default-image

হুমায়ূন আহমেদ একবার বলেছিলেন, ‘চাঁদ আসে একলাটি, আর নক্ষত্ররা আসে দল বেঁধে।’ ঢাকা শহরে চাঁদ আসলেই একলা। সত্যিকারেই নিঃসঙ্গ। বাক্সের মতো সারি সারি বহুতল ভবন ঢেকে দিয়েছে ঢাকার চার দিগন্ত। তাই আকাশছোঁয়া ভবনের ফাঁকফোকর দিয়ে কখনো চাঁদ উঁকি দিলেও বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানিতে সেটা প্রায় বোঝা যায় না বললেই চলে। আলোকিত এই শহরে চাঁদটাকে কেউ যদি ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেবে বসে, তাতেও বোধ হয় কাউকে দোষ দেওয়া যাবে না। আবার ঠেলাঠেলি, জ্যাম-ঘাম আর শত নাগরিক ব্যস্ততায় চাঁদের দিকে মায়াবী চোখে তাকানোর মতো কবিমনই কোথায় এখানে। তাই চাঁদ একলা হবে না তো কী! অত বড় চাঁদই যখন প্রায় দেখা যায় না, তখন এ শহরে বসে নক্ষত্রদের দলবল দেখার কথা কল্পনা করাও কঠিন। তবে শহর ছেড়ে একটু দূরের কোনো অন্ধকার এলাকায় আকাশভরা মিটিমিটি তারার মেলা দেখা যায়।

আকাশের কোটি কোটি তারার ঘূর্ণিপাকের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে আমাদের পৃথিবী। আর তারাদের বিস্তার যে কত বড়, তা চর্মচক্ষে কল্পনাও করা যায় না। কোনো গ্রামের রাতের খোলা মেঘমুক্ত আকাশে তাকালে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ফোঁটা ফোঁটা আলোকিত সাদা মেঘের মতো দেখতে পাওয়া যায়। এটি আসলে আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গার একটি অংশ। আকাশগঙ্গা মানে আকাশের নদী। এসব নক্ষত্র আকাশে উত্তর থেকে দক্ষিণপ্রান্তজুড়ে অনেকটা নদীর মতোই ছড়িয়ে থাকে বলে প্রাচীন মানুষেরা এমন নাম দিয়েছিল। ইংরেজিতে একেই বলে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। প্রাচীন ভারতবর্ষে যেটা আকাশের নদীর মতো মনে হতো ইউরোপিয়ানদের কাছে, সেটিই মনে হয়েছিল আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দুধ। সে কারণেই মিল্কিওয়ে বা দুধেল বৃত্তপথ নাম দিয়েছিল ইউরোপের প্রাচীন মানুষেরা। অবশ্য এ নামের পেছনে মজার এক গল্প পাওয়া যায় গ্রিক পুরাণে। আগ্রহীরা সেটা পড়ে দেখতে পারো।

বিজ্ঞাপন

খালি চোখে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির খুব সামান্য অংশই দেখতে পাই আমরা। অন্ধকার রাতে তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, আমাদের ছায়াপথের পুরোটা দেখতে পাবে না। কারণ, আমরা এই ছায়াপথের ভেতর বাস করি। প্রাচীন প্রবাদ আছে, ফলের ভেতরে থাকা পোকা গোটা ফল চিনতে বা দেখতে পায় না। একই অবস্থা আমাদেরও। একই কারণে তোমার বাড়ির সদর দরজা থেকে গোটা শহর কখনো দেখতে পাবে না তুমি। শহরের সামান্য কিছু অংশই কেবল দেখা যাবে তোমার দরজা থেকে। তবে কোনোভাবে যদি মিল্কিওয়ে ছায়াপথটাকে ওপর থেকে দেখতে পেতে, যাকে বলে বার্ড আই ভিউ, তাহলে দারুণ রোমাঞ্চকর ব্যাপার হতো সেটা। সে ক্ষেত্রে অসংখ্য নক্ষত্রের উজ্জ্বল ঘূর্ণি দেখা যেত। সেগুলো চারটি সর্পিল বাহুর মতো একটা পিনহুইল বা চরকির মতো আকৃতিতে একটা আরেকটার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। এ রকম মোচড় খাওয়া বা সর্পিল একটি বাহুর ভেতরের প্রান্তে আমাদের পৃথিবী বা সৌরজগতের অবস্থান। মিল্কিওয়ের চারটি বাহুর মধ্যে একটির নাম ওরিয়ন বাহু (বাংলায় যাকে বলে কালপুরুষ)। এখানেই অবস্থিত আমাদের সূর্য। ছায়াপথের মধ্যভাগের কেন্দ্র এবং বাইরের পরিধিকে সীমানা বিবেচনা করলে, কেন্দ্র থেকে এই সীমার দুই-তৃতীয়াংশ দূরত্বে অবস্থান করছে সূর্য। ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ। মিল্কিওয়ের কোটি কোটি ঘূর্ণমান নক্ষত্রের মধ্যে সূর্যও একটি।

সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখানো কাল্পনিক স্টারশিপ নিয়ে যদি তুমি পুরো ছায়াপথটা ঘুরে আসতে চাও, তাহলে তোমার দরকার হবে অতি দ্রুতগতির একটা নভোযান। আমাদের বর্তমানে প্রচলিত রকেটের গতি হলে না চলবে না, সেই নভোযানটির অন্তত আলোর বেগে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে। অবশ্য এই গতি অর্জন করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না, তা কেউ জানে না। আলোর বেগে চললে তুমি মাত্র এক সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারবে। তাহলে মাত্র এক সেকেন্ডে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে আসতে পারবে সাতবার। চাঁদে গিয়ে সেখান থেকে ফিরে নিজের বাসায় ফিরে আসতে পারবে মাত্র দেড় সেকেন্ডে। আর মাত্র ২০ মিনিটে ঘুরে আসতে পারবে মঙ্গল গ্রহ থেকে। সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টোরি। আলোর গতিতে চললে প্রতিবেশী এ নক্ষত্রে পৌঁছাতে সময় লাগবে চার বছরের কিছুটা বেশি। তবে বর্তমানে আমাদের সর্বোচ্চ গতির জেট বিমানে যদি সেখানে যেতে চাও, তাহলে সময় লাগবে ৫০ লাখ বছর। আর বাংলাদেশ বিমানে গেলে লাগবে তারও চেয়ে বেশি। এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নাও, কিসে চড়ে যাবে তুমি।

অবিশ্বাস্য আলোর গতির কোনো নভোযান যদি কখনো আমাদের হাতে চলে আসে, তাহলেও পৃথিবী থেকে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে যেতে চাইলে একটু ভাবনাচিন্তা করে নেওয়ায় ভালো।

অবশ্য অবিশ্বাস্য আলোর গতির কোনো নভোযান যদি কখনো আমাদের হাতে চলে আসে, তাহলেও পৃথিবী থেকে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে যেতে চাইলে একটু ভাবনাচিন্তা করে নেওয়ায় ভালো। কারণ, সেটা যেতে তোমার পাক্কা ৩০ হাজার বছর লাগবে। আর মিল্কিওয়ে ছায়াপথের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যদি যেতে চাও, তাহলে তোমার সময় লাগবে এক লাখ বছর। কারণ, আমাদের গ্যালাক্সির এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব এক লাখ আলোকবর্ষ (আলো এক বছরে যতটুকু পথ পাড়ি দেয়, তাকে বলে এক আলোকবর্ষ)। অর্থাৎ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ব্যাস এক লাখ আলোকবর্ষ। আমাদের সূর্য এ ছায়াপথের কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে। তার সঙ্গে ঘুরছি গোটা সৌরজগৎসহ আমরাও। হিসাবে দেখা গেছে, সূর্য সেকেন্ডে ২৩০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চারপাশে এক চক্কর ঘুরে আসতে সূর্যের সময় লাগে প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি বছর। এই সময়কে তাই বলা হয় কসমিক ইয়ার বা মহাজাগতিক বর্ষ।

এবার আসি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রতিবেশী ছায়াপথের কাছে, যার নাম অ্যান্ড্রোমিডা। আমাদের পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব ২৫ লাখ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ সেখানে আলোর গতিতে গেলেও ২৫ লাখ বছর সময় লাগবে। এখন আরও দূরের ছায়াপথগুলো আমাদের কাছ থেকে কতটা দূরে থাকতে পারে, তা নিশ্চয়ই কিছুটা আন্দাজ করতে পারছ।

বিজ্ঞানীদের অনুমান, আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে মোটামুটি ৩০ হাজার কোটি (৩০০,০০০,০০০,০০০) নক্ষত্র আছে। সংখ্যাটি কতটা বিশাল, তা কি কল্পনা করতে পারছ? তোমাকে একটু সাহায্য করা যাক। সাগরসৈকতের বালুকণার সঙ্গে তুলনা করে সংখ্যাটা কিছুটা বুঝতে পারবে। ধরা যাক, প্রতিটি বালুর কণা হলো একেকটি নক্ষত্র। তুমি যদি এক মুঠো বালু সৈকত থেকে তুলে নাও, তাহলে সেখানে কয়েক হাজার থেকে প্রায় লাখখানেক বালুকণা আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাহলে এই সংখ্যক নক্ষত্রই আসলে তুমি অন্ধকার রাতে খালি চোখে দেখতে পাও। কিন্তু এ ছায়াপথের মোট নক্ষত্র সংখ্যার খুবই সামান্য অংশ হবে সেটা। রাস্তায় বালু বয়ে নিয়ে যাওয়া ডাম্প ট্রাক তো নিশ্চয়ই দেখেছ। একটা প্রমাণ সাইজের ডাম্প ট্রাকে যে পরিমাণ বালুকণা থাকে, তার পরিমাণ হতে পারে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে থাকা মোট নক্ষত্রের সংখ্যা; মানে ৩০ হাজার কোটি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মহাবিশ্বে শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিই একমাত্র ছায়াপথ নয়। এ রকম আরও লাখো কোটি ছায়াপথ রয়েছে। সেসবের অসংখ্য এখনো আমাদের কাছে অজানা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীদের বর্তমান হিসাবে আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯,৩০০ কোটি (৯৩ বিলিয়ন) আলোকবর্ষ। তাহলে মহাবিশ্ব কতগুলো নক্ষত্র আছে, সেটা কি বলা যায়? সত্য হোক মিথ্যা হোক, অনুমান করতে তো দোষ নেই। বিজ্ঞানীদের অনুমান ২০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০টি নক্ষত্র আছে আমাদের মহাবিশ্বে (২-এর পর ২৩টি শূন্য)। এটা বিশাল একটি সংখ্যা। সংখ্যাটা কত বড়, সেটা অনুমান করতে আবারও বালুকণার কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মহাবিশ্বের সব নক্ষত্রকে বালুকণা হিসেবে ধরে নেওয়া যাক। তাহলে আমাদের পৃথিবীর সব সাগরসৈকতে যত বালুকণা, তা মহাবিশ্বে নক্ষত্রের সংখ্যার সমান।

এই ভাবনায় তোমার মাথা যদি গুলিয়ে না গিয়ে থাকে, তাহলে আঙুলের ডগায় একটা বালুকণা তুলে দেখে নাও। ওটাও একটা নক্ষত্র, আমাদের সূর্য। আমাদের সূর্যের আকার এই বালুকণার সমান হলে, খালি চোখে আমাদের প্রিয় পৃথিবীটা দেখতেই পাবে না তুমি।

আমাদের ছায়াপথ কিংবা মহাবিশ্ব কতটা, তা এতক্ষণে কিছুটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। এর আকার এবং এতে যে পরিমাণ নক্ষত্র আছে, তা অকল্পনীয়। এই সত্যটা জেনে নিজেকে অতিক্ষুদ্র আর তুচ্ছ মনে হতেই পারে। তবে একটা কথা মনে রেখো, আমরা মহাবিশ্বের তুলনায় অতিক্ষুদ্র হতে পারি, কিন্তু সমস্ত প্রাণিকুলে একমাত্র আমরাই বুঝি ও জানি, মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায় এবং কেমন। তাই নিজেকে তুচ্ছ ভেবে মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই।

সূত্র: স্পেস ডটকম, উইকিপিডিয়া, নাসা ডটকম

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন