ভালোবেসে চলে যেতে নেই

অনেক গান সময়কে ধরে রাখে। আবার অল্প কিছু গান অতিক্রম করে সময়কে। সব বয়সী শ্রোতার কাছে হয়ে যায় ভালোবাসার গান। অতঃপর সেই গানগুলো কালোত্তীর্ণ হয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ গায় সেই গানগুলো। কাজের ফাঁকে একটু অবকাশে, পথচলতি রাস্তায় অথবা গানের মঞ্চে প্রিয় গায়কের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একাত্ম হয়। লাকী আখান্দের সুর করা গানগুলো ঠিক এ রকম, চিরসবুজ। আশির দশকের শেষ ভাগে যখন মাত্র ক্যাসেট প্লেয়ারের অবয়ব আমার চোখে ধরা পড়ল আর কানে এসে দোলা দিল বাংলা গানের সুর—সেই সময় থেকেই একটা নামের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। লাকী আখান্দ্। ’৮৪-তে সারগামের ব্যানারে বের হওয়া লাকী আখান্দের প্রথম অ্যালবাম আমি হাতে পেয়েছিলাম আরও পরে। ’৮৮-৮৯-এর দিকে বোধ হয়। গানগুলো শুনে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল, মনে আছে এখনও। যেন দূর থেকে ভেসে আসা মন্দ্রসপ্তক। একটা অনির্বচনীয় সাইকেডেলিক আবহ। ‘আমায় ডেকো না’, ‘আগে যদি জানতাম’, ‘এই নীল মনিহার’, ‘মামনিয়া’—দুর্দান্ত এক একটা গান।

২.

লাকী আখান্দ্—এক বিস্ময়ের নাম। বাংলা আধুনিক গানের মায়েস্ত্রো। সফট-মেলোডি গানের জাদুকর। ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্ম এই কিংবদন্তির। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তৎকালীন পাকিস্তানের এইচএমভির সুরকার এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন তিনি। এই তথ্যটা জেনে আমি অবাক হয়েছি! মাত্র ১৬ বছর বয়সে এত বড় একটা আয়োজনে সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজেকে যুক্ত করা সহজ নয়। কিশোর আলোর বন্ধুদের জন্য লিখতে গিয়ে আমি নিজেও প্রথমবারের মতো এই সংবাদ সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম। বুঝতেই পারছ কী অসাধারণ মেধাবী সংগীতজ্ঞ ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় লাকী আখান্দ্। ক্রমে ক্রমে বাংলা গানে আমরা তাঁর মেধার স্ফুরণ অবলোকন করি।

৩.

এই গানটা তোমরা নিশ্চয়ই সবাই শুনেছ—

চলো না ঘুরে আসি, অজানাতে/ যেখানে নদী এসে থেমে গেছে...

ঠিক ধরেছ। ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’। ১৯৭৫-এর দিকে সুর করা একটা কালজয়ী গান। অ্যাকুয়াস্টিক গিটার যারা শিখতে শুরু করে, এই গানটাই তুলে নেয় প্রথমে। তারপর দল বেঁধে কোরাসে গলা মেলায়।

১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে লাকী আখান্দ্ আর তাঁর ছোট ভাই—আর এক মেধাবী গায়ক, সুরকার, গীতিকার হ্যাপী আখান্দ্ একসঙ্গে কিছু গানের সুর-সংগীত করেন। ‘নীল নীল শাড়ি’, ‘পাহাড়ি ঝরনা’ আর ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’।

এই গানটার পেছনের গল্প বেশ মজার। গীতিকার এস এম হেদায়েত আর লাকী আখান্দ্ দুই বন্ধু। তৎকালীন নওগাঁর জমিদারবাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিলেন একসঙ্গে। একদিন বেরিয়ে দেখলেন আকাশে রঙিন মেঘ, বেদে মেয়েরা রং-ঝলমল শাড়ি পরে হেঁটে যাচ্ছে...বেশ মন ভালো করা চারপাশ। এস এম হেদায়েত লেখালেখি করার জন্য ছোট্ট ডায়েরি রাখতেন সঙ্গে। লাকী আখান্দ্ এই সুন্দর প্রকৃতি আর চারপাশ দেখে বন্ধুকে অনুরোধ করলেন কিছু লিখতে।

‘আবার এল যে সন্ধ্যা/ শুধু দুজনে’—বন্ধুর অনুরোধে লেখা হলো দুই লাইন। লাকী আখান্দ্ তাগাদা দিলেন পরের কথাগুলো লিখে ফেলতে। কিন্তু গীতিকার কিছুতেই আর বাকি লাইনগুলো খুঁজে পান না। শেষে অনেক কাটাছেঁড়ার পর লেখা হলো, ‘চলো না ঘুরে আসি, অজানাতে/ যেখানে নদী এসে থেমে গেছে।’

বাংলা গানের ইতিহাসে সৃষ্টি হলো এক অসামান্য গান।

৪.

কত কত যে সুন্দর গান লাকী আখান্দের সুর আর সংগীত আয়োজনে করা! লম্বা তালিকা। কুমার বিশ্বজিতের ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’, সামিনা চৌধুরীর ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’, হ্যাপী আখান্দের ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ফেরদৌস ওয়াহিদের ‘মামনিয়া’।

ইতিমধ্যে ঘটল ছন্দপতন! লাকী আখান্দ্ গান থেকে দূরে চলে গেলেন। আশির দশকে প্রিয় ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের অকালপ্রয়াণে অন্তরালে চলে যান লাকী আখান্দ্। প্রায় এক যুগ পর পরিচয় কবে হবে অ্যালবামের মাধ্যমে ফিরে আসেন। কিছুদিন পরে প্রকাশ পায় লাকী আখান্দের সুরে মিক্সড অ্যালবাম বিতৃষ্ণা জীবনে আমার। গোলাম মোরশেদের কথায় এই অ্যালবামের গানগুলো অসাধারণ। আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’, জেমসের ‘ভালোবেসে চলে যেয়ো না’, সামিনা চৌধুরীর ‘চলো না স্বপ্নে’, কুমার বিশ্বজিতের ‘দেখেছি তোমায় আমি’ প্রিয় সব গান।

এখনো কানে লেগে আছে গানগুলো। এই অ্যালবাম মূলত দুই প্রজন্মের সংগীতের মেলবন্ধনও বলা যায়। লাকী আখান্দের সুরে বিতৃষ্ণা জীবনে আমার অ্যালবামে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন দুই প্রজন্মের দুই সংগীত পরিচালক মানাম আহমেদ আর বাপ্পা মজুমদার।

ছোটবেলায় লাকী আখান্দ

৫.

লাকী আখান্দে্র সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বাপ্পা ভাইয়ের বাসায়।

২০০১ সালের কোনো এক রোদেলা দুপুরে বাপ্পা ভাইয়ের বাসায় যাই। বছর দুয়েক হলো গীতিকার হওয়ার স্বপ্নপথে যাত্রা শুরু করেছি কেবল। ঘরে ঢুকেই দেখি লাকী ভাই বসে আছেন। বাপ্পা ভাই পরিচয় করিয়ে দিতেই বহু কষ্টে আবেগ-উচ্ছ্বাসে লাগাম পরিয়েছিলাম। স্মিত হাসিমুখে লাকী ভাই গুনগুন করছিলেন। পরে জেনেছিলাম দলছুট-এর অ্যালবাম হৃদয়পুরে আমার লেখা একটি গানে বাপ্পা ভাইয়ের অনুরোধে অ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়েছিলেন লাকী আখান্দ্। আমার লেখা প্রিয় গানের নাম জানতে চেয়ে কেউ প্রশ্ন করলে আমি সময় নষ্ট না করে বলি—গাছ। আমার লেখা সবচেয়ে প্রিয় গানের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সংগীতজ্ঞ লাকী আখান্দের নাম জড়িয়ে আছে—এই অনুভূতি আমি শব্দে কখনোই ধরতে পারব না।

৬.

দীর্ঘদিন কর্কট রোগে ভুগে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল চলে যানলাকী আখান্দ্। কাকতালীয়ভাবে অন্তিম প্রয়াণ সেই পুরান ঢাকাতেই। লাকী আখান্দ্ মৃত্যুকে বরণ করে নেয় আরমানিটোলার বাসায়।

তখন কি চারপাশে শব্দ আর সুরের একটা বিমূর্ত আবহ ঘিরে রেখেছিল তাঁকে? সেই শান্ত কিন্তু মন খারাপ করা নীল নীল শাড়ির সুর? কিংবা এই নীল মনিহারের অদ্ভুত সাইকেডেলিক আবহ? অভিমান ভেঙে ফিরে এসে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’-এর সেই অপার্থিব হামিং আলিঙ্গনে বেঁধেছিল লাকী আখান্দকে?

নাকি সব বাদ দিয়ে কেউ ফিসফিস করে তাঁর কানের কাছে গেয়ে উঠেছিলেন—

ভালোবেসে চলে যেয়ো না, ভালোবেসে চলে যেতে নেই...

জানা হবে না কোনো দিন!

(কিশোর আলোর মে ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত)