
চিত্রকলার নানান রকম মাধ্যম আছে। দেয়ালে খোদাই চিত্র, কাগজে তুলির আঁচড়, ভাস্কর্য—আরও অনেক। জর্ডান মং-ওসান এসব চিরাচরিত ধারার মধ্যে নেই। তিনিও চিত্রশিল্পী, ছবি আঁকেন। তবে ছবি আঁকতে তিনি তুলির বদলে ব্যবহার করেন আতশি কাচ। আতশি কাচ নিয়ে ছোটবেলায় অনেকেই অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ছোট্ট পিঁপড়েকে বড় করে দেখেছেন। ঠিক যে বয়সে সবাই আতশি কাচ ছাড়ে, সে বয়সেই আতশি কাচ হাতে নেন তিনি। জর্ডান মং ছবি আঁকার জন্য আতশি কাচ হাতে নেন ১৯ বছর বয়সে। বাড়ি তাঁর ফিলিপাইনে। থাকেন পাহাড়ি রাজ্য করডিলার্সে। ছবি আঁকার ক্যানভাস তাঁর সমতল কাঠের তক্তা। ওই সমান কাঠের তক্তার ওপর ধরেন আতশি কাচ। সূর্যের আলো আতশি কাচের ভেতর দিয়ে পড়ে কাঠের ক্যানভাসে। কাঠটা কমবেশি পুড়িয়ে পুড়িয়ে তারপর তৈরি করেন একেকটি চিত্রকর্ম। আর এভাবে তুলে ধরেন পাহাড়ি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী ছবি। বিশেষ করে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গ্যালারির মতো সাজানো ধানখেত। তাঁর সব চিত্রকর্ম শুধু কাঠের তক্তার ওপরই নয়, হাতে তৈরি কাগজেও ফুটিয়ে তোলেন অপূর্ব সব পাহাড়ি জীবনের ছবি।

ইদানীং স্ট্রিট আর্টের একটা চল চলছে নানান দেশে। তেমনি একজন স্ট্রিট আর্টিস্ট বাফ ডিস। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের এই চিত্রশিল্পীও ছবি আঁকেন তুলি, পেনসিল বা কলম ছাড়া। তিনি ছবি আঁকেন আঠালো টেপ দিয়ে। আঠালো টেপ সাধারণত ইলেকট্রিক মিস্ত্রিরাই ব্যবহার করেন। স্ট্রিট আর্টিস্টদের কাজে আছে নানা বাধা। কারও বাড়ির দেয়ালে কিংবা রাস্তায় কাজ করার জন্য অনুমতি নিতে হয় আগে থেকে। বাফ ডিস এসব অনুমতির তোয়াক্কা করেন না। অনুমতি ছাড়াই যত্রতত্র আঠালো টেপ দিয়ে ছবি এঁকে যান। যেখানে-সেখানে সোজাসুজি আটকানো যায় আঠালো টেপ। টেপের কিনারগুলোও নিখুঁত। আবার ইচ্ছে করলে টেপ দিয়ে সোজা দাগ যেমন টানা যায়, তেমনি ইচ্ছেমতো বাঁকানোও যায়। ছবি আঁকার সময় আঠালো টেপের এসব নানান সুবিধা নেন তিনি। ২০০৫ সাল থেকে তাঁর ছবি আঁকার প্রধান মাধ্যমই হচ্ছে আঠালো টেপ। তবে আঠালো টেপ দিয়ে ছবি আঁকার একটা সমস্যাও আছে। বেশির ভাগ ছবিই খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় কিংবা কেউ নষ্ট করে ফেলে। তাঁর ছবির স্থায়িত্ব নির্ভর করে চিত্রকর্মটি তিনি কিসের ওপর করেছেন। টেপ তো আর সব জায়গায় একই রকমভাবে আটকে থাকে না। যে জায়গায় টেপ ভালোভাবে আটকায়, সেখানকার চিত্রকর্ম অনেক দিন টিকে থাকে। প্রায় বছর খানেক। কাচের ওপর করা চিত্রকর্মগুলো বেশি দিন টেকে। আবার রাস্তার ওপর করা চিত্রকর্মগুলো এক দিনও টেকে না। রাস্তার ওপর প্রচুর চিত্রকর্ম করেছিলেন বাফ। ওগুলো বেশির ভাগের খোঁজই পরদিন আর পাওয়া যায়নি। আঠালো টেপ দিয়ে চিত্রকর্ম শুধু বাফ একাই করেন না। ম্যাক্স জর্ন আর মার্ক খাসমানের মতো মেধাবী চিত্রশিল্পীরাও করে থাকেন।

ওদিকে নিউজিল্যান্ডের আঁকিয়ে ও ভাস্কর বেন ইয়ং কাজ করেন কাচ দিয়ে। সনাতন ধারায় নয় অবশ্যই। অনেকগুলো কাচ জোড়া লাগিয়ে শিল্পকর্মকে ত্রিমাত্রিক রূপ দেন তিনি। রূপটা দেন তাঁর ইচ্ছেমাফিক। কাচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ তৈরির দক্ষতা তাঁর অতুলনীয়। শুধু তাই নয়, একটার পর একটা কাচ কেটে তিনি মূর্ত এবং বিমূর্ত—দুই ধরনের পানির ঢেউয়ের ভাস্কর্যই সৃষ্টি করতে পারেন। নিঃসন্দেহে তিনি এমন শিল্পকর্ম করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তাঁর বাড়ির কাছের বে অব প্লান্টি থেকে। বে অব প্লান্টি হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডের উত্তর ঊপকূলে। ইয়ংয়ের সব ধরনের ভাস্করই হাতে আঁকা, হাতে কাটা এবং হাতেই নকশা করা। স্তরের ওপর স্তর সাজিয়ে তিনি একেকটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। কাচ কাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন না। তবে একেকটি ভাস্কর্য সৃষ্টির আগে প্রচুর ভাবতে হয় তাঁকে। ভাবনা শেষে তিনি ছবি এঁকে তারপর কাচ কাটতে শুরু করেন। তাঁর ভাবনার পুরো জগৎজুড়েই রয়েছে সমুদ্র। তা তো হবেই। কারণ, পেশায় তিনি একজন নৌকানির্মাতা ও সার্ফার। এখন বসবাস করছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে।

কাচের স্তর সাজিয়ে ভাস্কর্য বানান বেন ইয়ং। আর বালুর স্তর সাজিয়ে শিল্প নির্মাণ করতেন এন্ড্রু ক্লিমেন্স। এ জন্য নানান রঙের বালু ব্যবহার করতেন এন্ড্রু। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ায় জন্ম নেওয়া এন্ড্রু কিন্তু এই বালুশিল্প নির্মাণ করেছেন এক শ বছরেরও বেশি সময় আগে। তাঁর জন্ম ১৮৫৬ সালে আর দেহত্যাগ করেন ১৮৯৪ সালে। তিনি ছিলেন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তবে জন্মসূত্রে নয়। পাঁচ বছর বয়সে হওয়া এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কপ্রদাহ রোগের কারণে আজীবন কানেও শুনতেন না, কথাও বলতে পারতেন না। তাতে কী! তিনি কোনোরকম আঠা ব্যবহার না করেই রঙিন বালুর অসাধারণ সব চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছেন। তাঁর স্যান্ডপেইন্টিং বা বালু দিয়ে আঁকাআঁকির শুরু ১৩ বছর বয়স থেকে। গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুল থেকে গিয়েছিলেন পাইকস পিকস স্টেট পার্কে। যেটা পিকচার্ড রকস নামে খ্যাত। ওখানেই দেখেছিলেন নানা রঙের পাথর। ওই পাথর গুঁড়ো করে পেয়েছিলেন নানা রঙের বালু। ব্যস। ওই রঙিন বালুই হয়ে উঠল তাঁর চিত্রকর্মের উপাদান। জোগাড় করলেন ছোট ছোট ওষুধের কাচের বোতল। তারপর ওই কাচের বোতলগুলো রঙিন বালু দিয়ে এমনভাবে ভরলেন, যেন একেকটা বোতল হয়ে উঠল একেকটা অসাধারণ ছবি। কাচের বোতলে বালু ভরলেন মাছ ধরার বড়শি আর হিকরি গাছের ডাল দিয়ে। কোনো আঠা ব্যবহার করেননি। কাচের বোতলে অন্য বালু এমনভাবে ভরলেন, যেন সে চাপেই সাজানো চিত্রকর্ম নড়ে না গিয়ে ঠিকঠাক থাকে। চিত্রকর্ম শেষ হওয়ার পর প্রতিটি বোতলের মুখ আটকে দিতেন ছিপি আর মোম দিয়ে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে কিছু চিত্রকর্ম বোতল উল্টো করে রাখলে সোজা দেখায়। তার মানে সেগুলো উল্টো করে তৈরি করতে হয়েছে তাঁকে। আবার কিছু চিত্রকর্ম পাশ থেকে দেখলে সোজা দেখায়। এমন চিত্রকর্মও আছে, যেগুলো নির্মাণে বছর খানেক সময় লাগত।

ক্লিমেন্সের এ অদ্ভুত চিত্রকর্মের সুনাম একসময় ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বোতলগুলো তিনি বিভিন্ন জাদুঘর আর প্রদর্শনীতেও পাঠাতেন। সে সময় একেকটা চিত্রকর্ম বিক্রি হতো পাঁচ থেকে সাত ডলারে। আর এখন! হাজার হাজার ডলার। সারা জীবন শ খানেক বালুপেইন্টিং করেছিলেন ক্লিমেন্স। তবে টিকে আছে মাত্র কয়েকটা।

এখন যে চিত্রকর্মের গল্প শোনাব, এর ক্যানভাস স্কুলের দেয়াল। আর রংটা কাদা দিয়ে বানানো। স্কুলটা ভারতের বিহার রাজ্যে। ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহার। বিহারের দুর্গম এক গ্রাম সুজাতা। প্রতিবছর এ গ্রামের নিরঞ্জন পাবলিক ওয়েলফেয়ার স্কুল আয়োজন করে দেয়ালচিত্র উৎসব। ভারত এবং জাপানের বিভিন্ন আঁকিয়ে এখানে আসেন এবং তিন সপ্তাহ ধরে থেকে স্কুলের দেয়ালগুলোকে ক্যানভাস বানিয়ে ছবি আঁকেন। আঁকিয়েদের সঙ্গে স্থানীয় ছেলেপুলেদের সম্পর্ক তৈরি করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক এবং চিত্রসম্পর্কিত ভাববিনিময়ও এর কারণ। তবে মূল কারণ এখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বাইরের দুনিয়াকে জানান দেওয়া, যাতে এখানকার ছেলেপুলেরা শিক্ষা ও চাকরিবাকরির সুযোগসুবিধা পায়। ২০০৬ সালে টোকিওর গাকুডাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সাহাযে্য ৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে এসে একটা নতুন স্কুল ভবন তৈরি করে। স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বেশ সাড়া ফেলে স্কুলটি। শিক্ষক এবং স্বেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র চার বছরে স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা হয়ে যায় চার শ। স্কুলে নার্সারি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। তো এই শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে গিয়ে কী কী সমস্যায় পড়ছে, ঘরে-বাইরে আরও কী কী সমস্যা আছে, সেসব সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার জন্যই চিত্র উৎসবের আয়োজন। তখনই সিদ্ধান্ত হয় স্কুলের সাদা দেয়ালই হবে আঁকিয়েদের ক্যানভাস।
এই উৎসবেই তিন বছর ধরে অংশ নিচ্ছেন জাপানি চিত্রশিল্পী ইয়াসুকি আসাই। ভারতীয় সনাতনী চিত্রকর্মে বেশ কৌতূহল তাঁর। ঠিক করলেন স্কুলের ছাদসহ সাদা দেয়ালগুলোয় তিনি ছবি আঁকবেন কাদা দিয়ে। শিশুদের সঙ্গে নিয়ে নানান জায়গা থেকে জোগাড় করলেন নানান ধরনের মাটি। তারপর পানির সঙ্গে মিশিয়ে রং তৈরি করলেন। আর ছবি দিয়ে ভরিয়ে তুললেন স্কুলটি। শিশুদের হাতের ছাপও ব্যবহার করলেন তাঁর চিত্রকর্মে।

চীনের সিচুয়ান প্রদেশে গেলে হঠাৎ চোখে পড়বে ভাস্কর্যগুলো। মাও সে তুং, বুদ্ধ, যিশুখ্রিষ্ট, সান্তা ক্লজ, শিশু, বুড়ো, সন্ন্যাসী, ড্রাগন এমনকি সুন্দরীদের ভাস্কর্য। মনে হতে পারে, এ আর এমন নতুন কী! এমন ভাস্কর্য তো দুনিয়ার অনেক ভাস্করই তৈরি করেন। উঁহু। একটা ভাস্কর্য হাতে নিলেই যে কারও ভুলটা ভাঙবে। নাহ্! ওগুলো চিরাচরিত ভাস্কর্য নয়।
এমন ভাস্কর্য তৈরির পেছনে একটি গল্প আছে। জাই লিয়ু ঝি নামের এক চীনা কৃষক একবার সিচুয়ান প্রদেশের হাজার বছরের পুরোনো এক মন্দির দেখতে গেলেন। তখন নাকি এক সন্ন্যাসী তাঁকে একটি স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন। সন্ন্যাসী স্বপ্নে একটি লাউ দেখেছেন, তবে সেটি দেবতা আকৃতির।
বাড়ি ফিরে জাই ভাবলেন, চেষ্টা করেই দেখা যাক। তাঁর কাছে একটি প্লাস্টিকের ছাঁচ ছিল। সেটা বসিয়ে দিলেন গাছের কচি লাউয়ের চারপাশে। ব্যস, লাউটা বড় হওয়ার পর দেখলেন, বাহ্, একেবারে ঠিক একটা ভাস্কর্য হয়ে গিয়েছে। লাউয়ের ভাস্কর্য। সেই থেকে নানা আকৃতির ছাঁচ দিয়ে লাউয়ের ভাস্কর্য তৈরি করে যাচ্ছেন। জাইয়ের দেখাদেখি ওই প্রদেশের আরও অনেক লাউচাষিও মন দিয়েছেন লাউ ভাস্কর্য নির্মাণে। চীনে এখন এই বিশেষ ধরনের লাউয়ের বেশ কদর। তাদের বিশ্বাস, এতে অর্থ ও সৌভাগ্য দুটোই আসে। এ ধরনের লাউ সন্তানের কর্মক্ষমতা বাড়ায় বলেও বিশ্বাস অনেকের। মানুষের বিশ্বাসের সুযোগটা কেবল লাউচাষিরা নয়, কিছু নাশপাতি চাষিও নিয়েছেন। তাঁরা এখন নাশপাতি ভাস্কর্য নির্মাণ করছেন।