চলচ্চিত্র

আমিও কাজ করি হলিউডে

বিজ্ঞাপন
default-image

ঢাকায় আমার দিনকাল মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল। একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করি, সুযোগ পেলেই উন্মাদ-এর অফিসে গিয়ে পড়ে থাকি, বই পড়ি, গান শুনি। ফুর্তিময় জীবন বলতে আসলে যা বোঝায় সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেই আমার মাথায় চাপল সিনেমা বানানোর ভূত। মনে হলো দারুণ একটা ছবি বানিয়ে সবাইকে যদি চমকেই দিতে না পারলাম, তবে জীবন বৃথা। মোটামুটি হুট করেই ডিসিশন নিয়ে চলচ্চিত্র বানানো নিয়ে পড়তে চলে এলাম কানাডা। প্রতিদিনই দারুণ দারুণ জিনিস শিখি আর হাত নিশপিশ করতে থাকে কিছু বানানোর জন্য। এর মধ্যেই বানিয়ে ফেললার একটা ভিডিও। সেটা দেখানো হলো বিখ্যাত টিভি হোস্ট কোনান ও’ব্রায়ানের টক শো ‘কোনান’-এ। এরই মধ্যে চলে এল সেকেন্ড ইয়ার। আমি ইন্টার্ন শুরু করলাম বিখ্যাত এনবিসি-ইউনিভার্সাল-এর শো ‘স্যুটস’ এবং ‘ডিফায়েন্স’-এ। ফাইনাল ইয়ারে নিজেই বানালাম হোয়াট অ্যাম আই ডোয়িং হেয়ার  নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মোটামুটি নামকরা একটা চলচ্চিত্র উৎসবে ছোটখাটো পুরস্কারও পেল এটি। আমার চোখে তখনো হলিউডের চলচ্চিত্র কাজ করার স্বপ্ন। এ দেশে বড় সিনেমাগুলোর সেটে কাজ করতে হলে ইউনিয়নের মেম্বার হতে হয়। আর ইউনিয়নের মেম্বার হওয়া যায় শুধু ক্যানাডিয়ান হলে। আমি যেহেতু বাংলাদেশি, আমার সেই সুযোগ নেই। তখন খোঁজ নিয়ে জানলাম, অ্যানিমেশন ও ভিএফএক্স স্টুডিওগুলোতে ইউনিয়নের ঝামেলা নেই। যোগ্যতা থাকলেই চাকরি পাওয়া সম্ভব। তো, আমার সেই যোগ্যতা প্রমাণের জন্য সেখানে লেগে রইলাম কাঁঠালের আঠার মতো। মাত্র তিন মাসের মাথায় অ্যানিমেশন স্টুডিও ‘বারডেল’-এ চাকরি পেয়ে গেলাম প্রডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। কাজ শুরু করলাম বড়দের জনপ্রিয় কাটু‌র্ন  রিক অ্যান্ড মরটি তে। ছয় মাস যেতে না যেতেই প্রোমোশন পেয়ে প্রোডাকশন সমন্বয়ক হিসেবে যোগ দিলাম ভিএফএক্স স্টুডিও মুভিং পিকচার কোম্পানিতে (এমপিসি)। এক বছরের বেশি সময় ধরে একে একে কাজ করি হালের বিখ্যাত টিভি সিরিজ গেম অফ থ্রোন্স, চলচ্চিত্র নাইট এট দ্য মিউজিয়াম থ্রিএক্সোডাসফিফটি শেডস অব গ্রে  ও ফিউরিয়াস সেভেন-এর মতো চলচ্চিত্রে। এই মুহূর্তে কাজ করছি  ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান   চলচ্চিত্রে, যেটা মুক্তি পাবে ২০১৮ সালে।

default-image

এই চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে আমার কোনো ধারণাই ছিল না, কত বিশাল আকারে এই পোস্ট প্রোডাকশন স্টুডিওগুলো কাজ করে। এমনও হয় যে ছোট্ট একটা অ্যানিমেশন দৃশ্যের বাজেট থাকে ১ মিলিয়ন ডলার। তোমরা যখন ছবিতে সেই দৃশ্যটা দেখো, তখন সেটা এক পলকেই শেষ হয়ে যায়। আর কাজগুলো এত ডিটেইলে হয় যে কল্পনাও করা যায় না। সমন্বয়ক হিসেবে আমার কাজ আর্টিস্টদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, সুপারভাইজার, ডিরেক্টরদের নোটে সমসন্বয় সাধন করা, আর্টিস্টরা যেন নির্ধারিত সময়সূচি মিস না করে, তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। সারা দিন এই কাজ করতে করতে আমি অবাক হয়ে দেখি সিনেমার পেছনের এই দারুণ দক্ষযজ্ঞ, যা এখানে না এলে কখনোই জানা হতো না। তবে এক লেখায় তো সব বলা সম্ভব না। আজকে নিচের তিনটি বিষয় নিয়ে বলি।

default-image

প্রি ভিজুয়ালাইজেশন ডিপার্টমেন্ট

স্টোরিবোর্ড জিনিসটা কী, আমরা সবাই জানি? সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার পর ডিরেক্টররা শট টু শট কেমন হবেন, তা কমিক্সের মতো করে একে ফেলেন। তাকেই স্টোরিবোর্ড বলে। এতে পুরো সিনেমার একটা ভিজ্যুয়াল ধারণা পাওয়া যায়। ক্যামেরা কোথায় বসবে, লেন্স কী হবে, চরিত্ররা কে কোন জায়গায় থাকবে ইত্যাদি সব খুব সহজেই ধারণা করা যায়। হলিউডের কম্পিউটার সিজিনির্ভর ছবিগুলো স্টোরিবোর্ডের এক ধাপ ওপরে। তারা শুরুতেই পুরো সিনেমার একটা অ্যানিমেটেড সংস্করণ বানিয়ে ফেলে। অনেক দ্রুত বানান হয় বলে এই অ্যানিমেশনগুলো হয় একদম প্রাথমিক মানের। কিন্তু এর ফলে সেট কেমন হবে, চরিত্ররা কে কোথায় থাকবে, ক্যামেরা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কী কী স্পেশাল এফেক্টস হবে—সবকিছু সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা পরিচালকেরা তাঁদের স্টুডিওকর্মীদের বুঝিয়ে দেন। অনেকটা মূল শুটিংয়ের আগে ডিজিটাল শুটিং হয়ে যায় আরকি! 

default-image

ডিজিটাল স্ট্যান্টম্যান বা সিজি ডাবল

স্ট্যান্টম্যানদের কথা তো সবারই জানা। নায়ক-নায়িকা বা ভিলেনদের যত বিপজ্জনক অ্যাকশন দৃশ্য আছে, তা সবই করেন আমাদের এই স্ট্যান্টম্যানরা। এ জন্য তাঁদের অ্যাকশনের সময় ক্যামেরা এমন অ্যাঙ্গেলে ধরা হয়, যাতে ঠিকমতো চেহারা না বোঝা যায়। এখনকার হলিউডের সিনেমায় স্ট্যান্টম্যানদের পাশাপাশি ডিজিটাল স্ট্যান্টম্যানও থাকে। প্রত্যেক অ্যাকশন হিরো-হিরোইনের একটা কম্পিউটার সংস্করণ বানানো হয়। কঠিন একশনের দৃশ্যগুলোয় অভিনেতাদের জায়গায় ব্যবহার করা হয় তাঁদের কম্পিউটার অ্যানিমেটেড সংস্করণ।  অনেক দ্রুত অ্যাকশনগুলো হয় দেখে বোঝার উপায়ই থাকে না যে কোনটা আসল আর কোনটা কম্পিউটারের মডেল। সিজি ডাবলের সবচেয়ে বড় কাজটি হয় ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ সিরিজের সপ্তম ছবি ফিউরাস সেভেন-এ। পউল ওয়াকারের মৃত্যুর পর সিনেমাটা শেষ করেন তাঁর দুই ভাই। কম্পিউটারের মাধ্যমে পালটে দেওয়া হয় তাঁদের মুখ।

default-image

সুপার হিরোদের উড়ন্ত কেপ

আচ্ছা, মানুষ না হয় ডিজিটাল হলো, কিন্তু তাই বলে সুপার হিরোরা দৌড়ানোর সময় পেছনে যে ঝালর আমরা উড়তে দেখি, যাকে বলা হয় ‘কেপ’, তা-ও কি ডিজিটাল হবে? সুপারম্যান সিরিজের ম্যান অব স্টিল মুভিটি যারা দেখেছে, তারা নিশ্চয়ই জানে পুরো সিনেমায় সুপারম্যান তার আইকনিক কেপটি কমিক্স বা কাটু‌র্নের মতোই খেলিয়ে গেছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি, যখন শুনি এই কেপটি ছিল সম্পূর্ণ ডিজিটাল! শুটিংয়ের সময় একটি কেপ ব্যবহার করলেও সেটা কাজ করে প্লেস হোল্ডার হিসেবে। যেকোনো সুপার হিরোর সিনেমাতেই নাকি এ রকম হয়। কেন? কারণ, কেপটি কম্পিউটারে বানালে ইচ্ছামতো তাকে নিয়ে খেলা যায়, ইচ্ছা মতো লাইট দেওয়া যায়, অ্যানিমেশন করা যায়। আগের দিনের সুপার হিরো মুভিতে দেখা যাবে কেপগুলো সব গলায় ঝুলে থাকে। আর এখন শরীরের সঙ্গে এমনভাবে থাকে, অ্যাকশনে এমনভাবে জড়িয়ে যায়, মনে হয় শরীরেরই অংশ। এই সবই হয় ডিজিটাল কেপের কল্যাণে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন