দ্য রেহমান ডুয়ো—দুজনের ব্যান্ড

২২ মে ২০২০।

করোনার থাবায় সবকিছু যখন বন্ধ, তখন একচিলতে দমকা বাতাসের মতোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে লাগল ‘অন্বয়’। নতুন ব্যান্ড দ্য রেহমান ডুয়োর প্রথম গান। সেভাবে ঝড় বয়ে গেছে, তোলপাড় হয়ে গেছে তাঁদের গানে, তা নয়। তবে একদমই নতুন, ভিন্নধারার গান যাঁরা শুনতে চান, তাঁদের কাছে ‘অন্বয়’ খরার পর হঠাৎ বৃষ্টির মতো। গানটা যে হুট করে হয়ে যায়নি, দ্বিতীয় গান ‘আসর’ দিয়ে তা ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে দ্য রেহমান ডুয়ো। শ্রোতাদের প্রশংসায় তো আপ্লুতই রুবায়াত-রুসলান, যাঁদের গান শুনে বড় হয়েছেন দুজন, তাঁদের কাছ থেকেও পেয়েছেন অভিনন্দন, শুভকামনা। ‘তোমাদের গান এত রিফ্রেশিং আর একেবারেই বাংলা। অন্য কিছুর প্রভাব নেই।’ দ্য রেহমান ডুয়োকে বলেছেন কিংবদন্তি ব্যান্ড ওয়ারফেজের কি–বোর্ডিস্ট শামস্।

সংগীতজগতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও ব্যান্ড হিসেবে দ্য রেহমান ডুয়ো ব্যান্ডের যাত্রা শুরু ২০১৮ সালে। রুসলান-রুবায়াত দম্পতির টাইটেল ‘রেহমান’ থেকেই ব্যান্ডের নামকরণ। শুরুতে ওয়ারফেজ, আর্টসেল, শিরোনামহীন, মেঘদলের কিছু গান কভার করে ইউটিউবে দিয়েছিলেন রুবায়াত। শ্রোতাদের দারুণ সাড়ায় ইউটিউবের সেই ‘দ্য রেহমান ডুয়ো’ চ্যানেলেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের দুটো মৌলিক গান—‘অন্বয়’ আর ‘আসর’। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে রুসলান-রুবায়াতের এই ইন্ডি ফোক বা রক ব্যান্ড।

ছোটবেলায় বাবার চাকরির সূত্রে খুলনায় থাকতেন রুসলান। খুলনার রোটারি স্কুলে পড়ার সময় গিটার শিখতেন স্কুলের পর্তুগিজ ফাদার পিন্টোজের কাছে। তাঁর হাত ধরেই ক্ল্যাসিক্যাল আর ফ্ল্যামেঙ্কো স্টাইলের সঙ্গে রুসলানের পরিচয়। তখন তো বটেই, এখনো ফ্ল্যামেঙ্কো স্টাইলে গিটার বাজাতে দেখা যায় না খুব বেশি মানুষকে। ফেলুদা-শঙ্কুর বইয়ে ডুবে থাকতেন রুসলান। বাকি সময়টায় সুর তুলতেন গিটারে।

বিজ্ঞাপন
ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা নেই আমাদের। আমাদের গান যদি মানুষের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে পারে, তাহলেই আমরা খুশি। আমাদের 'অন্বয়' গানটা শুনে যদি কারও ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক ঠিক হয়, 'আসর' যদি কারও মধ্যে হাহাকার তৈরি করতে পারে, তাহলেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক।
রুসলান রেহমান

খুলনা থেকে বহুদূরে টাঙ্গাইলের ভারতেশ্বরী হোমসের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে পড়তেন রুবায়াত। সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য খ্যাত এই স্কুলে তিনি গান শিখতেন শুরু থেকেই। গাইতেন রবীন্দ্রসংগীত।

দুজন দুই প্রান্তে থাকলেও গান শোনার রুচি প্রায় কাছাকাছি ছিল তাঁদের। এলআরবি, নগর বাউল, ওয়ারফেজ, আর্কের মতো ব্যান্ডগুলোর ভক্ত ছিলেন দুজনই। কিংবদন্তি এই ব্যান্ডগুলোর গান শুনে রুসলান ভাবতেন, ‘ইশ্! এ রকম ব্যান্ড যদি করতে পারতাম!’ ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচয় হয় মেটালিকা, মেগাডেথ, লিনকিন পার্কসহ বিশ্বসংগীতের সঙ্গে। রুসলান তখন ভাবতেন, ওয়ারফেজের মতো গান করবেন, লিনকিন পার্কের মতো ব্যান্ড করবেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি খুঁজে ফিরেছেন তাঁর নিজস্ব সুর।

অন্যদিকে রুবায়াতও নিজের মতো গান করছিলেন। অংশ নিয়েছেন গানের একটা রিয়েলিটি শোতেও। রুবায়াত-রুসলানকে একবিন্দুতে বাঁধল সুর। হুট করে একদিন দেখা হয়ে গেল রুসলানের সঙ্গে। গান নিয়ে অনেক কথা বললেন রুবায়াত। রুসলান তো বরাবরই চুপচাপ, প্রচারবিমুখ। রুবায়াত বুঝতেও পারেননি রুসলান একজন ঝানু শিল্পী। হাসতে হাসতে রুবায়াত বলেন, ‘তখনো বুঝিনি যে আমি চলি ডালে ডালে আর ও চলে পাতায় পাতায়।’

পরিচয় থেকে পরিণয়, তারপর বিয়ে। কোনো নাটকীয়তাই নাকি নেই তাঁদের জীবনের অ্যালবামে। গান নিয়েই রুসলানের কাজ। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল করেন। শতাধিক বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। ওয়েব সিরিজের সংগীত পরিচালনা করেন। সম্প্রতি জনপ্রিয় হওয়া ওয়েব সিরিজ তকদির-এর সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। দিয়েছেন নিজের স্টুডিও। ডিজাইনার আর আঁকিয়ে রুবায়াত নিজের ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি স্টুডিওটাও সামলান।

তবে তাঁদের মাথায় সব সময় ঘুরপাক খায় ব্যান্ডের কথা। স্টুডিওটাই তাঁদের ঘর। নিজেরা গান লিখছেন, মনমতো না হলে কাটাছেঁড়া করছেন শব্দ। সুর করছেন, পছন্দ না হলে বদলে ফেলছেন—সবকিছু দুজন মিলেই। সেদিক থেকে বলা যায় দ্য রেহমান ডুয়ো একটা ২৪ ঘণ্টার ব্যান্ড।

default-image

যদিও গান প্রকাশ করা নিয়ে একেবারেই তাড়াহুড়া নেই তাঁদের। দুজনই জানালেন, নিজেরা সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত গান প্রকাশ করা নিয়ে মাথাব্যথা নেই তাঁদের। দ্য রেহমান ডুয়োর গান যেন মানুষ মনে রাখে, এটাই চাওয়া রুবায়াত-রুসলানের। গানটার কত ভিউ হলো কিংবা কত লাইক-শেয়ার হলো, এসব নিয়ে একটুও মাথা ঘামান না এই দম্পতি। কারণটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন রুবায়াতই, ‘আমরা চাই, মানুষই খুঁজে নিক আমাদের গান।’

‘ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা নেই আমাদের।’ যোগ করলেন রুসলান। ‘আমাদের গান যদি মানুষের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে পারে, তাহলেই আমরা খুশি। আমাদের “অন্বয়” গানটা শুনে যদি কারও ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক ঠিক হয়, “আসর” যদি কারও মধ্যে হাহাকার তৈরি করতে পারে, তাহলেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক।’

দ্য রেহমান ডুয়োর এই কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় তাঁদের শ্রোতাদের মন্তব্যে। ইউটিউবে ‘অন্বয়’ গানের মন্তব্যে তামিম রেজওয়ান নামের একজন শ্রোতা লিখেছেন, ‘গানটা শোনার পর থেকে গানের কথাগুলো মিলিয়ে দেখি জীবনের সঙ্গে মিলে গেছে। যখনই মন খারাপ হয়, তখনই গানটা মাথায় চড়ে ওঠে। কিছুতেই নামাতে পারছি না।’

রুসলান রেহমানকে হেনরি নামের একজন আমেরিকানও বলেছেন, ‘আমি তোমাদের গানের ভাষা বুঝি না, কিন্তু তবু মনে হয় গানটা অনুভব করতে পারছি।’

এটাই চায় দ্য রেহমান ডুয়ো। তাদের সুর, গান ঘুরে বেড়াক সারা পৃথিবী। কিন্তু শিকড়টা সব সময়ই ভেতরে লালন করেন দুজন। রুবায়াত বলেন, ‘বাইরের জগৎটা দেখে নিজের ঘর ভুলে গেলে চলবে না।’

বিজ্ঞাপন
default-image

রুসলানেরও একই অভিমত। ‘অন্য দেশে পপ জনপ্রিয় বলে যে আমাকেও পপ করতে হবে, তা নয়। কিংবা অমুক গান হিট হচ্ছে বলে আমাকেও সে রকম গাইতে হবে, তা–ও নয়। নিজস্বতা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।’

সেভাবেই নিজেদের গানগুলো নিয়ে এগোচ্ছে দ্য রেহমান ডুয়ো। নিজেরা সন্তুষ্ট হলেই পরের গান নিয়ে হাজির হবে নতুন বছরে। নতুন বছর নিয়ে মজার একটা বাতিক আছে রুবায়াতের। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে অনেকটা টু–ডু লিস্টের মতো একটা তালিকা করেন তিনি। নতুন বছরে কী কী করতে চান, নোট করে রাখেন খাতায়। বছর শেষে মিলিয়ে দেখেন কী কী করতে পারলেন, কী কী এখনো করা হলো না। এ বছর রুবায়াতের টু–ডু লিস্টে যেন ‘আরও গান উপহার দেব’ থাকে, সেটাই চাইবেন দ্য রেহমান ডুয়োর ভক্তরা।

এমনিতে প্রচুর শো করেছেন রুবায়াত-রুসলান। কিন্তু নিজেদের গান নিয়ে এখনো কোনো শো করা হয়নি। রুবায়াত এ জন্য দায়ী করলেন করোনাভাইরাসকে। তাঁর কণ্ঠে করোনার বিরুদ্ধে অভিমান। তবে দুজনেরই আশা, করোনার এই ঝড় তো কেটে যাবেই। কোনো একদিন ঝড় থেমে গেলে নতুন ভোরের সূর্য হয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হবে দ্য রেহমান ডুয়ো—এটাই ভক্তদের আশা।

কিশোর আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন