নদীর চলা দেখে চলতে অক্ষম চাঁপাগাছের বড্ড আক্ষেপ হয়েছিল। তাই নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল গানে গানে নিজের চলার কথা বলে। চাঁপাগাছ চলনে অক্ষম হতে পারে, কিন্তু তারও চলা আছে। বছর বছর নতুন পাতা আসে, ফুল আসে ডালে। রবিঠাকুর তাই সেই চাঁপাগাছের হয়ে গেয়েছিলেন, ‘আমার চলা নবীন পাতায়/ আমার চলা ফুলের ধারায়…’
গাছ চলতে পারে না কে বলে? লতানো উদ্ভিদগুলো আকর্ষী দিয়ে অবলম্বন খুঁজে নেয়, সেটাকে জড়িয়ে মাথা উঁচু করে সূর্যের পানে উঁকি মারে। তাই উদ্ভিদ কথা বলতে না পারলেও আলোর পানে তার প্রাণের চলা দেখতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না, কবির চোখই যথেষ্ট।
উদ্ভিদের হাত-পা, নাক-মুখ নেই, তাতে কী! তবু তারা খাবার খায় পাতা-শিকড়ের সাহায্যে, সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে। অনুভূতি আছে তাদের, কাটলে ব্যথা পায়, ছিড়লে কাঁদে—সে কথা আমাদের বিক্রমপুরের বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন অব্যক্ত নামে কালজয়ী এক বিজ্ঞানের বই। এ জন্য গোটা বিশ্ব এখনো তাঁকে কুর্নিশ করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, উদ্ভিদ কি শুধু পাতা আর শিকড়ের সাহায্যে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমেই খাবার খায়, নাকি আর কোনো পদ্ধতি আছে? শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, গাছ মাংসও খায়। তার কথা যেমন বিজ্ঞান বইয়ে পাবে, পাবে গল্পের বইয়ের পাতায়ও।
কান্তিচরণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পেশায় বোটানিস্ট, গোটা দুনিয়া ঢুঁড়ে-ফুঁড়ে তিনি সংগ্রহ করতেন মাংসভুক উদ্ভিদ। ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ, পিচার প্ল্যান্টের মতো প্রায় কুড়ি প্রজাতির মাংসাশী উদ্ভিদ ছিল তাঁর সংগ্রহে। এর মধ্যে বিরল জাতটি হলো সেপ্টোপাস। দানবের মতো আকার, ভয়ানক তার খিদে! দিনে দুটো পাঁঠা আর কয়েকখানা মুরগিতেও পেট ভরে না, পরে তার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে মানুষের ওপর। আক্রমণ করে কান্তিচরণের বাগানের মালিকেই। বাধ্য হয়েই কান্তিচরণ তাঁর শিকারি বন্ধু পরিমলকে খবর দেন। সঙ্গে পরিমলের বন্ধু অভি আর তাঁর কুকুর বাদশাহ অভিযানে নামেন সেপ্টোপাস নিধনে। সেই যুদ্ধে প্রাণ যায় বাদশাহর, মরতে মরতে বেঁচে যান অভি। শেষমেশ গুলি করে গাছটাকে নিধন করতে সক্ষম হন পরিমল।
অক্টোপাসের মতো বিশাল আর শক্তিশালী তিনটি শুঁড়, মাঝখানে ঢাকনাওয়ালা থলে, এই ছিল সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ গল্পের দানব গাছটার চেহারা। সত্যজিতের বাংলা কল্পবিজ্ঞানের যে ধারা তৈরি করেছিলেন প্রফেসর শঙ্কুর গল্পগুলো লিখে, তার চেয়ে শক্তিশালী আর সাসপেন্সে ভরা ছিল ‘শঙ্কু’ সিরিজের বাইরে যেসব কল্পবিজ্ঞান লিখেছেন, সেগুলো। গাছ নিয়ে কল্পবিজ্ঞান লেখায় কতটা মুনশিয়ানা দেখানো যায়, সত্যজিৎ সেটা প্রমাণ করেছিলেন ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ গল্পের কালো কালো অক্ষরে।
কেবল কল্পবিজ্ঞানে নয়, এ দেশের মূলধারার সাহিত্যেও একটা বড় জায়গা দখল করে আছে প্রকৃতি আর উদ্ভিদকুল। কবিতায় তরু-লতা-গুল্মের উদাহরণ ভূরি ভূরি। গল্প–উপন্যাসেও বৃক্ষপ্রীতি সাহ্যিতের অলংকার হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু গাছ বা বৃক্ষকে প্রধান চরিত্র করে গল্প লেখা, বাংলা ভাষায় কেন, বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সত্যজিৎ রায় ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ যখন লিখছেন, তারও অর্ধশতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী গল্প ‘বলাই’। বলাই প্রধান চরিত্র হলেও এই গল্প এগিয়েছে একটি শিমুলচারার প্রতি বলাই নামের কিশোরের অকৃত্রিম ভালোবাসার আবেগ নিয়ে। গাছপ্রেমী বলাই বুনো জংলার নামগোত্রহীন গুল্মলতাইকেই বেশি ভালোবাসে। তারই মধ্যে অনাদরে বেড়ে ওঠা এক শিমুলচারাকে একটু বেশিই ভালোবেসে ফেলে সে। বড়রা যখন আগাছা নিধন করতে গিয়ে শিমুলচারা নিধন করছে, বলাইয়ের অনুরোধে সেটা রক্ষা পায়। কিন্তু কিশোরের আবেগের মূল্য কোথায় এ দেশের অতি ব্যস্ত অভিভাবককুলের কাছে? বলাই যখন লেখাপড়ার জন্য সিমলায় চলে যায়, তারপর সেখান থেকে সোজা বিলেতের পথ ধরে, তখন কাকাকে অনুরোধ করে যেন শিমুলগাছটার একটা ছবি পাঠান। কিন্তু হায়, তত দিনে কোথায় উধাও হয়ে গেছে সেই শিমুলচারা!
বিয়োগান্ত কাহিনিই রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মূল অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল, তাই বলাই গল্প পড়তে গিয়ে সব বয়সী পাঠক জাতকুলহীন একটা শিমুলচারার জন্য চোখের পানি না ফেলে পারে না।
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দের কবিতার ছত্রে ছত্রে জায়গা করে নিয়েছে এ দেশের বুনো গুল্মলতা। ভাঁট, আসশেওড়ার হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন কথা কয়, তা–ও নাকি শুনতে পেতেন জীবনানন্দ। আকন্দ ফুলের ভিমরুল কিংবা বেতের ফলে সৌন্দর্য তাঁর কবিতাকে বিশ্বমানে পৌঁছে দিয়েছে। জসীমউদ্দীন রসুলপুরের আসমানীদের ভেন্নাপাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘরের কথা কিংবা ডালিমগাছের তলায় দাদির কবরের কথা লিখে পরোক্ষভাবে গাছের অবদানকে স্বীকৃতিই দিয়েছেন একপ্রকার। তাঁর ‘পল্লীবর্ষা’র কবিতার ছত্রে ছত্রে বর্ষার প্রকৃতিকে গাছের অলংকরণ দিয়ে ভরিয়ে তুলেছেন। শিউলিতলায় ভোরবেলায় পল্লিবালিকার ফুল কুড়ানো কাহিনি শুনিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। বলেছেন ঝুমকোজবার বনের হয়ে ওঠার গল্প।
কবি না হয়েও ‘পথের কবি’র খেতাব পাওয়া বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প-উপন্যাসের পাতায় পাতায় পথের দুই পাশের ছবি তুলে ধরেছেন পিকাসো বা ভিঞ্চির মতো নিপুণ দক্ষতায়। পথের পাঁচালীর অপুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ দেশের মেঠো উদ্ভিদের ঘ্রাণ। তাঁর ইছামতী উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে পাঠক খুঁজে পান এ দেশের বুনো ফুল-ফলের গন্ধ। কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে তাঁর আরেক মাস্টারপিস আরণ্যক উপন্যাসটি। এই উপন্যাসের কাহিনির বুনোনই হয়েছে বিহারের লবটুলিয়া আর ফুলকিয়া বইহারের বন, বনের উদ্ভিদকুল, সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল হতদরিদ্র মানুষের গল্প দিয়ে। গল্পের প্রধান চরিত্রের হাতে বন ধ্বংস হয়, সেটা তার অনিচ্ছাতেই। সেই অরণ্যপ্রেমী মানুষ বাস্তুহীনদের ঘর জোগাতে গিয়ে বন ধ্বংসের জন্য যে মর্মপীড়ায় ভুগেছেন, তার একক নির্মম দৃশ্য ফুটিয়ে উপন্যাসের ইতি টেনেছেন বিভূতিভূষণ।
বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস চাঁদের পাহাড়-এ আফ্রিকার গহিন অরণ্যের ডেথ সার্কেলে আবার গাছদের ভিন্ন রূপ দেখিয়েছেন তিনি। উপন্যাসের নায়ক গহন বনে পথ হারানো শঙ্কর মর্মে মর্মে বুঝেছিল নির্বাক, নিশ্চল বৃক্ষদের মৃত্যুবৃত্ত তৈরির ভয়াবহতা।
এ তো গেল দেশীয় সাহিত্যে গাছের কথা, বিদেশি ভাষায় গাছকে প্রধান চরিত্র করে সেরা গল্প বা উপন্যাস কোনটি?
আমার তো খেলার সময় নেই। আমার এখন টাকার দরকার। অনেক টাকা। গাছ তাকে আপেল দেয়। সেই আপেল বিক্রি করে ছেলেটা সংসার চালায়। আরও বড় হয় ছেলেটা, বিয়ে থা করে সংসারী হয়।
শুধু গাছ নয়, বিশ্বসাহিত্যের সেরা শিশুতোষ বইয়ের মর্যাদা পেয়েছে মার্কিন লেখক শের সিলভারস্টোনের দ্য গিভিং ট্রি বইটি। একটা আপেলগাছ আর এক ছোট্ট ছেলের গল্প। ছেলেটা গাছটাকে ভালোবাসে। অবসর সময়টা গাছের সঙ্গেই কাটে। গাছের ডালে চড়ে, ঝুল খায়, মোট কথা গাছের সঙ্গেই দিন কাটে তার। কিন্তু যত দিন যায়, ছেলেটা যত বড় হয়, গাছটার সঙ্গেও তার দূরত্বও তত বাড়ে। ছেলেটা একসময় বড় হয়ে ওঠে। অনেক বড়। হঠাৎ একদিন সেই গাছটার পাশ দিয়েই যাচ্ছিল সে। গাছ তাকে বলে, ছোট্ট বন্ধু, তুমি আর আসো না কেন? আমার ডালে ডালে খেলো না কেন?
ছেলেটা বলে, আমার তো খেলার সময় নেই। আমার এখন টাকার দরকার। অনেক টাকা। গাছ তাকে আপেল দেয়। সেই আপেল বিক্রি করে ছেলেটা সংসার চালায়। আরও বড় হয় ছেলেটা, বিয়ে থা করে সংসারী হয়। তখন আবার গাছের সঙ্গে দেখা করে সে। গাছ ভাবে, ছেলেটা বুঝি খেলতে এসেছে। কিন্তু ছেলেটা জানায় তার আসলে ঘর দরকার। গাছ তাকে নিজের সব ডালপালা দিয়ে দেয়। ছেলেটা চলে যায়, গাছ খুশি হয়। এরপর আবার যখন ছেলেটা আসে, তার তখন একটা নৌকার দরকার। গাছ তার কাণ্ডটা কেটে ছেলেটাকে দেয় নৌকা তৈরির জন্য। সেটা নিয়ে সেই ছেলে চলে যায়। গাছ খুশি হয়। এরপর আবার যখন সেই ছেলে আসে, তখন সে থুত্থুড়ে বুড়ো। গাছ বলে, এখন তো আমি নিঃস্ব, ডালপাতা নেই, আপেল নেই, কাণ্ড নেই। সেই বুড়ো ছেলে বলে, আমার এখন এসবের কিছুই দরকার নেই। দরকার একটু বিশ্রামের। গাছ বলে, আমার গুঁড়ির ওপরই বসো তাহলে। ছেলেটা বসে। গাছ খুশি হয়।
গল্পের মাধ্যমেই অসাধারণ একটা মেসেজ শিশু–কিশোরদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছেন সিলভারস্টোন। মানবজাতির একমাত্র নিঃস্বার্থ বন্ধু গাছ। যখনই আমাদের দরকার পড়ে, গাছ নিজেকে উজাড় করে দেয়। আমরা শুধু নিয়েই যাই। দিই না কিছুই।
সিলভারস্টোনের এই গল্প গত শতাব্দীর ষাটের দশকের লেখা। এরপরও গাছ নিয়ে অনেক সাহিত্য রচিত হয়েছে। তবে মধ্যে গুণে-মানে, থ্রিলে সবার সেরা জেমস রলিন্সের বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান আমাজনিয়া। আমাজন থেকে ছড়িয়ে পড়া একটা মহামারির উৎস খুঁজতে যায় একদল বিজ্ঞানী ও সৈনিক। খোঁজ পায় এক অবিশ্বাস্য রহস্যের। আমাজনে একটা বিশেষ অঞ্চলে নাকি এমন গাছ আছে, যার আঠা লাগিয়ে দিলে ক্ষতস্থান সেরে যায়, অঙ্গহীনেরা ফিরে পায় তাদের হাত-পা; হুবহু আগের মতো। সেই রহস্যের সন্ধান করতে গিয়ে অভিযাত্রিকের দল মুখোমুখি হন এক অবিশ্বাস্য সত্যের। আমাজনের গহিন অরণ্যে গুপ্ত সংঘের মতো বেড়ে উঠেছে একটা সভ্যতা। সেই সভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে একটা গাছ!
কীভাবে?
রূপকথার গল্পের মতো করে নয় নিশ্চয়ই! তাহলে?
সেটা বললে মজা ফুরিয়ে যাবে। টান টান রহস্য আর রুদ্ধশ্বাস সাসপেন্সে ভরা উপন্যাসটি সবারই পড়ে দেখা উচিত। শুধু আমাজনিয়ার কথাই–বা বলি কেন, এখানে যেসব বই বা গল্পের কথা বলা হলো, সেগুলো যত দ্রুত পড়ে ফেলতে পারবে, তত দ্রুত উদ্ভিদের বিচিত্র জগতের সুলুকসন্ধান পাবে। হয়তো গাছের প্রতি অন্য রকম একটা ভালোবাসা তৈরি হবে তোমার মনে।