বিজ্ঞাপন

ইতিহাস বিষয়ে অরুণ সরকারের অগাধ পাণ্ডিত্য। ভারত উপমহাদেশ নিয়ে তার মতো জানাশোনা লোক আমি খুব কম দেখেছি।

‘দেখার কী আছে এর মধ্যে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘ভালো করে দেখুন। কী দেখছেন, বলুন।’

‘সাতটা পাখির ছবি। তার মধ্যে দুইটি জোড়া। মানে পাঁচ রকমের পাখি দেখছি। সুন্দর কম্পোজিশন। পাখিগুলো চেনা চেনা লাগে।’

‘ওপরে বাঁ কোনায় সবুজ পাখিটা একটা বাজ পাখি। বাকিগুলোও চেনাচেনা। মাঝখানেরটা বাদে। মাঝখানের মোটাসোটা পাখিটা দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। ডোডোর নাম শুনেছেন?

‘বিলুপ্ত পাখি ডোডো?’

default-image

‘হ্যাঁ। দুনিয়ায় শেষ ডোডোর ছবি এটা। মনসুর এই ছবি আঁকার অল্প কয়েক বছরের মাথায় এই পাখি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। মরিশাস দ্বীপের পাখি। ভারী শরীর। ডানা নেই। পালক নেই। সহজ শিকার। কেন বিলুপ্ত হলো, এ নিয়ে নানা কথা চালু আছে। বলা হয়, পশ্চিমা নাবিকেরা এই দ্বীপে নেমে মেরেকেটে তাদের বিলুপ্ত করে দিয়েছে। হতে পারে। তবে এটা একটা বিরল ছবি। জীবিত কোনো ডোডো পাখিকে সামনে বসিয়ে রেখে আঁকা আর কোনো ছবি দুনিয়ার কোথাও নেই। যেসব ছবি আপনি পাবেন, সেগুলো হয় কাল্পনিক, নতুবা স্টাফ করা প্রতিরূপ থেকে আঁকা।’

‘এই মিনিয়েচারের মূল ছবিটা কোথায় আছে এখন?’

‘পিকিউলিয়ার একটা জয়গায়। বিলাত বা আমেরিকার নয়। আছে রাশিয়ার একটা জাদুঘরে। সেন্ট পিটার্সবুর্গে। ছবিটা ওখানে কী করে গেল, কেউ বলতে পারে না।’

আমি পুলকিত বোধ করলাম। ছবিটাকে ঘিরে একটা কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব পাকানোর চেষ্টা করছে লোকটা।

‘তাহলে ছবিটার সেন্ট পিটার্সবুর্গে যাওয়াটাই রহস্য?’

‘না। আরও আছে।’

‘কী সেটা?’

‘এই পাখি জাহাঙ্গীরের রাজদরবারে এল কী করে?’

‘আসার কথা না?’

‘কথা না। মরিশাস দ্বীপ ছাড়া ডোডো আর কোথাও পাওয়া যেত না। ওইটা আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের একটা ছোট্ট দ্বীপ। সেখানকার একটা বেঢপ, বিদঘুটে, অসুন্দর পাখি সুদূর আগ্রায় হেঁটে হেঁটে চলে আসার কথা না। কেউ নিয়ে এসেছে।’

‘জিপসিরা?’

‘না। তবে যারা এনেছে, তারা জিপসিদের চেয়ে কম ছিল না—পর্তুগিজ নাবিকেরা। ভারতের পশ্চিম উপকূলে গোয়ায় তখন তাদের একটা নৌঘাঁটি ছিল। একটা শহরই বানিয়ে ফেলেছিল তারা সেখানে। অনেক পরিবার থাকত। ওই বন্দর দিয়ে তারা তিন মহাদেশজুড়ে বাণিজ্য করত। মূলত মসলা। তা ছাড়া যেখানে যা পেত, উদ্ভট, এক্সোজোটিক, তা-ই জাহাজে তুলত। এক জায়গার জিনিস আরেক জায়গায় বিক্রি করা। ঠিক বিক্রি না, বিনিময়। তুমি এই রুপার আয়নাটা নাও, বদলে তোমাদের হাতে বোনা ওই শতরঞ্জিটা দাও—এই রকম। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াত তখন পর্তুগিজ নাবিকেরা। সামুদ্রিক জিপসি বলতে পারেন। তাদের জাহাজ ভর্তি থাকত দুনিয়ার বিস্ময়কর সব জিনিসপত্রে। একেকটা জাহাজ যেন একেকটা আজিব জিনিসপত্রের জাদুঘর। শোনা যায়, গোয়া থেকে পর্তুগিজরা উপঢৌকন হিসেবে এক জোড়া ডোডো সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠিয়েছিল।’

‘কোনো প্রমাণ আছে?’

‘আছে। একটা ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় পিটার মান্ডি নামের তখনকার এক ব্রিটিশ বণিক-পর্যটকের ডায়েরি থেকে।’

‘তাহলে তো হয়েই গেল। রহস্য কোথায়?’

‘রহস্য আছে। সত্য কীভাবে তৈরি হয়, সেটা আজকাল চোখের সামনে দেখছেন তো। আজকের জমানায় যেভাবে অনুমান আর কানকথায় মিশিয়ে, গুজবে ভর করে মানুষ সত্য জানছে, অতীতকালেও ব্যাপারটা তা-ই ছিল। আমি হিসাব কষে দেখেছি, পিটার মান্ডি আগ্রায় পা রাখার কয়েক বছর আগে ডোডোর ছবিটা আঁকা হয়েছে। তার মানে মান্ডি জাহাঙ্গীরের দরবারে এসে ডোডোর ছবিটা দেখেছেন, অথবা স্বয়ং ডোডো পাখিদের দেখেছেন। রাজদরবারে তিনি শুনে থাকবেন, এটা গোয়া থেকে উপঢৌকন পাওয়া। আরেকটা উৎস হওয়ার কথা ছিল সম্রাটের নিজের ডায়েরি।’

‘সম্রাটের ডায়েরি মানে?’

‘সম্রাট জাহাঙ্গীর ডায়েরি লিখতেন। প্রায় প্রতিদিন। যেখানে যা ঘটছে, যা দেখছেন, শুনছেন, বুঝছেন—সব লিখে রাখতেন। বিস্তারিত। অনেকটা প্রফেসর শঙ্কুর মতো। সেগুলো কম্পাইল করে জাহাঙ্গীরনামা নামে বই বেরিয়েছে। ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বই। মূল ফারসি বইটির নাম ছিল তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি। “তুজ্‌ক” মানে ডায়েরি। দিনলিপি। মানে জাহাঙ্গীরের ডায়েরি। সেই বইয়ে গোয়ার কথা বলা আছে। বিস্তারিতই বলা আছে। সেখানকার পর্তুগিজদের কাছ থেকে জাহাঙ্গীর যে বিদঘুটে সব পশুপাখি পেতেন, সেটার উল্লেখ আছে। ওখান থেকে একটা টার্কি পেয়েছিলেন তিনি। সে কথাও লিখেছেন।’

‘টার্কি মানে তুরস্কের ঢাউস মুরগি?’

‘স্যরি। টার্কি তুরস্কের কোনো পাখি নয়। এটা মধ্য আমেরিকার একটা প্রাণী। তখন আমেরিকা আবিষ্কৃত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। সুদূর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে টার্কি এসেছে জাহাঙ্গীরের দরবারে। ইথিওপিয়া থেকে এসেছে জেব্রা। সেই জেব্রা দেখে সবাই ভেবেছিল চুনকাম করা ঘোড়া। তারা ঘষে ঘষে জেব্রার কালো ডোরা তোলার চেষ্টা করেছিল বলে শোনা যায়।’

‘ডোডোর ব্যাপারটা কী?’

‘জাহাঙ্গীরনামায় প্রায় সবার কথা বলা আছে। কিন্তু ডোডোর কথা কিছু বলা নেই। পিটার মান্ডি সম্ভবত দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছেন। মানে অন্য প্রাণীগুলো যেহেতু গোয়া থেকে এসেছে, সেহেতু অনুমান করে নিয়েছেন, ডোডোও এসেছে গোয়া থেকে। তারপর সেটাকেই তিনি তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পরে তাঁর অনুমানই ঘুরপথে সত্য রেফারেন্স হয়ে গেছে। এভাবেই হয়। ইতিহাসের ভেতরে অনুমান আর গুজব ঢুকে বসে থাকে।’

‘যদি এটা ডোডোর মতো দেখতে কিন্তু আলাদা পাখি হয়, সেটাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরে নিতে হবে।’

‘ডোডো গোয়া থেকে না এলে অন্য কোথাও থেকে এসেছে। সমস্যা কী?’

‘সমস্যা আছে। গভীর সমস্যা। ব্যাপার হলো, মনসুরের ছবির এই পাখি আসলে ডোডো নয়।’

‘ডোডো নয়?’

‘ডোডোর মতো দেখতে বটে। কিন্তু ডোডো নয়। আমি ডোডো নিয়ে ব্যাপক খোঁজখবর করেছি। গবেষণাই বলতে পারেন। ডোডোর যত রকম ছবি পাওয়া যায়, সব ঘেঁটেছি। আমাকে এ বিষয়ে এখন বিশেষজ্ঞ মানতে পারেন। মনসুরের পেইন্টিংয়ে ডোডোর গলা একটু বেশি লম্বা। পায়ের গড়নে তফাত আছে। লেজের দিকটাতেও অমিল। সামান্য অমিল। এটা ৯০ শতাংশ ডোডো। ১০ শতাংশ অন্য কিছু।’

‘হয়তো শিল্পীর খেয়াল। অথবা অদক্ষতা।’

‘আপনি জানেন না বলে বলছেন, ওস্তাদ মনসুর ছিলেন তাঁর সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত ন্যাচারাল আর্টিস্ট। পশুপাখি, ফুল-ফলের ছবি তাঁর মতো নিখুঁত আর কেউ আঁকতে পারত না। একেবারে ফটোগ্রাফিক কপি করতে পারতেন। তাঁর ভুল করার কোনো কারণ নেই।’

‘তার মানে কী?’

‘তার মানে জাহাঙ্গীরের দরবারে ডোডোর মতো দেখতে একটা পাখি ছিল বটে, কিন্তু সেটা ডোডো ছিল না। ছিল অন্য কিছু। অন্য কোনো প্রজাতি। সম্ভবত নতুন একটা প্রজাতি। জীববিজ্ঞানে আমার জ্ঞানের দৌড় খুবই সীমিত। কিন্তু এটুকু বুঝি, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা একটা বিস্ফোরক তথ্য। বিশেষ করে ট্যাক্সোনমির দিক থেকে, মানে যারা পশুপাখির নামকরণ করে আরকি। নতুন একটা প্রজাতি পাওয়া গেলে সেটাকে একটা বর্গে ফেলতে হয়, নাম দিতে হয়।’

‘যদি এটা ডোডোর মতো দেখতে কিন্তু আলাদা পাখি হয়, সেটাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরে নিতে হবে।’

‘আগে নিশ্চিত হতে হবে, এ রকম একটা পাখি সত্যি ছিল। সেখানেই সমস্যা। জাহাঙ্গীরের সময় পর্যন্ত বেঁচে ছিল যে পাখি, যেটা হাতবদল হয়ে হয়ে জাহাঙ্গীরের দরবারে এসেছে, সারা দুনিয়ায় সেটার আর কোথাও কোনো উল্লেখ থাকবে না, শুধু একটা ছবি ছাড়া—এটা হতে পারে?’

আমি অরুণ সরকারের দিকে তাকালাম। শুকনো হাড়জিরজিরে লোকটা একটা আয়রনবিহীন কোঁচকানো হাফ হাতা শার্ট পরে আমার সামনে পায়চারি করতে শুরু করেছে। অস্থির। চোখ চকচক করছে। বুঝলাম তার ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মেশিন চালু হয়ে গেছে।

বললাম, ‘হতে পারে না বলেই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটার ব্যাখ্যা কী?’

অরুণ সরকারের পায়চারি থেমে যায়। আমার সামনে এসে দাঁড়ায় সে।

‘আমার অনুমান শুনতে চান?’

‘চাই।’

‘অনুমান নয়, আমি বলব, হাইপোথিসিস। শক্ত খুঁটির ওপর দাঁড় করানো হাইপোথিসিস।’

‘খুব বেশি তথ্য–প্রমাণের ওপর দাঁড়াতে পারলে তো সেটা আর হাইপোথিসিস থাকে না। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে পরিণত হয়।’

‘তত্ত্ব বলবেন কি না, সেটা আপনার বিবেচনা।’

‘বলুন দেখি?’

অরুণ সরকার আমার হাত চেপে ধরল। বলল, ‘চলুন, নাজিরাবাজার যাই। বিসমিল্লাহ হোটেলে মুরগির চাপ আর পরোটা খাই। খেতে খেতে কথা বলি। তারপর পান্নু টি–স্টোরে এক কাপ দুধ-চা।’

আমরা দুজন রিকশায় চেপে চললাম বিসমিল্লাহ হোটেলে মুরগির চাপ খেতে। পাশে বসে অরুণ সরকার অস্থির হয়ে উসখুস করছে। পেটের কথা বের করে না ফেলা পর্যন্ত এই লোক শান্তি পাবে না। তার বগলে একটা কাগজের ফাইল-ফোল্ডার। তাতে বেশ কিছু কাগজপত্র নিয়েছে সে।

আমার ভালোই লাগছে। একটা ইকসেন্ট্রিক লোকের সঙ্গে ছুটির বিকেলটা খুব বৃথা যাচ্ছে না।

‘আপনি সম্রাট জাহাঙ্গীর সম্পর্কে কী জানেন?’ একটা টেবিলে বসে জিজ্ঞেস করল অরুণ।

সন্ধ্যা হতে এখনো কিছুটা বাকি। এরই মধ্যে ভিড় জমতে শুরু করেছে বিসমিল্লাহ হোটেলে। একটা চারমাথার মোড়ে এই রেস্টুরেন্ট আমাদের দুজনের খুব প্রিয়। সমস্যা হলো, চিপা রেস্টুরেন্ট। কয়েকটামাত্র টেবিল। সন্ধ্যার সময় এমন ভিড় হয়, টেবিলের পেছনে অপেক্ষমাণ লোক দাঁড়িয়ে থাকে। বিরক্ত লাগে। সে কারণে আমরা দুপুর-পেরোনো বিকেলে আসি।

‘জাহাঙ্গীর সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না,’ আমি বললাম। ‘শুধু জানি যে উনি মোগল সম্রাট ছিলেন। শাহজাহানের ছেলে ছিলেন কি?’

‘না। শাহজাহানের বাবা।’

‘তাহলেই বুঝুন আমার বিদ্যার দৌড়। ইতিহাসে আমার আগ্রহ কম। নাম, সন-তারিখ মনে থাকে না,’ আমি বললাম।

‘ইতিহাস কতগুলো শুকনা সন-তারিখ না। এনিওয়ে, মোগল সম্রাটদের মধ্যে দেখবেন, জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা কম। মানে ধরুন, তাঁর বাবা আকবরকে নিয়ে যত আলাপ, কিংবা ধরুন পুত্র শাহজাহান যতটা সেলিব্রিটি, উনি ততটা ছিলেন না। কিন্তু এটা জেনে রাখুন, মোগল সম্রাটদের মধ্যে সবচেয়ে পিকিউলিয়ার ক্যারেক্টার ছিলেন জাহাঙ্গীর। তিনি ছিলেন এই ভূভারতের প্রথম প্রকৃতিবিজ্ঞানী।’

‘কী রকম?”

‘পশুপাখি, ফুল-ফল—এগুলোর প্রতি সহজাত আগ্রহ ছিল তাঁর, কৌতূহল ছিল। পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল বলা যাবে না, মানে আজকের জমানার বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে। কিন্তু একটা পর্যবেক্ষকের চোখ ছিল তাঁর। সারা দুনিয়া থেকে বিচিত্র সব পশুপাখি ধরে আনতেন তিনি। তাঁর বাগানবাড়ির চিড়িয়াখানায় এগুলোর জায়গা হতো। বিচিত্র সব গাছপালাও আনতেন। বাগানে লাগাতেন। আর সেগুলোর আচরণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। নোট নিতেন। ডায়েরিতে সেগুলোর কথা লিখতেন। জাহাঙ্গীরনামা যদি পড়েন, মাঝেমধ্যে মনে হবে, প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরি পড়ছেন।’

আমাদের চাপ আর পরোটা এসে গেছে। ওয়েটার সেগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখার কারণে অরুণ সরকারের বক্তৃতায় একটু ছেদ পড়ল।

‘আগেই বলেছি, দরবারে মনসুর নামে এক চিত্রশিল্পী ছিলেন। দুর্দান্ত শিল্পী। তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ইন ফ্যাক্ট, মোগল দরবারে যতজন জাঁদরেল শিল্পী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র বিহজাদের সঙ্গেই তার তুলনা চলে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মনসুরকে আমি এগিয়ে রাখব। তিনি গাছপালা আর পশুপাখির অ্যানাটমিক ডিটেইল আঁকতে পারতেন। দেখে মনে হতে পারে, এই লোকের বায়োলজির ট্রেইনিং ছিল। সম্রাটের খুব প্রিয় লোক ছিলেন মনসুর। সম্রাট তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন নাদির-আল-আসর। মানে হলো সমকালে অতুলনীয়। নাদির মানে অতুলনীয়, আল-প্যারালাল্ড।’

‘আপনার তো ডোডো নিয়ে বলার কথা। আপনার হাইপোথিসিস।’

‘আসছি সেই প্রসঙ্গে। আপনাকে পরিপ্রেক্ষিতটা বুঝতে হবে। সম্রাট যেখানে যেতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন শিল্পী মনসুরকে। কোনো অচেনা ফুল বা লতাপাতা দেখলে ছবি আঁকিয়ে নিতেন। কোনো নতুন পশুপাখি এলে আঁকিয়ে নিতেন সেগুলোর ছবি। এ রকম শত শত ছবি এঁকেছেন মনসুর। এমন অনেক প্রাণী আছে, সারা দুনিয়ায় যেগুলোর তিনিই প্রথম ডকুমেন্টেশন করেছেন। তার মধ্যে ডোডো যেমন আছে, তেমনি আছে সাইবেরিয়ান ক্রেন।’

‘কিন্তু ওটা তো ডোডো ছিল না।’

‘দুনিয়া সেটাকে ডোডো হিসেবেই চেনে। যা বলছিলাম, সম্রাট শিকারে গেলে শিল্পী মনসুরকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এই একটা ব্যাপার ছিল জাহাঙ্গীরের। শিকারের নেশা। ভয়ানক নেশা। নিজেদের শৌর্য-বীরত্ব দেখাতে সেকালে সম্রাটেরা শিকারে বেরোতেন, সবাই জানে। কিন্তু জাহাঙ্গীরের শিকারে বের হওয়ার টানের পেছনে আসলে ছিল তাঁর কৌতূহলী প্রকৃতিবিদ মন। শিকারের নামে তিনি আসলে জীববৈজ্ঞানিক এক্সপ্লোরেশনে বেরোতেন, অনেকটা ডারউইনের মতো। জাহাঙ্গীরনামার ছত্রে ছত্রে তার চিহ্ন আছে।’

‘তাই নাকি?’

‘আমি জাহাঙ্গীরের শিকারের দিকটিতে জোর দেব। আপনাকে ওই সময়টার কথা মাথায় রাখতে হবে। জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসেছেন ১৬০৫ সালে। ওই বছর শেক্‌সপিয়ার ওথেলো আর কিং লিয়ার লিখেছেন। জাহাঙ্গীরের বয়স তখন ৩৬ বছর। আগ্রায় ফতেপুর সিক্রিতে রাজধানী। বাবা আকবর দিল্লি থেকে সরিয়ে এনে সেখানে নতুন রাজধানী বানিয়েছেন। চারপাশে মাইলের পর মাইলজুড়ে ঘন জঙ্গল ছিল। সেগুলো কেটে সাফ করে বানানো হয়েছে দুর্গ-শহর। আকবর আর জাহাঙ্গীরের সময় ভারতে চাষাবাদ বাড়ছে। নতুন নতুন বনভূমি কেটে চাষের জমি বানানোর কাজ চলছে। ফলে, বনে-মানুষে লড়াইয়ের গল্প তখন মুখে মুখে।’

‘আপনি বর্ণনা তো খুব ভালো দেন।’

‘এই ল্যান্ডস্কেপে জাহাঙ্গীর শিকারে বেরোতেন। চিতাবাঘ ছিল প্রধান শিকার। সিংহ শিকারের ছবি দেখতে পাবেন নানা মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ে। তবে তত দিনে ভারতে সিংহ অনেক কমে গেছে। সম্রাটদের শিকার অভিযান ছিল এলাহি কাণ্ড, দেখার মতো একটা মিছিল। বহরে তিন–চারটি হাতি থাকত। সবচেয়ে বড় হাতির পিঠে থাকতেন সম্রাট। আরও বহু লোকলস্কর থাকত। তারা হলো পদাতিক। বর্শা হাতে তারা ঢেঁড়া পেটাত। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল শিকার। বিশেষ করে যারা হাতির পিঠে নেই, তাদের জন্য। বাঘের আক্রমণে অনেকের প্রাণ যেত।’

‘সম্রাট কী দিয়ে শিকার করতেন? অস্ত্র কী ছিল?’

‘বন্দুক।’

‘বন্দুক? বন্দুক ছিল মোগল রাজদরবারে?’

‘থাকবে না কেন? বাবরের সময় থেকেই বারুদের ব্যবহার ছিল। ইন ফ্যাক্ট, আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষ করে কামান ব্যবহারের কারণেই মোগলরা অমন দুর্জয়, দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে। আর ভুলে গেলে চলবে না, মোগলরা ওই সময় দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী সম্রাটদের কাতারে ছিল।’

‘আমাদের ডোডোর রহস্য ভেদ করার কথা।’

default-image

‘আপনি যদি জাহাঙ্গীরনামা পড়েন, বিশেষ করে শিকারের অভিযানগুলো, তাহলে খুব সহজে একটা মানচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারবেন। জাহাঙ্গীরের শিকারের অভিযানের মানচিত্র। মানে তিনি কোথা থেকে বেরিয়ে কোথায় শিকারে যেতেন। ডায়েরিতে এসব অভিযানের ডিটেইল ভৌগোলিক তথ্য টুকে রাখতেন জাহাঙ্গীর। আপনি দেখবেন, ফতেপুর সিক্রি থেকে ৪০-৫০ মাইল রেডিয়াসের মধ্যেই সীমিত থাকত এসব অভিযান। মূলত সমভূমি। মাঝেমধ্যে পাথুরে টিলা আছে। ঊষর এলাকা। ডায়েরিতে আপনি যেমন দলিতপুরের নাম পাবেন, তেমনি পাবেন নাসিরাবাদের নাম। এগুলো সবই আপনি এখনকার মানচিত্রে চিহ্নিত করতে পারবেন। তবে এসব অভিযানের সময় মাঝেমধ্যেই ইদ্রাকভাট নামে একটা জায়গার উল্লেখ পাওয়া যায়। জায়গাটার খুব ডিটেইল বিবরণ ডায়েরিতে নেই। তবে বিচ্ছিন্ন উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, এলাকাটা পাথুরে, দুর্গম আর স্থানে স্থানে ঘন জঙ্গলে আকীর্ণ। কোনো ইতিহাসবিদ এবং কার্টোগ্রাফার আজ পর্যন্ত এই ইদ্রাকভাট এলাকাটা শনাক্ত করতে পারেননি। ডায়েরিতে জায়গাটার যে ভূতাত্ত্বিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে, সে রকম বিবরণ ওই এলাকার ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে মেলে না। প্রতিটি অভিযান শেষে জাহাঙ্গীর সেখান থেকে কিছু এক্সোটিক পশুপাখি ও গাছপালা নিয়ে আসতেন। ইদ্রাকভাট থেকেও এনেছিলেন। তিন দফায় বারোটি পাখি, তিনটি বেজি ধরনের প্রাণী আর একটি সরীসৃপ এসেছে ইদ্রাকভাট থেকে। আর এসেছে দুটি বুনো ফুলের গাছ।’

আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে। টেবিল ছাড়তে হবে।

আমরা বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এসে গলিপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পান্নু টি–স্টোরের সামনে এলাম। বসার জায়গা নেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খেতে হয়। আমরা দুটি চায়ের অর্ডার দিলাম।

অরুণ সরকার চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘সম্রাটের কালেকশনের প্রায় সব পশুপাখির ছবি দরবারের শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো হয়েছে। বেশির ভাগই শিল্পী মনসুরের হাতে আঁকা। মনসুর মনোযোগী শিল্পী হলেও অন্যদিকে খেয়ালি ছিলেন। বেশির ভাগ ছবিতে স্বাক্ষর করতেন না। ফলে কোন ছবিগুলো তাঁর, কোনটি অন্য শিল্পীর, সেটা শুধু তাঁর স্টাইলবিষয়ক বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবে। আমি বিভিন্ন জাদুঘরে ছড়ানো-ছিটানো ছবিগুলোর প্রতিলিপি জোগাড় করেছি। কিছু পুরোনো বইপত্র ঘেঁটে। বাকিটা ইন্টারনেটে। পশুপাখি ও গাছপালার দু-তিন শ ছবি এঁকেছেন মনসুর। আমি বলব, কিছু পশুপাখি আর গাছপালা দেখলে মনে হতে পারে, মনসুর বোধ হয় অ্যাকিউরেসির ব্যাপারে কমপ্রোমাইজ করেছেন। একটা বাজ পাখির ছবি দেখুন। এই যে।’

অরুণ সরকার তার বগলে বেকায়দা ভঙ্গিতে ধরে রাখা ফোল্ডারটা থেকে একটা কাগজ বের করে দেয়।

‘এটা ভালো করে দেখুন, বাজ পাখিটার ঠোঁটের গড়ন দেখুন। এ রকম গড়ন কোনো বাজ পাখির পাবেন না। অন্য একটা পাখির ঠোঁট বা চঞ্চু যেন বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি ভালো করে মিলিয়ে দেখেছি। দুনিয়ার কোনো পাখির চঞ্চুর সঙ্গে এটা মেলে না। একেবারে বেখাপ্পা একটা জিনিস। একটা ফুলের ছবি দেখুন। এই যে এটা। এটার পাপড়ির বিন্যাস লক্ষ করুন। কোনো পতঙ্গপরাগি ফুলের পাপড়িবিন্যাসে এ রকম প্রতিসাম্যহীনতা আপনি দেখতে পাবেন না। পতঙ্গকে আকৃষ্ট করতে হলে পতঙ্গপরাগি ফুলকে সুন্দর হতে হয়। প্রতিসাম্যই সৌন্দর্যের প্রধান শর্ত।’

‘আপনি কী বলতে চান?’

‘বলতে চাই, যেসব ছবিতে মনসুর ভুল করেছেন বলে মনে হচ্ছে, সেগুলোর পশুপাখি আর গাছপালা ইদ্রাকভাট এলাকা থেকে আসা।’

‘মানে কী?’

‘মানে আমি নিজেও জানি না। সম্ভবত মনসুরের কোনো ছবিতে কোথাও কোনো ভুল নেই। প্রাণীগুলো ছিল, এভাবেই ছিল। বেখাপ্পা প্রাণীগুলোর সবই ইদ্রাকভাট থেকে আসা।’

‘তাহলে ওই ডোডোও কি ইদ্রাকভাট থেকে আসা?’

‘সম্ভবত।’

‘এটাই আপনার হাইপোথিসিস?’

‘হ্যাঁ।’

‘সে ক্ষেত্রে ওই পাখিটাকে কি আমরা আর ডোডো নামে ডাকব?’

‘আপনি নতুন কোনো নাম দিতে পারেন। আমার আপত্তি নেই।’

আমরা চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে রিকশা নিলাম। এক রিকশায় বকশীবাজার পর্যন্ত একসঙ্গে যাওয়া। সেখানে অরুণ সরকার নেমে যাবে।

বকশীবাজারে নেমে হাঁটা দেওয়ার আগমুহূর্তে একটা কথা বলল অরুণ সরকার।

‘আমি জাহাঙ্গীরনামা ভালো করে ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। আশপাশের জায়গাগুলোর বিবরণ থেকে ইদ্রাকভাটের একটা সম্ভাব্য লোকেশন আমি অনুমান করে নিয়েছি। আগামী মাসে আমি সেখানে যাচ্ছি। খুঁজে দেখি, ইদ্রাকভাটে ঢোকার কোনো গোপন পথ এখনো অবশিষ্ট আছে কি না। যদি ফিরে না আসি, ইটনা-মিঠামইনে আমার গ্রামের বাড়িতে একটা খবর দেবেন।’

‘কী বলব?’

‘কী বলবেন? হ্যাঁ, কী বলবেন...থাক, কিছু বলতে হবে না।’

কিশোর আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন