default-image

চেলসির কিংস রোডের গ্যালান্ট এন্ডেভার রেস্তোরাঁ। বন্ধু হেনরি বনিংটনের সঙ্গে বসে রাতের খাবার সারতে এসেছেন বিখ্যাত গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো।

রেস্তোরাঁটা মি. বনিংটনের খুব প্রিয়। এখানকার ঘরোয়া মেজাজটা পছন্দ করেন তিনি। আর সুস্বাদু, খাঁটি ইংরেজ খাবারের টান তো আছেই। ভদ্রলোক আবার শিল্পটিল্পের ব্যাপারে দারুণ উত্সাহী। যদিও ন্যূনতম শিল্পগুণও নেই তার মধ্যে।

এখানকার ওয়েট্রেস মলি বহুদিন ধরেই চেনে মি. বনিংটনকে। খদ্দেরদের পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখার বিশেষ গুণটি আছে তার।

দুই বন্ধুকে কোনার দিকের একটা টেবিলে বসতে দেখে সহাস্যে এগিয়ে এল সে। ‘শুভ সন্ধ্যা, স্যার। আজকে আপনার কপাল ভালো, টার্কি স্টাফ করা হয়েছে চেস্টনাট দিয়ে। এটা তো আপনার সবচেয়ে প্রিয়, তাই না? আর স্টিলটন পনিরও আছে। কোনটা আগে খাবেন বলুন—স্যুপ নাকি মাছ?’

মেনু দেখছিলেন পোয়ারো। তার মতামত জানতে চাইলেন বনিংটন।

‘আজকে আপনার পছন্দের খাবার খাব,’ হাত নেড়ে বললেন পোয়ারো। ‘আপনার যা খুশি অর্ডার করুন।’

অনুমতি পেয়ে ঝটপট ফরমাশ দিয়ে দিলেন মি. বনিংটন। খাবার আনতে চলে গেল মলি।

‘ভালো মেয়ে,’ তার অপস্রিয়মাণ অবয়বের দিকে তাকিয়ে বললেন ভদ্রলোক। ‘ডাকসাইটে সুন্দরী ছিল যৌবনে। ছবি আঁকার জন্য ওকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করত শিল্পীরা। খাবারদাবারের ব্যাপারেও ভালো জ্ঞান রাখে ও।’

‘যাকগে, এখন বলুন আপনার দিনকাল কেমন কাটছে, বন্ধু?’ জিজ্ঞেস করলেন পোয়ারো।

‘কেটে যাচ্ছে আরকি কোনোরকমে!’ ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন মি. বনিংটন। ‘এখন তো জীবন বড্ড কৃত্রিম হয়ে গেছে।’

তার কথার মাঝখানে খাবার নিয়ে এল মলি।

‘আমার পছন্দ-অপছন্দ তুমি খুব ভালো জানো, মলি,’ সন্তুষ্টচিত্তে বললেন মি. বনিংটন।

‘জানা তো উচিত। আপনি আমাদের এখানে নিয়মিত খেতে আসেন,’ জবাবে বলল ওয়েট্রেস।

পাশ থেকে এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘লোকজন কি এখানে এসে রোজ রোজ একই খাবার খায়? মাঝেমধ্যে স্বাদ বদলায় না?’

‘পুরুষেরা বদলায় না, স্যার। তবে মহিলারা ঘন ঘন বদলায়। বৈচিত্র্য পছন্দ করে তারা। পুরুষেরা সব সময় একই জিনিস খেতে পছন্দ করে।’

‘মেয়েরা আসলে বড্ড চঞ্চল। ওদের মধ্যে কোনো স্থিরতা নেই,’ একগাল হেসে বললেন মি. বনিংটন। রেস্তোরাঁর চারপাশে চোখ বোলালেন তিনি। তারপর আবার মুখ খুললেন, ‘পৃথিবীটা বড় মজার জায়গা। ওই যে ওই কোনায় বসা ওই উদ্ভট চেহারার বুড়োটাকে দেখছেন? মুখে দাড়ি। মলিকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, প্রতি মঙ্গল আর বিষ্যুদবার রাতে এখানে খেতে আসে বুড়ো। টানা দশ বছর ধরে এই রুটিন মেনে চলছে সে। তবু এখানকার কেউ তার নাম জানে না। এমনকি জানে না কোথায় তার বাড়ি কিংবা কী তার পেশা। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত না?’

মলি টার্কি নিয়ে ফিরে এলে তিনি বললেন, ‘তোমার ওই বুড়ো খদ্দের দেখি এখনো নিয়মিত আসছেন।’

‘হ্যাঁ, স্যার। মঙ্গলবার আর বিষ্যুদবারে আসেন। কিন্তু গত হপ্তায় সোমবারে এসেছিলেন! ব্যাপারটা দেখে বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল দিন-তারিখ সব গুলিয়ে ফেলেছি, আমার অজান্তে নিশ্চয়ই মঙ্গলবার চলে এসেছে! কিন্তু এরপরের রাতেও এসেছিলেন উনি। তখন আমি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। গত হপ্তায় এক দিন বাড়তি এসেছিলেন আরকি।’

‘অভ্যাসের ইন্টারেস্টিং ব্যতিক্রম,’ বিড়বিড় করে বললেন পোয়ারো। ‘কারণটা কী, তা-ই ভাবছি।’

‘আমার মনে হয় উনি কোনো কারণে বিচলিত বা কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত ছিলেন,’ বলল মলি।

‘এ রকম মনে হলো কেন আপনার? তার আচার-আচরণ দেখে?’

‘না স্যার, ঠিক আচার-আচরণ দেখে না। বরাবরের মতোই একদম চুপচাপ বসে ছিলেন ভদ্রলোক। রেস্তোরাঁয় এসে উনি কখনো “শুভ সন্ধ্যা” ছাড়া আর কিছু বলেন না। এই শব্দ দুটোই তার অর্ডার।’

‘এই দুটো শব্দই?’ অবাক হলেন দুঁদে গোয়েন্দা।

‘শুনলে হয়তো হাসবেন আপনারা,’ লজ্জায় লাল হয়ে বলল মলি। ‘কিন্তু ভদ্রলোক দশ বছর ধরে খেতে আসছেন এখানে। তার পছন্দ-অপছন্দ জানা আমার কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। না চাইতেই জানা হয়ে যায়। উনি কখনো ষাঁড় বা ভেড়ার চর্বির পুডিং বা ব্ল্যাকবেরি খান না; তার সহ্য হয় না। ওনাকে আমি জীবনে কখনো ঘন স্যুপ নিতে দেখিনি। অথচ গত সোমবার রাতে ঘন টমেটো স্যুপ, ভাজা গরুর মাংস, কিডনির পুডিং আর ব্ল্যাকবেরির চাটনি খেয়েছেন! মনে হচ্ছিল, কী অর্ডার করছেন না করছেন, সে ব্যাপারে কোনো খেয়ালই নেই!’

‘ব্যাপারটা দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগছে আমার কাছে,’ পোয়ারো বললেন।

খুশি হয়ে চলে গেল মলি।

‘পোয়ারো, এ ব্যাপারে আপনার অনুমান কী, শুনি,’ হাসতে হাসতে বললেন হেনরি বনিংটন।

‘আগে আপনারটা শুনি।’

‘আমাকে ওয়াটসন বানাতে চান, অ্যাঁ? বেশ, বলছি। আমার ধারণা, ডাক্তার দেখিয়েছিল বুড়ো। ডাক্তার সাহেব তার খাবারের মেনু বদলে দিয়েছিলেন।’

‘বদলে কী খেতে বলেছেন? ঘন টমেটো স্যুপ, ভাজা গরুর মাংস, কিডনির পুডিং আর ব্ল্যাকবেরির চাটনি? কোনো ডাক্তার যে অমন উপদেশ দিতে পারেন, আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

‘কল্পনা করার দরকার নেই। ডাক্তাররা এমন অনেক উদ্ভট কাণ্ড করে।’

‘এ ছাড়া আর কোনো সম্ভাবনা আসছে না আপনার মাথায়?’

হেনরি বনিংটন বললেন, ‘একটা ব্যাখ্যাই আছে এই কাণ্ডের। তীব্র মানসিক ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়েছিল আমাদের অপরিচিত বন্ধুটি। বেচারা মানসিকভাবে এমনই বিক্ষিপ্ত ছিল যে কোন খাবার ফরমাশ করেছে বা কী খাচ্ছে, তা খেয়ালই করেনি।’

মিনিটখানেক চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর আবার বললেন, ‘এবার আপনার ধারণা বলুন। হয়তো বলবেন, মনে মনে কোনো খুনের মতলব আঁটছিল বুড়ো।’

বিজ্ঞাপন

কথাটা বলেই আপনমনে হেসে উঠলেন তিনি। কিন্তু পোয়ারো হাসলেন না। চিন্তার রেখা তার চেহারায়। অস্ফুটে কেবল বললেন, কী ঘটতে পারে সে আভাস দিতে পারেন তিনি।

হপ্তা তিনেক পরের কথা। আবার বনিংটনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল এরকুল পোয়ারোর। এবার পাতালট্রেনে।

পরস্পরের দিকে চেয়ে স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন তারা। পিকাডিলি সার্কাস স্টেশনে এসে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেল তাদের বগি। পেছনের দিকে এক জোড়া ফাঁকা সিট পেয়ে একসঙ্গে বসে পড়লেন দুই বন্ধু। এদিকে যাত্রী বলতে গেলে নেই। তাই শান্তিতে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন তারা।

‘আমরা যে গ্যালান্ট এন্ডেভারে গিয়েছিলাম, মনে আছে আপনার?’ জিজ্ঞেস করলেন মি. বনিংটন। ‘ওখানকার ওই বুড়োর কথা মনে আছে? পাক্কা একটা সপ্তাহ ধরে ওখানে খেতে যাচ্ছে না সে। মলি তো বেশ ঘাবড়ে গেছে।’

ঝট করে সিধে হয়ে বসলেন এরকুল পোয়ারো। চকচক করছে তার সবুজ চোখ জোড়া।

‘সত্যি?’ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন তিনি। ‘সত্যি?’

বনিংটন বললেন, ‘আপনার মনে আছে, আমি বলেছিলাম, লোকটা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, উনি তার খাবারের মেনু বদলে দিয়েছেন? খাবারের ব্যাপারটা হয়তো ভুল অনুমান করেছি। তবে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনাটা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না তার। ডাক্তার তাকে যা বলেছেন, তা শুনে হয়তো প্রবল নাড়া খেয়েছে সে। সে জন্যই হয়তো অমন ভুলোমনা হয়ে উল্টাপাল্টা খাবার অর্ডার করেছিল। ওই ধাক্কার চোটেই হয়তো পটল তুলেছে বুড়ো। আরেকটু সাবধান হয়ে রোগীর সঙ্গে কথাবার্তা বলা উচিত ডাক্তারদের।’

‘তা তারা বলেন,’ মন্তব্য করলেন পোয়ারো।

‘আমার স্টেশন চলে এসেছে,’ উঠে দাঁড়ালেন বনিংটন। ‘নামছি আমি। বুড়ো লোকটার ব্যাপারে আর কিছু জানতে পারব বলে মনে হয় না। এমনকি তার নামটাও হয়তো জানা হবে না। বড় বিচিত্র এই পৃথিবী।’

কথা শেষ করে তড়িঘড়ি ট্রেন থেকে নেমে গেলেন ভদ্রলোক।

পেছনে ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন এরকুল পোয়ারো। গভীর চিন্তায় মগ্ন।

সেদিন বাড়ি ফিরে খানসামা জর্জকে কয়েকটা কাজ দিলেন তিনি।

দুই

একটা নামের তালিকার ওপর আঙুল বোলাচ্ছেন পোয়ারো। একটা নির্দিষ্ট এলাকার মৃত্যুর রেকর্ডের তালিকা ওটা।

একটা নামের ওপর এসে থেমে গেল পোয়ারোর আঙুল।

‘হেনরি গ্যাসকোয়েন,’ শব্দ করে পড়তে লাগলেন তিনি। ‘বয়স, উনসত্তর। একে দিয়েই শুরু করা যাক।’

সেদিনই, বিকেলের দিকে, কিংস রোড থেকে খানিক দূরে, ডা. ম্যাকঅ্যান্ড্রুর চেম্বারে বসে থাকতে দেখা গেল এরকুল পোয়ারোকে। দীর্ঘদেহী লালচুলো মানুষ ম্যাকঅ্যান্ড্রু। চেহারায় বুদ্ধির ঝিলিক।

‘গ্যাসকোয়েন?’ বললেন তিনি। ‘হ্যাঁ, চিনতাম তো লোকটাকে। খামখেয়ালি স্বভাবের বুড়ো। পুরোনো, জরাজীর্ণ একটা বাড়িতে একা থাকত। আধুনিক ফ্ল্যাট বানানোর জন্য বাড়িটা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। লোকটাকে আগে কখনো দেখিনি আমি। তবে পরে দেখেছি তাকে। তার পরিচয়ও জানতাম। সে যে মরে গেছে, তা প্রথম টের পায় দুধওয়ালা। দুধের বোতলের স্তূপ জমে গিয়েছিল বুড়োর দরজার সামনে। কাউকে ওগুলো ভেতরে নিতে না দেখে সন্দেহ হয় পাশের বাসার লোকজনের। পুলিশকে খবর দেয় তারা। ওরা এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। ঢুকে দেখে, সিঁড়ি থেকে পড়ে ঘাড় ভেঙে মারা গেছে বুড়ো। তার পরনে ছিল জরাজীর্ণ ফিতাওয়ালা পুরোনো একটা ড্রেসিং গাউন। ওটাতে পা বেঁধেই পড়ে গিয়েছিল বোধ হয়।’

‘আচ্ছা,’ বললেন পোয়ারো। ‘একেবারেই সোজাসাপ্টা কেস দেখছি। স্রেফ একটা দুর্ঘটনা।’

‘হ্যাঁ।’

‘কোনো আত্মীয়স্বজন নেই তার?’

‘ভাগনে আছে একটা। নাম লরিমার...জর্জ লরিমার। মাসে একবার এসে মামাকে দেখে যেত। সে নিজেও ডাক্তার। উইম্বলডনে থাকে।’

‘বৃদ্ধের মৃত্যুতে বিচলিত হয়নি সে?’

‘ঠিক বিচলিত হয়েছে বলা যাবে না। মানে, বুড়োর প্রতি টান থাকলেও তার সম্পর্কে খুব বেশি জানত না সে।’

‘মৃত্যুর কদিন পর পাওয়া যায় মি. গ্যাসকোয়েনের লাশ?’

‘কমপক্ষে আটচল্লিশ ঘণ্টা পর,’ জানালেন ডা. ম্যাকঅ্যান্ড্রু। ‘তবে বাহাত্তর ঘণ্টার বেশি হবে না। ৬ তারিখ সকালে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। আরেকটু সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে আমাদের হাতে। একটা চিঠি পাওয়া গেছে বৃদ্ধের ড্রেসিং গাউনের পকেটে। চিঠিটা লেখা হয়েছে ৩ তারিখে। পোস্ট করা হয়েছে সেদিনই সন্ধ্যায়, উইম্বলডন থেকে। ওটা তার কাছে পৌঁছায় রাত ৯টা বিশে। অর্থাৎ বুড়োর মৃত্যু হয়েছে ৩ তারিখ রাত সাড়ে ৯টার পর। তার পেটের খাবার পরীক্ষা করেও সেই ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে। মৃত্যুর ঘণ্টা দুয়েক আগে রাতের খাবার খেয়েছিল সে। ৬ তারিখ সকালে তার দেহ পরীক্ষা করে দেখতে পাই, আরও প্রায় ৬০ ঘণ্টা আগে মারা গেছে মি. গ্যাসকোয়েন। অর্থাৎ ৩ তারিখ রাত ১০টার দিকে।’

‘হুম, সব একেবারে খাপে খাপে মিলে গেছে। আচ্ছা, তাকে শেষ কখন জীবিত দেখা গেছে, বলুন তো?’

‘সেদিনই, সন্ধ্যা সাতটার দিকে, কিংস রোডে। ৩ তারিখ, বৃহস্পতিবার। সাড়ে সাতটায় গ্যালান্ট এন্ডেভার রেস্তোরাঁয় ডিনার করত সে। বৃহস্পতিবার রাতে বোধ হয় ওখানেই খেত। বুড়ো কিন্তু শিল্পী ছিল। তবে অত্যন্ত জঘন্য শিল্পী।’

‘ওই ভাগনে ছাড়া আর কোনো আত্মীয় নেই তার?’

‘যমজ ভাই আছে একটা। পুরো কাহিনি বড় অদ্ভুত। বহু বছর ধরে মুখ–দেখাদেখি বন্ধ ছিল ওদের। দ্বিতীয় ভাই অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েন পয়সাওয়ালা এক মহিলাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর আঁকাআঁকি ছেড়ে দেয় সে। এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া হয় দুই ভাইয়ের মধ্যে। সেই থেকে শুনেছি কেউ কাউকে মুখ দেখায় না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন? দুই ভাই মারা গেছে একই দিনে। বড় জন, মানে অ্যান্টনি, মরেছে সেদিনই বেলা তিনটার দিকে। যমজ ভাইদের একই দিনে মরার ঘটনা আর একটাই জানা আছে আমার। তবে তারা মরেছিল পৃথিবীর দুই প্রান্তে। ঘটনা দুটো হয়তো কাকতালীয়। এ-ই হলো কাহিনি।’

‘আমরা যে গ্যালান্ট এন্ডেভারে গিয়েছিলাম, মনে আছে আপনার?’ জিজ্ঞেস করলেন মি. বনিংটন। ‘ওখানকার ওই বুড়োর কথা মনে আছে? পাক্কা একটা সপ্তাহ ধরে ওখানে খেতে যাচ্ছে না সে। মলি তো বেশ ঘাবড়ে গেছে।’

‘অ্যান্টনির স্ত্রী বেঁচে আছে?’ জানতে চাইলেন পোয়ারো।

‘নাহ, কয়েক বছর আগে মারা গেছে।’

‘অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েন থাকত কোথায়?’

‘তার একটা বাড়ি ছিল কিংসটন হিলে। ডা. লরিমার জানিয়েছেন, খুব নিঃসঙ্গ, নিভৃত জীবন কাটাত লোকটা।’

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন এরকুল পোয়ারো। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছেন ডা. ম্যাকঅ্যান্ড্রু।

‘ব্যাপারটা কী, মি. পোয়ারো?’ জানতে চাইলেন তিনি। ‘আপনার সব প্রশ্নের জবাবই তো দিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।’

‘আপনি বলেছেন সাধারণ একটা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কেস এটা,’ ধীরকণ্ঠে বললেন পোয়ারো। ‘আমার মনও তা-ই বলছে, অতি সহজ একটা কাজ। স্রেফ একটা ধাক্কা।’

চমকে উঠলেন ডা. ম্যাকঅ্যান্ড্রু তার কথা শুনে।

‘মানে খুন! আপনার এই বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি আছে?’

‘না,’ জবাব দিলেন পোয়ারো। ‘এটা স্রেফ আমার অনুমান।’

‘নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ভিত্তি আছে এই অনুমানের পেছনে,’ জোর গলায় বললেন ডাক্তার।

কোনো মন্তব্য করলেন না পোয়ারো।

আবার মুখ খুললেন ম্যাকঅ্যান্ড্রু, ‘বুড়োর ভাগনে লরিমারকে সন্দেহ করছেন নাকি? তাহলে জোর দিয়ে বলতে পারি, ভুল লোকের ওপর নজর পড়েছে আপনার। সেদিন রাত সাড়ে আটটা থেকে মাঝরাত অবধি উইম্বলডনে ব্রিজ খেলছিল সে। তদন্ত করার সময় জানা গেছে সেটা।’

‘তথ্যটার সত্যতাও বোধ হয় যাচাই করে দেখা হয়েছে,’ বিড়বিড়িয়ে বললেন পোয়ারো। ‘পুলিশ এসব কাজ খুব যত্ন নিয়ে করে।’

‘আপনি বোধ হয় লরিমারের ব্যাপারে কিছু জানেন?’ প্রশ্নের ঢঙে বললেন ডাক্তার।

‘আপনি তার সম্পর্কে বলার আগে ওই নামে যে কেউ আছে, তা-ই জানতাম না।’

‘তাহলে আপনার সন্দেহ অন্য কারও ওপর?’

‘না না। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। এই কেসটা মানুষ নামক প্রাণীর নিয়মিত অভ্যাসের। এ ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ব্যাপারটাতেই ঘাপলা আছে, বুঝলেন।’

‘আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,’ বিভ্রান্ত কণ্ঠে বললেন ম্যাকঅ্যান্ড্রু।

‘ঝামেলাটা হলো, পচা মাছের ওপর মাত্রাতিরিক্ত সস দেওয়া হয়ে গেছে,’ বিড়বিড় করে বললেন পোয়ারো।

‘অ্যাঁ! কী বললেন, স্যার?’

মুচকি হাসলেন পোয়ারো। ‘আপনি বোধ হয় আমাকে পাগল ঠাওরাচ্ছেন, মঁসিয়ে। কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আমি কোনো পাগলটাগল নই। আসলে সবকিছুতেই শৃঙ্খলা আর যথাযথ পদ্ধতি মেনে চলতে পছন্দ করি আমি। আর কোনো ঘটনায় এসবের অভাব দেখা গেলে চিন্তায় পড়ে যাই। আপনাকে অনেক বিরক্ত করলাম, সে জন্য নিজগুণে ক্ষমা করবেন।’

উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ডাক্তারও উঠলেন। বললেন, ‘আমি কিন্তু হেনরি গ্যাসকোয়েনের মৃত্যুতে সন্দেহ করার মতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দুর্ঘটনাবশত সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে বুড়ো। অথচ আপনি বলছেন, কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে তাকে।’

‘হ্যাঁ, তা-ই মনে হচ্ছে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন পোয়ারো। ‘যাকগে, হেনরি গ্যাসকোয়েনের কি নকল দাঁত ছিল?’

‘নাহ্। তার আসল দাঁতগুলো বহাল তবিয়তেই ছিল। এই বয়সেও অমন মজবুত দাঁত রাখতে পারাটা বিশাল ব্যাপারই বটে।’

‘লোকটা তাহলে দাঁতের যত্ন নিত। দাঁতগুলো নিশ্চয়ই ঝকঝকে সাদা? আর খুব ভালোমতো মাজা হতো?’

‘হ্যাঁ। দাঁতগুলো আমি বিশেষ করে পরীক্ষা করেছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দাঁত হলদেটে হতে থাকে। কিন্তু বুড়োর দাঁত ছিল ঝকঝকে সাদা।’

‘একটুও রং বদলায়নি?’

‘না। লোকটা ধূমপান করত না।’

‘ঠিক আছে, মঁসিয়ে, আজ তাহলে আসি। আপনার বদান্যতার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।’

ডাক্তারের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নিলেন তিনি।

তিন

গ্যালান্ট এন্ডেভার। বনিংটনের সঙ্গে সেদিন যে টেবিলে বসেছিলেন, আজও সেটাতেই বসেছেন পোয়ারো। তবে আজ মলি আসেনি তাকে খাবার পরিবেশন করতে। অন্য একটা মেয়ে এসেছে। মলি নাকি ছুটিতে আছে।

সবে সাতটা বাজে। খদ্দেরের ভিড় তেমন নেই। কাজেই মেয়েটার সঙ্গে মন খুলে আলাপ শুরু করতে কোনো অসুবিধা হলো না পোয়ারোর। দুই মিনিটের মধ্যে মি. গ্যাসকোয়েনকে নিয়ে আলাপ জমিয়ে ফেললেন তিনি।

‘হ্যাঁ, বহু বছর ধরে এখানে খেতে আসছিলেন তিনি,’ মেয়েটা বলল। ‘কিন্তু আমরা কেউই তার নাম জানতাম না। তার মৃত্যুর খবর জেনেছি পত্রিকা পড়ে। কাগজে ওর ছবি দেখে মলিকে বলেছিলাম, “ইনি আমাদের সেই বুড়ো খদ্দের না?”’

‘উনি যেদিন মারা যান, সেদিন রাতেও তো এখানেই খেতে এসেছিলেন, তাই না?’ জানতে চাইলেন পোয়ারো।

‘হ্যাঁ। বৃহস্পতিবার, ৩ তারিখ। প্রতি মঙ্গল আর বৃহস্পতিবার এখানে খেতে আসতেন উনি।’

বিজ্ঞাপন

‘সেদিন উনি কী খেয়েছিলেন, মনে আছে তোমার?’

‘উমম, দাঁড়ান, একটু ভেবে নিই।...হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কড়া মসলা দেওয়া মালিগ্যাটনি স্যুপ, ভাজা গরুর মাংসের পুডিং...আর...আর কী যেন? ভেড়ার মাংস? না না, ভেড়ার মাংস না।...আর খেয়েছিলেন ব্ল্যাকবেরি, আপেল পাই ও পনির। এরপরই বাড়ি ফিরে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। ঝোলা ড্রেসিং গাউন পরার কারণেই নাকি পা জড়িয়ে পড়ে যান ওটাতে। ভদ্রলোক সব সময় বিদঘুটে সব পোশাক পরতেন—মান্ধাতার আমলের, জরাজীর্ণ। মজার সব খদ্দের আসে আমাদের এখানে।’

কথা শেষ করে চলে গেল মেয়েটা। এবার খাওয়ায় মন দিলেন এরকুল পোয়ারো। জ্বলজ্বল করছে তার সবুজ চোখ দুটো।

‘অদ্ভুত ব্যাপার,’ আপনমনে বললেন তিনি। ‘বুদ্ধিমান মানুষগুলো যে কী করে বিস্তারিত তথ্য ভুলে যায়! বনিংটন নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আগ্রহী হবে।’

তবে তার সঙ্গে আলোচনা করার সময় আসেনি এখনো।

চার

পরদিন কয়েকজন প্রভাবশালী লোকের সুপারিশ নিয়ে জেলা করোনারের সঙ্গে দেখা করলেন এরকুল পোয়ারো।

‘অদ্ভুত লোক ছিল এই গ্যাসকোয়েন,’ করোনার বললেন। ‘নিঃসঙ্গ, খামখেয়ালি।’

কথা বলতে বলতে তীক্ষ্ণ চোখে সামনে দাঁড়ানো ছোটখাটো মানুষটাকে দেখছেন সরকারি শব পরীক্ষক।

জবাব দিতে গিয়ে খুব সাবধানে শব্দচয়ন করলেন পোয়ারো। ‘তার মৃত্যুর সঙ্গে এমন কিছু পরিস্থিতি জড়িত যে তদন্তটা দরকারি হয়ে পড়েছে।’

‘বেশ, তাহলে করুন আপনার তদন্ত। বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি আমি?’

‘কোনো কেসের কাগজপত্র আদালতে পেশ করা হয়ে গেলে কাগজগুলো নষ্ট করে ফেলা হবে, নাকি সংরক্ষণ করে রাখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তো আপনার। শুনেছি, একটা চিঠি পাওয়া গিয়েছিল হেনরি গ্যাসকোয়েনের ড্রেসিং গাউনের পকেট থেকে?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন।’

‘চিঠিটা নাকি তার ভাগনে ডা. জর্জ লরিমারের কাছ থেকে এসেছিল?’

‘হ্যাঁ, তা-ও ঠিকই শুনেছেন। আনুষ্ঠানিক তদন্তের সময় আদালতে পেশ করা হয় চিঠিটা। মৃত্যুর সময় নির্ধারণে বেশ কাজে লেগেছে ওটা।’

‘ডাক্তারি পরীক্ষার সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে ওটার?’

‘হ্যাঁ।’

‘চিঠিটা কি এখনো আছে?’

অধীর আগ্রহে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন এরকুল পোয়ারো। চিঠিটা এখনো আছে শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ওটা হাতে পেতেই পর্যবেক্ষণে লেগে গেলেন তিনি। স্টাইলোগ্রাফিক কলমে লেখা, আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষর।

ওতে লেখা:

প্রিয় হেনরি মামা,

অ্যান্টনি মামাকে রাজি করাতে পারিনি বলে আমি দুঃখিত। তোমার সঙ্গে দেখা করার কোনো আগ্রহই দেখাল না অ্যান্টনি মামা। তাকে বারবার অনুরোধ করেছিলাম অতীতের কথা ভুলে যেতে, কিন্তু আমার কথায় কানই দিল না। অ্যান্টনি মামা কিন্তু ভীষণ অসুস্থ। চিন্তাভাবনায় স্থিরতা নেই। আর বেশি দিন বাঁচবে বলে মনে হয় না। এমনকি তোমাকেও ঠিকমতো চিনতে পারছে না।

দুঃখিত, কাজটাতে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে আমি কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।

তোমার স্নেহধন্য ভাগনে

জর্জ লরিমার

চিঠিটায় তারিখ ৩ নভেম্বরের দেওয়া। খামের ওপর ডাকঘরের সিলমোহরটা দেখে নিলেন পোয়ারো—বিকেল ৪:৩০, ৩ নভেম্বর।

‘দারুণভাবে সাজানো-গোছানো,’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি।

পাঁচ

এরপর পোয়ারো গেলেন কিংসটন হিলে। অল্প দুয়েক কথায় পটিয়ে ফেললেন প্রয়াত অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েনের রাঁধুনি ও হাউসকিপার অ্যামেলিয়া হিলকে।

প্রথমে একটু সন্দেহের সুরে কথা বলছিল মিসেস হিল। কিন্তু পরে অদ্ভুতদর্শন বিদেশি ভদ্রলোকের আন্তরিকতায় জড়তা কেটে গেল তার। ধীরে ধীরে মন খুলে কথা বলতে শুরু করল মহিলা। মনোযোগী ও সহানুভূতিশীল শ্রোতা পেয়ে যাবতীয় ঝুটঝামেলা আর দুঃখ–দুর্দশার কথা বলে যেতে লাগল সে একে একে।

চৌদ্দ বছর ধরে মি. গ্যাসকোয়েনের বাড়িতে কাজ করছে মিসেস অ্যামেলিয়া। খুব একটা সহজ কাজ নয়। তাকে যে ঝামেলা পোহাতে হয়, অন্য কোনো মেয়ে হলে এত দিনে চম্পট দিত। খ্যাপা স্বভাবের লোক ছিল অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েন। টাকাপয়সার মোহ একটু বেশিই ছিল তার। স্বভাবে ছিল কঞ্জুস। তবে মিসেস হিল বিশ্বস্ততার সঙ্গে ভদ্রলোকের সেবাযত্ন করে গেছে। তার খ্যাপামিও সহ্য করেছে। বিনিময়ে আশা করেছিল, অল্প কিছু টাকা হলেও তাকে দিয়ে যাবে মি. গ্যাসকোয়েন। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। ভদ্রলোক তার পুরোনো উইলে তার যাবতীয় টাকাপয়সা, সয়সম্পত্তি স্ত্রীকে দিয়ে গেছে। আর স্ত্রী যদি তার আগে মারা যায়, তাহলে সব সম্পত্তি পাবে তার ভাই হেনরি। বেশ অনেক বছর আগে করা হয়েছে উইলটা। তবে কাজটা ঠিক হয়নি!

আস্তে আস্তে অ্যামেলিয়া হিলের ওপর থেকে সন্দেহ দূর হয়ে গেল পোয়ারোর। সত্যি, ভারি অবিচার করা হয়েছে মহিলার ওপর! অ্যান্টনির কাজের জন্য সে দুঃখ পেতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক। অ্যান্টনি যে টাকার ব্যাপারে অত্যন্ত হিসাবি ছিল, সে কথা সবাই জানে। এ-ও শোনা গেছে যে লোকটা তার ভাইয়ের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেছিল। মিসেস হিল হয়তো এ ব্যাপারে কিছু জানে।

‘ডা. লরিমার কি এ ব্যাপারেই দেখা করতে এসেছিলেন তার সঙ্গে?’ বলল মিসেস হিল। ‘উনি যে মি. অ্যান্টনির ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলেন, তা জানতাম। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, তাদের ঝগড়া মিটমাট করে ফেলতে চেয়েছিলেন মি. হেনরি। বহু বছর আগে ঝগড়া হয়েছিল দুজনের।’

‘মি. অ্যান্টনি নাকি ভাইয়ের প্রস্তাবে মানা করে দেন?’ বললেন পোয়ারো।

‘হ্যাঁ,’ মাথা নেড়ে সায় জানাল মিসেস হিল। ‘বলেছিলেন, “হেনরি! হেনরির কী হয়েছে? এত বছরেও আমার সঙ্গে দেখা করেনি ও। এখন এসেছে দরদ দেখাতে? আমি দেখা করব না। ও তো একটা জাত ঝগড়াটে।”’

‘না না। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। এই কেসটা মানুষ নামক প্রাণীর নিয়মিত অভ্যাসের। এ ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ব্যাপারটাতেই ঘাপলা আছে, বুঝলেন।’

এরপর আবার মিসেস হিলের ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশার দিকে ঘুরে গেল আলোচনার মোড়। তার সঙ্গে নিষ্ঠুর পাষাণের মতো আচরণ করেছে মি. গ্যাসকোয়েনের উকিল।

মহিলার কাছ থেকে ছুটে আসতে বেশ বেগ পেতে হলো পোয়ারোকে।

রাতের খাবারের পর উইম্বলডনের এল্মক্রেস্ট রোডে গেলেন তিনি ডা. জর্জ লরিমারের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়িতেই ছিল ডাক্তার, সবে খেয়ে উঠেছে। চেম্বারে বসানো হলো পোয়ারোকে।

‘আমি রোগী নই, ডাক্তার সাহেব,’ বললেন তিনি। ‘আমার এখানে আসাটা বোধ হয় একটু ধৃষ্টতাই হয়ে গেছে। তবে আমি বুড়ো মানুষ, সরাসরি কথা বলায় বিশ্বাসী। উকিল আর তাদের দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির ওপর আমার ভরসা নেই।’

এ কথা বলে লরিমারের কৌতূহল উসকে দিলেন তিনি। মাঝারি উচ্চতার মানুষ জর্জ লরিমার, দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করে কামানো। চুলের রং বাদামি, তবে চোখের পাতাগুলো প্রায় সাদা। ফলে চোখ দুটো কেমন যেন গোল গোল দেখায়। চটপটে স্বভাবের লোক সে, তবে রসকষ বলে কিছু নেই তার মধ্যে।

‘উকিল?’ ভুরু উঁচিয়ে বলল সে। ‘ওদের দেখতে পারি না আমি। আপনি কিন্তু আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিচ্ছেন, স্যার। বসুন না।’

একটা চেয়ারে বসে পড়লেন পোয়ারো। পকেট থেকে তার কার্ড বের করে দিলেন ডাক্তারের হাতে।

পিটপিট করে উঠল জর্জ লরিমারের সাদা চোখের পাতা।

আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনে ঝুঁকে এলেন পোয়ারো। ‘আমার মক্কেলদের মধ্যে অনেক ভদ্রমহিলা আছেন।’

‘স্বাভাবিক,’ চোখ পিটপিট করে বলল জর্জ লরিমার।

‘মহিলারা সাধারণত পুলিশকে বিশ্বাস করেন না,’ বললেন পোয়ারো। ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভদের দিয়ে কাজ করাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তারা। ব্যক্তিগত ঝামেলাগুলো জনসমক্ষে চলে আসুক, তা তারা চান না। কয়েক দিন আগে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন আমার কাছে। বহু বছর আগে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল তার। সে নিয়ে মনোমালিন্য, মনে সুখ নেই। তার স্বামীটি কে, জানেন? আপনার মামা, প্রয়াত মি. গ্যাসকোয়েন।’

লাল হয়ে গেল জর্জ লরিমারের চেহারা। ‘আমার মামা? ফালতু কথা। তার স্ত্রী বহু বছর আগেই মারা গেছে।’

‘আপনার মামা মি. অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েনের স্ত্রীর কথা বলছি না আমি, ডাক্তার সাহেব। আপনার আরেক মামা মি. হেনরি গ্যাসকোয়েনের স্ত্রীর কথা বলছি।’

‘হেনরি মামা? কিন্তু হেনরি মামা তো জীবনে বিয়েই করেনি।’

‘করেছিলেন, ডক্টর, করেছিলেন,’ অম্লান বদনে মিথ্যা বললেন পোয়ারো। ‘এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ভদ্রমহিলা তাদের বিয়ের সার্টিফিকেটও নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে।’

‘মিথ্যা!’ চেঁচিয়ে উঠল জর্জ লরিমার। মুখের রং টকটকে লাল। ‘আমি বিশ্বাস করি না। আপনি একটা ডাহা মিথ্যুক।’

‘ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে গেল না?’ নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন পোয়ারো। ‘শুধু শুধু একটা খুন করলেন। কোনো লাভ হলো না।’

‘খুন?’ কেঁপে গেল লরিমারের গলা। আতঙ্কে দুই চোখ বেরিয়ে আসতে চাইছে কোটর ঠেলে।

‘ভালো কথা,’ পোয়ারো বলল, ‘আপনি দেখছি আবার ব্ল্যাকবেরির চাটনি খাওয়া ধরেছেন। অভ্যাসটা ভালো না। ব্ল্যাকবেরিতে প্রচুর ভিটামিন আছে বটে, তবে ফলটা কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারে। ফলটা এবার একজন মানুষের গলায় ফাঁসির দড়ি পরাতে সাহায্য করেছে। গলাটা কার, জানেন? আপনার, ডা. লরিমার।’

ছয়

‘আপনার অনুমানে ভুলটা কোথায় হয়েছিল, বুঝতে পারছেন তো, বন্ধু?’ মি. বনিংটনের উদ্দেশে বললেন এরকুল পোয়ারো। গ্যালান্ট এন্ডেভারে এসেছেন তারা রাতের খাওয়া সারতে। ‘ধরুন, একজন মানুষ অসহ্য মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। এ অবস্থায় তার পক্ষে এমন কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, যা সে আগে কখনো করেনি। অমন অবস্থায় নতুন কিছু নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতাই মানুষের নেই। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত লোকটা হয়তো পায়জামা পরেই বাইরে ডিনার করতে চলে আসবে। তবে পায়জামাটা হবে তার নিজের, অন্য কারোর নয়।’

‘ঘন স্যুপ, চর্বির পুডিং আর ব্ল্যাকবেরির চাটনি যে লোকের দুই চোখের বিষ, সে কেন হঠাৎ একসঙ্গে এই তিনটা খাবারের অর্ডার করবে? আপনি বলেছিলেন, সেদিন সে কোনো কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল। কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে, যে মানুষ কোনো ব্যাপারে চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন থাকে, সে তখন আপনা থেকেই তার রোজকার অভ্যাসমতো পুরোনো খাবারের অর্ডার করবে।’

‘এ ছাড়া আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে, বলুন? আমিও অন্য কোনো ব্যাখ্যার কথা ভাবতেই পারিনি। সে জন্যই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। মি. গ্যাসকোয়েনের নিয়মিত রুটিন মিলছিল না। তার মানে, কোথাও কোনো ঘাপলা আছে। আমি আবার সুশৃঙ্খল কাজকর্ম এবং চিন্তাভাবনার ভক্ত। কাজেই মি. গ্যাসকোয়েনের ডিনারের অর্ডার আমাকে ভাবিয়ে তুলল।’

‘তারপর আপনি জানালেন লোকটা উধাও হয়ে গেছে। বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম মঙ্গল আর বিষ্যুদবার রেস্তোরাঁয় আসা বন্ধ হয়ে যায় তার। ব্যাপারটা আরও পছন্দ হলো না আমার। অদ্ভুত একটা হাইপোথিসিস উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল মনের মধ্যে। আমার অনুমান সঠিক হলে, লোকটা আর বেঁচে নেই। শুরু করলাম খোঁজখবর নেওয়া। জানতে পারলাম, আসলেই মারা গেছে সে। এবং আপাতদৃষ্টিতে একবিন্দু অস্বাভাবিকতা নেই সেই মৃত্যুতে।

‘যা-ই হোক, ৩ তারিখ সন্ধ্যা সাতটায় কিংস রোডে দেখা গিয়েছিল বুড়োকে। সেদিনই সাড়ে সাতটায়, অর্থাৎ মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে এখানে রাতের খাওয়া সারতে দেখা যায় তাকে। এসবই মিলে যাচ্ছে লোকটার পাকস্থলীতে পাওয়া খাদ্য আর চিঠির সময় ও তারিখের সঙ্গে। সবকিছু যেন বড্ড বেশি স্বাভাবিক।

‘বুড়োর পকেটে পাওয়া চিঠিটা লিখেছিল তার অনুগত ভাগনে। মৃত্যুর সময় সম্পর্কে চিঠিটা চমত্কার একটা অ্যালিবাই হয়ে দাঁড়াল ভাগনের জন্য। মৃত্যুটা হয়েছেও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে। নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিষ্কার খুন? সবার বিশ্বাস—দুর্ঘটনা।

‘ভাগনেই একমাত্র জীবিত আত্মীয়। তাই সবকিছুর উত্তরাধিকার হবে সে-ই। কিন্তু উত্তরাধিকার হওয়ার মতো কোনো সম্পত্তি কি আছে? হেনরি মামার তো টাকাপয়সা কিচ্ছু নেই।’

‘কিন্তু মামাটির একটা ভাই আছে। ভাইটি সময়মতো বিয়ে করেছিল এক ধনী মহিলাকে। সে থাকে কিংসটন হিলের একটা বিলাসবহুল বাড়িতে। কাজেই ধরে নিতে পারি যে ধনী স্ত্রী তার সব টাকাপয়সা স্বামীর জন্যই রেখে গেছে। ঘটনাটা বুঝতে পারছেন তো? পয়সাওয়ালা স্ত্রী তার সব টাকা দিয়ে গেল অ্যান্টনিকে। অ্যান্টনি দিয়ে গেল হেনরিকে। আর হেনরির সব টাকাপয়সা পাবে জর্জ। একদম সুসজ্জিত ঘটনাশৃঙ্খল।’

‘খুব ভালো একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন,’ বললেন বনিংটন। ‘এরপর কী করলেন?’

‘এরপরের কাজ তো পানির মতো সোজা। হেনরি মারা গিয়েছিল খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর। তদন্তে শুধু এ ব্যাপারের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোন খাবার খাওয়ার পর মারা গেছে, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ধরুন, সেই খাওয়াটা যদি ডিনার না হয়ে লাঞ্চ হয়?

‘নিজেকে এখন জর্জ লরিমারের জায়গায় বসান। জর্জের টাকা দরকার, খুব বেশি দরকার। ওদিকে অ্যান্টনি গ্যাসকোয়েনের মরণ আসন্ন। কিন্তু তার মৃত্যুতে জর্জের কোনো লাভ হচ্ছে না। তার টাকাপয়সা সবই পাচ্ছে হেনরি। আর হেনরি গ্যাসকোয়েন হয়তো আরও বছর দশেক বেঁচে থাকবে। কাজেই তাকেও মরতে হবে। হেনরি যত তাড়াতাড়ি মরে, জর্জের জন্য ততই মঙ্গল। তবে তার মৃত্যুটা হতে হবে অ্যান্টনি মরার পর। নইলে উইল অনুসারে টাকা পাবে না জর্জ। এবং সেই সঙ্গে একটা অ্যালিবাইও জোগাড় করতে হবে আমাদের ভাগনেকে।

‘সপ্তাহে দুই দিন গ্যালান্ট এন্ডেভারে আসত হেনরি, রাতের খাওয়া সারতে। এই অভ্যাসই মোক্ষম অ্যালিবাই হয়ে দাঁড়াল জর্জের জন্য। অত্যন্ত ধুরন্ধর লোক আমাদের ভাগনেটি। তাই ঠিক করল, কাজটা করার আগে একটা ট্রায়াল দিয়ে নেবে।

‘যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। মামার ছদ্মবেশ নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় চলে এল রেস্তোরাঁয় খেতে। এখানে কোনো ঝামেলা হলো না। সবাই বিশ্বাস করল, সে-ই হেনরি। রিহার্সাল হয়ে গেছে, এবার শুধু অপেক্ষা কখন মুমূর্ষু অবস্থা হয় অ্যান্টনি মামার। অচিরেই ঘনিয়ে এল তার মরণকাল।

‘এবার কাজে নামল জর্জ। নভেম্বরের ২ তারিখ বিকেলে হেনরি মামাকে চিঠি লিখল সে। কিন্তু ওতে তারিখ দিল ৩ নভেম্বরের। ৩ তারিখ বিকেলে শহরে আসে সে, হেনরি মামার সঙ্গে দেখা করতে। এবং প্ল্যানমাফিক কাজ সেরে ফেলে। ছোট্ট একটা ধাক্কা—ব্যস, সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পটল তুলল হেনরি।

‘তারপর আগের দিন পাঠানো চিঠিখানা খুঁজে বের করল জর্জ। ওটা ঢুকিয়ে দিল মামার ড্রেসিং গাউনের পকেটে। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চলে যায় গ্যালান্ট এন্ডেভারে। মুখে নকল দাড়ি, চোখে ঝোপের মতো ঘন ভুরু—নিখুঁত ছদ্মবেশ। সুতরাং সবাই নিজ চোখে দেখল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়ও জীবিত ছিল হেনরি গ্যাসকোয়েন।

‘খাওয়াদাওয়া সেরে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে একটা বাথরুমে ঢুকল জর্জ। ঝটপট খুলে ফেলল ছদ্মবেশ। তারপর শাঁই শাঁই করে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল উইম্বলডনে, ব্রিজ খেলতে। পরে পুলিশসহ সবাই বিশ্বাস করে নিল, হেনরি খুন হয়েছে সাড়ে নয়টার দিকে। অর্থাৎ অ্যান্টনির পর। সে সময় জর্জ ছিল উইম্বলডনে, একদঙ্গল লোকের সামনে ব্রিজ খেলায় ব্যস্ত। নিখুঁত অ্যালিবাই।’

‘কিন্তু চিঠির খামের ওপর পোস্টাপিসের সিলমোহরটা কীভাবে ব্যবস্থা করল?’ জানতে চাইলেন বনিংটন।

‘ওটা তো মামুলি ব্যাপার,’ জবাব দিলেন পোয়ারো। ‘পোস্টাপিসের ছাপটার ওপর একটা ঝাপসা দাগ ছিল। কেন, বলুন তো? প্রদীপের কালি দিয়ে ২ নভেম্বর লেখাটা ঢেকে দিয়েছে। ওটার জায়গায় ৩ নভেম্বর লিখেছে। আগে থেকে অনুমান করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখলে এই পরিবর্তন চোখেই পড়বে না। আর সবশেষে ব্ল্যাকবেরি।’

‘ব্ল্যাকবেরি?’

‘হ্যাঁ, ব্ল্যাকবেরির চাটনি। জর্জ আসলে অত ভালো অভিনেতা না। ওথেলো নাটকে এক অভিনেতা পুরোটা সময় গায়ে কালো রং মেখে অভিনয় করে, মনে আছে আপনার? এই অপরাধ-নাটকে জর্জ হচ্ছে সেই কালিমাখা অভিনেতা।

‘জর্জ দেখতে অনেকটা তার মামার মতো, চলাফেরার ভঙ্গি মামার মতো, কথাও বলে মামার মতোই। মুখে দাড়ি-গোঁফ আর চোখে ভুরুও লাগিয়ে নিল মামার মতো। কিন্তু একটা জায়গায় পা ফসকে গেল তার। মামার মতো খেতে ভুলে গিয়েছিল সে। গ্যালান্টে এসে নিজের অর্ডার করল পছন্দের খাবারের।

‘জানেন তো, ব্ল্যাকবেরির চাটনি খেলে দাঁতের রং ময়লা হয়ে যায়। কিন্তু মৃত হেনরির দাঁতের রং ময়লা হয়নি। অথচ সেদিন সন্ধ্যায় গ্যালান্টে হেনরি গ্যাসকোয়েনকে ব্ল্যাকবেরি খেতে দেখেছিল সবাই। কিন্তু ময়নাতদন্তে তার পাকস্থলীতে ব্ল্যাকবেরির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

‘কালই জর্জ লরিমারের বাড়ি গিয়েছিলাম আমি। লোকটা ভারি বোকা, নকল দাড়ি-গোঁফ আর মেকআপের জিনিসপত্র সব বাড়িতেই রেখে দিয়েছিল।’

‘দেখলেন তো, কতগুলো প্রমাণ জোগাড় করলাম? যা-ই হোক, একথা–সেকথা বলে তাতিয়ে দিয়েছিলাম জর্জকে। ব্যস, মেজাজ হারিয়ে ফাঁদে পা দিয়ে বসল বোকাটা। আমি যখন গেছি, তখন সবে খাবার টেবিল থেকে উঠেছে সে। দেখলাম, তখনো ব্ল্যাকবেরি খেয়েছে। লোকটা অতিলোভী। খাওয়াদাওয়ার লোভটা সামলাতেই পারে না। এই লোভই ফাঁসির দড়ি পরাবে ওর গলায়। “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু”—কথাটা ভুলেই গিয়েছিল ব্যাটা।’

পোয়ারোর কথা শেষ হতে না হতেই তাদের টেবিলে দুই বাটি করে ব্ল্যাকবেরি ও আপেলের চাটনি দিয়ে গেল ওয়েট্রেস।

‘অ্যাই,’ আতঙ্কিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন বনিংটন। ‘এই চাটনি নিয়ে যাও। এ জিনিস আর গলা দিয়ে নামবে না আমার। এই ব্ল্যাকবেরি খেয়ে কখন কোথায় ফেঁসে যাই, কে জানে! তুমি বরং আমার জন্য ছোট্ট এক বাটি সাগুর পুডিং নিয়ে এসো।’

(মূল গল্প : ফোর অ্যান্ড টোয়েন্টি ব্ল্যাকবার্ডস)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন