গোপাল ভাঁড় বলে আদৌ কেউ ছিলেন কি না, সেটাই আসলে নিশ্চিত না!
বলা হয়, গোপাল ভাঁড় ছিলেন নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ; মানে সভার ভাঁড়। কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের যত বইপত্র পাওয়া যায়, দরবারের যত বর্ণনা পাওয়া যায়, তার কোথাও গোপালের কোনো উল্লেখ নেই। আবার সেই সময়ের নথিপত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন, এমন বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা পরে লিখেছেন যে গোপাল ভাঁড় বলে কেউ একজন ছিলেন।
আবার অনেক পণ্ডিত বলেছেন, গোপাল ভাঁড় নামে কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে কেউ ছিলেন না। তবে লক্ষ্মণ নামে রাজার এক দেহরক্ষী ছিলেন, যাঁর ঘটনাবলি গোপালের সঙ্গে মিলে যায়।
কয়েক বছর আগে অবশ্য কলকাতা বইমেলায় গোপাল ভাঁড়ের ওপর একটি গবেষণাগ্রন্থের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর কয়েকজন বংশধর উপস্থিত হন! তাতে বিতর্কটা আবার চাঙা হয়ে ওঠে। তবে গোপাল থাকুন আর না-ই থাকুন, তাঁকে নিয়ে গবেষণা চলছেই। এই তো কিছুদিন আগেই বাংলাদেশে গোপাল ভাঁড় গবেষক গৌতম ভদ্র এক সেমিনারে বক্তৃতা করে গেছেন।
তর্কের তো মীমাংসা নেই। তার পরও ঢের রশি টানাটানি করে গোপাল ভাঁড়ের জীবনী সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দাঁড় করানো হয়েছে। সেই ধারণা অনুযায়ী, ১৭ শতকের গোড়ার দিকে কৃষ্ণনগরের পাশে ঘূর্ণি বলে এক গ্রামে নরসুন্দর পরিবারে জন্ম হয়েছিল গোপালের। তার মানে, গোপাল পেশায় ছিলেন নাপিত। কিন্তু কোনো এক ঘটনাচক্রে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নজরে পড়ে যান গোপাল। এই নজরে পড়া নিয়ে অনেক অনেক গল্প আছে।
একবার দরবারে ঠাঁই পেয়ে যাওয়ার পর গোপাল নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। রাজা তাঁর সঙ্গে রাজ্য পরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত অনেক বিষয়েও শলাপরামর্শ করতেন। আর এসবের ভেতর দিয়েই ফুটে ওঠে গোপালের বৃদ্ধিদীপ্ত চরিত্র। যেখানে গোপাল মজার মজার কথা বলে, রাজাকে ছোটখাটো খোঁচা দিয়ে নজর কেড়ে নেন, আর আমাদের হাসির অফুরন্ত উৎসব তৈরি করে দিয়ে গেছেন।
গোপাল ভাঁড়ের দশটি গল্প
১
গোপাল ভাঁড়ের ভাইপো আর তার স্ত্রীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া। মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে গেল গোপাল। বলল, ‘বলি কী নিয়ে এত ঝগড়া হচ্ছে শুনি?’
গোপালের ভাইপো বলল, ‘দেখুন তো কাকা, আমি আগামী বছর একটা দুধেল গাই কিনব বলেছি। আর আমার স্ত্রী বলছে, সে নাকি গাইয়ের দুধ দিয়ে পায়েস রাঁধবে।’
ভাইপোর স্ত্রীও সমান তেজে চেঁচিয়ে উঠল।
দুই হাত তুলে দুজনকে থামতে ইঙ্গিত করে বলল গোপাল, ‘আস্তে আস্তে! গাধা নাকি তোরা?’
দুজন একটু ঠান্ডা হলে গোপাল ভাইপোকে বলল, ‘আরে গাধা, তোর বউয়ের পায়েস রাঁধা তো পরের কথা। আমি যে বাড়ির পেছনে সবজির বাগান করেছি, সেসব যে তোর গরু খাবে, সে খেয়াল আছে? আগে সবজির ক্ষতিপূরণ কীভাবে দিবি, তা-ই ভাব।’
২
রাজা গোপাল ভাঁড়কে প্রশ্ন করল, গাধা আর তোমার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু?
গোপাল রাজা থেকে নিজের দূরত্বটা মেপে তারপর জবাব দিল, বেশি না, মাত্র সাড়ে চার হাত ব্যবধান।
৩
গোপালের তখন বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখতে পারে না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, ‘কী গোপাল, গতকাল আসোনি কেন?’
‘আজ্ঞে চোখে সমস্যা হয়েছে। সবকিছু দুটো দেখি। কাল এসেছিলাম। এসে দেখি দুটো দরবার। কোনটায় ঢুকব, ভাবতে ভাবতেই...।’
‘এ তো তোমার জন্য ভালোই হলো। তুমি বড়লোক হয়ে গেলে। আগে তোমার বলদকে দেখতে একটা, এখন দেখবে দুটো হিসেবে।’
‘ঠিকই বলেছেন মহারাজ। আগে দেখতাম আপনার দুটো পা, এখন দেখছি চারটা পা। ঠিক আমার বলদের মতোই।’
৪
মন্দিরে ঢুকতে যাওয়ার সময় পেছন থেকে পণ্ডিতের বাধা, ‘এ তুমি কী করছ গোপাল! মন্দিরে কুকুর নিয়ে ঢুকছ?’
‘কোথায় কুকুর?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে গোপাল।
‘এই তো তোমার পেছনে!’ একটি কুকুরের দিকে হাত তুলে দেখায় পণ্ডিত।
‘এটি আমার কুকুর নয়!’
‘তোমার নয় বললেই হলো?’ রাগ দেখিয়ে বলে পণ্ডিত, ‘তোমার পেছন পেছনেই তো যাচ্ছে!’
‘বটে? তা তুমিও তো আমার পেছন পেছন আসছ!’
৫
গোপালের গিন্নি রাতে গোপালের ঘুম ভাঙিয়ে বলল, ‘ব্যাপার কী, চশমা পরে ঘুমাচ্ছ কেন?’
গোপাল নতুন চশমা নিয়েছে। খাপ্পা হয়ে বলল, ‘চোখে ছানি পড়েছে, চশমা ছাড়া স্বপ্ন দেখব কী করে?’
৬
সুসংবাদ দিলে বকশিশ পাওয়া যায় জেনে এক লোক গোপালকে গিয়ে বলল, ‘তোমার জন্য খুব ভালো খবর আছে গোপাল।’
‘কী খবর?’
‘তোমার পাশের বাড়িতে পোলাও রান্না হচ্ছে।’
‘তাতে আমার কী?’
‘তোমাকে সে পোলাও দেবে বলেছে।’
‘তাতে তোমার কী?’
৭
একদিন মহারাজ গোপালকে বললেন, ‘ওহে গোপাল! কাল খুব ভোরে দরবারে এসো, একটা জরুরি পরামর্শ আছে।’
রাতে আহারাদির পর গোপাল স্ত্রীকে বলল, ‘খুব ভোরে
রাজ-বাড়ি যেতে হবে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ডেকে দিও।’
দৈবক্রমে সেদিন খুব ভোরেই গোপালের ঘুম ভেঙে গেল আপনা থেকেই। সে তখন স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে তুলে বলল, ‘বাইরে বেরিয়ে দেখো তো সূর্য উঠল কি না।’
স্ত্রী চোখ ঘষতে ঘষতে বাইরে থেকে ঘুরে এসে বলল, ‘চারদিকে অন্ধকার। কী করে সূর্য দেখব?’
গোপাল বলল, ‘অন্ধকারে যদি দেখতে না পাও, আলোটা জ্বেলে দেখলেই তো পারো।’
৮
গোপাল ভাঁড় ও তার ছেলে বাজারে গিয়েছে। ছেলেকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে গোপাল বলল, ‘বাবা, তুমি এখানে বসে থাকো। আমি বাজার করে নিয়ে আসি।’
দীর্ঘক্ষণ হয়ে গেল। গোপাল আর আসে না। তখন তার ছেলে উঠে চিৎকার করতে শুরু করল, ‘গোপাল ভাঁড়, গোপাল ভাঁড়’!
তার বাবা এসে খেপে গেল, ‘এই ব্যাটা আমার নাম ধরে
ডাকছিস কেন?’
‘নাম না ধরে কী বলে ডাকব?’
‘বাবা বলবি।’
‘হুহ্। আমি বাবা বাবা বলে ডাকি, আর এখানকার সব হাটুরে যার যার ছেলে ডাকছে ভেবে ডাক শুনুক আর কি।’
৯
গোপালের গ্রামে এক ধোপা বাস করত। সে খুবই বোকা। তার একটা ঘোড়া ছিল। কিন্তু ঘোড়া দিয়ে কাপড় কেচে বাড়ি বাড়ি দেওয়া যায় না। তার একটা গাধার দরকার। কিন্তু ঘোড়া বিক্রি করে সেই টাকায় যে গাধা কিনে আনা যায়, সে এ কথাটা ভাবতে পারে না। এমনই তরল তার মগজের ঘিলু। গোপাল অনেক কাজ সমাধা করে দিতে পারে লোকের মুখে শুনে সে গোপালকে গিয়ে ধরল, ‘গোপাল দাদা, গোপাল দাদা, আমার এই ঘোড়ার দরকার নেই, একে গাধা বানিয়ে দাও। লোকে বলে, তুমি নাকি সব পারো?’
গোপাল হেসে বলল, ‘ব্যাটা তোমার মতো গাধাকে পিটিয়ে বরং ঘোড়া বানানো যায়, ঘোড়া পিটিয়ে গাধা তৈরি করা যায় না আদপেই।’
১০
রাজা বললেন, ‘শীতের রাতে কেউ কি সারা রাত এই পুকুরে গলাজলে ডুবে থাকতে পারবে? যদি কেউ পারো, আমি তাকে অনেক টাকাপয়সা, ধনরত্ন পুরস্কার দেব।’
এক ছিল গরিব দুঃখী মানুষ। সে বলল, ‘আমি পারব।’
সে মাঘ মাসের তীব্র শীতে সারা রাত পুকুরের পানিতে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভোরবেলা সে উঠল পানি থেকে।
রাজার কাছে গিয়ে সে বলল, ‘আমি সারা রাত পুকুরের পানিতে ছিলাম। আপনার সান্ত্রী-সেপাই সাক্ষী। এবার আমার পুরস্কার দিন।’
রাজা বললেন, ‘সে কী! তুমি কেমন করে এটা পারলে?’
গরিব লোকটা বলল, ‘অনেক দূরে এক গৃহস্থবাড়িতে আলো জ্বলছিল। আমি সেই দিকে তাকিয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছি।’
মন্ত্রী বললেন, ‘এই যে দূরের প্রদীপের আলোর দিকে ও তাকিয়ে ছিল, ওই প্রদীপ থেকে তাপ এসে তার গায়ে লেগেছে। তাই সম্ভব হয়েছে এই শীতেও ওই পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।’
রাজা বললেন, ‘তাই তো! তাহলে তো তুমি আর পুরস্কার পাও না। যাও। বিদায় হও।’
গরিব লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল। সে গেল গোপাল
ভাঁড়ের কাছে। অনুযোগ জানাল তার কাছে। তারপর গোপাল ভাঁড় বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি ন্যায়বিচার পাবে।’
তার কয়েকদিন পরেই গোপাল ভাঁড় নিমন্ত্রণ করল রাজাকে। দুপুরে খাওয়াবে। রাজা এলেন গোপাল ভাঁড়ের বাড়ি। গোপাল ভাঁড় বলল, ‘আসুন আসুন। আর সামান্যই আছে রান্নার বাকি। কী রাঁধছি দেখবেন, চলুন।’
গোপাল ভাঁড় রাজাকে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনে। সেখানে একটা তালগাছের ওপর একটা হাঁড়ি বাঁধা আর নিচে একটা আগুন জ্বালানো।
গোপাল ভাঁড় বলল, ‘ওই যে হাঁড়ি, ওটাতে পানি, চাল, ডাল, নুন সব দেওয়া আছে। এই তো খিচুড়ি হয়ে এল বলে। শিগগিরই আপনাদের গরম গরম খিচুড়ি খাওয়াচ্ছি।’
রাজা বললেন, ‘তোমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাব বলে সকাল থেকে তেমন কিছু খাইনি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। এখন এই রসিকতা ভালো লাগে!’
‘রসিকতা কেন, রান্না হয়ে এল বলে।’
রাজা বললেন, ‘তোমার ওই খিচুড়ি জীবনেও হবে না, আমার আর খাওয়াও হবে না। চলো মন্ত্রী, ফিরে যাই।’
গোপাল বলল, ‘মহারাজ, কেন খিচুড়ি হবে না? দূরে গৃহস্থবাড়িতে জ্বালানো প্রদীপের আলো যদি পুকুরের জলে ডুবে থাকা গরিব প্রজার গায়ে তাপ দিতে পারে, এই প্রদীপ তো হাঁড়ির অনেক কাছে। নিশ্চয়ই খিচুড়ি হবে?’
রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘আচ্ছা, পাঠিয়ে দিয়ো তোমার ওই গরিব প্রজাকে। ওর প্রতি আসলেই অন্যায় করা হয়েছে। ওকে দুই গুণ পুরস্কার দেব।’
‘সে তো আপনি দেবেনই। আমি জানতাম। আসুন, ঘরে আসুন। দুপুরের খাওয়া প্রস্তুত।’
তারপর রাজা সত্যি সত্যি গরিব লোকটাকে অনেক পুরস্কার দিয়েছিলেন।