ফিল কোলসন: আড়ালে থাকা এক অ্যাভেঞ্জার
মার্ভেলের দুনিয়ার দুর্ধর্ষ স্পাই নিক ফিউরির সবচেয়ে কাছের, আস্তাভাজন ব্যক্তি ফিল কোলসন। ফিউরির চোখে চোখ রেখে নিজের কাজ আদায় করে নিত সে। অথচ অ্যাভেঞ্জার্স থেকে শুরু করে সরকারের বড় পর্যায়ের কর্মকর্তারা ফিউরির সামনে চোখ তুলে কথা বলতে ভয় পেত। নাতাশা আর ক্লিন্ট ছিল ফিউরির ‘বিগ শট’ স্পাই, কোলসন কাজ করত পর্দার আড়ালে। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেই টনি স্টার্ক ক্যাপ্টেন আমেরিকার মতো অ্যাভেঞ্জারদের মনে গেঁথে গিয়েছিল সে।
কোলসন শিল্ডে এসেছিল নিক ফিউরির হাত ধরে। নিজের কাজ দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ফিউরির আস্থাভাজন হয়ে ওঠে সে। ফিউরিও নিজের গোপন প্রজেক্টে যুক্ত করতে থাকে কোলসনকে। ক্যাপ্টেন মার্ভেলের পরিচয়, স্ক্রালদের আগমন, কোনো কিছুই গোপন ছিল না কোলসনের কাছে। ফিউরির ‘অ্যাভেঞ্জার্স ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রথম গোয়েন্দা ছিল কোলসন।
ফিল কোলসনের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেস কনফারেন্সে। টনি স্টার্ককে অপহরণ অতঃপর খুনের চেষ্টা, বিলিয়নেয়ার স্টার্কের ওপর তাই আলাদা নজরদারির ব্যবস্থা করেছিল শিল্ড। আর সেই কাজে কোলসনের চেয়ে বড় ভরসার পাত্র আর কেই–বা হতে পারে। এই এজেন্টের কাছ থেকে ‘থাম্বস আপ’ পাওয়ার পরই অ্যাভেঞ্জার্সের জন্য টনি স্টার্ককে প্রস্তাব দেয় ফিউরি। আয়রন ম্যানকে নিয়োগ করেই নতুন মিশনে পা বাড়ায় কোলসন।
হুট করেই পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয় এক হাতুড়ি। না কেউ তা নড়াতে পারে, না সেটা কেউ তুলতে পারে। হাতুড়ি-রহস্য আবিষ্কার করতে পাঠানো হয় কোলসনকে। কেচো খুঁড়তে গিয়ে বের হয় সাপ, হাতুড়ি-রহস্য সমাধান করতে এসে পরিচয় হয় থরের সঙ্গে।
শিল্ডের বাইরের তিন অরিজিনাল অ্যাভেঞ্জার—আয়রন ম্যান, থর আর হাল্কের নিয়োগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল কোলসন। সবাইকে এক করে কোলসন যখন প্রথম মিশনের অপেক্ষায়, তখনই আক্রমণ করে লোকি। থর ও ব্ল্যাক উইডোকে বোকা বানিয়ে অ্যাভেঞ্জার্স হেলিক্যারিয়ারে মুক্ত হয়ে যায় লোকি। একদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অ্যাভেঞ্জার্স অন্যদিকে মুক্ত লোকি, তাকে থামাতে তাই নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নেয় কোলসন। কিন্তু কিছু করার আগেই কোলসনের পিঠে স্ক্যাপ্টার বসিয়ে দেয় লোকি। সমাপ্ত হয় কোলসন-গাঁথার।
কোলসনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিক ফিউরি পুনরায় এক করে অ্যাভেঞ্জার্সকে। টনি স্টার্ক, থরের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল কোলসনের; স্টিভ রজার্সের বিশাল ভক্ত ছিল কোলসন, ব্ল্যাক উইডো-ক্লিন্ট বার্টন শুরু থেকেই কাজ করে আসছে কোলসনের সঙ্গে। প্রতিশোধ নিতে এক হয় অ্যাভেঞ্জাররা। মরে গিয়েও তাই অ্যাভেঞ্জার হয়ে বেঁচে ছিল কোলসন, অ্যাভেঞ্জার্সের অনুপ্রেরণা হয়ে।
এমসিইউর তৈরি করা প্রথম অরিজিনাল চরিত্র ফিল কোলসন। শিল্ড এজেন্ট হিসেবে কমিকসের পাতায় অনেকের পদচারণ থাকলেও ‘ফিল কোলসন’ ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক চরিত্র। টিভি বা বড় পর্দার জন্য নতুন চরিত্র তৈরি করা অবশ্য নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে ব্যাটম্যান দ্য এনিমেটেড সিরিজ–এর জন্য তৈরি করা হয়েছিল হার্লি কুইন চরিত্রটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রটি এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে টিভি সিরিজ থেকে কমিকের পাতায় স্থান পেয়েছে হার্লি। তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন কমিকস, নতুন ভিলেন হিসেবে খুঁজে পেয়েছে স্বকীয়তা।
সময়ের হিসাবে খুবই নগণ্য একটি চরিত্রে সুযোগ পেয়েছিলেন অভিনেতা ক্লার্ক গ্রেগ। বিশাল এক সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার নাম না জানা একজন কর্মচারী, সহজে সবার সঙ্গে মিশে যাওয়াই ছিল তার কাজ। চরিত্রটি এতটাই নগণ্য ছিল যে চরিত্রের জন্য আলাদা করে কোনো নামও ভেবে রাখেননি পরিচালক জন ফ্যাব্রু। সিনেমার শুরুতে চরিত্রের নাম ছিল ‘এজেন্ট’। কিন্তু অভিনেতাদের মধ্যে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ক্লার্ক, ফলে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে ক্লার্কের স্ক্রিনটাইম। আয়রন ম্যান মুক্তির পর ভক্তদের মধ্যেও বাড়তে থাকে এজেন্ট কোলসনের জনপ্রিয়তা। ২০ বছরের অভিনয়জীবনে যতটা না নাম কামিয়েছেন ক্লার্ক গ্রেগ, তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এক এজেন্ট কোলসন চরিত্রে। ভক্তদের ভালোবাসায় আয়রন ম্যান ২ সিনেমায় ফিরে আসে কোলসন। পরে মুক্তি পাওয়া থর সিনেমায় বেশ বড় রোলে দেখা যায় তাকে। কোলসন আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছিল মার্ভেল ইউনিভার্সের ‘ব্যুরোক্র্যাট’। পুরো ইউনিভার্সকে এক সুতায় বেঁধে রাখার দায়িত্বটা যেন তার ওপরই।
মার্ভেলের নতুন ওয়ান শট সিরিজের মূল চরিত্র হিসেবে পরিচিত করা হয় কোলসনকে। দুই সিনেমার মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে এক সুতায় বাঁধতে কোলসনই ছিল একমাত্র পছন্দ। অ্যাভেঞ্জার্সের পরিচালক জস উইডনের পরিকল্পনা ছিল অন্য। অ্যাভেঞ্জারদের এক করতে দরকার ছিল একটা ধাক্কা। আর সেই ধাক্কাটাই ছিল এজেন্ট কোলসন। লোকির হাতে সলিলসমাধি হয় মার্ভেলের কাল্ট হিরো কোলসনের।
কোলসনের মৃত্যু চমকে দিয়েছিল মার্ভেল–ভক্তদের । সুপারহিরোদের পেছনের কারিগর হিসেবে বড় একটি চরিত্রের বেশ পরিচিত একটি ঘটনা। কিন্তু মার্ভেল অনায়াসে কোলসনের মতো জনপ্রিয় চরিত্রকে পর্দা থেকে সরিয়ে ফেলবে, এমনটা ভাবনাতে ছিল না অনেকের। কোলসনের মৃত্যু ছুঁয়ে যায় মার্ভেল ফ্যানদের মন, আরেকবার তাকে পর্দায় ফিরে পাওয়ার জন্য শুরু হয় ক্যাম্পেইন।
টুইটারজুড়ে (বর্তমান এক্স) শুরু হয় #BringBackCoulson ক্যাম্পেইন। দাবির মুখে কোলসনকে আবারও জীবিত করে মার্ভেল। তবে বড় পর্দার জন্য নয়, কোলসন আটকে পড়ে ছোট পর্দায়। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সকে আরও বড় করতে ছোট পর্দায় সিরিজ আনার পরিকল্পনা করে মার্ভেল এন্টারটেইনমেন্ট। যার প্রথম সিরিজ ছিল এজেন্টস অব শিল্ড। এজেন্ট কোলসনের অধীনে আন্ডারকাভারে কাজ করা কয়েকজন এজেন্টের প্রতিদিনের ঘটনা ও মিশন নিয়েই গড়ে উঠেছে সিরিজের প্লট। মূলত মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পরিণতি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই তৈরি করা হয়েছে সিরিজটি। যেখানে শিল্ডের পতন, আল্ট্রনের আক্রমণ, অ্যাভেঞ্জারদের দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া—সবটাই উঠে এসেছে সিরিজের অংশ হিসেবে। নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত স্পাইয়ের মৃত্যু এত সহজে নিতে পারেনি ফিউরি। তাই কোলসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাকে ক্রি টেকনোলজির সাহায্যে ফিরিয়ে আনে সে। দায়িত্ব দেয় শিল্ডের আন্ডারকাভার প্রজেক্টের। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া শিল্ডের কেউই জানত না কোলসনের ফিরে আসার কথা। এমনকি ধ্বংসের পর নতুন করে গড়ে তোলার জন্য শিল্ডের পুরো দায়িত্ব পড়েছিল কোলসনের কাঁধেই। এমসিইউর ঘটনার বাইরে গিয়ে নিজেদের স্টোরিলাইন দিয়ে সিরিজটি নিজের আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল মার্ভেল–ভক্তদের মনে।
এমসিইউর অংশ হিসেবে শুরু হলেও একে আনুষ্ঠানিকভাবে মার্ভেল টাইমলাইনের অংশ হিসেবে স্বীকার করেননি কেভিন ফাইগি। মার্ভেল এন্টারটেইনমেন্টের সঙ্গে ঝামেলার কারণে এজেন্টস অব শিল্ডকে বরাবরই পর করে রেখেছেন তিনি। তারপরও নিজেদেরকে মার্ভেল ইউনিভার্সের অংশ ভেবেছে এজেন্টস অব শিল্ড।
এমসিইউর টাইমলাইন অনুযায়ী এজেন্ট কোলসনের মৃত্যু হয়েছে সেই ২০১২ সালেই। কিন্তু এজেন্টস অব শিল্ড টিভি সিরিজে প্রজেক্ট তাহিতির মাধ্যমে আবারও পুনর্জীবন লাভ করে সে। এজেন্ট কোলসন বেঁচে ছিল ২০১৮ সাল পর্যন্ত। শরীরের মৃত্যু হলেও মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়নি, তার ব্রেইনকে জীবিত রাখা রয়েছে এলএমডি বা লাইফ মডেল ডিকয়ের মাধ্যমে।