default-image

একদল বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ওপারে। সবাই মিলে জড়ো হয়ে চেষ্টা করছে রাস্তা পার হতে। কিন্তু ব্যস্ত রাস্তায় এই কাজ এতই কঠিন আর বিপজ্জনক যে বড়রাও ভয়ে থমকে যায়। সেই সঙ্গে তুমুল বেগে চলতে থাকা গাড়িগুলোও থামার নাম নিচ্ছে না। তাই অগত্যা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে বাচ্চারা। এদিকে স্কুলে যাওয়ার সময়ও হয়ে এসেছে। এত শত ঝামেলায় যখন হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, তখনই হুট করে দলটার সামনে হাজির হলো মাঝারি আকারের এক কুকুর। কাউকে অবাক হওয়ার সুযোগ না দিয়েই সে সোজা জেব্রাক্রসিং ধরে চলে এল রাস্তায়, টানা হুংকার দিয়ে থামিয়ে দিল সব গাড়ি। শুধু এই কাজ করেই সে থামল না, বাচ্চাদের রীতিমতো পাহারা দিয়ে রাস্তা পার করিয়ে দিল।
ভাবছ বোধ হয় রূপকথার গল্প বলছি। ভাবাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সত্য হলো এটা মোটেই কোনো গল্পের অংশ না, একেবারেই বাস্তব!

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার বাটুমি শহরে এই অভাবনীয় দৃশ্যের দেখা হরহামেশাই মেলে। শহরটিতে প্রতিদিন বিনে পয়সায় ট্রাফিক অফিসারের কাজ করে কুপাটা নামের কুকুরটি। দুই বছর ধরে কুপাটাকে এলাকার বাচ্চাদের নিয়মিত রাস্তা পার হতে সাহায্য করতে দেখা যায়। নিজের এই কাজকে কুপাটা নেয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে। তাই বাচ্চারা রাস্তা পার হতে গেলে কোনো গাড়ি যদি একটু উনিশ-বিশ করে, তাহলে সেই গাড়ির ড্রাইভারের আর রক্ষা থাকে না। এ কারণে কুপাটাকে সমঝে চলে গাড়িগুলো।

তবে আসল কথা হলো, প্রতিদিন একটা কুকুর গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার করাচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের, এই দৃশ্য কল্পনা করাটাও তো কষ্টকর। কারণ এত টনটনে মানবতাবোধ বুদ্ধিমান মানুষ প্রজাতির মধ্যেও দেখা যায় না। তাই প্রথম দিকে কুপাটার এই বিস্ময়কর আচরণে অবাক হতো এলাকাবাসী, রাস্তায় চলতে থাকা গাড়িগুলোও হতবাক হয়ে ব্রেক কষত। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল বিষয়টা, মেনে নিল সবাই। আজকাল বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনো দিন কুপাটার দেখা না পেলে বাচ্চারা রাস্তাই পার হতে চায় না।

default-image

এবার হয়তো জানতে ইচ্ছে হবে যে কুপাটা কী কারণে শুরু করল এই কাজ? 

আসলে এর উত্তর সবার কাছেই অজানা। পাঁচ বছর আগে কুপাটা যখন বাটুমি শহরে আসে, তখন সে ছোট্ট এক কুকুরছানা, খাবারের অভাবে মৃতপ্রায়। এলাকার লোকেরাই তাকে খাবার দিয়ে সুস্থ সবল করে তোলে। আর দিনদিন মানুষের আদরযত্নের মধ্যে দিব্যি বেড়ে উঠতে থাকে সে। কে জানে হয়তো ছোটবেলায় সেই সাহায্যের প্রতিদান দিতেই কুপাটা শুরু করেছে দারুণ এই কাজ। যেহেতু কুপাটার মনের কথা জানার উপায় নেই, তাই এটা ভেবেই শান্তি পায় বাটুমির বাসিন্দারা। 

পেশাদার জীবন থেকে এবার কুপাটার ব্যক্তিগত জীবনের কথায় আশা যাক। ট্রাফিক অফিসারের খাটুনির কাজ শেষে ক্লান্ত কুপাটা দিনের অনেকটা অংশ ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়! তবে কাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ে মোটেও দায়িত্বে অবহেলা করে না। এ ছাড়া নিজের ভীষণ ব্যস্ত সূচির মধ্যে সে কিছু সময় এলাকার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলার জন্য বরাদ্দ রাখে। এভাবেই দিন কেটে যায় তার। আর হ্যাঁ, কুপাটার দিন আরও বেশি ভালো কাটে যদি খাবারের মেনুতে দু-একটা সসেজ পাওয়া যায়, মায়াকাড়া কুকুরটা সসেজ খেতে একটু বেশিই ভালোবাসে। মজার বিষয় হলো, কুপাটা নামের অর্থও কিন্তু সসেজ। এই তথ্য কুপাটা জানতে পারলে বেশ খুশিই হতো মনে হয়। 

default-image

নিজ শহরে কুপাটা এতই জনপ্রিয় যে, এলাকায় তার সম্মানে আঁকা হয়েছে বিশাল এক ছবি। সেই সঙ্গে তাকে নির্বাচিত করা হয়েছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে। এত কিছুর মধ্যে কুপাটার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের ভালোবাসা। বাটুমি শহরের ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, বাচ্চা—সবাই কুপাটাকে আগলে রাখে ভালোবাসা দিয়ে। সেই ভালোবাসার মর্যাদা বোঝে বলেই হয়তো প্রতিদিন আরও দ্বিগুণ উৎসাহে বাচ্চাদের সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। 

সম্প্রতি কুপাটার এই সমাজসেবার ভিডিও আলোড়ন তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। সবাই তাকে ভাসাচ্ছে প্রশংসায়। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সবাই বুঝতে পারছে, কুপাটা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের। কুপাটার এই ভালোবাসাটা যদি আমরা সবাই মানুষের প্রতি দেখাই, তাহলে সড়কে বাঁচবে হাজারো প্রাণ। 


তথ্যসূত্র: বোরড পান্ডা 
ছবি: লাভলি কুপাটার ইনস্টাগ্রাম

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন