বিজ্ঞাপন
সেখানে আবার রাজ্যের তথ্য চেয়ে বসে। ফোনে তির ছোড়ার গেম ইনস্টল করতে গেলে কন্টাক্ট লিস্ট চেয়ে বসে। আর আমরাও সুবোধ বালকের মতো দিয়ে বসি।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরে নিলাম আমি ১৫ বছরের এক কিশোর। স্কুলে যাই নিয়মিত। ছুটিতে ঘুরতে বেরোই। ক্রিকেট আমার সবচেয়ে প্রিয়। পছন্দের খাবার পাস্তা। এখন কেউ যদি বিজ্ঞাপন দেখায়, ঘরের মেঝেতে ব্যবহার করুন আমাদের টাইলস, কী করব? এড়িয়ে যাওয়ার কথা।

এখন এভাবে চললে তো টাইলসের ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দেবে। আয় কমে যাবে। আর তাতেই চিন্তায় পড়ে গেল ফেসবুক। ভেবেচিন্তে বের করল, যার যেটা পছন্দ, তাঁকে তেমন বিজ্ঞাপনই দেখাতে হবে। আর পছন্দ জানতে হলে সে মানুষটা সম্পর্কে জানতে হবে। কিসে তাঁর আগ্রহ, কী ভালো লাগে, কী লাগে না, সেসব জানতে হবে।

আমাদের পোস্ট করা লেখা, ছবি, ইনবক্সে কথোপকথন, কোথায় লাইক দিয়েছি, কোন ভিডিও বেশিক্ষণ দেখছি, কোন ওয়েবসাইটে বেশিক্ষণ থেকেছি, এসব তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করল ফেসবুক। প্রত্যেক ব্যবহারকারীর আলাদা প্রোফাইল তৈরি করল। ফেসবুক সেটা নিজের কাছে না রেখে বিজ্ঞাপনদাতাদের দিয়ে বলল, এই ব্যবহারকারী এটা পছন্দ করে, ওই ব্যবহারকারী ওটা পছন্দ করে। বিজ্ঞাপনদাতারা তা দেখে দেখে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করল।

এসব পুরোনো ঘটনা। প্রযুক্তি আধুনিক হয়েছে। মোবাইল কাছে রেখে ‘কফি খেতে ইচ্ছে করছে’ বললেও নাকি কফিশপের বিজ্ঞাপন দেখায়। আগে দেয়ালের কান নিয়ে সচেতন থাকতে হতো, এখন থাকতে হয় ডিভাইসের কান নিয়ে।

সচেতনতার কথা যখন এলই, আরেকটা কথা বলি। পথেঘাটে কেউ কিছু খেতে দিলেই যে খেতে হয় না, মা–বাবা আমাদের বহুবার সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে ওয়েবে কেউ কিছু চাইলেই যে দিতে হয় না, এখন বরং তা নিয়ে সতর্ক করার সময়।

ওয়েবে অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি দিতে বারণ করা হয়। এর একটা কারণ, ওই মানুষটি তা নিয়ে কী করবেন, আমরা জানি না। আরেকটা কারণ, যে মাধ্যমে পাঠালাম (মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, শেয়ারইট) তা থেকেই যে একদিন ফাঁস হবে না, তা–ও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। সুতরাং সাধু সাবধান (নাম সাধু না হলেও সাবধানতার মার নেই)।

এ তো গেল একটা দিক। ভুঁইফোড় কী সব ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে বলে, সেখানে আবার রাজ্যের তথ্য চেয়ে বসে। ফোনে তির ছোড়ার গেম ইনস্টল করতে গেলে কন্টাক্ট লিস্ট চেয়ে বসে। আর আমরাও সুবোধ বালকের মতো দিয়ে বসি। বরং নিজেকেই প্রশ্ন করো। কেন দেব? যৌক্তিকতা কী? এই কাজে এই তথ্য কেন দরকার? চাহিবামাত্র তথ্য দেওয়ার বিড়ম্বনা যে কী...আচ্ছা, চলো আরেক ঘটনা দিয়ে আজকের মতো বকবক শেষ করি।

ছয় সদস্যের এক পরিবার। মা-বাবা আর চার সন্তান। চারজনের বয়সই দশের নিচে। ওদের ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের বাসায় নিনটেনডো সুইচ গেম কনসোল ছিল। ফিফা খেলত তারা। গেমের নিয়ম হলো, বিশেষ খেলোয়াড়ের জন্য টাকা খরচ করে প্যাক কিনতে হয়। তবে সে প্যাকে কোন খেলোয়াড় পাওয়া যাবে, তা কেনার আগে জানার সুযোগ থাকে না।

বাবার নাম থমাস কার্টার। সন্তানদের আবদারে একদিন ৮ পাউন্ড খরচ করে একটি প্যাক কিনে দিলেন। কেনার সময় ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করেন। তবে কেনা হয়ে গেলে যে কার্ডের তথ্য মুছে ফেলা উচিত ছিল, সেটা তাঁর মনে ছিল না। এরপর যা হওয়ার তা–ই হলো।

সন্তানদের যখন ইচ্ছা মনের আনন্দে ফিফার প্লেয়ার প্যাক কিনতে থাকে আর তাঁদের পারিবারিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটা হয়। এমন করতে করতে একসময় ব্যাংকের সব টাকা ফুরিয়ে তাঁদের পথে বসার মতো অবস্থা হলো।

বিবিসি এই খবর প্রকাশ করে। এরপর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক মা-বাবা তাঁদের কথা লিখে পাঠিয়েছিলেন। বিবিসি সেগুলোও প্রকাশ করেছিল। যাহোক, খবর প্রকাশের পর টাকা ফেরত পেয়েছিল কার্টার পরিবার। বাবা আফসোস করে জানিয়েছিলেন, এই যে এত টাকা খরচ করল, তবু আমার সন্তানেরা তাদের পছন্দের খেলোয়াড় মেসিকে পেল না।

উপদেশ দেওয়ার জন্য লেখা শুরু করেছিলাম। ভেবে দেখলাম, কিশোর আলোর পাঠকেরা যথেষ্ট স্মার্ট। তোমরাই বরং সবাইকে জানিয়ে দিয়ো। বলে দিয়ো, ওয়েবসাইটে কোনো তথ্য চেয়েছে বলেই যেন তারা না দেয়। বলে দিয়ো, ব্যক্তিগত তথ্য যেন ব্যক্তিগত বলেই মানে, যাকে-তাকে যেন না দিয়ে বসে। বলে দিয়ো, তারা যেন অনলাইনে নিরাপদ থাকে।

কিশোর আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন