বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
‘ঠিক আছে,’ হাসল মিসেস অ্যাডামস। ‘তবে বেশি দূর যেয়ো না। সন্ধ্যা হতে খুব একটা দেরি নেই কিনা! পল, তুমি ওদের সঙ্গে থেকো।’

‘তা ছাড়া ভালুকের থাবা এত ছোট হয় না,’ যোগ করল অয়ন। মনোযোগ দিয়ে দাগগুলো দেখছে ও।

‘হয়তো ভালুকের ছানা,’ জিমি হার মানতে রাজি নয়।

‘ধ্যাত, কী যে বলিস না!’

‘সব কথা হেসে উড়িয়ে দিস না, অয়ন।’

‘বেশ,’ সোজা হয়ে বলল অয়ন। ‘তাহলে সায়েন্টিফিকেলি এগোনো যাক। ছাপগুলোর মডেল তৈরি করব, যাতে পায়ের আকৃতি দেখে প্রাণীটার পরিচয় বোঝা যায়।’

‘কী যে আবোল-তাবোল বকছিস, তুই-ই জানিস।’ বিরক্ত গলায় বলল জিমি।

‘আবোল-তাবোল বকছি মানে?’ চটে উঠল অয়ন।

‘কী করতে চাস, সেটা সরাসরি বললেই পারিস! এত পেঁচিয়ে কথা বলিস কেন?’

‘আমি পেঁচিয়ে কথা বলি? তবে রে...’ মুঠো পাকাল অয়ন।

‘দাঁড়া, দাঁড়া,’ তাড়াতাড়ি বলল পল। ‘মারামারি বাধাস না। অয়ন কী করতে চাইছে, আমি বুঝতে পারছি। ছাপের ওপর সিমেন্ট–জাতীয় কিছু ঢালতে চাইছে, যাতে সেটা জমাট বেঁধে পায়ের আকৃতি তৈরি হয়, তা–ই না? বাসায় প্লাস্টার অব প্যারিস আছে, এনে দেব?’

‘খুব ভালো হয়,’ অয়ন বলল।

এক দৌড়ে চলে গেল পল। ফিরে এল কয়েক মিনিট পর। হাতে প্লাস্টার অব প্যারিসের প্যাকেট, পানির বোতল আর একটা মাঝারি সাইজের বাটি। সাদা পাউডারের মতো জিনিসটা বাটিতে ঢালল অয়ন, পানি মিশিয়ে থিকথিকে পেস্ট তৈরি করল। তারপর সাবধানে ঢালল একটা ছাপের ওপর।

‘শুকাতে বেশি সময় লাগবে না,’ বলল পল।

‘ততক্ষণে একটু ঘুরে আসা যায়,’ অয়ন বলল। ‘ছাপগুলো ফলো করলে কেমন হয়? প্রাণীটাকে হয়তো দেখতেই পাব।’

‘প্রস্তাবটা মন্দ নয়,’ পল মাথা ঝাঁকাল। ‘চল।’

গাছপালার ভেতর ঢুকে পড়ল তিন বন্ধু। মাটিতে চোখ। ছাপগুলো পরিষ্কার। তবে বনের ভেতর খুব বেশি দূর যেতে হলো না। খানিক পরেই দিক বদলাল ছাপগুলো, সেগুলোকে অনুসরণ করে ওরাও বেরিয়ে এল খোলা জায়গায়। মুখ তুলে দেখল, পলদের বাঁ পাশের শেষ বাড়িটার পেছনে পৌঁছে গেছে।

বড় একটা ওক গাছের গোড়ায় গিয়ে শেষ হয়েছে ছাপের সারি। পল বলল, ‘আর নেই। মনে হচ্ছে গাছে উঠেছে প্রাণীটা।’

‘ভালুক কিন্তু গাছে ওঠে,’ মনে করিয়ে দিল জিমি।

‘জানি,’ অয়ন বলল। ‘তবে সেটা মৌচাক ভেঙে মধু খাওয়ার জন্য। এ জন্য ভালুককে মৌ-চোরও বলে। কিন্তু এই গাছে কোনো মৌচাক দেখছি না। তা ছাড়া ভালুক হলে নেমে আসার চিহ্ন থাকত। ভালুক গাছে বসে থাকে না।’

‘উড়ে গেছে হয়তো,’ ঠাট্টা করল পল। ‘টারজানের মতো লতায় দোল খেয়ে অন্য গাছেও চলে যেতে পারে।’

আহত চোখে ওর দিকে তাকাল জিমি। ‘তুইও?’

ওর কথায় কান দিল না অয়ন। বলল, ‘এখানে ছাপগুলো অনেক বেশি পরিষ্কার। দেখি, একটা তোলা যায় কি না।’

পলদের বাড়ির পেছনে রেখে আসা প্লাস্টার অব প্যারিসের বাটিটা নিয়ে এল ও। নিচু হয়ে একটা ছাপের ওপর মিশ্রণটা ঢালতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এল দ্রুত পদশব্দ। আঁতকে ওঠার আওয়াজ করল জিমি, শুনতে পেল ও। কী ব্যাপার, দেখার জন্য ঘুরতে শুরু করল...আর তখনই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল লোমশ এক দানব!

দুই

ধাক্কা খেয়ে চিত হয়ে পড়ল অয়ন। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফুট আওয়াজ। প্লাস্টার অব প্যারিসের বাটি ছিটকে পড়ল মাটিতে।

‘থামো, রাস্টি! থামো!’ শোনা গেল গম্ভীর গলা।

লিকলিকে শুকনো এক বয়স্ক ভদ্রলোক ছুটে আসছে, কণ্ঠটা তার। সোজা হয়ে হামলাকারীর দিকে তাকাল অয়ন। অতিকায় এক সেইন্ট বার্নার্ড জাতের কুকুর। সারা শরীর বড় বড় লোমে ঢাকা।

‘ওরে বাপ রে!’ বলল জিমি। ‘কত্ত বড় কুকুর!’

‘ওর নাম রাস্টি,’ হাসিমুখে জানাল পল।

কুকুরটার গলায় শিকল বাঁধা আছে, কাছে এসে সেটা টেনে ধরলেন ভদ্রলোক। ‘বসো, রাস্টি। বসো!’

কিন্তু হুকুম মানল না দুরন্ত কুকুর। তিড়িং বিড়িং করে লাফালাফি করছে। শিকল টানতে টানতে রাগে লাল হয়ে উঠল ভদ্রলোকের চেহারা। ধমকাতে শুরু করল রাস্টিকে।

‘রাস্টি শুধু তিনটা হুকুম মানে,’ বলল পল। ‘থামো, বসো, আর দাঁড়াও।’

‘কই, শুনছে না তো,’ শঙ্কিত গলায় বলল জিমি।

অয়ন উঠে দাঁড়িয়েছে। পলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কে উনি?’

‘মি. হেনরি ওয়াইজ,’ বলল পল। ‘বাম দিকের শেষ বাড়িটা ওনার। রাস্টি ওনার হুকুম মানতে চায় না। আসলে... হুকুমগুলো শিখিয়েছেন মি. স্মিথ, রাস্টি শুধু তাঁর কথা শোনে।’

‘কুকুরটার মালিক কে? মি. ওয়াইজ, নাকি মি. স্মিথ?’

‘মি. ওয়াইজ। তবে উনি বেশির ভাগ সময় বাইরে বাইরে থাকেন, রাস্টিকে রেখে যান মিস্টার আর মিসেস স্মিথের কাছে।’

অবশেষে শান্ত হয়েছে রাস্টি। হাঁপাতে শুরু করল লম্বা জিভ বের করে দিয়ে। মি. ওয়াইজের সঙ্গে অয়ন আর জিমিকে পরিচয় করিয়ে দিল পল।

কোনো ধরনের সৌজন্য দেখাল না ভদ্রলোক। রাগী গলায় বলল, ‘রিটায়ারমেন্টের পর এখানে বাসা নিয়েছি দুদণ্ড শান্তিতে থাকব বলে। তোমাদের জন্য দেখছি তার উপায় নেই। আওয়াজ করছ, আমার পোষা কুকুরকে খেপাচ্ছ...ময়লা ছড়িয়ে দেখছি পরিবেশও নষ্ট করছ! ব্যাপারটা কী?’

‘কোথায় ময়লা?’ জিমি অবাক।

আঙুল তুলে মাটিতে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টার অব প্যারিস দেখাল মি. ওয়াইজ।

‘ইচ্ছে করে ফেলিনি,’ অয়ন বলল। ‘আমরা আসলে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম...’

‘কৈফিয়ত শুনতে চাই না,’ ওকে থামিয়ে দিল মি. ওয়াইজ। ‘সব পরিষ্কার করো এখনই।’

প্রথম ছাঁচটা তুলে নিল অয়ন। বলল, ‘এই তো, এটা শুকিয়ে গেছে। বাহ্, থাবা আর নখের ছাঁচ ভালোই বসেছে দেখছি।’ জিনিসটা বাড়িয়ে ধরল বাকিদের দেখার জন্যে।

চোখ পিট পিট করল মি. ওয়াইজ। ‘কিসের ছাপ এটা?’

‘জানি না। আপনার কী মনে হয়?’

কাঁধ ঝাঁকালেন মি. ওয়াইজ। ‘বিড়াল হতে পারে। সেদিন শুনলাম, জিম গ্যারিটি কতগুলো বিড়াল এনেছে পোষার জন্যে। ওগুলোর কোনোটা হয়তো রাতের বেলা বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে।’

‘উঁহু, বিড়াল না,’ মাথা নাড়ল অয়ন। ‘বিড়ালের থাবা এত বড় হয় না। মি. গ্যারিটির বিড়ালগুলো আপনি দেখেছেন?’

‘না,’ মাথা নাড়লেন ওয়াইজ। ‘জিমের সঙ্গে খাতির নেই কারও। নিজের মতো থাকে। আজ পর্যন্ত ওর বাড়িতে ঢুকিনি।’

‘হুম। ইন্টারেস্টিং!’

‘আগামীকাল তোদের দানব ভালুকের গুহাটা দেখাতে নিয়ে যাব,’ বলল পল। ‘ওখানে হয়তো ছাপের মালিকের দেখা পাওয়া যাবে।’

‘যা খুশি করো,’ বলল ওয়াইজ। ‘কিন্তু আমাকে আর বিরক্ত কোরো না। এরপর কিন্তু আমি তোমার মা–বাবার কাছে গিয়ে নালিশ করব।’

রাস্টির শিকল টানতে টানতে চলে গেল ওয়াইজ।

‘ওঁর কথায় কিছু মনে করো না,’ বন্ধুদের বলল পল। ‘খিটখিটে স্বভাবের মানুষ। সবার সঙ্গেই এভাবে কথা বলেন।’

‘না, কিছু মনে করছি না,’ হাতে ধরা ছাঁচটা নাড়াচাড়া করছে অয়ন। ‘আমি ভাবছি ছাপটা নিয়ে। ভালুক ভাবার মতো বড় না, কিন্তু ভালুকের পায়ের সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে।’

‘ভালুকের বাচ্চা,’ বলল জিমি। ‘আমি তো আগেই বলেছি।’

‘ধ্যাত্তেরি! ভালুক ভালুক করে তুই দেখি আমাদের মাথা খারাপ করে দিবি,’ বিরক্ত গলায় বলল অয়ন। ‘এদিকে আয়, হাত লাগা।’

ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টার অব প্যারিস পরিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তিন বন্ধু। কুড়িয়ে নিল দ্বিতীয় ছাঁচটাও। ওটা ভালো করে দেখল অয়ন। বলল, ‘হুম, মডেল বেশ ভালোই তৈরি হয়েছে। দেখা যাক, এ থেকে প্রাণীটাকে আইডেন্টিফাই করা যায় কি না। এরপর ওটাকে খুঁজে বের করব।’

‘ওসব পরে করা যাবে,’ পল বলল। ‘এখন চল, ডিনারের সময় হয়ে গেছে।’

হাঁটতে শুরু করল তিনজন। লাল রঙের একটা বাড়ির পেছনের আঙিনা পেরুচ্ছে, এমন সময় ওটার একটা জানালায় চোখ আটকে গেল জিমির। কাচের ওপাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা ড্রাগনের মতো মুখ।

‘ওরে বাবা!’ আঁতকে উঠল ও। ‘কী ওটা?’

ওদিকে তাকাল পল। বলল, ‘ইগুয়ানা...পোষা ইগুয়ানা। একধরনের গিরগিটি ওটা।’

‘কী বিশ্রী চেহারা!’ মন্তব্য করল জিমি। ‘কে পোষে ওটা? ড্রাকুলা, নাকি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন?’

হাসল পল। ‘ইগুয়ানাটার মালিক মি. ড্যারেন স্মিথ ও তাঁর স্ত্রী।’ বাড়ির পাশ ঘুরে মোটাসোটা একজন ভদ্রলোককে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। ‘ওই তো, মি. স্মিথ এসে গেছেন।’

কাছাকাছি এলে দুই বন্ধুর সঙ্গে ভদ্রলোককে পরিচয় করিয়ে দিল সে। ওদের সঙ্গে হাত মেলাল স্মিথ। বলল, ‘সো নাইস টু মিট ইউ। তোমাদের হাতে ওগুলো কী?’ ইশারা করল প্লাস্টারে তোলা মডেল দুটোর দিকে।

‘মাটিতে অদ্ভুত কতগুলো পায়ের ছাপ দেখতে পেয়ে ছাঁচ তুললাম,’ বলল অয়ন। একটা মডেল দেখতে দিল মি. স্মিথকে। ‘নখগুলো কত লম্বা, খেয়াল করেছেন? কিসের ছাপ, বুঝতে পারছি না।’

‘আমিও পারছি না,’ বলল মি. স্মিথ। গম্ভীরভাবে নেড়েচেড়ে দেখছে মডেলটা। সন্দেহ হলো অয়নের, কিছু কি গোপন করছে?

‘একদমই কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন না?’

‘না,’ মডেলটা ফিরিয়ে দিল মি. স্মিথ। ‘কোনো জিয়োলজিস্টকে দেখালে হয়তো বলতে পারবে।’

‘জিয়োলজিস্ট কোথায় পাব?’ কাঁধ ঝাঁকাল পল। ‘তার চেয়ে নিজেরা খোঁজাই ভালো। আগামীকাল যখন দানব ভালুকের গুহাটা দেখতে যাব, তখন ভালো করে খুঁজব। কী বলিস?’ বন্ধুদের দিকে তাকাল সে।

একটু যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল মি. স্মিথ। বলল, ‘এ সময় বনেবাদাড়ে না ঘোরাই বোধ হয় ভালো।’

‘কেন?’ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল অয়ন।

সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারল না মি. স্মিথ। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ‘না, মানে...ছাপগুলো কিসের, সেটা তো জানো না। হিংস্র কোনো জানোয়ারও তো হতে পারে।’

‘ভালুকের কথা বলছেন?’ জিমির প্রশ্ন।

‘ভালুক?’ ভ্রুকুটি করল স্মিথ। ‘না, তা বলব কেন? এদিকে কোনো ভালুক নেই।’

‘কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন?’

‘জিয়োলজিস্ট না হলেও মি. স্মিথ কিন্তু জীবজন্তুর বিষয়ে ছোটখাটো একজন বিশেষজ্ঞ,’ বলল পল।

‘না, না, সে রকম কিছু না,’ বিব্রত হলো স্মিথ। ‘কয়েকটা পোষা প্রাণী আছে আমার—এক জোড়া প্যারাকিট, কিছু দুর্লভ মাছ, আর জানালার ধারের ওই ইগুয়ানা। ব্যস, এই আর কী।’

‘ইগুয়ানাটা পেলেন কীভাবে?’ জানতে চাইল অয়ন।

‘এদিককার অ্যানিমেল শেল্টারে কে যেন ফেলে গিয়েছিল। মায়া হলো, তাই নিয়ে এলাম। ওই শেল্টারটায় আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মাঝেমধ্যে কাজ করি।’

‘অ্যানিমেল শেল্টারে ইগুয়ানা?’ কপালে ভাঁজ পড়ল অয়নের। ‘আমার ধারণা ছিল, ওখানে শুধু বেওয়ারিশ কুকুর আর বিড়াল থাকে।’

‘কথাটা ঠিক না। আজকাল কিছু পছন্দ না হলেই অ্যানিমেল শেল্টারে ফেলে দিয়ে আসে লোকে। সেদিন কী জমা পড়েছে, জানো? একটা কোয়াটিমান্ডি!’

‘সেটা আবার কী?’ জিজ্ঞেস করল জিমি।

‘বেজির মতো একটা প্রাণী, দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া যায়,’ বলল মি. স্মিথ। ‘এক মহিলা দিয়ে গেছে। দেখতে ভালো লেগেছে বলে নাকি পুষতে চেয়েছিল। পরে যখন টের পেল, ওটার ধারালো দাঁত আর নখ আছে, ভয় পেয়ে নিয়ে এসেছে শেল্টারে। জানতে চেয়েছিলাম, ওটাকে কোত্থেকে জোগাড় করেছে। জবাবে মিথ্যে কথা শোনাল, ওর এক বন্ধু নাকি উপহার দিয়েছে।’

‘কথাটা মিথ্যে ভাবছেন কেন?’

‘কারণ, এসব প্রাণী চোরাই পথে আমেরিকায় আনা হয়, তারপর বিক্রি করা হয় কালেক্টরদের কাছে। কাজটা বেআইনি। বেআইনি জিনিস কেউ উপহার দেয় না।’ হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মি. স্মিথ। ‘কী জঘন্য ব্যাপার! অসহায় জন্তুগুলোকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে ছিনিয়ে আনা হয় বিক্রি করার জন্যে!’

বাড়ির পেছনের দরজা খুলে গেল এ সময়। ধূসর চুলের এক মহিলা বেরিয়ে এল। মিসেস স্মিথ...হাবভাবে বোঝা গেল পরিষ্কার। গলা চড়িয়ে স্বামীকে ডাকল, ‘ড্যারেন?’

ঘাড় ফেরাল মি. স্মিথ। ‘হ্যাঁ, বলো।’

‘অ্যানিমেল শেল্টার থেকে মিসেস জর্ডান এসেছেন। সঙ্গে একটা কুকুরছানা। তুমি নাকি ওটাকে রাখতে চেয়েছ?’

‘হ্যাঁ... হ্যাঁ। এখনই আসছি।’

বাড়ির ভেতর আবার অদৃশ্য হয়ে গেল মিসেস স্মিথ।

অয়নের জামায় লেগে থাকা কুকুরের পায়ের ছাপ চোখে পড়ল মি. স্মিথের। হেসে বলল, ‘মনে হচ্ছে রাস্টির সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে তোমার।’

‘আর বলবেন না,’ মুখ বাঁকাল অয়ন। ‘কুকুর তো না, একটা দানব!’

‘দেখতেই অমন, কিন্তু খুব ভালো কুকুর। আমার কাছেই থাকে বেশির ভাগ সময়। মি. ওয়াইজ ভ্রমণবিলাসী মানুষ, বাড়িতে খুব কম থাকেন। কোথাও গেলে আমার কাছে রেখে যান রাস্টিকে। আগামী সপ্তাহেও দেশের বাইরে যাবেন শুনেছি।’

‘কয়েক বছর আগে এক লোক এই জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, সে ভালুকের শিকার হয়েছিল।’

‘এসব উটকো ঝামেলায় বিরক্ত হন না?’

‘ঝামেলা ভাবতে যাব কেন? পশু–পাখি ভালোবাসি আমি...’

‘ড্যারেন!’ বাড়ির ভেতর থেকে শোনা গেল ডাক।

‘আসছি!’ তড়িঘড়ি করে বলল মি. স্মিথ। ছেলেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

‘পশু–পাখিকে সত্যিই ভালোবাসেন ভদ্রলোক,’ আনমনে বলল অয়ন। ‘জানেনও অনেক কিছু...যদিও সেটা মুখে বলছেন না।’

ঝট করে ওর দিকে তাকাল জিমি। ‘বলতে চাইছিস ছাপটা কিসের, তা বুঝতে পেরেছেন উনি? তাহলে বললেন না কেন?’

‘এমন একটা উদ্ভট চিন্তা তোর মাথায় এল কেন?’ পল সুর মেলাল। ‘ওঁর কথাবার্তা শুনে আমার তো অমন কিছু মনে হলো না।’

‘যা বলেননি, সেটাই ইম্পরট্যান্ট,’ বলল অয়ন।

‘কথাটা বুঝলাম না।’

‘ওকে সরাসরি কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম, সবই এড়িয়ে গেলেন। ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়...’

কথা শেষ হলো না অয়নের। তার আগেই দূর থেকে ভেসে এল বিজাতীয় একটা চিত্কার!

তিন

চঞ্চল হয়ে উঠল তিন বন্ধু।

‘ক্...কিসের আওয়াজ?’ বিভ্রান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল পল।

জবাব দিল না অয়ন। ছুটল শব্দের উত্স লক্ষ্য করে। ওকে অনুসরণ করল জিমি আর পল। মি. স্মিথের বাড়ির পাশ ঘুরে বেরিয়ে এল সামনের রাস্তায়।

আবার শোনা গেল আওয়াজটা। ওদিকে তাকাতেই শেষ প্রান্তের ড্রাইভওয়েতে একটা ভ্যান দেখতে পেল ওরা। পেছনের দরজা খোলা। তাতে মাঝারি আকারের কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স তুলছে একজন যুবক। বাক্সগুলোর গায়ে রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটা ফুটো, বাতাস চলাচলের জন্যে। শেষ বাক্সটা তুলতেই আবারও শোনা গেল অদ্ভুত চিত্কার, ফুটো দিয়ে বেরিয়ে এল একটা লোমশ পা। যুবক নির্বিকার, বাক্সটা তুলে ফেলল ভ্যানে।

‘কী ওটা?’ কাছে গিয়ে জানতে চাইল অয়ন।

ভ্যানের দরজা বন্ধ করল যুবক, তারপর ঘুরল ওর দিকে। তার ডান হাতের অনামিকায় শোভা পাচ্ছে একটা বড় পাথর বসানো আংটি। ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘কে তুমি?’

তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল পল। বলল, ‘এরা আমার বন্ধু, মি. গ্যারিটি। উইকেন্ড কাটাতে এসেছে। অয়ন, জিমি...ইনি আমাদের প্রতিবেশী মি. জিম গ্যারিটি।’

দায়সারা ভঙ্গিতে কুশল বিনিময় করল গ্যারিটি, তারপর বলল, ‘গল্প করতে পারলে খুব খুশি হতাম, কিন্তু আমার তাড়া আছে। পোষা বিড়ালগুলোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি—টিকা দেওয়ার জন্যে।’

‘অ! বাক্সগুলোয় তাহলে বিড়াল নিয়ে যাচ্ছেন?’ জিজ্ঞেস করল অয়ন।

‘বিড়ালের এ রকম চিত্কার কখনো শুনিনি,’ বলল জিমি।

‘ভয় পেলে বা নার্ভাস হলে অনেক রকম আওয়াজ করতে পারে ওরা,’ হেসে বলল গ্যারিটি। ‘আমি যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

‘এক মিনিট,’ বাধা দিল অয়ন। ‘একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যান।’ একটা মডেল দেখাল। ‘এই ছাপগুলো আমরা পেছনের জঙ্গলে পেয়েছি। কিসের ছাপ, বলতে পারেন?’

একটু যেন অবাক হলো গ্যারিটি। এরপর কাঁধ ঝাঁকাল। ‘কী জানি। দেখে তো ভালুকের পায়ের ছাপের মতো লাগছে। জঙ্গলে পেয়েছ? তাহলে ওদিকে আর যেয়ো না। ভালুকের কবলে পড়তে পারো।’

‘কিন্তু এদিককার জঙ্গলে তো কোনো ভালুক নেই!’ প্রতিবাদ করল অয়ন। ‘আমরা খোঁজ নিয়েছি।’

‘তাহলে আরও ভালোমতো খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল,’ বলল গ্যারিটি। নার্ভাস ভঙ্গিতে আঙুল বোলাল হাতের আংটির পাথরে। ‘কয়েক বছর আগে এক লোক এই জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, সে ভালুকের শিকার হয়েছিল।’

কথাটা সে এমনভাবে বলল, গা শিরশির করে উঠল জিমির। কিন্তু অয়নের কোনো ভাবান্তর নেই। গম্ভীর গলায় জানতে চাইল, ‘কবেকার ঘটনা এটা? নিখোঁজ লোকটার নাম কী?’

থতমত খেয়ে গেল গ্যারিটি। বলল, ‘এত প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

ভ্যানে উঠে পড়ল সে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে পেছাতে শুরু করল, ড্রাইভওয়ে থেকে গাড়ি নামাল রাস্তায়। মুখ ঘুরিয়ে এগোতে শুরু করল, কিন্তু বাধা পেল কিছু দূর যেতেই। রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা অতিকায় পিকআপ, ফার্নিচার তুলছে। পথ বন্ধ। থমকে দাঁড়াল গ্যারিটির ভ্যান।

‘ওটা মিস সিলিয়া প্যাটারসনের বাড়ি,’ যে বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পিকআপ, সেটার দিকে ইশারা করে বলল পল। ‘অবিবাহিতা। মা আর এক খালাকে নিয়ে থাকেন। পেশায় ফার্নিচার ডিজাইনার। বাড়িতে বসেই কাজ করেন। সে জন্যই মাঝেমধ্যে আসে ওই পিকআপ—অর্ডারের মালামাল পৌঁছে দিতে, কিংবা তুলে নেওয়ার জন্যে। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় তখন। অবশ্য এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কাউকে অভিযোগ করতে শুনিনি।’

‘মি. গ্যারিটি করছেন,’ সংক্ষেপে বলল অয়ন।

ভ্যানের জানালা দিয়ে মাথা বের করেছে গ্যারিটি, হইচই জুড়েছে পিকআপের লোকের সঙ্গে।

‘হুম। ভদ্রলোকের দেখছি সত্যিই খুব তাড়া।’

‘ওই পিকআপ কি ঘন ঘন আসে এখানে?’ জিজ্ঞেস করল অয়ন।

‘সপ্তাহে একবারের বেশি নয়,’ পল জানাল।

‘পিকআপের রুটিন জানতে চাইছিস কেন?’ প্রশ্ন করল জিমি। ‘এর সঙ্গে অচেনা জন্তুটার কী সম্পর্ক?’

‘হয়তো কোনো সম্পর্কই নেই,’ বলল অয়ন। ‘কিন্তু সব ধরনের তথ্য জানা থাকা ভালো।’

‘কেন?’

‘কিছু একটা রহস্য আছে এখানে। আমি সেটা টের পাচ্ছি পরিষ্কার। রহস্যটা ভেদ করতে হবে আমাদের।’

‘অ্যাই ছেলেরা!’ পেছন থেকে ভেসে এল অ্যাবির ডাক। ঘাড় ফেরাতেই ওকে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তিন বন্ধু। ‘তোমরা ওখানে কী করছ? এদিকে আমি খুঁজে খুঁজে হয়রান। জলদি এসো, ডিনারের সময় হয়ে গেছে।’

মাথা ঝাঁকিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল ছেলেরা। ওদেরকে কিচেনে নিয়ে গেল অ্যাবি। বেড়ে দিল খাবার।

‘এ কী!’ বলে উঠল পল। ‘এই বুঝি ডিনার? হট ডগ আর ফ্রুট সালাদ! নিশ্চয়ই তোমার কাণ্ড, অ্যাবি?’

‘শোকর করো যে এগুলো পেয়েছ,’ মুখ ঝামটে উঠল অ্যাবি। ‘নইলে উপোস থাকতে।’

‘মানে কী! আম্মু কোথায়?’

‘ঘর গোছাচ্ছে। রান্নার সময় পায়নি, তাই আমাকে বলল কিছু একটা তৈরি করে দিতে। আমার পক্ষে এর চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব না।’

‘তাই বলে...আমার বন্ধুরা বেড়াতে এসেছে...ওরা এসব খাবে? ওদের মেহমানদারি হবে না?’

‘বাদ দে তো,’ বন্ধুকে বলল অয়ন। ‘মেহমানদারির জন্যে পুরো উইকেন্ড পড়ে আছে। একবেলা হট ডগ খেলে কিচ্ছু হবে না। তা ছাড়া...ডিনারে ভারী খাবার না খাওয়াই ভালো। কী বলিস, জিমি?’

‘ঠিক বলেছিস,’ জিমি সায় জানাল।

‘তাহলে তো আর কথাই রইল না,’ বলল অ্যাবি। ‘চুপচাপ খেতে থাকো। আর হ্যাঁ, এঁটো ছড়িয়ে কিচেন নোংরা কোরো না। আমি পরিষ্কার করতে পারব না।’

‘আমরা বরং পেছনের বারান্দায় গিয়ে খাওয়াটা সারি,’ জিমি বলল। ‘তাহলে আর কিচেন নোংরা হওয়ার ভয় থাকবে না।’

‘সেটা তোমাদের মর্জি।’

খাবারের প্লেট আর ফ্রুট সালাদের বাটি নিয়ে পেছনের বারান্দায় বেরিয়ে এল ছেলেরা।

ক্ষুব্ধ গলায় পল বলল, ‘এই অভদ্রটাকে নিয়ে আর পারি না। মেহমানের সঙ্গে কেউ এমন করে?’

‘আমরা কিন্তু নিজেদের মেহমান ভাবছি না,’ বলল অয়ন। ‘খামোকা ওসব নিয়ে মাথা গরম করিস না।’

তাতে শান্ত হলো না পল। আপনমনে গজগজ করতে থাকল। অবশ্য একটু পরেই ভুলে গেল সব। পরিবেশটা সুন্দর। বারান্দা থেকে চোখে পড়ছে পেছনের অরণ্যের গাছগাছালির সারি—ডুবন্ত সূর্যের আলোয় সোনারঙা আভায় সেজেছে। শোনা যাচ্ছে নাম না জানা হাজারো পাখির কলতান। বারান্দার এক প্রান্তে রাখা টেবিলে বসে ডিনার সারতে সারতে সেসব উপভোগ করতে থাকল তিন বন্ধু।

হঠাৎ পরিবেশটায় ছন্দপতন ঘটাল একটা ভয়ার্ত নারীকণ্ঠ। ‘মা গো!’ বলে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা, কয়েক সেকেন্ড পরেই পাশের বাড়ির পেছন থেকে তাকে ছুটে আসতে দেখল ওরা। বয়স বেশি নয়, পঁচিশ থেকে ত্রিশের মধ্যে—পড়িমরি করে ছুটছে। দুই বাড়ির মাঝখানের ফাঁকাটা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া মাথায় উঠল, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তিন বন্ধু। দৌড়ে বারান্দা থেকে নেমে এল ওরা, পিছু নিল তরুণীর।

সামনের রাস্তায় পৌঁছে থামল মেয়েটা। হাঁপাচ্ছে। কাছে গিয়ে ছেলেরাও থামল। গোলমালের আওয়াজ শুনে পলদের বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল মিসেস অ্যাডামস।

‘সিলিয়া!’ তরুণীকে লক্ষ করে বলে উঠল সে। ‘কী হয়েছে?’

‘একটা জানোয়ার...বাড়ির পেছনে...’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সিলিয়া, ‘...আরেকটু হলেই...’

‘কী জানোয়ার?’ জানতে চাইল অয়ন।

‘জানি না। ...র‌্যাকুনের মতো লাগল। কিন্তু র‌্যাকুন না।’

‘কী করেছে ওটা?’

‘বাড়ির পেছনে ময়লা ফেলতে যাচ্ছিলাম, আচমকা সামনে উদয় হলো। আমাকে দেখতে পেয়েই হিসিয়ে উঠল। লম্বা লম্বা নখ, আর ধারালো দাঁত...বাপ রে! মনে হচ্ছিল হামলা করবে। ভয়ে চিত্কার দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছি।’

‘কথা নেই, বার্তা নেই, একটা র‌্যাকুন কেন আপনাকে আক্রমণ করবে?’ জিমির গলায় সন্দেহ।

‘বললাম তো, র‌্যাকুন না। অন্য কিছু। হিংস্র প্রাণী।’

সিলিয়ার দিকে এগিয়ে এল মিসেস অ্যাডামস। ‘এখানে কোনো হিংস্র প্রাণী নেই, সিলিয়া। আমার মনে হচ্ছে তুমি অযথাই ভয় পেয়েছ।’

‘ব্যাপারটা সত্যিও হতে পারে,’ বলল অয়ন। ‘মিস সিলিয়া, প্রাণীটার পা দেখেছেন আপনি?’

‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল সিলিয়া। ‘চওড়া পায়ের পাতা, নখগুলো লম্বা। গাছের ডালে লেজ পেঁচিয়ে ঝুলে ছিল।’

মুখ চাওয়াচাওয়ি করল তিন বন্ধু। পায়ের বর্ণনা, কিংবা ঝুলে থাকার কায়দা...কোনোটাই র‌্যাকুনের সঙ্গে মেলে না। এ নিশ্চয়ই সেই রহস্যময় প্রাণীটা!

‘ওটা এখন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল পল।

‘জানি না। দেখার জন্যে অপেক্ষা করিনি।’

ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেল। রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে জিম গ্যারিটির গাড়ি, পশু ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে আসছে নিশ্চয়ই। ওদেরকে পেরিয়ে নিজের বাড়ির সামনে চলে গেল সে, ড্রাইভওয়েতে গাড়ি রেখে ঢুকে পড়ল বাড়িতে। ফিরে তাকাল না পর্যন্ত।

‘জিম মনে হচ্ছে রেগে আছে আমার ওপর,’ বলল সিলিয়া। ‘আমার ডিজাইন করা একটা টেবিল নেওয়ার জন্যে পিকআপ এসেছিল, রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওটার কারণে। জিমের নাকি দেরি হয়ে গেছে তাতে।’

‘বাদ দাও ওর কথা,’ বলল মিসেস অ্যাডামস। ‘আমার সঙ্গে চলো, চা খাওয়াব। তুমি তো এখনো কাঁপছ।’

মাথা ঝাঁকিয়ে তাঁর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল সিলিয়া।

অয়ন ও জিমির দিকে ফিরে পল বলল, ‘চল, আমরাও যাই। ডিনার শেষ করি গে।’

বাড়ির পেছনের বারান্দায় পৌঁছাতেই থমকে দাঁড়াতে হলো। ওদের খাবারের প্লেট-বাটি সব গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। হট ডগে হাত দেওয়া হয়নি, কিন্তু উধাও হয়ে গেছে ফ্রুট সালাদ।

‘কী সর্বনাশ!’ চেঁচিয়ে উঠল পল। ‘নিশ্চয়ই রাস্টির কাণ্ড!’

‘উঁহু, রাস্টি না,’ গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল অয়ন। ‘রাস্টি হলে হট ডগ খেত। কিন্তু এখান থেকে গায়েব হয়েছে শুধু ফলের সালাদ।’

‘ভালুকেরা ফলমূল খায়,’ ইতস্তত করে বলল জিমি।

‘হট ডগও খায়,’ বলল অয়ন। ‘ভালুক সবকিছুই খায়।’

‘তাহলে কে ঘটাল এ কাণ্ড?’

‘নিশ্চয়ই সেই রহস্যময় প্রাণী।’

‘কিন্তু কী সেটা?’

জবাব দিল না অয়ন। নিচু হয়ে কুড়োতে শুরু করল মাটিতে পড়ে থাকা প্লেট, বাটি আর খাবার। বাকি দুজন যোগ দিল ওর সঙ্গে।

গ্যারিটি বলল, ‘ভালোর জন্যে সাবধান করতে এসেছিলাম। শোনা না-শোনা আপনার মর্জি। আচ্ছা, আসি।’

রাতে বসে বসে টিভি দেখছে তিন বন্ধু, এমন সময় বেজে উঠল কলিংবেল। মি. অ্যাডামস দরজা খুলতে গেল, এরপরেই শোনা গেল জিম গ্যারিটির গলা।

‘না, বসব না। আপনাকে একটা জরুরি কথা বলতে এলাম। আপনার ছেলে আর ওর দুই বন্ধুকে একটু চোখে চোখে রাখবেন, ওরা যেন বনের ভেতরে না যায়। বিপদের ভয় করছি আমি।’

জবাবে কী যেন বলল মি. অ্যাডামস, ঠিকমতো শোনা গেল না। তার কথায় গ্যারিটি যেন একটু রেগে গেল।

ক্ষুব্ধ গলায় লোকটা বলল, ‘জানি, পল আশপাশটা ভালো করেই চেনে। কিন্তু ভুল করে যদি বনের গভীরে চলে যায়, তাহলে কী ঘটবে ভেবে দেখেছেন? তা ছাড়া ইদানীং ভালুকের উত্পাতের কথা কানে আসছে...’

তাকে থামিয়ে দিল মি. অ্যাডামস। বিরক্ত গলায় বলল কিছু।

গ্যারিটি বলল, ‘ভালোর জন্যে সাবধান করতে এসেছিলাম। শোনা না-শোনা আপনার মর্জি। আচ্ছা, আসি।’

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। খানিক পর টিভি রুমে ঢুকল মি. অ্যাডামস।

‘বাবা, মি. গ্যারিটির কথা আমরা শুনতে পেয়েছি,’ বলল পল। ‘খামোকা দুশ্চিন্তা কোরো না। আমাদের কিছু হবে না।’

‘ওর কথায় আমিও কান দিচ্ছি না,’ বলল মি. অ্যাডামস। ‘তোমাদের ওপর আমার আস্থা আছে। জানি, অকারণে কোনো ঝুঁকি নেবে না।’

‘ভালুকের কথা বললেন কেন?’ অয়নের প্রশ্ন। ‘সত্যিই কি ভালুকের উত্পাত আছে এদিকে?’

‘আরে নাহ্,’ মাথা নাড়ল মি. অ্যাডামস। ‘ভালোমতো খোঁজখবর নিয়ে তবেই এ বাড়ি কিনেছি আমি। লোকটা হয়তো কোথাও গুজব শুনে এসেছে।’

মিসেস অ্যাডামস উদয় হলো। বলল, ‘মি. ওয়াইজের সঙ্গে মিল পাচ্ছি জিমের। খানিক আগে ফোন করেছিলেন। উনিও বললেন, ছেলেদের যেন বনে যেতে না দিই। ওরা নাকি বুনো প্রাণীদের বিরক্ত করছে।’

‘তুমি কী বললে?’ জিজ্ঞেস করল মি. অ্যাডামস।

‘বললাম যে, ওঁর ধারণা ভুল। প্লাস্টারের ছাঁচ তুললে বুনো প্রাণীদের কোনো ক্ষতি হয় না।’

‘এঁদের সমস্যা কী?’ বিরক্ত গলায় বলল জিমি। ‘আমরা বনে গেলে ওঁদের কী অসুবিধে?’

‘ভালো প্রশ্ন,’ মন্তব্য করল অয়ন। ‘আমিও এর জবাব জানতে চাই। আমাদের বন থেকে দূরে রাখতে চাইছেন কেন এঁরা?’

‘বিশেষ কোনো কারণ না-ও থাকতে পারে,’ বলল মিসেস অ্যাডামস। ‘স্বভাবই হয়তো এমন—অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো। এত দিন অবশ্য টের পাইনি।’ ঘড়ি দেখল মিসেস অ্যাডামস। ‘বাব্বাহ্! দশটা বেজে গেছে দেখছি! ছেলেরা, শুতে যাও। এখন আর টিভি দেখতে হবে না।’

টিভিতে আকর্ষণীয় কিছু হচ্ছেও না। তাই দ্বিরুক্তি না করে উঠে পড়ল তিন বন্ধু। সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল দোতলায়। কামরার দরজায় বিদায় নেওয়ার সময় পল বলল, ‘সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়িস। ব্রেকফাস্ট সেরে তোদের দানব ভালুকের গুহাটা দেখাতে নিয়ে যাব।’

‘ভালো প্রস্তাব,’ বলল অয়ন। ‘তাহলে সকালে দেখা হবে। গুড নাইট।’

‘গুড নাইট।’

গেস্টরুমে ঢুকে পড়ল দুই বন্ধু। হাত-মুখ ধুয়ে, রাতের পোশাক পরে শুয়ে পড়ল যার যার বিছানায়।

বালিশে মাথা ঠেকাতেই ঘুমিয়ে গেছে অয়ন, কিন্তু জিমির চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে থাকল ও। এভাবে কতটা সময় গেছে বলতে পারবে না, হঠাৎ চোখ পড়ল রুমের জানালায়। চমকে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।

একটা জন্তুর মুখ দেখা যাচ্ছে জানালার ওপাশে। স্থির হয়ে ওটা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কান দুটো গোল, মুখটা ঠেলে বেরিয়ে আছে সামনের দিকে—ভালুকের মতো! পার্থক্য এটুকুই যে প্রাণীটা ভালুকের মতো বড় নয়, অনেক ছোট।

‘ওহ্ গড!’ লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল জিমি। ডাকল, ‘অয়ন! অয়ন!!’

ঘুমজড়ানো গোঙানি বেরুল অয়নের মুখ দিয়ে। নড়েচড়ে উঠল, কিন্তু ঘুম ভাঙল না। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নামল জিমি, পাশে গিয়ে ধাক্কা দিতে থাকল বন্ধুকে।

‘অ্যাই অয়ন! জলদি ওঠ!’

চোখ পিটপিট করল অয়ন। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’ কণ্ঠে বিরক্তি।

‘জানালার দিকে তাকা। রহস্যময় সেই প্রাণীটা...ওটা আমাদের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে!’

চার

হুটোপুটির আওয়াজ হলো জানালার বাইরে। প্রাণীটা চমকে গেছে। দ্রুত সরে গেল জানালা থেকে।

অয়নের ঘুম তখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিভ্রান্ত গলায় বলল, ‘কিসের কথা বলছিস?’

‘কী জ্বালা! সেই প্রাণীটা...আমরা যেটাকে খুঁজছি।’

ধড়মড় করে এবার উঠে বসল অয়ন। জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায়?’

‘ওই যে, ওখানে।’

জানালার দিকে তাকাল অয়ন। ‘কই, নেই তো।’

‘এইমাত্রই তো ছিল!’ ওখানে ছুটে গেল জিমি। পাল্লা খুলে উঁকি দিল বাইরে। ‘যাহ্, পালিয়ে গেছে।’

টেবিলের ওপর রাখা একটা ল্যাম্প জ্বালল অয়ন। ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজে। হাই তুলে বলল, ‘ঠিক কী দেখেছিস, বল তো।’

‘অচেনা একটা জন্তু...’

‘অচেনা? আগে কখনো ছবিটবিও দেখিসনি?’

‘উঁহু।’

‘হুম। বর্ণনা দে।’

‘ভালুকের মতো চেহারা। বড় বড় চোখ, গোল গোল কান...’

‘কিন্তু ভালুক নয়?’

‘না, অনেক ছোট। জানালার ওপাশের কার্নিশে দাঁড়িয়ে ছিল নিশ্চয়ই।’

‘ভালুকের মতো চেহারা বললি কেন?’

‘মুখটা ওরকমই। সামনের দিকে বেরিয়ে আছে। কিন্তু চোখ আর কান অন্য রকম।’

‘কী রকম?’

‘চোখ দুটো একদম গোল, যেন বেরিয়ে আসছে কোটর ছেড়ে। মাথার তুলনায় কান দুটো বড়, খাড়া।’

‘আর প্রাণীটার আকার?’

একটু ভাবল জিমি। ‘রাস্টির মতো বড় না, তবে র‌্যাকুনের চেয়ে বড়। ভালুকছানা হতে পারে।’

‘মি. স্মিথের কোয়াটিমান্ডিটা নয় তো?’ সন্দেহ করল অয়ন।

‘না, না। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই আঙ্কেলের কম্পিউটারে কোয়াটিমান্ডির ছবি দেখে নিয়েছি। ওটার সঙ্গে কোনো মিল নেই। মিল যা আছে, তা ভালুকের সঙ্গে।’

‘কম্পিউটার?’ উজ্জ্বল হলো অয়নের চেহারা। নেমে পড়ল বিছানা থেকে। ‘ভালো কথা বলেছিস। ইন্টারনেটে ছবি পাওয়া যাবে। ছবি দেখলে প্রাণীটাকে চিনতে পারবি নিশ্চয়ই?’

‘পারব।’

‘তাহলে চল। পলের ঘুম ভাঙাতে হবে।’

দুই মিনিটের মাথায় বন্ধুর কামরায় হাজির হলো দুজনে। জাগিয়ে তুলল পলকে। চোখ কচলাতে কচলাতে সে বলল, ‘কী হয়েছে?’

সংক্ষেপে ঘটনাটা তাকে জানাল অয়ন। শেষে বলল, ‘আঙ্কেলের কম্পিউটারটা একটু ব্যবহার করা যাবে? নেট থেকে ছবি দেখে প্রাণীটাকে চেনার চেষ্টা করব।’

‘এত রাতে?’ পল ভুরু কোঁচকাল।

‘সরি, কিছু মনে করিস না...’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। চল।’ উঠে পড়ল পল। ‘তবে শব্দ করিস না। সবাই ঘুমাচ্ছে।’

কম্পিউটারটা নিচতলায়, মি. অ্যাডামসের প্রাইভেট স্টাডিতে। সিঁড়ি ধরে নিচে নামল তিন বন্ধু। ঢুকল ওখানে। কম্পিউটার অন করা হলো। এরপর গুগলের ইমেজ সার্চে গিয়ে শুরু হলো খোঁজাখুঁজি।

‘কিসের খোঁজ করব?’ জানতে চাইল পল।

‘ভালুক,’ বলল অয়ন। ‘যত ধরনের ভালুক আছে, সব কটির ছবি দেখতে চাই।’

গ্রিজলি ভালুক দিয়ে শুরু করা হলো, এরপর একে একে দেখা হলো কোডিয়াক, ব্রাউন বেয়ার, ব্ল্যাক বেয়ার, পোলার বেয়ার, এমনকি কোয়ালা বেয়ারের ছবিও। প্রতিবারই মাথা নাড়ল জিমি।

‘আমার মাথায় আর কিছু আসছে না,’ বলল পল। ‘তা ছাড়া ঘুমও পেয়েছে খুব। বাকিটা সকালে করলে কেমন হয়?’

‘ঠিক আছে, তা-ই হোক,’ সায় জানাল অয়ন।

কম্পিউটার বন্ধ করে স্টাডি থেকে বেরিয়ে এল তিন বন্ধু। সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল। ঝট করে তাকাল সদর দরজার দিকে। পাল্লার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে খসখসে আওয়াজ।

‘কিছু একটা ঢোকার চেষ্টা করছে ভেতরে,’ চাপা গলায় বলল অয়ন।

‘সেই জন্তুটা নয়তো?’ নিজের অজান্তে কেঁপে উঠল জিমির গলা।

‘ঢুকতে পারবে না,’ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল পল। ‘দরজাটা যথেষ্ট শক্ত। তা ছাড়া লক করা আছে।’

‘আমরা খুলব দরজা,’ বলল অয়ন। ‘প্রাণীটাকে দেখার এটাই সুযোগ। তবে সতর্ক থাকা ভালো।’ এগিয়ে গিয়ে দরজার পাশের র‌্যাক থেকে একটা ছাতা তুলে নিল। মুগুরের মতো বাগিয়ে ধরল ওটা। পলকে বলল, ‘খোল দরজা।’

দুই পা এগোলো পল। আর তখনই ওপাশ থেকে চাবি ঘোরানোর আওয়াজ হলো। পরক্ষণে ঝট করে খুলে গেল পাল্লা। দেখা গেল একটা ছায়ামূর্তি। চমকে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল তিন বন্ধু। দরজায় দাঁড়ানো মানুষটাও চেঁচিয়ে উঠল। মেয়ের গলা।

ওপর তলার বাতি জ্বলে উঠল। তাড়াহুড়ো করে নিচে ছুটে এল পলের মা–বাবা। মি. অ্যাডামস উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘হচ্ছেটা কী এখানে?’

আলো পড়েছে দরজার মানুষটার গায়ে। সে আর কেউ নয়, অ্যাবি।

‘দেখো না, বাবা,’ নালিশ জানাল মেয়েটা, ‘কীভাবে লাঠিসোঁটা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! আরেকটু হলেই আমার মাথা ফাটাত!’

‘এত রাতে তুমিই–বা এলে কোত্থেকে?’ রাগী গলায় বলল পল। ‘চোরের মতো বাড়িতেই–বা ঢুকছ কেন?’

‘মোটেই চোরের মতো ঢুকছি না,’ প্রতিবাদ করল অ্যাবি। ‘গিয়েছিলাম বেবিসিটিংয়ের জন্যে। ফিরতে দেরি হবে, সেটা তো ফোন করে জানিয়েছি! আম্মুই বলেছে বেলটেল না বাজাতে, চাবি দিয়ে দরজা খুলে যেন নিজেই ঢুকে পড়ি।’

‘সরি, অ্যাবি,’ বিব্রত গলায় বলল অয়ন। ‘আমরা জানতাম না তুমি বাইরে ছিলে।’

‘ওর ব্যাপার তো বুঝলাম,’ বলল মি. অ্যাডামস। ‘কিন্তু তোমরা এখানে কেন? তোমাদের তো এখন ঘুমানোর কথা।’

‘জানালার বাইরে একটা অচেনা প্রাণী দেখেছে জিমি,’ ব্যাখ্যা করল অয়ন। ‘আমরা কম্পিউটারে ছবি দেখে প্রাণীটাকে চেনার চেষ্টা করছিলাম...’

‘কী ধরনের প্রাণী?’ বাধা দিয়ে জানতে চাইল মি. অ্যাডামস।

‘ভালুক-ছানার মতো লাগল,’ ইতস্তত করে বলল জিমি।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মি. অ্যাডামস। ‘আমি তো তোমাদের বারবার বলছি, এই এলাকায় কোনো ভালুক নেই। তুমি সেটা বিশ্বাস করছ না, তাই নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্ন দেখেছ।’

‘আমি মোটেই...’ প্রতিবাদ করতে গেল জিমি।

ওকে থামিয়ে দিল মি. অ্যাডামস। ‘থাক, এ নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। এখন ঘুমুতে যাও সবাই। অ্যাবি, তুমিও।’

‘ভালুক, না?’ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চাপা গলায় বলল অ্যাবি। ‘ভালোই গল্প ফেঁদেছ। আসলে যে আমাকে ভয় দেখাতে চাইছিলে, সেটা বুঝিনি ভেবেছ? দাঁড়াও, সময়মতো আমিও দেখাব মজা।’

তার ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করল না তিন বন্ধু। তাতে লাভ নেই। পরাজিত ভঙ্গিতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল ওরা।

পরিকল্পনামাফিক সকালে নাশতা সেরেই বেরিয়ে পড়ল অয়ন, জিমি আর পল—দানব ভালুকের গুহা দেখার জন্যে। সঙ্গে নিয়েছে একটা ব্যাকপ্যাক, তাতে প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস—টর্চলাইট, দেশলাই, দড়ি, শুকনো খাবার ইত্যাদি। বোতলে ভরে প্লাস্টার অব প্যারিসের খানিকটা মিশ্রণও নিয়েছে, যাতে নতুন কোনো পায়ের ছাপ পেলে ছাঁচ তুলতে পারে।

‘এত কিছুর দরকার ছিল না,’ হাঁটতে হাঁটতে বলল পল। ‘গুহাটা বেশি দূরে না। পনেরো মিনিটের মতো হাঁটলেই পৌঁছে যাব। সব মিলিয়ে ঘণ্টাখানেকের ভেতর ফিরে আসা যাবে।’

‘কখন কী ঘটে, বলা যায় না,’ অয়ন বলল। ‘সব ধরনের পরিস্থিতির জন্যে তৈরি থাকা ভালো।’

‘না। তবে অনেক সময় এ ধরনের খালি গুহায় শিয়াল-টিয়াল আশ্রয় নেয়। তাই নিশ্চিত হয়ে নিলাম। চল, এবার তাহলে ভেতরে ঢোকা যাক।’

নীরবে হেঁটে চলল তিনজনে। আশপাশে তীক্ষ্ণ নজর। মাটিতে নানা ধরনের বুনো প্রাণীর ছাপ দেখতে পাচ্ছে। এ ছাড়া দেখা গেল বিভিন্ন কীটপতঙ্গ। একটু পরেই বনের মাঝখানে ছোট্ট একটা খোলা জায়গায় পৌঁছাল ওরা। উঁচু একটা মাটির ঢিবির মতো রয়েছে ওখানে, ঘাস আর আগাছায় ছাওয়া। ঢিবির গোড়ায় হাঁ করে আছে একটা গর্ত—দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে তিন-চার ফুটের বেশি হবে না।

‘এই যে,’ কাছে গিয়ে ইশারা করল পল, ‘এটাই সেই ভালুকের গুহার মুখ।’

‘এত ছোট?’ ভ্রুকুটি করল জিমি। ‘এখানে না দানব ভালুক বাস করত?’

‘ভালুকের গুহার মুখ একটু ছোটই হয়,’ বলল অয়ন। ‘চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে ঢোকে-বেরোয় ওরা। তবে ঠিকই বলেছিস...এটা একটু বেশিই ছোট।’ কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখল গুহামুখটা। ‘হুম, আসলে ছোট না, মাটি-পাথর জমে ছোট হয়ে গেছে। বহুদিন ব্যবহার হয় না তো।’

‘দেখে তো মনে হচ্ছে, মাটির তলায় গেছে গুহাটা,’ বলল জিমি।

‘হ্যাঁ,’ সায় জানাল পল। ‘গুহাটা ওই ঢিবির তলায়।’

হাঁটু গেড়ে বসল অয়ন, টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল গুহার ভেতরে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল। বলল, ‘খালি মনে হচ্ছে।’

‘কিছু থাকবে বলে আশা করেছিলি নাকি?’ জিজ্ঞেস করল পল।

‘না। তবে অনেক সময় এ ধরনের খালি গুহায় শিয়াল-টিয়াল আশ্রয় নেয়। তাই নিশ্চিত হয়ে নিলাম। চল, এবার তাহলে ভেতরে ঢোকা যাক।’

হামাগুড়ি দিয়ে গুহামুখ গলে ভেতরে ঢুকে পড়ল তিন বন্ধু। সামনে অয়ন, এরপর জিমি, সবশেষে পল। ঢালু হয়ে কয়েক গজ নেমেছে সুড়ঙ্গ, তারপর ধীরে ধীরে চওড়া হতে শুরু করেছে। তলায় গিয়ে সমতল হয়ে গেল মেঝে, সোজা হয়ে দাঁড়ানো গেল অনায়াসে। সামনে আলো ফেলে হাঁটতে শুরু করল ওরা।

এতক্ষণে বোঝা গেল, সত্যিই দানব ভালুকের গুহা। ভেতরটা যথেষ্ট প্রশস্ত। এলোমেলো পড়ে থাকা কিছু পাথরের চাঁই আছে, মাটিটা ভেজা ভেজা। বাতাসে ভাসছে পচা, উত্কট দুর্গন্ধ।

‘কী বিশ্রী গন্ধ রে, বাবা,’ নাক চেপে ধরল জিমি। ‘কিছু মরেটরে পড়ে আছে নাকি?’

মেঝেতে আলো ফেলল অয়ন। বলল, ‘না, সে রকম কিছু না। গুহার মুখ দিয়ে মরা পাতা এসে ঢোকে ভেতরে। শিয়াল-টিয়াল এসে হাগুও করে হয়তো। সেগুলোই পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বদ্ধ জায়গা বলে দুর্গন্ধটা একটু বেশিই লাগছে নাকে।’

‘একটু? আমার তো দম আটকে আসছে। জলদি চল, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়!’

‘হুম,’ গুহার ভেতরে আলো ঘোরাল অয়ন। ‘দেখার মতো তেমন কিছু নেইও। বেরিয়েই যাই। কী বলিস, পল?’

‘চল,’ রাজি হলো পল। ‘আমিও আজই প্রথম ঢুকলাম এখানে। আগে জানলে তোদের আনতাম না।’

উল্টো ঘুরে হাঁটতে শুরু করল তিনজনে। হঠাৎ চাপা গলায় জিমি বলল, ‘শুনতে পাচ্ছিস?’

বাকিরাও শুনতে পেয়েছে। গুহার বাইরে থেকে ভেসে আসছে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ।

‘কিছু একটা শ্বাস নিচ্ছে,’ বলল পল।

‘শ্বাস না,’ অয়ন মাথা নাড়ল। ‘গন্ধ শুঁকছে।’

‘কী?’

‘দেখতে হয়।’

ঢালু অংশটার দিকে এগিয়ে গেল অয়ন। হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল, আর তখনই থেমে গেল শব্দটা। ওপর দিকে তাকাতেই একটা ছায়াকে সরে যেতে দেখল গুহামুখ থেকে। আলোর আভা দেখা গেল ওখানে। পরক্ষণে ধুপ–জাতীয় একটা শব্দের সঙ্গে অন্ধকার হয়ে গেল জায়গাটা। থেমে গেল ও।

‘কী হয়েছে?’ পেছন থেকে জানতে চাইল পল। ‘থামলে কেন?’

থমথমে চেহারা নিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকাল অয়ন। বলল, ‘গুহামুখ বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ আমাদের আটকে ফেলেছে এখানে।’

পাঁচ

ভয়ংকর খবরটা হজম করতে তিন সেকেন্ড সময় নিল জিমি আর পল। তারপরেই পল প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী! কে আটকাল? কেন?’

‘অ্যাবি নয়তো?’ সন্দেহ প্রকাশ করল জিমি। ‘কাল রাতে হুমকি দিয়েছিল, আমাদের দেখে নেবে...’

‘আমার তা মনে হয় না,’ অয়ন মাথা নাড়ল। ‘আমরা বেরুনোর পরপরই আন্টির সঙ্গে ওর বাজারে যাওয়ার কথা, ভুলে গেছিস? এদিকে আসার সময় কোথায়?’

‘তাহলে কে করল এ কাজ?’ আতঙ্ক ফুটল পলের কণ্ঠে।

‘তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কী দিয়ে করল,’ বলল জিমি। ‘পাথরটাথর দিয়ে আটকালে সর্বনাশ। ভেতর থেকে ঠেলে সরানো যাবে না।’

‘হা ঈশ্বর!’ আঁতকে উঠল পল। ‘তাহলে উপায়?’

‘শান্ত হও,’ ওকে বলল অয়ন। ‘এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আগে দেখে নিই, কীভাবে গুহামুখ বন্ধ করা হয়েছে।’

হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গের মাথা পর্যন্ত উঠে গেল ও। আলো ফেলল গুহামুখে। ভুরু কুঁচকে গেল সঙ্গে সঙ্গে। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল বাধাটা, পরক্ষণে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার ভঙ্গিতে ছিটকে সরিয়ে নিল হাত।

‘কী...কী ওটা?’ নিচ থেকে সাগ্রহে জানতে চাইল জিমি।

‘পাথরটাথর না,’ জানাল অয়ন। ‘চামড়া আর বড় বড় লোম।’

‘মানে?’

‘মানে হচ্ছে, জলজ্যান্ত একটা জানোয়ার বসে আছে ওখানে। ওটার কারণেই আটকে গেছে গুহামুখ।’

‘বড় বড় লোম?’ এবার জিমির গলা কেঁপে উঠল। ‘ভালুক না তো?’

‘জলদি নেমে এসো, অয়ন!’ তাড়া দিল পল। ‘ওটা হামলা করতে পারে!’

‘তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই,’ আলো ফেলে লোমগুলো ভালো করে দেখছে অয়ন। খয়েরি আর সাদা রঙের এমন লোম ওরা গতকালই দেখেছে। ‘গুহার মুখে রাস্টি বসে আছে।’

‘রাস্টি!’ মুখ চাওয়াচাওয়ি করল জিমি আর পল।

‘হুঁ।’

‘ও কেন গুহার মুখে বসে থাকবে?’ পলের প্রশ্ন।

‘নিশ্চয়ই কেউ বসতে বলেছে।’

‘কেন?’

‘কারণ, আমাদেরকে বন থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল, আমরা কথা শুনিনি। তার জন্যে শাস্তি দিতে চাইছে।’

‘কে সেটা? মি. ওয়াইজ, নাকি মি. স্মিথ? দুজনেই মানা করেছেন আমাদের। রাস্টি ওদের দুজনেরই হুকুম মানে।’

‘ওসব নিয়ে পরে মাথা ঘামালে হয় না?’ জিমি এগিয়ে এল। ‘এখান থেকে বেরুতে হবে। রাস্টিকে সরানো দরকার। সাহায্য কর আমাকে।’

রাস্টির গায়ে হাত লাগিয়ে ঠেলা দিল দুই বন্ধু। মুখে চেঁচাল, ‘সরো, রাস্টি!’ কিন্তু একচুল নড়ল না দানব কুকুর।

‘ওভাবে হবে না,’ এবার এগিয়ে এল পল। ভয় কেটে গেছে তার। ‘ভুলে গেছিস, রাস্টি শুধু তিনটা হুকুম মানে?’ কাছে গিয়ে চেঁচাল, ‘দাঁড়াও, রাস্টি!’

সঙ্গে সঙ্গে যেন জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হলো। উঠে দাঁড়াল বিশাল কুকুরটা। উন্মুক্ত হলো গুহামুখের খানিকটা। তবে এখনো ওদের বেরুনোর মতো বড় হয়নি। ব্যাকপ্যাক থেকে কয়েকটা বিস্কুট বের করল পল, রাস্টির পায়ের তলা দিয়ে ছুড়ে দিল দূরে। খাবারের লোভে দৌড়ে ওদিকে চলে গেল কুকুরটা। এবার গুহা থেকে বেরিয়ে এল তিন বন্ধু।

‘দারুণ দেখালে,’ পলের পিঠ চাপড়ে দিল জিমি।

অয়ন কিছু বলল না, আশপাশে দৃষ্টি বোলাচ্ছে ও। রাস্টিকে কে নিয়ে এসেছে, বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেখা গেল না কাউকে। এবার চোখ ফেরাল কুকুরটার দিকে। কপালে ভাঁজ।

‘কী ভাবছিস?’ জিজ্ঞেস করল জিমি।

‘পল প্রমাণ করে দিল, সঠিক হুকুম দিলে রাস্টি যে কারও কথা শোনে,’ বলল অয়ন। ‘তার মানে, শুধু মি. ওয়াইজ আর স্মিথ নন, গ্যারিটিও আজকের ঘটনার জন্যে দায়ী হতে পারেন। তিনিও চাননি আমরা বনের ভেতরে ঘোরাফেরা করি।’

‘যে–ই কাজটা করে থাকুক, ভুল করেছে। এবার তাকে খুঁজে বের করব আমরা, রাইট?’

মাথা ঝাঁকাল অয়ন।

‘কীভাবে?’ জানতে চাইল পল।

‘বাড়িতে চল,’ জবাব না দিয়ে বলল অয়ন। ‘তোর বাবার কম্পিউটারটা আরেকবার ব্যবহার করতে চাই আমি।’

আধা ঘণ্টা পর।

মি. অ্যাডামসের স্টাডিতে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে তিন বন্ধু।

অয়ন বলল, ‘রহস্যময় প্রাণীটাই আমাদের একমাত্র সূত্র। ওটাকে ঘিরেই ঘটছে এসব। কাজেই ওটার পরিচয় বের করতে হবে। কম্পিউটারটা সে কাজে সাহায্য করবে আমাদের।’

‘গত রাতে এক দফা চেষ্টা করেছি,’ মনে করিয়ে দিল পল। ‘তাতে লাভ হয়নি।’

‘গতকাল আমরা ওটাকে ভালুক ভেবেছিলাম, ভুলটা করেছি সেখানেই। ওটা অন্য কোনো প্রাণী। অপরিচিত...বিদেশি। এ জন্যেই কেউ পায়ের ছাপ দেখে চিনতে পারছে না।’

‘বিদেশি হলে এখানে এল কোত্থেকে?’ জিজ্ঞেস করল জিমি।

‘মি. স্মিথ কী বলেছিলেন, মনে আছে? অবৈধভাবে বিদেশি প্রাণী আনা হয় আমেরিকায়—পোষা প্রাণী হিসেবে বিক্রি করার জন্যে।’

‘মনে আছে। একটা কোয়াটিমান্ডি কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু কাল রাতে আমি যেটাকে দেখেছি, সেটা কোয়াটিমান্ডি নয়।’

‘তাহলে প্রাণীটা সম্পর্কে আমরা যা যা জানি, তার একটা তালিকা করে ফেলা যাক। ওটা নিশাচর। ফলমূল খেতে ভালোবাসে। পাগুলো চওড়া, লম্বা লম্বা নখ আছে। লেজটা যথেষ্ট শক্তিশালী, গাছের ডালে পেঁচিয়ে ঝুলে থাকতে পারে। মুখটা ভালুকের মতো। কিছু বাদ দিয়েছি?’

‘চোখ,’ বলল জিমি। ‘বড় বড়...গোল গোল চোখ।’

‘ঠিক।’ ইন্টারনেটের ব্রাউজার খুলে তাতে সব তথ্য টাইপ করল অয়ন। সার্চ বাটন চাপল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নানা ধরনের লেখা ভেসে উঠল পর্দায়, আর ফুটে উঠল একটা ছবি।

উত্তেজিত হয়ে উঠল জিমি। ‘হ্যাঁ... এটাই! এটাকেই দেখেছি গতকাল!’

ঝুঁকে ছবির তলার তথ্যগুলো পড়ল অয়ন, ‘কিংকাজু। র‌্যাকুন বা বেজি–জাতীয় প্রাণী। আবাস, মেক্সিকো থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত। আদর করে এদের হানি বেয়ার বা মধু-ভালুকও বলা হয়ে থাকে। কারণ, ভালুকের মতো এরাও মৌমাছির চাক থেকে মধু খেতে ভালোবাসে।’

‘দেখলি তো?’ বলল জিমি। ‘সত্যিই ভালুক। জাতের দিক না হলেও নামের দিক দিয়ে তো বটেই। জেনুইন মৌ-চোর।’

‘এটা এখানে এল কোত্থেকে?’ পল বিভ্রান্ত।

‘খুব সহজ। কেউ অবৈধভাবে এনেছে এটাকে—গ্রিজলি হিলেরই কোনো বাসিন্দা। নিশ্চয়ই অ্যানিমেল স্মাগলিংয়ের সঙ্গে জড়িত সে। সে কারণেই আমাদের ওই প্রাণীর কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছে।’

‘কে হতে পারে?’ জিজ্ঞেস করল জিমি।

‘এমন কেউ, যার মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় যাতায়াত আছে।’ পলের দিকে ফিরল অয়ন। ‘তোদের প্রতিবেশীদের কেউ সম্প্রতি দেশের বাইরে গেছে কি না বলতে পারিস?’

‘কে কোথায় যায়, বলা মুশকিল,’ কাঁধ ঝাঁকাল পল। ‘গত সপ্তাহে বাড়িতে ছিলেন না মি. ওয়াইজ। রাস্টিকে মি. স্মিথের কাছে রেখে কোথায় যেন গিয়েছিলেন।’

‘মি. স্মিথ কোথাও যান না?’

‘ওভাবে হবে না,’ এবার এগিয়ে এল পল। ভয় কেটে গেছে তার। ‘ভুলে গেছিস, রাস্টি শুধু তিনটা হুকুম মানে?’ কাছে গিয়ে চেঁচাল, ‘দাঁড়াও, রাস্টি!’

‘যান। এর আগের সপ্তাহে উনিও ছিলেন না। আমাদের বলেছিলেন অ্যানিমেল শেল্টারের কাজে স্যাক্রামেন্টো যাচ্ছেন।’

‘মি. গ্যারিটি?’

‘উনিও প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকেন। তখন বাড়িটা তালাবন্ধ থাকে।’

‘সিলিয়া প্যাটারসনকে বোধ হয় সন্দেহের বাইরে রাখা যায়, কী বলিস?’ জিমি বলল।

‘উঁহু,’ দ্বিমত পোষণ করল অয়ন। ‘প্রতি সপ্তাহে ফার্নিচার নেওয়ার নামে ট্রাক আসে তাঁর কাছে। ওটায় করে যে চোরাই প্রাণী পাচার করা হচ্ছে না, কী করে জানছি?’

‘তার মানে সবাই সন্দেহভাজন,’ হতাশ গলায় বলল পল। ‘অপরাধীকে খুঁজে বের করবি কী করে? কেউ তো স্বীকার করবে না।’

‘খুব সহজ।’ অয়নের মুখে মিটিমিটি হাসি। ‘মৌ-চোরটাকে ধরব আমরা।’

ছয়

দিনের বাকি সময়টা প্ল্যান-প্রোগ্রাম সাজাতে আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জোগাড়ে কেটে গেল। এরপর তিন বন্ধু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকল সন্ধ্যে নামার জন্যে। সূর্য ডোবার খানিক আগে গেস্টরুমে হাজির হলো মি. অ্যাডামস, ওদের খোঁজ নিতে।

‘কী করছ তোমরা?’ জিজ্ঞেস করল মি. অ্যাডামস। চোখ চলে গেল ড্রেসারের ওপর রাখা প্লাস্টারের ছাঁচ দুটোর দিকে। ‘এই বুঝি তোমাদের রহস্যময় প্রাণীর পায়ের ছাপ?’

‘রহস্যটা ভেদ হয়েছে,’ বলল পল। ‘আমরা জানি ওটা কী। একটা কিংকাজু।’

‘কিংকাজু?’ ভ্রুকুটি করল মি. অ্যাডামস। ‘ক্যালিফোর্নিয়ায়?’

তখনই ঝট করে খুলে গেল রুমের দরজা। ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকল অ্যাবি। চেঁচিয়ে বলল, ‘বাবা, ওদেরকে তুমি কিছু বলবে?’

‘কেন? কী হয়েছে?’

‘পাইনের গোটা ছুড়েছে আমার দিকে,’ নালিশ জানাল অ্যাবি। ‘দুটো আমার মাথাতেও লেগেছে!’

‘কখন?’

‘এই তো, একটু আগে। পেছনের আঙিনা থেকে শুকনো কাপড় আনতে গিয়েছিলাম, ওরা ওপর থেকে পাইনের গোটা ছুড়তে শুরু করল।’ তিন বন্ধুর দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানল অ্যাবি। ‘শয়তানির একটা সীমা থাকে।’

‘আমরা কিচ্ছু ছুড়িনি,’ প্রতিবাদ করল জিমি। ‘কেন খামোকা তোমার মাথায় পাইনের গোটা ছুড়তে যাব?’

‘সেটা তোমরাই ভালো জানো। এই শেষবারের মতো বলছি, আমার সঙ্গে লাগতে গেলে কিন্তু তার ফল ভালো হবে না।’

যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল অ্যাবি। মি. অ্যাডামস পিছু পিছু ছুটল ওকে শান্ত করার জন্যে।

‘মিথ্যুক কোথাকার!’ গাল দিয়ে উঠল পল।

‘আমার তা মনে হয় না,’ বলল অয়ন। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিল ও। ‘সত্যিই কেউ পাইনের গোটা মেরেছে ওকে।’

ওর পাশে এসে দাঁড়াল জিমি। ‘কে? ওই কিংকাজুটা?’

‘আর কে?’

‘উচিত কাজ করেছে,’ বলল পল।

‘একটা লাভও হয়েছে এতে,’ অয়ন বলল। ইশারা করল বাইরে—পেছনের আঙিনার যেখানে কাপড় শুকানোর দড়ি টাঙানো হয়েছে, সেদিকে। ‘ওই যে, নিশ্চয়ই ওখানকার গাছ থেকে গোটা ছুড়েছে। তার মানে কিংকাজুটা ওখানেই লুকিয়ে আছে। আমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল।’

‘আমরা কি বেরুব এখন?’

‘আরেকটু অপেক্ষা করি। আঁধার নামুক। নইলে ওটা খোলা জায়গায় বেরুবে না।’

দশ মিনিট পর পেছনের আঙিনায় বেরিয়ে এল তিন বন্ধু। পলের হাতে একটা প্লাস্টিকের প্লেট—তাতে কমলা, আপেল আর কলা। জিমি নিয়েছে একটা নাইলনের নেট। অয়নের হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা।

‘গাছগুলোর গোড়ায় রাখ প্লেট,’ পলকে বলল অয়ন। এরপর জিমিকে নির্দেশ দিল, ‘রেডি থাকিস, ইশারা পাওয়ামাত্র নেট ছুড়বি। আমি ততক্ষণে ছবি তুলে ফেলব।’

কাছের একটা ঝোপের পেছনে গিয়ে লুকাল তিনজনে। পাতা সরিয়ে চোখ রাখল প্লেটটার ওপর। কয়েক মিনিট কেটে গেল নীরবতায়। হঠাৎ খসখসে আওয়াজ হলো। সেদিকে তাকাতেই একটা গাছের গা বেয়ে কিংকাজুকে নামতে দেখল ওরা। অবিকল ছবিতে দেখা চেহারা। ভীত পদক্ষেপে এগিয়ে এল প্লেটের দিকে, একটা আপেল তুলে খেতে শুরু করল।

জিমিকে নেট ছোড়ার জন্যে ইশারা দিতে গেল অয়ন, কিন্তু তখনই শোনা গেল দ্রুত পদশব্দ। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে আসছে কে যেন। ভোজবাজির মতো গাছের সামনে উদয় হলো লোকটা—পরনে গাঢ় রঙের সোয়েট শার্ট আর ট্রাউজার, মুখে মুখোশ। হাতে একটা টর্চলাইট জ্বলে উঠল, শক্তিশালী আলোর রেখা গিয়ে পড়ল কিংকাজুর ওপর। ভয় পেয়ে প্রাণীটা উল্টো ঘুরে ছুট লাগাল, কিন্তু লাভ হলো না। দক্ষ হাতে একটা নেট ছুড়ল লোকটা, তাতে আটকা পড়ল কিংকাজু, গড়াগড়ি খেতে থাকল মাটিতে। সেদিকে এগিয়ে গেল সে, কাপড়ের একটা ছোট থলে বের করল পকেট থেকে, জালসহ বন্দী প্রাণীটা ঢুকিয়ে ফেলল তাতে।

ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গিয়েছিল তিন বন্ধু, এবার সচল হয়ে উঠল। এক লাফে উঠে দাঁড়াল ওরা। জিমি চেঁচিয়ে উঠল, ‘দাঁড়ান!’

ঘাড় ফিরিয়ে ওদের দিকে এক পলক তাকাল লোকটা, তারপরেই দৌড় দিল।

‘ধর ওকে!’

কথাটা অয়নের মুখ থেকে বেরুতে যা দেরি, তিরবেগে লোকটার পিছু নিল তিন বন্ধু। কাছে পৌঁছেই ডাইভ দিল জিমি, চেষ্টা করল তার কোমর আঁকড়ে ধরতে। নির্মম ভঙ্গিতে কনুই চালাল লোকটা, কপালে লাগল...চোখে সরষে ফুল দেখল ও। পাশ থেকে অয়নও চেষ্টা করল, কিন্তু বেমক্কা একটা ঘুষি খেতে হলো বুকে। পলকে আঘাত করা হলো কাঁধ দিয়ে। তিন বন্ধুই ছিটকে পড়ল মাটিতে। লোকটা উধাও হয়ে গেল গাছগাছালির ভেতর।

ব্যথা সয়ে এলে কঁকাতে কঁকাতে উঠে দাঁড়াল ছেলেরা। পেছন থেকে ভেসে এল দরজা খোলার আওয়াজ। গোলমালের আওয়াজ শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে পলের মা–বাবা।

‘কী হয়েছে?’ কাছে এসে জিজ্ঞেস করল মি. অ্যাডামস। ‘তোমাদের এ দশা কেন?’

জবাব না দিয়ে আশপাশে তাকাল অয়ন। অন্যান্য বাড়ির দরজাও খুলে গেছে, বেরিয়ে আসছে সবাই। কয়েক মিনিটের ভেতরেই ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেল ছেলেদেরকে ঘিরে। ঘেউ ঘেউ করে উঠল রাস্টি, মি. ওয়াইজ তাকেও নিয়ে এসেছে।

‘হচ্ছেটা কী?’ রাগী গলায় জিজ্ঞেস করল মি. ওয়াইজ। ‘এরা আবার এখানে গোলমাল পাকাচ্ছে, তা–ই না?’

‘আহ্, কিছু না জেনেই ওদের ওপর চোটপাট দেখাচ্ছেন কেন?’ বিরক্ত গলায় বলল মি. স্মিথ।

‘পল...অয়ন...জিমি!’ ডাকল মি. অ্যাডামস। ‘কিছু বলছ না কেন তোমরা?’

জবাব দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল অয়ন। ভালো করে দেখে নিল উপস্থিত প্রতিবেশীদের। মি. ওয়াইজের পরনে হালকা রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার, মি. স্মিথ পরেছে ফুল শার্ট আর প্যান্ট, মিসেস স্মিথের পরনে ঘরের গাউন, সিলিয়ার গায়ে টপস আর স্কার্ট, গ্যারিটি গায়ে দিয়েছে হাওয়াই শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। কারও সঙ্গেই খানিক আগে দেখা হামলাকারীর বেশভূষা মেলে না। নিশ্চয়ই পোশাক পাল্টে এসেছে।

বড় করে শ্বাস ফেলল ও। তারপর বলল, ‘গোলমাল একটা সত্যিই আছে এখানে—একটা কিংকাজু ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলে।’

‘সেটা আবার কী?’ ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল সিলিয়া।

‘দক্ষিণ আমেরিকার বন্য প্রাণী। ওটাই গতকাল আপনাকে ভয় দেখিয়েছিল।’

‘এক মিনিট,’ বলে উঠল মি. স্মিথ। ‘এখানে দক্ষিণ আমেরিকান প্রাণী আসবে কোত্থেকে?’

‘অবৈধভাবে নিয়ে আসা হয়েছে—চোরাই পথে।’

‘ঠাট্টা করছ নাকি?’ বলল গ্যারিটি।

‘মোটেই না,’ এবার জিমি মুখ খুলল। ‘আমরা গতকাল থেকে এ নিয়ে তদন্ত করছি। এখানকার কেউ একজন প্রাণী চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। কিংকাজুটাকে সে-ই নিয়ে এসেছে। তার হাত থেকেই পালিয়ে ওটা আশ্রয় নিয়েছিল জঙ্গলে।’

‘খানিক আগে ওটাকে আবার ধরে নিয়ে গেছে ওই লোক,’ যোগ করল পল। ‘আমরা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি।’

‘তোমাদের মাথাটাথা ঠিক আছে তো? কিসের তদন্ত? কিসের চোরাচালান?’

‘মাথা আমাদের ঠিকই আছে, মি. গ্যারিটি,’ শান্ত গলায় বলল অয়ন। ‘আর সে জন্যেই বুঝতে পারছি, এসবের পেছনে যে লোকটা রয়েছে, সে আর কেউ নয়...আপনি!’

‘আমি!’ চমকে উঠল গ্যারিটি।

‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল অয়ন। ‘গ্রিজলি হিলে বসে আপনি প্রাণী চোরাচালানের ব্যবসা করছেন। গতকাল ডাক্তারের কাছে বিড়াল নেননি আপনি, ওই অজুহাত দেখিয়ে বিড়াল–জাতীয় অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে গেছেন বিক্রি করার জন্যে—বাঘের ছানা কিংবা ববক্যাট। ওগুলোর ডাক সে জন্যেই অন্য রকম লেগেছে আমাদের কাছে।’

‘বাজে কথা। আমি বিড়ালই নিয়েছি।’

‘তাহলে সেগুলো গেল কোথায়? ফিরে আসার পর আপনাকে তো গাড়ি থেকে কিছু নামাতে দেখলাম না আমরা। ডাক্তারের কাছে রেখে এসেছেন? কে সেই ডাক্তার? একটু খোঁজ নিয়ে দেখি?’

‘আমি তোমাদের প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই,’ গোঁয়ারের মতো বলল গ্যারিটি।

‘প্রয়োজনও নেই। কী ঘটেছে, আমরা জানি। আপনার ব্যবসা ভালোই চলছিল, কেউ কিছু সন্দেহ করেনি। কিন্তু ঝামেলা বাধল কিংকাজুটা পালিয়ে যাওয়ায়। আমরা যখন ওটার পায়ের ছাপ নিয়ে খোঁজখবর শুরু করলাম, ভয় পেয়ে গেলেন। নানাভাবে বাধা দিতে চেয়েছেন আমাদের। বনে যেতে মানা করেছেন, ভালুকের ভয় দেখিয়েছেন... তারপরও যখন কথা শুনিনি, আজ সকালে রাস্টির সাহায্য নিয়ে আমাদেরকে দানব ভালুকের গুহায় আটকেছিলেন। নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, ভয় পেয়ে আমরা পিছিয়ে যাব, তা–ই না? তাতেও কাজ হয়নি। শেষে খানিক আগে মুখোশ পরে আমাদের সামনে থেকেই ছিনিয়ে নিলেন প্রাণীটাকে। এখন আবার পোশাক পাল্টে এখানে এসেছেন সাধু সাজতে।’

‘মিথ্যে কথা!’ প্রতিবাদ করল গ্যারিটি। ‘এসবের কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না তোমরা।’

‘পারব, স্যার,’ মুচকি হাসল অয়ন। ‘পোশাক বদলানোর জন্যে খুব বেশি সময় পাননি আপনি, গায়ের শার্টটাই তার প্রমাণ। ওই দেখুন, বোতাম উঁচু-নিচু করে লাগিয়েছেন। কিসের তাড়া ছিল, বলতে পারেন?’

সবার চোখ চলে গেলে গ্যারিটির শার্টের বোতামের দিকে। অয়ন ঠিকই বলেছে।

‘এটা কোনো প্রমাণ না,’ বলল গ্যারিটি।

‘তা ঠিক, কিন্তু এটার সূত্র ধরে আরেকটা ব্যাপার বোঝা যায়। পোশাক বদলানোর যখন সময় পাননি, কিংকাজুটাকে লুকানোরও সময় পাননি আপনি। আপনার বাড়িতে তল্লাশি চালালেই প্রাণীটাকে খুঁজে পাব আমরা।’

‘হাহ্। কিসের তল্লাশি? যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া, এমনকি পুলিশও কারও বাড়িতে ঢুকতে পারে না।’

‘আপনার বেলায় পারবে,’ বলল অয়ন। হাসল। ‘আপনি বোধ হয় জানেন না, খানিক আগে আমার হাতে একটা ক্যামেরা ছিল। আপনি যখন কিংকাজুটাকে ধরছিলেন, তখন ওতে ক্রমাগত ছবি তুলে গেছি আমি। সন্দেহ নেই, একটা না একটা ছবিতে আপনার হাতের আংটিটা ঠিকই ধরা পড়েছে—ঝোপের পেছন থেকে ক্যামেরা নিয়ে এলেই দেখিয়ে দিতে পারব। বড্ড ভুল করেছেন হাতমোজা না পরে...অন্তত আংটিটা খুলে আসা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো বেঁচে যেতেন।’

হাতের আংটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল গ্যারিটি, তারপর ঝট করে হাতটা নিয়ে গেল শরীরের পেছনে, যেন তাতেই ব্যাপারটা চুকেবুকে যাবে।

‘আমরা শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না,’ মি. ওয়াইজ আর মি. স্মিথের দিকে ফিরে বলল জিমি। ‘আপনারা আমাদের বনে যেতে মানা করছিলেন কেন?’

‘না বোঝার কী আছে?’ মুখ বাঁকালেন মি. ওয়াইজ। ‘বাচ্চাদের স্বভাবই হলো বনের প্রাণীদের বিরক্ত করা। আমি সেটা চাইনি বলে মানা করেছি।’

‘আর আমি মানা করেছি নিরাপত্তার কথা ভেবে,’ বলল মি. স্মিথ। ‘জঙ্গলে পথ হারাতে পারো তোমরা, বিষাক্ত লতাপাতা বা কীটপতঙ্গের সংস্পর্শে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো। এ জন্যেই সতর্ক করা।’

‘আরি, আরি! পালাল!’ চেঁচিয়ে উঠল সিলিয়া। কথার ফাঁকে হঠাৎ উল্টো ঘুরে ছুট লাগিয়েছে গ্যারিটি।

‘রাস্টি!’ গমগম করে উঠল মি. স্মিথের গলা। ‘ধরো!’

সঙ্গে সঙ্গে গ্যারিটিকে ধাওয়া করল বিশাল কুকুরটা। কাছে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। হুড়মুড় করে মাটিতে আছড়ে পড়ল গ্যারিটি। চিত হতেই তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে গেল রাস্টি। চাপা গরগর শব্দ বেরুচ্ছে গলা দিয়ে। হার মানল লোকটা। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুই হাত মেলে দিল মাথার ওপর।

‘এটা কী হলো?’ বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল জিমি। ‘আমরা তো জানতাম রাস্টি শুধু তিনটা হুকুম মানে!’

‘ওটা সিক্রেট কমান্ড,’ মুচকি হেসে বলল মি. স্মিথ। ‘ডগ ট্রেইনাররা সব সময়েই এ রকম দু–চারটা বাড়তি হুকুম শিখিয়ে রাখে কুকুরকে, অন্য কাউকে জানায় না।’

‘দারুণ ট্রেইনিং দিয়েছেন, কোনো সন্দেহ নেই।’

ঘেউ ঘেউ করে কথাটায় যেন সায় জানাল রাস্টি।

(শেষ)

কিশোর আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন