরা উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল পেয়েছেন গত মাসে। অথচ তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এ বছরের জানুয়ারি থেকেই। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমতো পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় আর পছন্দের তিনটি বিষয় নির্বাচন করেন। তারপর পরবর্তী ধাপে কেন তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয়টি নিয়ে স্নাতক করতে চান, তা নিয়ে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার শব্দের একটা মোটিভেশনাল লেটার লিখে পাঠিয়ে দেন পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বিভাগে। কে কত সুন্দর করে তাঁর পছন্দের বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সক্ষমতা লিখতে পারেন, সেটাই একটা ‘টেস্ট’-এর মতো। পছন্দের বিষয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন পাওয়ার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লেখায় ও ভাবনায় দেখাতে হয় নিজস্বতা। তবে ভালো র৵াঙ্কিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কলেজের শিক্ষকদের দেওয়া রেফারেন্স লেটার। শিক্ষকেরা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে কোন শিক্ষার্থী কতখানি ভালো, কতখানি মৌলিকতা আছে, কী বিশেষ যোগ্যতা আছে—এসব বিশদভাবে লিখে পাঠান। এই রেফারেন্স লেটারেই শিক্ষকেরা অনুমাননির্ভর একটা ফলাফল দেন। সেই ফলাফলের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় সেই শিক্ষার্থী কোন র‌্যাঙ্কিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোন বিষয়ে পড়তে পারবেন।

শিক্ষকদের রেফারেন্স লেটার পাওয়ার চার থেকে ছয় সপ্তাহের ভেতর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। সেটা আবার তিন রকম হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন বাতিল করে দিতে পারে। অথবা শর্তসাপেক্ষে ভর্তির আবেদন গ্রহণ করতে পারে। শর্তসাপেক্ষে ভর্তির সুযোগ মানে হচ্ছে চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁকে নির্দিষ্ট গ্রেড পেতে হবে। এর চেয়ে কম পেলে এই ভর্তি আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে। আর শর্তহীন অফার মানে মূল ফলাফল যা–ই হোক না কেন, তিনি চাইলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে কেউ সব কটি থেকেই ভর্তি হওয়ার অফার পেতে পারেন, সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে ইচ্ছেমতো যেকোনো দুটিতে চূড়ান্ত আবেদন করে বাকিগুলো ছেড়ে দিতে হবে। এই দুটির মধ্যে এবার শিক্ষার্থীকে ঠিক করতে হবে কোন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর প্রথম পছন্দ, কোনটা দ্বিতীয় পছন্দ।

default-image

শিক্ষকদের দেওয়া অনুমাননির্ভর ফলাফলের চেয়ে যদি কোনো শিক্ষার্থী কম গ্রেড পায়, তবে তিনি আর তাঁর নির্বাচিত প্রথম পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন না। বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে, সেটা যে শহরেই হোক, পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।

তবে শিক্ষকদের অনুমান–ফলাফলের চেয়ে যদি কেউ খুব কম গ্রেড পান, তবে তিনি দ্বিতীয় পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সুযোগ হারাবেন। এই সংখ্যা খুব একটা হয় না, কিন্তু হলে তাদের অন্য একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, সেটাকে বলে ‘ক্লিয়ারিং’। সব ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর কোথাও যদি শূন্য আসন থাকে, তবে তাঁদের সেখানে ভর্তি করা হয়। তবে আসন খালি নেই বলে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেননি, এমন ঘটনা ঘটে না।

তবে কোনো শিক্ষার্থী যদি শিক্ষকদের দেওয়া অনুমান–ফলাফলের চেয়ে মূল পরীক্ষার ফলাফলে খুব বেশি ভালো ফলাফল করে ফেলেন, তবে তিনি তাঁর দেওয়া পছন্দের দুটির কোনোটিতেই ভর্তি না হয়ে তাঁর চেয়ে ওপরের র৵াঙ্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারেন। এটাও ‘ক্লিয়ারিং’। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী আগের চেয়ে ভালো মানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত হলে আগের দুটি ছেড়ে দিয়ে নতুন আসন নেন। এই প্রক্রিয়ায় কেবল ইউরোপই না, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই ও বিষয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া বছরের গোড়া থেকে শুরু হয় কলেজশিক্ষকদের দেওয়া অনুমান–ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি মূল পরীক্ষা শেষ হলে চার সপ্তাহের ভেতর ফলাফল এবং পরের দুই সপ্তাহের ভেতর পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। উন্নত দেশের পড়াশোনায় আমাদের দেশের মতো এত পরীক্ষানির্ভরতা নেই। প্রথম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পযন্ত কোনো পরীক্ষাই হয় না। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকই মূলত বড় পরীক্ষা। করোনার কারণে তাঁদের পরীক্ষা না নিয়েই গ্রেড দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই খুব সহজেই নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই খুব পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এই করোনার মহামারি সেটাকে তাই সেশন জটের দিকে হয়তো নিয়ে যাবে। আমরা এখনো ভাবতে পারছি না, এ বছরের পিছিয়ে যাওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা না হোক, শিক্ষকেরা তাঁদের গ্রেড দিয়ে দিক। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা না হোক, ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হোক কে কোথায় কোন বিষয়ে স্নাতক করবেন। উন্নত বিশ্বের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার হয়তো একসময় পরিবর্তন হবে। করোনাভাইরাসের এই সময় এ রকম সিদ্ধান্ত সময় বাঁচিয়ে ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনতে হয়তো সক্ষম হবে।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কমনওয়েলথ স্কলার

(কিশোর আলোর সেপ্টেম্বর ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0