ছেলেবেলার ঈদ

আমি জন্মেছি তৎকালীন ঢাকা জেলার এক নিভৃত গ্রামে। মাথার ওপরে বিশাল আকাশে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানোর খেলা। কখনো প্রশান্ত নীল, কখনো নীলচে আভা আবার কখনো-বা বজ্রবিদ্যুতের প্রচণ্ড শব্দ ও বর্ণচ্ছটায় মনে হতো আকাশ বুঝি চৌচির হয়ে ভেঙে পড়বে। ঝড়-বৃষ্টির উন্মত্ততা, নদীনালায় দুই কূলপ্লাবী টইটম্বুর অবস্থা আমাদের আনন্দিত-শিহরিত এবং কিছু পরিমাণে দামাল করে তুলত। গ্রামবাংলায় এখন সেই অবস্থা আর নেই।

আমি তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার নিচু অঞ্চল সিঙ্গাইর থানার চারিগ্রামের কথা বলছি। ঢাকা শহর থেকে মাত্র ২০-২২ মাইল দূরে এই গ্রাম। গ্রামটি বর্ধিষ্ণু কিন্তু যাতায়াতব্যবস্থা সেকালে ছিল অতি দুর্গম। এই গ্রামেই আমার জন্ম এবং আকৈশোর বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক ও হাইস্কুলের পড়াশোনাও এই গ্রামেই। গ্রামে সেকালে জীবনযাত্রা, আনন্দ-উৎসব, পালা-পার্বণ কম ছিল না। ফুটবল খেলা হতো খুব ধুমধামের সঙ্গে। বিশাল শিল্ড উপহার দেওয়া হতো বিজয়ী দলকে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে এই ফুটবল খেলা তো গ্রামীণ বাংলাদেশের বড় বিনোদন। বড় দুই উৎসব ছিল হিন্দুদের পূজা-পার্বণ আর মুসলমানদের ঈদ উৎসব। আমরা পূজা-পার্বণে যোগ দিয়েছি নিজ গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামে। সেই উৎসবে গানবাজনা এবং নানা যাত্রাগানের আয়োজন হতো। রামযাত্রা, অশ্বমেধযজ্ঞ, কৃষ্ণলীলা এসবও দেখেছি প্রচুর। আমাদের গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক মুসলমান সমাজে ঈদ উৎসবও হতো আনন্দময় পরিবেশে। রোজার সময়েই ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। মা-খালা-চাচিরা সেমাই কাটতেন এবং মসলাপাতিসহ ঈদের দিনে খাওয়াদাওয়ার জিনিসপত্র জোগাড় করতেন। আমরা রোজা থাকি বা না থাকি আর কয় দিন পরেই ঈদ, সেটা গোনার প্রতিযোগিতাতেই বেশি ব্যস্ত থাকতাম। আর আসল মজাটা ছিল কে কী জামা নেব, সে বিষয়ে। কেউ কাউকে বলতাম না কোন দরজির দোকানে কোন রঙের কাপড় দিয়ে ঈদের জামা বানাতে দিয়েছি। অনেক কৌতূহল নিয়ে এবং গোয়েন্দাগিরি করেও একজন অন্যজনের জামার রঙের বিষয়টা জানা যেত না। সব্বাই চাইত ঈদের দিন চমক দিতে হবে। আগে যেন কেমন জামা, কী জামা তা ফাঁস না হয়ে যায়। পাকা মসজিদে আমরা মুরব্বিদের হাত ধরে নামাজ পড়তে যেতাম। মসজিদে গিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হওয়ায় বড়ই আনন্দ হতো। মসজিদে হাস্যরস এবং দুষ্টুমি করার জন্য মুরব্বিদের গালিও খেতে হতো। দারুণ লাগত তখন।

গ্রামে ঈদের দিনের নতুন জামাকাপড়, খাওয়াদাওয়া, ফুটবল প্রতিযোগিতার আনন্দ-উৎসব ছাড়াও আর একটি আনন্দ উপকরণের আবির্ভাব ঘটেছিল গত শতকের পঞ্চাশের দশকের সূচনায়। আমাদের পাশের বাড়ির মামাদের বাড়িতে তখন সবে কলের গান (গ্রামোফোন) এসেছে। আজব বাক্সের ভেতর থেকে গান বেরিয়ে আসছে সে এক অবাক কাণ্ড। রবীন্দ্র, নজরুলের গান, কে মল্লিকের গান, আব্বাসউদ্দীনের পল্লিগীতি, আর যতদূর মনে পড়ে জগন্ময় মিত্রের গান শোনা গেছে। আব্বাসউদ্দীনের পল্লিগীতি আর নজরুলের ইসলামি গানের প্রতি মুরব্বিদের দুর্বার আকর্ষণ। আর আমরা শুনতে চাই রূপকথার কাহিনির একটা রেকর্ড। সেটা শোনার জন্য আমাদের প্রবল আগ্রহ। রূপকথার গল্পটা এখন পুরো মনে নেই। এক রাজকুমারীকে আটকে রেখেছিল এক রাক্ষস। তার ভাইয়েরা এসে বীর বিক্রমে উদ্ধার করে তাকে। আমরা প্রবল উ্ণ্ঠাতকয় উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতাম, কখন ভাইয়ের কণ্ঠে শোনা যাবে সেই সংলাপ: ‘কোথায়, কোথায় পালাবে রাক্ষসী, কোথায় তোর জাদুবিদ্যা’ এই বলেই তাদের তরবারির আঘাতে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে রাক্ষসীর মৃত্যুকাতরতা শুনে বিপুল উল্লাস-উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গিয়ে আমরা হাততালি দিয়ে উঠতাম।

বর্ষাকালে ঈদ হলে আরেক ধরনের আনন্দ-উপভোগের সুযোগ ঘটত। নৌকাবাইচ হতো চারিগ্রামের নূরুনিগঙ্গায় অথবা পাশের গ্রাম পারিলের খালে। ছইওয়ালা নৌকার ওপরে বসে চিনাবাদাম চিবোতে চিবোতে নদীতে ভেসে নানা ধরন, সাইজ ও রঙের নৌকার প্রতিযোগিতা দারুণ আনন্দ দিত। দৌড়ের নৌকার ঢাকঢোল, কাঁসর ঘণ্টা, কখনো-বা আলী আলী রণ-হুংকার বা রাধাকৃষ্ণের গান এবং কখনো আবার বিপক্ষ দলের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মক গানের সুরে কলহাস্যমুখরিত হয়ে উঠত পরিবেশ। নৌকাবাইচের এই আড়ংয়ের উৎসবটি ছিল বড়ই মনোরম ও চিত্তসুখকর। এই নৌকাবাইচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল শ্রীকৃষ্ণের মতো ঘোর কৃষ্ণবর্ণের একহারা গড়নের শালপ্রাংশু অবয়বের ইয়াছিন হাজমের অতিদর্শনীয় বাইচের নৌকা। নৌকার গলুইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ইয়াছিনের বাবরি ঝুলিয়ে বাহারি নাচ আর কিছু রং-তামাশার ভিয়ান দেওয়া পাঁচালিতে মন ভরে যেত। সন্ধ্যাবেলায় আমরা নাটকের অভিনয় করতাম। কখনো টিপু সুলতান, কখনো-বা তারাশঙ্করের দুই পুরুষ বা সিরাজউদ্দৌলা নাটক ইত্যাদি অভিনীত হতো। এই ছিল আমাদের ছোটবেলার ঈদ।