বিজ্ঞাপন

সে সময় পারস্যে ফারসি বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল। প্রচলিত আছে অবশ্য আজও । ততটা জনপ্রিয় নয় আর কি। ফারসি পঞ্জিকার অনুসারেই তৎকালীন হিজরি পঞ্জিকা থেকে সূচনা করা হয় বাংলা সনের। তখন হিজরি ৯৯২ সাল ও ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ। সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসেন ৯৬৩ হিজরি সালে। তাই তিনি নির্দেশ দেন যাতে সেই সময় থেকেই বাংলা সন গণনা করা হয়। এ কারণে ৯৬৩ সাল থেকেই বাংলা সন গণনা শুরু হয়। হিজরি মাসের প্রথম মাস মহররম। আর বাংলা প্রথম মাস হয় বৈশাখ।

এ বছর বসন্ত বরণ হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারির বদলে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। তবে এটি উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো বাংলা যে তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সব সময় সে দিবসেই অনুষ্ঠিত হতে থাকবে।

অন্য অনেক পঞ্জিকার মাসের মতোই বাংলা মাসগুলোর প্রতিটি মাসের বিপরীতে একটি করে রাশির নাম প্রচলিত আছে। সাধারণত রাশি বললে জ্যোতিষবিজ্ঞানের কথা মাথায় আসে। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানে রাশির ভিন্ন অর্থ। পৃথিবী মোটামুটি ৩৬৫ দিনে একবার সূর্যকে পুরোটা ঘুরে আসে। পৃথিবীর এই বার্ষিক গতির কারণে প্রতিদিনই রাতের আকাশে দৃশ্যমান নক্ষত্রদের অবস্থান একটু একটু করে বদলে যায়। আর সূর্যের তুলনায় আকাশের দূরবর্তী নক্ষত্রদের চলাচল পৃথিবীর সাপেক্ষে খুব ধীর। ফলে পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে সূর্যের বিপরীতে একেক সময় একেক নক্ষত্র থাকে। পুরো আকাশের নক্ষত্রদের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৮৮টি অঞ্চলে ভাগ করেছেন। এ অঞ্চলগুলোর প্রতিটির নাম একেকটি তারামণ্ডল। এ ৮৮টি তারামণ্ডলের মধ্যে পুরো এক বছরে সূর্য মোট ১৩টি অঞ্চল অতিক্রম করে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য সারা বছরের সব সময় এই ১৩টি অঞ্চলের কোনো না কোনো একটিতে অবস্থান করে বলে মনে হয়।

আর এই ১৩টি অঞ্চলকেই বলা হয় রাশিচক্র। অবশ্য প্রাচীনকালে সূর্য ১৩টির বদলে ১২টি অঞ্চল অতিক্রম করত। কালের বিবর্তনে সেই ১২টি অঞ্চলের সঙ্গে আরেকটি অঞ্চল যুক্ত হয়েছে। কিন্তু অপবিজ্ঞান জ্যোতিষবিদ্যা বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় এখনো পত্রিকার রাশিচক্রে ১২টি রাশিই পাওয়া যায়। একইভাবে বাংলা সনের প্রতিটি মাসের সঙ্গেও একটি করে রাশি যুক্ত আছে। যেমন বৈশাখ মাসে সূর্য অবস্থান করে মেষ রাশিতে। পরের মাসে অবস্থান করে বৃষ রাশিতে। আষাঢ় মাসে চলে আসে মিথুন রাশিতে। অবশ্যই এখানে রাশি মানে একেকটি আলাদা তারামণ্ডল।

default-image

আসলে জুলীয় পঞ্জিকার পরিবর্তিত সংস্করণ গ্রেগরীয় সাল। জুলীয় বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে। সূচনা করেন রোম সাম্রাজ্যের জুলিয়াস সিজার। ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি এর উন্নতি সাধন করে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। জুলীয় থেকে গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় যাওয়ার মূল কারণ ছিল অতিমাত্রায় অধিবর্ষের উপস্থিতি। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিনের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে বলে কিছু বছর পরপর ৩৬৫ দিনে বছর ধরে বানানো পঞ্জিকায় একটি নতুন দিন যোগ করতে হয়। জুলীয় পঞ্জিকার সেই যোগের নিয়ম ভালোভাবে কাজ করত না। ফলে নতুন করে অধিবর্ষের নিয়ম বানিয়ে গ্রেগরীয় পঞ্জিকা বানানো হয়। আর সৌরভিত্তিক পঞ্জিকা হওয়ায় বাংলা সনেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় বাড়তি একটি দিন যুক্ত হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। অধিবর্ষের বছর একটি দিন বেড়ে মাসটি হয় ২৯ দিনের।

অন্যদিকে বাংলা সনের প্রথম সংস্করণ অনুসারে প্রথম পাঁচ মাস ছিল ৩১ দিনের ও পরের ছয় মাস ৩০ দিনের। সর্বমোট ১৫৫ + ২১০ = ৩৬৫ দিন। আর গ্রেগরীয় অধিবর্ষের সালে বাংলা সনেও যুক্ত হতো বাড়তি একটি দিন। সে বছর ফাল্গুন মাস ৩০ দিনের বদলে হতো ৩১ দিন।

তবে এ বছর থেকে পাল্টে গেছে বাংলা সনের নিয়ম। স্বাভাবিক নিয়মে এমনিতে প্রতিটি বছর ৩৬৫ দিনেরই থাকছে। আগের নিয়মে প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র ছিল ৩১ দিনের। নতুন নিয়মে আশ্বিন মাসসহ প্রথম ৬টি মাস হবে ৩১ দিনের। আর ফাল্গুন ছাড়া বাকি ৫টি মাস হবে ৩০ দিনের। শুধু ফাল্গুন মাস হবে ২৯ দিনের। তবে অধিবর্ষের সময় ১ দিন বেড়ে গিয়ে এই মাসটি হবে ৩০ দিনের। তাহলে মোট ১৮৬ + ১৫০ + ২৯ = ৩৬৫।

অন্য অনেক পঞ্জিকার মাসের মতোই বাংলা মাসগুলোর প্রতিটি মাসের বিপরীতে একটি করে রাশির নাম প্রচলিত আছে।

এই নিয়মের ফলে এ বছর বসন্ত বরণ হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারির বদলে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। তবে এটি উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো বাংলা যে তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সব সময় সে দিবসেই অনুষ্ঠিত হতে থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর সঙ্গে বাংলা তারিখ সব সময় সমন্বিত থাকবে ভবিষ্যতে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি এর আগেও দুই দফা সংস্কার হয়েছে। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল ভারতে ১৯৫২ সালে। বাংলাদেশের সন্তান বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে প্রধান করে ভারতের সরকার একটি পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি করেছিল। এরপর ১৯৬৩ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র নেতৃত্বে এই সংস্কার হয়। মেঘনাদ সাহার সুপারিশে বৈশাখ থেকে ভাদ্র ৩১ দিন, আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিন ছিল, অধিবর্ষে ১ দিন যুক্ত হতো চৈত্র মাসে। তার আগে কেবল চান্দ্র হিসাব ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি করা হতো, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। নতুন বর্ষপঞ্জি তারই আলোকে করা হয়েছে।

লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ।

সূত্র: বিবিসি, কোরা, বাংলাপিডিয়া

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন