default-image

ছোটবেলায় আমরা স্কুল ছুটির অপেক্ষায় থাকতাম সারা বছর। বছর শেষে ফাইনাল পরীক্ষা, তারপর ছুটি। ছুটি মানেই অফুরন্ত আনন্দ আর স্বাধীনতা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই। বিকেলে নিচে খেলতে গিয়ে একটু দেরি হলেও বকা খাওয়ার আশঙ্কা কম, সন্ধ্যাবেলা ফিরে তড়িঘড়ি করে পড়তে বসতে হবে না। ছুটিতে আমাদের বেড়াতে যাওয়া মানে অবশ্য বড়জোর কয়েক দিনের জন্য দাদুবাড়ি বা নানাবাড়ি যাওয়া। কোনো একবার যাওয়া হয়েছিল কক্সবাজার। এ-ই। কিন্তু এই আনন্দেরই তো সীমা নেই।
এখন অবশ্য তোমাদেরও ছুটি চলছে। কিন্তু এই ছুটি সেই ছুটির মতো নয়। গত ১০০ বছর পৃথিবীর শিশু–কিশোরেরা এ রকম ছুটির স্বাদ পায়নি। চীনের উহানে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসের তাণ্ডব কয়েক মাসের মধ্যে সারা দুনিয়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি করায় সেই মার্চ থেকে একে একে ছুটি হয়ে গেছে দুনিয়ার সব স্কুল–কলেজ। শিশু–কিশোরেরা সবাই ঢুকে পড়েছে যার যার ঘরের ভেতর, বাবা–মায়েরাও। বাবা–মায়েরা আস্তে আস্তে কাজে অকাজে বেরোতে শুরু করলেও ছোটরা কিন্তু এখনো ঘরে বন্দী। স্কুল–কলেজ খোলার বা সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। স্বাভাবিক? আসলেই কি সব স্বাভাবিক হবে আগের মতো?
হবে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যা হবে, তা হলো নিউ নরমাল। নতুন স্বাভাবিক। আমরা আবার যে দুনিয়ায় বেরোব, সেটা আর আগের দুনিয়া থাকবে না। সেই নতুন দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, অভিযোজন করেই চলতে হবে আমাদের। শিখতে হবে নতুনভাবে বাঁচা। কিন্তু কেমন হবে সেই নিউ নরমাল? কীভাবেই–বা আমরা সেই নতুন দুনিয়ায় খাপ খাইয়ে নিতে পারব?

default-image

বদলে যাচ্ছে পড়ালেখা
এরই মধ্যে তোমরা টের পেয়ে গেছ যে পড়ালেখার ধরনটাই বদলে গেছে অনেক। এখন তোমাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি বসেই পড়ালেখা করছ। স্কুলের শিক্ষক বা বাড়ির টিউটর অনলাইনে, ভিডিও কলে পড়াতে শুরু করে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও পরীক্ষাও হচ্ছে অনলাইনে। টেলিভিশনেও ক্লাস হচ্ছে। প্রথম প্রথম একটু কেমন যেন লাগলেও ইতিমধ্যে অনেকেই এই নতুন নিয়মে পড়ালেখায় বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠছ। করোনাভাইরাসের তাণ্ডব কমে এলেও আমাদের পড়ালেখার অনেকখানি ভবিষ্যতে হয়তো এ রকম দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতেই রয়ে যাবে। হয়তো তোমাদের মধ্যেই অনেকে আর কয়েক বছর পর বাড়ি বসেই দূরের কোনো দেশের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের সাবজেক্টে পড়ার সুযোগ পাবে। নিউ নরমাল আমাদের এসব নতুন সুযোগ আর সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। আবার এর খারাপ দিকটাও আছে। যেমন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে এই মহামারিতে ঝরে পড়বে অনেক ছাত্রছাত্রী। স্কুল–কলেজে পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে অনেকে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে, যার মূল কারণটা হলো অর্থনৈতিক। বাকিটা হলো সুযোগ–সুবিধার অভাব। বাড়ি বসে পড়ালেখা করতে আমাদের ইন্টারনেট, টেলিভিশন বা নিদেনপক্ষে একটা ভালো মুঠোফোন দরকার। সব জায়গায় সবার কাছে হয়তো এ সুবিধা নেই। আমি যে কলেজে পড়াই, সেখানে কিছু বিদেশি ছাত্রছাত্রীও পড়ে। লকডাউনের শুরুতেই তারা যার যার দেশে চলে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা যখন তাদের অনলাইন ক্লাস নিতে শুরু করলাম, তখন সুদূর কাশ্মীরের এক ছেলে জানাল যে এই ক্লাস করার জন্য তাকে পায়ে হেঁটে তার বাড়ি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে একটা সাইবার ক্যাফেতে যেতে হয়! বোঝো অবস্থাটা। তাহলে নিউ নরমাল সবার জন্য একই রকম নয়। তবু এরই মধ্যে আমাদের টিকে থাকতে হবে। তোমাদের জন্য এটা হবে এক নতুন সংগ্রাম। এর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে তোমাদের।

default-image

খেলাধুলা আর নয়?
কেবল ছোটদের খেলার জগৎই নয়, বড়দের খেলাও কিন্তু পাল্টে গেছে। বড় বড় ফুটবল ক্লাবগুলো খেলতে শুরু করেছে, কিন্তু মাঠে কোনো দর্শক নেই। অনুশীলনে, খেলার নিয়মকানুনে আসছে নানা বিধিনিষেধ। তোমাদের খেলাধুলাও বদলে যাচ্ছে। চাইলেই এখন স্কুলের বা পাড়ার মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা যাচ্ছে না। তোমরা আগেও মুঠোফোন আর কম্পিউটারের খেলার প্রতি কিছুটা ঝুঁকেই ছিলে, এই করোনার সময় তা আরও বেড়েছে। তবে আমি বলব, এই সুযোগে আমরা পুরোনো খেলাগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারি। একসময় গ্রামে, শহরে আর পাড়ায় পাড়ায় ক্যারম, লুডু, দাবা—এসব খেলার প্রচণ্ড চল ছিল। আমরা বাসার সবাই মিলে বা অন্তত বিল্ডিংয়ের ছেলেমেয়েরা মিলে সেই দিন ফিরিয়ে আনতে পারি। দিব্যি দিয়ে বলছি, এতে আনন্দ আর উত্তেজনা তোমাদের কম্পিউটার গেম বা এক্স বক্সের চেয়ে কম নয়। ও হ্যাঁ, মনোপলি, স্ক্রাবল–জাতীয় খেলাও খেলা যায়। যাদের বাড়ির সামনে বা ছাদে জায়গা আছে, তারা খেলতে পারবে ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস। তবে খেলাধুলাটা কিন্তু দরকার। শারীরিক ফিটনেসের জন্য তো বটেই; বিজ্ঞানীরা বলেন, খেলাধুলা আর ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে এনডরফিন নামে এক হরমোন তৈরি হয়, যা আমাদের আনন্দিত রাখে। তাই ভাইবোন, মা–বাবা বা পাশের বাড়ির ফ্ল্যাটের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলার নতুন নিয়মকানুন শিখে নেওয়াই ভালো। এই খারাপ সময় কত দিন থাকে তার যখন ঠিক নেই, তাহলে আমরা বসে থাকব কেন বলো?

রুটিন বলে কিছু নেই?
করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনে, তা হলো রুটিনটা নষ্ট হয়ে গেছে। ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে ভোরে উঠতে হয় না, সকালের নাশতা খেতে ১০টা থেকে ১১টা পেরিয়ে যাচ্ছে। টিফিন টাইম বলে কিছু নেই। ঘুমের সময়ও ওলট–পালট। কিন্তু মনে রাখবে, আমাদের শরীরের ভেতর একটা ঘড়ি আছে। তার নাম বায়োলজিক্যাল ক্লক। আদিম কাল থেকে মানুষ সূর্য ওঠার সঙ্গে জাগে, সারা দিন কাজ করে আর রাতে ঘুমায়। সে অনুযায়ী আমাদের শরীরের হরমোন, নিউরো রাসায়নিক—এসব ওঠানামা করে। এখন আমরা যদি এই বায়োলজিক্যাল ক্লকের কাঁটা একেবারে উল্টেপাল্টে দিই, তবে এই হরমোন আর নিউরোট্রান্সমিটারের ছন্দ যায় নষ্ট হয়ে। তার ফলে ক্লান্তি, অমনোযোগ, অবসাদ, শরীর খারাপ, ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ—এসব সমস্যা হতে পারে। তাই ঘড়িটা পুরো উল্টে দিয়ো না। ভোর ছয়টায় না হোক, অন্তত আটটা–নয়টায় উঠতে চেষ্টা করবে। সময়মতো খাওয়া আর গোসল, আর ঘুমাতে খুব বেশি দেরি না করার চেষ্টা করবে। নিজে নিজে একটা রুটিন বানিয়ে নাও। সেই রুটিনে পড়ালেখা, ইনডোর খেলাধুলার পাশাপাশি মা–বাবাকে ঘরের কাজে সাহায্য করা, বারান্দা বা ছাদে বাগান করা, বন্ধুবান্ধব বা দাদু–নানুর সঙ্গে ভিডিও কলে বা ফোনে কথা বলা, ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া বা গান–নাচ করার মতো কিছুও (যা অনলাইনেও করা যায়) রাখতে চেষ্টা করো। দেখবে দিনগুলো আর বোরিং লাগছে না আর। দিব্যি কেটে যাচ্ছে। 

default-image

স্বাস্থ্যসচেতনতা
আগেই বলেছি, বাইরের পৃথিবীটা আর আগের মতো থাকবে না। এখন হয়তো বাইরে যেতে হলে আমাদের মুখে মাস্ক পরতে হবে। বন্ধুর গলা জড়িয়ে হাঁটা আর সম্ভব হবে না। টিফিন টাইমে একজন আরেকজনের পানির ফ্লাস্ক বা টিফিন বাক্সে চট করে হাত দিতে পারবে না। বাইর থেকে ফিরে ছুটে গিয়ে দাদুর গালে চুমু খেতে পারবে না। কিন্তু এই নিয়মকানুনগুলো আমাদের টিকে থাকার জন্যই দরকার। ভাইরাস থেকে বাঁচতে আমাদের এসব রপ্ত করতে হবে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। বাড়িতেও বারবার হাত ধোয়া, হাঁচি–কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা, মুখে মাস্ক পরা, নাক–মুখে হাত না দেওয়া,শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা—এসব অভ্যাস করতে শুরু করো। মানুষ অভ্যাসের দাস। দেখবে এরপর চাইলেও আমরা ভিড় জমিয়ে, ধাক্কাধাক্কি করে কিছু করছি না। সবাই জায়গা ফাঁকা রেখে লাইনে দাঁড়াচ্ছি, হাত পরিষ্কার করে বাসে উঠছি বা রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেও সতর্ক থাকছি। এগুলো মোটেও খারাপ অভ্যাস নয়; বরং হাইজিন আর স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চলা সব সময়ই ভালো। আগে আরোপিত মনে হতো, কিন্তু সবার একসঙ্গে অভ্যাস হয়ে গেলে নিয়মে দাঁড়িয়ে যাবে।

default-image

জীবনকে উপভোগ করো
জানোই তো, গুণীজনেরা বলছেন, ২০২০ সালে বেঁচে থাকা আর টিকে থাকাটাই বড় ধরনের বিজয়। বাকিটা পরে ভাবা যাবে। তোমাদের মধ্যে অনেকেরই পরিবারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বাবা বা মা কারও চাকরি চলে যাওয়া, টাকাপয়সার সমস্যা, বাড়ি বা স্কুল বদলে বাধ্য হওয়া, আপনজনের মৃত্যু—অনেক খারাপ খারাপ ঘটনা ঘটার বছর এটি। কিন্তু এর মধ্যেও আমরা যে টিকে আছি, সেটাই বড় কথা। সেটাই বড় সাফল্য। তাই যা হারিয়েছি, তার জন্য একটুও মন খরাপ করব না আমরা। ফেলে আসা জীবনের জন্য আফসোস করব না। একটা নতুন দুনিয়া কেমন হবে, নিউ নরমাল লাইফ কীভাবে এনজয় করবে; সেটা নিয়ে ভাবা যাক বরং। এ এক নতুন দেশ বা নতুন গ্রহ আবিষ্কারের মতো উত্তেজনাকর হতে পারে। তোমরা সবাই মিলে হয়তো এই নতুন বিশ্ব গড়ে তুলবে। যুগে যুগে সবার কিন্তু এই ভাগ্য হয় না। পুরোনোকে ভেঙে নতুন করে গড়ার ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর। ব্যাপারটাকে উপভোগ করার জন্য তৈরি হও।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0