default-image

বিপদ যখন আসে, তখন আসে গুচ্ছ আকারে।

একে তো লোকাল ট্রেন অনেক লেট করল, তার ওপর ইদ্রিসপুর রেলস্টেশনে নেমে দেখলাম, আমার জন্য যে লোক দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সে আসেনি। দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেছে—এমন না। আসেইনি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। কমলারঙা রোদ ছড়িয়ে পড়ছে এমন এক তল্লাটে, যেখানে বিদ্যুৎ নেই। 

এই অঞ্চল আমার অপরিচিত। এমনই অপরিচিত যে পূর্বনির্ধারিত লোকটাকে রেলস্টেশনে না পেয়ে আমি অসহায় বোধ করলাম। অপরিসর প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। তারপর স্টেশনমাস্টারের কক্ষে ঢুকে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে থাকার কোনো আয়োজন সম্ভব কি না।

লোকটা বলল, কোনো আবাসিক হোটেল-মোটেল নেই এখানে। লোকে অতিথিবৎসল নয়, আততায়ী-আতঙ্কে ভোগে। কারও বাসায় কেউ অপরিচিত লোককে থাকতে দেয় না। 

তাহলে উপায়?

জবাব না দিয়ে স্টেশনমাস্টার আজকের মতো অফিস গুটিয়ে নিজ কোয়ার্টারে চললেন। ছোট্ট ব্রাঞ্চ লাইনে আজ আর ট্রেন নেই। তাই ছুটি। প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় আমাকে অসহায়, দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তিনি ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়ার সময় শুধু বললেন, ‘মল্লিকবাড়ি যেতে পারেন, যদি সাহসে কুলায়।’

ব্যস! এইটুকুই। মল্লিকবাড়ি। আর কিছুই উল্লেখ করলেন না লোকটা। মল্লিকবাড়ি কী, কোথায়, কেন—কিছুই না।

রেলস্টেশনের পেছনে একটা একই রকম অমিশুক, ঝাঁকড়া আমড়াগাছের নিচে দুটি দোকান। একটা সাইকেল ঠিক করার, আরেকটা চা-সিগারেট-ওষুধের। সাইকেল সারাইয়ের লোকটা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে বলল, মল্লিকবাড়ি এখান থেকে মাইল চারেক দূরে। রাস্তা আছে। সমস্যা একটাই: মাইজা সাধুর হাট পেরিয়ে যেতে হবে। শুধু এইটুকুই বলল লোকটা। মাইজা সাধুর হাটের বিষয়টা কী, সেটা পেরোনো কেন সমস্যা, কোনো কথা নেই।

এই এলাকায় লোকে যেভাবে দুম করে মুখে কুলুপ এঁটে দিতে পারে, এমন কোথাও দেখিনি। এত অপমানজনকভাবে তারা সেটা করে, দ্বিতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে না। 

আমি স্টেশন ছেড়ে গ্রামের রাস্তায় হাঁটা দিলাম। ত্রিতল্লাটে রিকশাভ্যান-ট্যান নেই। ফলে পা-ই সম্বল।

দুপাশে দিগন্তজোড়া আলুখেত। মাঝে মাঝে পানের বরজ। ধান-পাটের বালাই নেই। সবকিছু কেমন নিমন্ত্রণহীন, বিমুখ। লোকালয় নেই বললেই চলে। যদিবা একটি-দুটি বাড়ি চোখে পড়ে, সেগুলো রাস্তা থেকে বেশ দূরত্ব রেখে এবং রাস্তার দিকে পিঠ দিয়ে বানানো, যেন গৃহকর্তা কাউকে স্বাগত জানাতে চান না।

এ রকম বিমর্ষ চরাচরে যখন আলো নিভে রাস্তাঘাট অস্পষ্ট হয়ে আসছে, আমার সামনে হাজির হলো মাইজা সাধুর হাট। কেউ আমাকে বলে দেয়নি। নিজে থেকে বুঝে নিলাম। 

হাট বললাম, তবে বলা উচিত হাটের কঙ্কাল বা হাড়গোড়। জনহীন, পরিত্যক্ত একটা বাজার। দোকানপাটের কাঠামোগুলো টিকে আছে শুধু, দরজা-জানালা-ছাদ নেই। সবকিছুতে যেভাবে শেওলা ধরেছে, যেভাবে আগাছা গজিয়েছে, বোঝা যায়, অনেক দিন ধরে পরিত্যক্ত জায়গাটা। একটা কুকুরও নেই হাটে। কেন এভাবে পরিত্যক্ত হলো? 

‘জ্বর হইছিল,’ বলল আসগর। 

‘হাটের?’

‘না। মাইনষ্যের। অনেক লোক মরছিল।’

আসগরের সঙ্গে দেখা এই হাটের মধ্যে। সে একটা দোকানের কঙ্কালে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এসেছে। স্বতঃপ্রণোদিত আচরণ এখানে এই প্রথম। তবে আসগরকে দেখে যে কারও গা ছমছম করে উঠবে। লোকটার একটা চোখ নেই। অন্ধ নয়, চোখ নেই। চোখের জায়গায় একটা শূন্যতা, একটা গর্ত। সেই গর্তে সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকার। যে মহামারিতে হাট উজাড় হয়েছে, সেই একই মহামারির ফল। রোগটা আসগরের কণ্ঠস্বরেও কী এক ঝামেলা করে গেছে। এ রকম খ্যাসখ্যাসে গলা আমি কারও শুনিনি। আসগর বলল, ‘হ্যানো কেউ আহে না।’

আসগরের বাড়ি ধারেকাছে। তবে সে হাটেই থাকে বেশির ভাগ সময়। মল্লিকবাড়ির নিশানা সে বাতলে দিল আমাকে। না দিলে আমার জন্য দিক পাওয়া কঠিন হতো। একে তো দ্রুত আলো পড়ে আসছে, তার ওপর হাট থেকে অনেকগুলো পায়ে চলা পথের রেখা মাকড়সার জালের মতো চলে গেছে নানান দিকে। 

আসগরের নির্দেশনা মেনে হাটের পাশে একটা দিগন্তজোড়া মাঠে এসে পড়লাম। এককালে এখানে তুলার খেত ছিল। দূরে এক কোনায় একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি টেক্সটাইল মিল। তার চিমনির পেছনে ধকধক করে জ্বলছে সন্ধ্যাতারা। উল্টো দিকে সিঁদুররঙা প্রায় গোলাকার একটা চাঁদ উঠছে অলস ভঙ্গিতে। মাঠটা এত বড় যে পেরোতে পেরোতে চাঁদ অনেকখানি উঠে এল, আর তার রংটাও সিঁদুর থেকে ক্রমে হয়ে এল সাদাটে। আমি তখন ফেলে আসা হাটের কথা ভাবছিলাম না আর। ভাবছিলাম মল্লিকবাড়ির কথা। কেন একটা বাড়ির নাম বলতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে সাহসের কথাটা তুলেছিলেন স্টেশনমাস্টার? কী আছে মল্লিকবাড়িতে?

বিজ্ঞাপন
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা এমনভাবে কাঠের পাল্লা মেলে ধরলেন, বুঝতে বাকি থাকে না, দরজা অবারিত। তবু ভদ্রতাবশত আমি অপেক্ষাই করছিলাম। অবশেষে বৃদ্ধ বললেন, ‘আসেন।’

সাহসের অভাব আমার কোনোকালে ছিল না। তবু জ্যোৎস্নার আলোয় অপরিচিত মাঠঘাটের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমি বুঝতে পারছিলাম, এই যাত্রার শেষ মাথায় যে গন্তব্য, সেটা একটা বাড়িই বটে, কিন্তু ধীরে ধীরে আমার মগজের ভেতরে সেটা এক অজানা চরিত্রে পরিণত হচ্ছে। সেই বাড়ি যেন এমন এক স্থাপনা, যার অভিপ্রায় আছে, যে অপেক্ষা করতে জানে, বসে থাকতে জানে সন্ধ্যারাতে আকস্মিক এক অতিথির জন্য।

তারপর, অবশেষে, একসার নারকেলগাছের ফাঁকে উঁকি দিল মল্লিকবাড়ির উঁচু ছাদ। আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বুঝিনি, এসে পড়েছি।

পুরোনো জমিদারবাড়ি যেমন হয়, মল্লিকবাড়ি হুবহু তেমনই—চিকন ইটের একটা ক্ষয়ে যাওয়া স্তূপ। পশ্চিমা ম্যানশনের আদলে গড়া এ রকম কয়েক তলা ভবন দেড়-দুই শ বছর আগে খুব চালু ছিল। প্রত্যন্ত মফস্বলের ভেতরে তালপুকুরের ধারে হুটহাট করে দেখা মেলে এ রকম বাড়ির। যারা এগুলো বানিয়েছেন, তারা সবাই যে জমিদার বা ভূস্বামী ছিলেন, এমন না। অনেকে লবণ ও পাটের সওদাগরি ব্যবসা করে ভাগ্য গড়েছেন।

মল্লিকবাড়ির আদি মালিক রাধাপ্রসাদ মল্লিক অবশ্য জমিদারই ছিলেন। এখন এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়গোছের লোক বাড়ি আগলে আছে। চারপাশে লিচু, পেয়ারা আর আমলকীর বাগান এখন প্রায় জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

চাঁদের আলোয় বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কোথায় উঁচু আমলকীগাছের ডালপালাগুলোর শেষ আর ভবনের ইট-সুরকির শুরু।

এই অঞ্চল যতটা অতিথিবিমুখ, মল্লিকবাড়ি ততটা না।

দুবার ডাকাডাকি আর কাঠের দরজার শিকল ধরে ঝাঁকুনির পর ভেতরে কোথাও নড়াচড়ার দূরবর্তী আওয়াজ পেলাম। লন্ঠনের কয়েক ফালি আলো গায়ে এসে পড়ায় টের পেলাম শালকাঠের দরজার কয়েক জায়গায় চিড় ধরেছে।

যে লোকটা দরজা খুলে দিল, সে মনে হলো সময়ের ওই পার থেকে উঠে এসেছে। লন্ঠন হাতে দাঁড়ানো একটা আশি বছরের বৃদ্ধ। কার্তিকের সন্ধ্যারাতে গায়ে মোটা আলোয়ান। 

আমি তাকে বললাম, কেন, কী পরিস্থিতিতে এখানে এক রাতের জন্য আশ্রয় চাইতে এসেছি। 

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা এমনভাবে কাঠের পাল্লা মেলে ধরলেন, বুঝতে বাকি থাকে না, দরজা অবারিত। তবু ভদ্রতাবশত আমি অপেক্ষাই করছিলাম। অবশেষে বৃদ্ধ বললেন, ‘আসেন।’

তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, কণ্ঠস্বর হাটুরে আসগরের মতো খসখসে। 

আমি ভেতরে পা রাখলাম। অনায়াস ভঙ্গিতে। চৌকাঠ পেরোনোর সময় আমার কানে কোনো কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে নিষেধ করল না, কেউ বলল না, ‘ভুল করছ, ফিরে যাও।’

আমার এই স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে একটা অদৃশ্যপ্রায় কৌতুকের রেখা উঁকি দিয়ে মিলিয়ে গেল বৃদ্ধের ঠোঁটে। নাকি আমি ভুল দেখলাম, আবছা আলোয়? 

বৃদ্ধের নাম মণিলাল মিত্র। এই বাড়ির বাজার সরদার ও কেয়ারটেকার। তার সঙ্গে আমি পা রাখলাম বাড়ির শানবাঁধানো উঠানে। আমার হাতে একটা চামড়ার স্যুটকেস। মণিলাল সেটা তার হাতে নিতে চেয়েছিলেন। আমি দিইনি। সামনে আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনের দিকে আমি একমুহূর্ত তাকালাম। একবার মনে হলো, ভবনটিও যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একতলায় একটি কি দুটি কক্ষে আলো জ্বলছে। দোতলা আর তিনতলা অন্ধকার।

লম্বা বারান্দা ধরে মণিলাল আমাকে নিয়ে চললেন তার মনিব অর্থাৎ এই বাড়ির কর্তা দ্বারকাপ্রসাদ মল্লিকের কাছে। নিচতলায় একটা জীর্ণ বৈঠকখানায় আমাকে বসতে দেওয়া হলো। মাথার ওপর একটা ঝাড়বাতি। তাতে রাজ্যের ধুলা জমে আছে। টিমটিম করে কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে ঝাড়বাতিদানে। মেঝেতে সাদা-কালো মার্বেল পাথরে দাবার বোর্ডের নকশা করা। ঘরজুড়ে আভিজাত্যের ধ্বংসাবশেষ। দেয়ালে শিংসহ একটা হরিণের মুণ্ডু।

দ্বারকাপ্রসাদ এলেন ভেতরের দিককার একটা কক্ষ থেকে। আমি মণিলালের মতো বয়স্ক একটা লোককে আশা করেছিলাম। কিন্তু লন্ঠনের আলোয় যে লম্বা, লিকলিকে লোকটা এসে হাজির হলেন, তার বয়স কোনোভাবে পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। পরিপাটি পোশাকের লোকটি যেন এইমাত্র বের হবেন কোথাও। 

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর দ্বারকাপ্রসাদ শুনলেন আমার কথা। বললেন, অনায়াসে আমি এখানে রাত কাটাতে পারি। প্রয়োজনে একাধিক রাতও। তিনি জানতে চাইলেন, আমি রাতের খাবার খাব কি না। পেটে ক্ষুধা থাকলেও আমি ‘না’ বললাম। আমার কাছে কিছু শুকনা খাবার আছে। 

দ্বারকাপ্রসাদের সঙ্গে আমার কথা হলো সামান্যই। কথা বলার সময় তিনি দুই দফা আমার সামনে মেঝেতে রাখা স্যুটকেসের দিকে আড়চোখে তাকালেন। সন্দেহ নেই স্যুটকেসটা আকারে বিদঘুটে। লোকে চারকোনা স্যুটকেস দেখে অভ্যস্ত। আমার স্যুকটেসটা গোল। কালো চামড়ায় বাঁধাই এই বাক্সটার চেহারায় কিছু একটা আছে, যে কারও চোখ আটকে যায়। অস্বস্তি লাগে। প্রতিবার স্যুটকেসের দিকে তাকানোর পর দ্বারকাপ্রসাদ যে তার কেয়ারটেকারের দিকেও তাকিয়েছিলেন, তা আমার নজর এড়াল না। মনে হলো যেন মনিবে আর কেয়ারটেকারে চোখে চোখে কী এক অদৃশ্য বোঝাপড়া হলো।

আমার থাকার ব্যবস্থা হলো দোতলার পশ্চিম কোনার একটা কক্ষে। মণিলাল আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। দরজা খুলতেই ন্যাপথলিনের গন্ধ নাকে এল। অনেক দিন অব্যবহারে ঘরের ভেতরের বাতাস ভারী আর ভেজা। মণিলাল বিছানায় চাদর বিছিয়ে দিলেন। বালিশে নতুন ঢাকনা। সাইড টেবিলে পানি। সকালে নাশতায় কী খাব জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, পরোটা আর ডিম। মণিলাল ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন। 

ঘরের টেবিলের ওপর একটা লন্ঠন জ্বালানো।

আমি আমার হ্যান্ডব্যাগ থেকে রাতের পোশাক বের করে পরলাম। এই কক্ষে একটা ছোট্ট অ্যাটাচড বাথরুম আছে। ভেতরে ট্যাপের পানি নেই। বালতিতে পানি ভরা। আমি বেসিনে হাত–মুখ ধুলাম।

কক্ষে প্রবেশ করে গোল স্যুটকেসটা বিছানার ওপর তুললাম। সেটার ঢাকনা খুলে দেখে নিলাম ভেতরের জিনিসপত্র ঠিকঠাক আছে কি না। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় টোকা পড়ল। তিনবার। আমি দ্রুত স্যুটকেসের ডালা বন্ধ করে সেটাকে চৌকির নিচে চালান করে দিলাম। 

দরজা খুলে দেখি বাইরে দ্বারকাপ্রসাদ দাঁড়ানো। পোশাক বদলেছেন। ধবধবে সাদা পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরা। বললেন, ‘আমি দুঃখিত। শুয়ে পড়েছেন কি?’

আমি বললাম, আমি কেবল শোবার আয়োজন করছি। তবে তিনি চাইলে ভেতরে আসতে পারেন। 

দ্বারকাপ্রসাদ আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ভেতরে এলেন।

আমি তাকে একটা চেয়ার দিলাম বসতে। নিজে বসলাম খাটের ওপর। দ্বারকাপ্রসাদ না বললেও টের পেলাম, বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মণিলাল।

শুকনা হলেও দ্বারকাপ্রসাদ অত্যন্ত সুদর্শন দেখতে। পোশাক পরিপাটি। তার গা থেকে মৃদু সুগন্ধি ভেসে আসছে।

‘আপনি কি গোলকুণ্ড দেখার জন্য এসেছেন?’ জানতে চাইলেন দ্বারকাপ্রসাদ।

আমি বললাম, ‘গোলকুণ্ডের কথা আমি শুনেছি। তবে সেটা দেখার উদ্দেশে আমি আসিনি। আমার ভিন্ন কাজ আছে। আমি এসেছি জরিপের কাজে।’    

দ্বারকাপ্রসাদ আমার কথা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হলো না। তিনি জানতে চাইলেন, গোলকুণ্ড সম্পর্কে আমি আসলে কী শুনেছি।

আমি বললাম, শুনেছি এই যে সেটা এমন এক কূপ বা কুয়া, যার তল নেই। কেউ যদি সেখানে পাথর ফেলে, সারা জীবন কান পাতলেও সেটা কোথাও আছড়ে পড়ার আওয়াজ পাওয়া যাবে না। কেউ কেউ বলে, পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত চলে গেছে এই কূপের তলানি।

এটুকু বলে আমি থামলাম। দেখি দ্বারকা প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে আছেন। বললেন, ‘আর কিছু?’

বললাম, ‘আর শুনেছি, প্রতিবছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় ওই কূপের অতল থেকে আওয়াজ ভেসে আসে। অপার্থিব গোঙানির আওয়াজ। আর কূপ থেকে বেরিয়ে আসে একটা ছায়া। জ্যোৎস্নার আলোয় সেই ছায়া ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীময়। এই তো, এইটুকুই।’ 

দ্বারকাপ্রসাদ বললেন, গোলকুণ্ড একটা জনশ্রুতি, কিংবদন্তি। আপনি যদি ওইটার উদ্দেশে এসে থাকেন, তাহলে বলব, আপনার পরিশ্রম জলে গেছে। সে রকম কিছুই এখানে নেই।  

আমি চুপ করে থাকলাম। লক্ষ করলাম, লোকটা শিরদাঁড়া সোজা করে বসে থাকলেও তার চোখ ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু একটা খুঁজছে লোকটা। আমি জানি, কী সেটা। আমার সেই স্যুটকেস।  

কিছুক্ষণ নীরবতার পর দ্বারকাপ্রসাদ বললেন, ‘আপনি মল্লিকবাড়ি সম্পর্কে কী শুনেছেন?’

আমি বললাম, ‘আমি কিছুই শুনিনি। রাতে থাকার জন্য একটা আশ্রয় দরকার ছিল আমার। স্টেশনমাস্টার এই বাড়ির কথা বলেছেন। সেটা যে এত দূরে, ধারণা ছিল না।’ 

দ্বারকাপ্রসাদ তখন আচমকা এমন এক প্রশ্ন করলেন, তাতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, ‘আপনি পিশাচ সম্পর্কে কী জানেন?’

কিছুক্ষণ আমি কোনো জবাব দিতে পারলাম না। তারপর বললাম, ‘কী বললেন?’

‘পিশাচ ব্যাপারটা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?’

আমি বললাম, এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। শুধু এটুকু জানি, পিশাচেরা এমন এক ধরনের অশুভ সত্তা, যারা মানুষের মৃতদেহ ভক্ষণ করে।

‘ভুল’, বললেন দ্বারকা।

বললাম, ‘কোনটা ভুল?’

মৃতদেহ ভক্ষণের ব্যাপারটা। পিশাচেরা মৃতদেহ খায় না। জীবিত দেহ খায়।

আমি চুপ করে থাকলাম। দূরে কয়েকটা কুকুর ডাকছে। প্রলম্বিত করুণ ডাক: উ…উউ…উ…উউউউ…উউ। 

দ্বারকাপ্রসাদ বললেন, ‘আপনি এখানে আসার পথে বাড়ির চারপাশে কিছু কি দেখেছেন? চোখে পড়েছে কিছু?’

আমি বললাম, ‘পড়েছে।’ 

‘কোথায়?’

‘লিচুবাগানের ভেতর দিয়ে যখন আসছি, তখন।’ 

‘কী দেখেছেন?’

‘কয়েকটা কুকুর। আমাকে ঘিরে ধরে হাঁটছিল।’

দ্বারকাপ্রসাদ বললেন, ‘কুকুরগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু কি চোখে পড়েছে?’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর সোজা দ্বারকাপ্রসাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘পড়েছে। কুকুরগুলো ধবধবে সাদা। সব কটি। চুনকাম করলে যেমন সাদা হয়, সে রকম সাদা। অনেকটা আপনার এই পাঞ্জাবির মতো। চাঁদের আলোয় সেগুলো আমাকে ঘিরে ধরে হাঁটছিল। আর গরগর আওয়াজ করছিল।’ 

দ্বারকাপ্রসাদ নিচুস্বরে বললেন, ‘ওগুলো কুকুর নয়।’

আমি বললাম, ‘আমি অনুমান করেছি।’

‘মল্লিকবাড়ির অনেক দুর্নাম, জানেন তো?’

আমি বললাম, ‘আমি শুনিনি। কিসের দুর্নাম?’ 

দ্বারকাপ্রসাদ বললেন, ‘এখানে যারা রাত কাটাতে আসে, তারা কেউ ফিরে যায় না।’

বলে বিসদৃশভাবে হেসে উঠলেন দ্বারকাপ্রসাদ। হাসতেই থাকলেন। আমি গম্ভীর হয়ে বসে আছি। কৌতুক বোধ করছি না।

বিজ্ঞাপন
যখন উঠলাম, চারদিকে একসঙ্গে ডেকে উঠতে শুরু করেছে কুকুর। প্রলম্বিত ডাক: উ…উউউ…উউ…উউউউ…উউ

অবশেষে হাসি থামিয়ে লোকটা বললেন, ‘আপনি ঘুমান। আমি আর বিরক্ত করব না।’

উঠে দাঁড়ালেন দ্বারকা। দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। 

উনি যখন দরজায় হাত রেখেছেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই বাড়িতে আর কে কে থাকে?

দ্বারকা বললেন, ‘শুধু আমি আর মণিলাল। আর কেউ না। লোকে বলে, আমরা দুজন নাকি রাতের বেলা সাদা কুকুর সেজে আশপাশে ঘুরে বেড়াই।’ 

বলে বারান্দায় পা রাখলেন দ্বারকা। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন। 

‘রাতের বেলা এখানে কুকুরগুলো খুব উৎপাত করে। কোনো কোনোটা সিঁড়ি বেয়ে দোতলার বারান্দায় উঠে আসতে পারে। দরজা ধাক্কাতে পারে। আপনি দরজা খুলবেন না,’ বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে হেঁটে চলে গেলেন দ্বারকাপ্রসাদ। 

আমি দরজা লাগিয়ে দিলাম। ভালো করে এঁটে দিলাম খিল। হারিকেনের আলো কমিয়ে বিছানায় উঠে পড়লাম। 

মণিলাল একটা কাঁথা দিয়ে গেছে ভাঁজ করা। সেটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তারপর বিছানার পাশের জানালাটা খুলে দিলাম। 

বাইরে আমলকীর বাগান। আমলকীপাতা খুব মিহি হয়। তার ফাঁক গলে হু হু করে ঢুকছে জ্যোৎস্নার আলো। একটা বুনো ফুলের গন্ধে ঘরটা ভরে যাচ্ছে। বাইরের নীরব চরাচরের দিকে তাকিয়ে থেকে একসময় তন্দ্রামতো এসেছিল। 

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল।

দেখি ঘরে বুনো ফুলের গন্ধ ছাড়াও আরেকটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে সেই গন্ধ। দ্বারকাপ্রসাদের গায়ের সুগন্ধি।

সেই সঙ্গে বারান্দার দিকের দরজায় কিছু একটা আঁচড়াচ্ছে।

আমি উঠে বারান্দার দিকের জানালার কাছে গেলাম। একটা পাল্লা ফাঁক করলাম। বারান্দায় বসে আছে তিনটি কুকুর। সাদা, ধবধবে। আমাকে দেখে সেগুলো জানালার দিকে এগিয়ে এল। পা তুলে দিল জানালার চৌকাঠে। তারপর কামড়াতে থাকল জানালার শিক। 

আমি ফিরে এসে চৌকির ওপর বসলাম। 

অপর কুকুরটা এখনো দরজা আঁচড়াচ্ছে। শালকাঠের দরজা। যথেষ্ট শক্ত। ভেঙে ঢুকতে পারবে না। তবে সমস্যা হলো, এখন আমার বাথরুমের দরজাতেও মৃদু আঁচড়ের শব্দ। ভেতর থেকে। বাথরুমের ভেতরে কিছু একটা আছে। 

আর অপেক্ষা করার মানে হয় না। আমারও সময় হয়ে এসেছে। 

আমি বিছানা থেকে নামলাম। চৌকির তলা থেকে বের করলাম গোল স্যুটকেসটা। ডালা খুললাম। দুটা বয়াম বের করলাম। আর কয়েকটা ঝোলা। ঝোলার মধ্যে একগাদা উপকরণ। ভেষজ দ্রব্য। কিছু যন্ত্রপাতি। যন্ত্রপাতিগুলো এখন একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া দিতে হবে। 

আমি দ্রুত, অভ্যস্ত হাতে কাজ করতে থাকলাম। 

যখন উঠলাম, চারদিকে একসঙ্গে ডেকে উঠতে শুরু করেছে কুকুর। প্রলম্বিত ডাক: উ…উউউ…উউ…উউউউ…উউ। 

অজস্র কুকুর। তাদের সম্মিলিত ডাক সবকিছু ডুবিয়ে দিচ্ছে।

আমি দরজার খিল খুলে বারান্দায় পা রাখলাম। 

জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে বারান্দা। 

চারটি কুকুর আমাকে ঘিরে ধরল। এই কুকুরগুলো ডাকছে না। আমাকে আক্রমণও করছে না। শুধু ঘিরে ধরে আছে।

আমি এগিয়ে গেলাম। কুকুরগুলোও অনুসরণ করছে। 

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম আমি। প্রথম যে দরজাটার সামনে দাঁড়ালাম, অনুমান করলাম সেটা মণিলালের ঘর। মণিলালকে দিয়েই শুরু করতে হবে। এরপর তার মনিব। 

আমি দরজা ধাক্কালাম। 

ভেতরে প্রবল গোঙানির শব্দ। মণিলাল গোঙাচ্ছেন। প্রবল ভয় পেয়েছেন আমাকে।  

আমি জানি, মণিলাল কিছুতেই দরজা খুলবেন না। আমাকে চিনে ফেলেছেন তিনি। ওই কালো গোলাকার স্যুটকেস চিনিয়ে দিয়েছে আমাকে। মণিলালকে পেতে হলে এখন আমাকে দরজা ভাঙতে হবে। সেই শক্তি আমার আছে। 

সকালবেলা যখন মল্লিকবাড়ি থেকে বের হচ্ছি, আমার শরীরভরা ক্লান্তি। অনেক খাটুনি গেছে। 

গোল চামড়ার স্যুটকেসটা আগের চেয়ে অনেক ভারী।

দুটি কাচের বয়ামে যা ভরেছি, তা এত ভারী হবে, ভাবিনি।

এখান থেকে হেঁটে ইদ্রিসপুর রেলস্টেশনে যেতে হবে। দীর্ঘ পথ। তবে আমার মনে একটা চনমনে ফুর্তি। গোলকুণ্ডের খবর পেয়ে এ তল্লাটে এসেছি বটে, তবে আমি জানতাম গোলকুণ্ড সত্যি নয়, মিথ। ওখানে গিয়ে কিছুই পাব না। কিন্তু কে জানত, ওই ভুয়া জিনিসের সন্ধানে এসে এভাবে হাতের নাগালে এমন এক খনি পেয়ে যাব।

মল্লিকবাড়ির বাসিন্দারা শুরুতে বুঝতে পারেনি, রাতের আঁধারে যে নিরীহ চেহারার লোকটাকে তারা আশ্রয় দিয়েছে, সে আসলে এক দক্ষ শিকারি। পিশাচশিকারি। যখন পেরেছে, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

মন্তব্য পড়ুন 0