default-image

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে বয়সের ব্যবধান বিস্তর হলেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল মধুর। একজন সঞ্চয়িতার কবি। আরেকজন সঞ্চিতার কবি। ১৯১৯ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে নজরুলের প্রথম কবিতা ছাপা হয়। আর ১৯২৩ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে কবি সম্বোধন করে তাঁর বসন্ত নাটক উত্সর্গ করেন। তাহলে বুঝতেই পারছ দুজনের ভেতরে সম্পর্কের নৈকট্য কতটা গভীর ছিল।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একবার নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাই নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা তো নগণ্য, স্বয়ং গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স ৬০ ও নজরুল ইসলামের ২২। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভা। নজরুল সভাকক্ষে ঢুকেই সোজা মঞ্চে উঠে বিশ্বকবিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মাথায় আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন। মঞ্চ থেকে নামার মুখেই রবীন্দ্রনাথ খপ করে নজরুলের হাত ধরে টানলেন। না নজরুল, তুমি নিচে নয়, তুমি এই সভায় আমার পাশেই বসবে। ৬০ বছরের বিশ্বকবির পাশে ২২ বছরের বিদ্রোহী কবি। 

নজরুল তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতুতে জানিয়েছিলেন, ‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয় এবং দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি, তা দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনী।’ তাই ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতায় পত্রিকার নামের নিচেই রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী।

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,/আধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।/অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা,/জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন।

১৯২১ সালে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম শান্তিনিকেতনে যান। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের দুই ঘণ্টার ট্রেন ভ্রমণে গীতাঞ্জলির সব কবিতাই একটার পর একটা সবাইকে শুনিয়ে দেন নজরুল। সেটার জন্য তাঁর বইয়ের সাহায্য লাগেনি। অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথের সব কবিতা তাঁর মুখস্থ থাকত।

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা ছাপা হওয়ার পর রাজদ্রোহের অপরাধে কবিকে জেলে যেতে হয়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য নজরুলকে উত্সর্গ করেন।

রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে নজরুলকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, ‘গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক, আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ।’

১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নজরুল প্রকাশ করলেন নতুন পত্রিকা লাঙল। এবারেও লাঙল-এর সূচনায় থাকলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখলেন: ধর হাল বলরাম আন তব মরু-ভাল হল/বল দাও ফল দাও স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।

এরই মাঝে নজরুল ইসলাম কবিতা ও গানের অনেকগুলো বই নিয়ে  বের করলেনসঞ্চিতা। উত্সর্গবাক্যে লিখলেন, ‘বিশ্বকবি সম্রাট শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু।’

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে ১৯২৩-এ আর নজরুল রবীন্দ্রনাথকে বই উত্সর্গ করেছিলেন ১৯২৮ সালে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0