বিতর্কের মহাযাত্রা

দশ হাজার বর্গফুটের অডিটরিয়ামটিতে এক পা জায়গাও নেই কারও দাঁড়ানোর। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল এসেছে বিশাল ভিডিও রেকর্ডার নিয়ে। নিস্তব্ধ অডিটরিয়ামের স্পিকারে দুবার মাইক্রোফোনে টোকা দেওয়ার শব্দ শোনা গেল। সবার দৃষ্টি মঞ্চের দিকে। এই তো বেল বাজল। ১৫ সেকেন্ড, ৩০ সেকেন্ড...সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু স্পিচ শুরু হচ্ছে না কেন?

লাফ দিয়ে উঠে বসল রেহান, পুরো শরীর ভিজে গেছে ঘামে। দুঃস্বপ্নটা মনে করতেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কী যে হবে আজ!

ওহ, তোমাদের বলা হয়নি; আজ রেহানের জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড। রেহান তার প্রতিযোগিতার জন্য চূড়ান্ত মনোনিবেশ করুক, ততক্ষণে আমরা বরং বিতর্কের জগৎ থেকে একটু ঘুরে আসি।

বিজ্ঞাপন

বিতর্ক কী

বিতর্ক মূলত একধরনের যৌক্তিক বাগ্‌যুদ্ধ। ‘যুদ্ধ’ শুনে কেউ যেন ভেবো না, এটা সহিংসতার আসর, এই যুদ্ধ আসলে এক নান্দনিক উপস্থাপন। কেননা, এর মাধ্যমে শাণিত হয় যুক্তি ও মনন।

যুক্তি, তথ্য, তত্ত্বের সমন্বয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক যে বিশেষ বাদানুবাদ উপস্থাপিত হয়, তা–ই বিতর্ক।

বিতার্কিক

তিনিই বিতার্কিক, যিনি প্রতিপক্ষের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাঁর যুক্তির সীমাবদ্ধতার গঠনমূলক সমালোচনা করেন। সপক্ষের বক্তব্য যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপন করেন। চেষ্টা করেন নিজের মতামতের ভিত্তিতে সত্য প্রতিষ্ঠার।

বিতর্কের প্রকারভেদ

বিতর্ককে বিভিন্নভাবে চর্চা করা হয়। যেমন সংসদীয় বিতর্ক, সনাতনী বিতর্ক, বারোয়ারি বিতর্ক, জাতিসংঘ মডেল বিতর্ক, ওয়ার্ল্ড ফরম্যাট, রম্য বিতর্ক, প্ল্যানচেট বিতর্ক, কাব্য বিতর্ক প্রভৃতি।

সংসদীয় বিতর্ক: এটি বর্তমানে সবচেয়ে প্রচলিত বিতর্কধারা। এই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় দুটি পর্বে—গঠনমূলক পর্ব ও যুক্তিখণ্ডন পর্ব। সংসদীয় বিতর্কে দুটি দল থাকে—সরকারি দল ও বিরোধী দল। সরকারি দলে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য থাকেন। বিরোধী দলে থাকেন নেতা, উপনেতা ও সংসদ সদস্য। মোট বিতার্কিক ছয়জন। প্রত্যেকে গঠনমূলক পর্বে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য পাঁচ মিনিট সময় পান। যুক্তিখণ্ডন পর্বে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা সময় পান তিন মিনিট করে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তিখণ্ডন দলের যে কেউই করতে পারছে। তা ছাড়া এখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে পয়েন্ট অব অর্ডার, পয়েন্ট অব ইনফরমেশন, পয়েন্ট অব প্রিভিলেজ তোলার সুযোগ থাকে, যা এই ধারাকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও জমজমাট করে তোলে। ও, আরেকটা কথা, সংসদীয় বিতর্ক যিনি পরিচালনা করেন, তাঁকে ‘স্পিকার’ বলে সম্বোধন করা হয়।

সনাতনী বিতর্ক: বিতর্কের এই ধারা বেশ প্রাচীন হলেও বাংলাদেশের জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক বা স্কুল পর্যায়ের বিতর্কগুলো সনাতনী পদ্ধতিতেই হয়ে থাকে। এখানেও দুটি পর্ব থাকে—গঠনমূলক ও যুক্তিখণ্ডন। দুটি দল থাকে—পক্ষ দল ও বিপক্ষ দল। পক্ষ ও বিপক্ষ দলের তিনজন করে মোট ছয়জন বক্তা বিতর্কে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। উভয় দলের প্রথম বক্তা, দ্বিতীয় বক্তা ও দলনেতা গঠনমূলক পর্বে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য পাঁচ মিনিট এবং যুক্তিখণ্ডনের জন্য প্রতিটি দলের দলনেতা তিন মিনিট সময় পেয়ে থাকেন। সনাতনী বিতর্ক যিনি পরিচালনা করেন, তাঁকে ‘সভাপতি’ বা ‘মডারেটর’ বলে সম্বোধন করা হয়।

বারোয়ারি বিতর্ক: বারোয়ারি বিতর্ক বিতর্কের এমন একটি ধারা, যেখানে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ থাকে না, অর্থাৎ এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এখানে সাবলীলভাবে একক ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে বিতর্ক করতে হয়। এই বিতর্কের উদ্দেশ্য হলো চিন্তাজগতের নতুনত্ব ও সৃষ্টিশীলতাকে সবার সামনে উপস্থাপন এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে পারার সক্ষমতাকে পরিস্ফুটিত করা। যেহেতু বারোয়ারি বিতর্কে কোনো দলনির্ভরতা থাকে না, তাই একক উপস্থাপনকে যুক্তিনির্ভর, শৈল্পিক, নাটকীয়, আবেগময় করতে হয় কণ্ঠের ওঠা-নামা ও অনবদ্য শব্দচয়নের মাধ্যমে। বারোয়ারি বিতর্কের বিষয় সুররিয়েলিস্টিক, দর্শনভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক, কল্পনির্ভর, বাস্তববাদী, সাপেক্ষনির্ভর বিভিন্ন রকম হতে পারে।

বিতার্কিকের করণীয় ও লক্ষণীয় বিষয়

  • কেইস বা স্ট্র্যাটেজি, স্ট্যান্ড পয়েন্ট দাঁড় করানোর পর বিষয়ের সঙ্গে সাবলীল ও সমন্বয়মূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।

  • নিজ দলের প্রতিপাদ্যের প্রতি সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রেরণ করা যাবে না। সর্বোপরি, দলীয় সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।

  • তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্য প্রদান করতে হবে, যেখানে বক্তব্য থাকবে সুস্পষ্ট। যুক্তির মূলে গিয়ে তাকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

  • বিতার্কিক তার প্রয়োজন অনুসারে বিতর্কের স্ক্রিপ্ট দেখতে পারবেন, কিন্তু স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে বিতর্ক করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

  • বিতর্কের ধারা অনুযায়ী বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং অসংযত আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

  • প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র, গোষ্ঠীর মর্যাদাহানি হয় বা অনুভূতিতে আঘাত লাগে, এমন বক্তব্য প্রেরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন
  • বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, কণ্ঠের ওঠা-নামা, অঙ্গভঙ্গি, চেহারার এক্সপ্রেশন সবকিছুর সমন্বয় থাকতে হবে।

  • প্রতিপক্ষ, বিচারক, দর্শক এবং উপস্থিত সবার সঙ্গে eye contact বজায় রেখে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।

  • মাইক্রোফোনের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।

  • একজনের উপস্থাপিত বক্তব্যকে অন্যজনের বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করে স্ববক্তব্য প্রেরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

  • আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ চোখে, মুখে ও সর্বাঙ্গে আত্মবিশ্বাসের ঝংকার থাকতে হবে।

  • বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে।

বিতর্ক নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা

যেহেতু ‘বিতর্ক’ শব্দটিতে ‘তর্ক’ উপস্থিত, সুতরাং ‘বি’ উপসর্গের কথা মানুষ একেবারেই ভুলে যায়। আর তখন তারা বিতর্ক আর তর্ককে এক ভেবে ভুল করে। খুব প্রচলিত একটি ইংরেজি উক্তি ‘Intellectuals can debate, fools argue.’ অর্থাৎ যুক্তি, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর, গঠনমূলক পর্যালোচনা-সমালোচনার আসরই হলো বিতর্ক; আর যুক্তিহীন, অমর্যাদাপূর্ণ উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজের মতামতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টাই তর্ক। আশা করি, তোমরা বিতর্ক আর তর্কের মাঝে বুদ্ধিদীপ্ততার যে উজ্জ্বল ফারাক, সেটি ধরতে পেরেছ।

পড়তে হবে প্রচুর বই

একজন সফল বিতার্কিক ও সুবক্তা হতে হলে প্রচুর বই পড়তে হবে। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিশ্বধর্ম-সংস্কৃতি, সমসাময়িক ইস্যু সম্পর্কে অনুসন্ধানী ও জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। তার জন্য পড়তে হবে অনেক বই। বিতর্ক শেখার জন্য যেমন অনেক বই আছে, পাশাপাশি নিজের জ্ঞানের পরিধিকে বিস্তৃত করার জন্যও রয়েছে বইয়ের সমাহার। আর জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই শাণিত করতে হবে যুক্তির চর্চা।

কেন শিখব বিতর্ক

  • বিতর্ক একজন মানুষকে গঠনমূলক সমালোচক হিসেবে গড়ে তোলে।

  • বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও প্রেক্ষাপট থেকে ভাবতে শেখায়।

  • Brainstorming করতে সাহায্য করে ও মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ করে তোলে।

  • নিজের মতবাদকে সরল, বোধগম্য, সুস্পষ্ট ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে শেখায়। আইনস্টাইনের মতে, ‘If you can’t explain it simply, you don’t understand it well enough.’

  • ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা করতে শেখো...

  • পাল্টাপাল্টি যুক্তির দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি গড়তে শেখায়।

  • অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়। দার্শনিক সেনেকা দ্য ইয়াংগারের মতে, ‘He, who decides a case without hearing the other side, though he decides justly, can’t be considered just.’

আশা করি, বিতর্কজগতে তোমাদের এই ছোট্ট সফর আনন্দময় ছিল। দেরি না করে তাহলে শুরু করে দাও নিজেদের বিতর্কের মহাযাত্রা। আর হ্যাঁ! তোমাদের বলা হয়নি, রেহানের দল ফাইনাল রাউন্ডে বিজয়ী হয়েছে আর রেহান হয়েছে শ্রেষ্ঠ বক্তা। তাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন।

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন