বাংলা ভাষার অনেক শব্দ ও বাগ্ধারা হলো রান্নাঘর। রান্নার বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও ভাঁড়ার ঘর থেকে এসব বাগ্ধারার উৎপত্তি। আজকের অভিধানের গল্প রান্নাঘরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু শব্দ ও বাগ্ধারা নিয়ে। এসব শব্দ ও বাগ্ধারা তৈরিতে এবং ব্যবহারে বাঙালির রসিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
কাসুন্দি
পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা কিংবা পুরোনো কাসুন্দি বের করা বলে একটা বাগ্ধারা আমরা কথায় কথায় বেশ ব্যবহার করি। অপ্রীতিকর কোনো পুরোনো প্রসঙ্গ কেউ তুললেই আমরা ক্লান্ত হয়ে বলে ফেলি—থাক, আর পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই।
কাসুন্দি রান্নাঘর থেকে পাওয়া শব্দ ও বস্তু। সরষেবাটাসহ প্রস্তুত কাসুন্দি বা কাসন্দি নামের রুচিকর সুগন্ধি আচার দিয়ে কাঁচা আম বা পাকা পেয়ারা খাওয়া অপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। এই অপূর্ব সুস্বাদু কাসুন্দি যখন পাত্রে থেকে পুরোনো হয়ে পড়ে, তখনই তা মুখ থেকে চলে আসে মুখের কথায়।
কাসুন্দি টাটকা খেতে হয়। পুরোনো হয়ে গেলে তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। সুগন্ধের বদলে সৃষ্টি করে দুর্গন্ধের। পাত্র থেকে কাসুন্দি বের করার জন্য পাত্রটি বেশ করে ঝেঁকে নিতে হয় কিংবা কাঠি দিয়ে ঘেঁটে নিতে হয়। পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটলে বের হয় দুর্গন্ধ। তখন তা ফেলে দিতে হয়। মুখরোচক সুগন্ধি কাসুন্দি পুরোনো হলে মুখে তোলার অযোগ্য হয়ে যায় কিন্তু তাতে লাভ হয় ভাষার।
ছ্যাঁৎ
উদ্বেগজনক কোনো বিষয় হঠাৎ শুনলে বুকের মধ্যে ছ্যাঁত্ করে ওঠে। তীব্র শিহরণের এই অনুভূতি আমরা ছ্যাঁত্ করে ওঠা বাগ্ধারার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করি। বক্তা তাঁর বাক্যে ‘বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল’ বলামাত্রই শ্রোতা বুঝে নেন বক্তার বুকের মধ্যে তখন কী হয়েছিল।
ব্যাকরণের দিক থেকে ছ্যাঁত্ করে ওঠা বাগ্ধারার ছ্যাঁৎ শব্দটি আহামরি কোনো শব্দ নয়। এটি ধ্বন্যাত্মক অব্যয়। অর্থাৎ ধ্বনি থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি।
এই ধ্বনিটি রান্নাঘরে অহরহ শোনা যায়। ফোড়ন দেওয়ার সময় টুকরা করা শাকসবজি কড়াইয়ের উত্তপ্ত তেলে পড়ামাত্রই ছ্যাঁৎ ধ্বনিটি উৎপন্ন হয়। ধ্বনি উৎপাদনের এই আকস্মিকতাহেতু ছ্যাঁৎ ধ্বনি বাগ্ধারার রূপ নিয়ে কালক্রমে রান্নাঘর পেরিয়ে ভাষায় স্থান লাভ করে।
ফোড়ন
বাংলা ভাষায় ফোড়ন শব্দটা একা ব্যবহূত হয় না। ব্যবহৃত হয় কাটা বা দেওয়া ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাগ্ধারা হিসেবে। তরকারি সুস্বাদু করার জন্য গরম তেলের ওপর জিরা, মরিচ, তেজপাতা ইত্যাদির সম্বরা দেওয়াকে বলা হয় ফোড়ন দেওয়া। রন্ধনক্রিয়ার এই ব্যাপারটিই বাগ্ধারা হিসেবে উঠে এসেছে আমাদের মুখের কথায়।
বাগ্ধারা হিসেবে ব্যবহৃত ফোড়ন দেওয়া বা কাটা কথাটির অর্থ হলো কথার মাঝে টিপ্পনী কাটা বা মন্তব্য করা। তরকারিতে ফোড়ন দিলে তরকারি সুস্বাদু হয়। আর কথার মাঝে ফোড়ন দিলে কথা জমে ওঠে।
কুপোকাত
কুপোকাত একটি চিত্র রূপময় শব্দ। কিন্তু শব্দটির বাস্তব চিত্র অন্য রকম। আমরা কাউকে কুপোকাত করি আবার নিজেরাও কুপোকাত হই। কুপোকাত শব্দের অর্থ চিতপাত, বিনষ্ট, পরাজিত, পর্যুদস্ত ইত্যাদি।
এসব শব্দের ভাব বা প্রকৃতি যা-ই হোক, কুপোকাত শব্দের মধ্যে ব্যঙ্গের ভাব আছে। এটাই কুপোকাত শব্দের বৈশিষ্ট্য। আমরা কাউকে কুপোকাত করতে পারলে আনন্দ পাই। আবার নিজেরা কুপোকাত হলে কষ্ট বোধ করি।
কুপোকাত শব্দটাকে ঠিকমতো বুঝতে হলে একটি দৃশ্যের কথা আমাদের মনে করতে হবে। ভাঁড়ার ঘরে একটা তেলের কুপো কাত হয়ে পড়ে আছে এবং সেই কুপো থেকে তেল গড়িয়ে পড়ছে—এটাই হলো মূল কুপোকাত দৃশ্য এবং এই দৃশ্য থেকেই কুপোকাত শব্দের উৎপত্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে কুপো হচ্ছে পেটমোটা সরু গলাবিশিষ্ট বড় তৈলপাত্র।
খই
অনেকের মুখে কথার খই ফোটে। মানুষ তাতে মুগ্ধ হয়। খই ফোটা বহুল ব্যবহৃত একটি বাগ্ধারা। বাগ্ধারাটির সৃষ্টি ধান থেকে তৈরি সুপরিচিত সুখাদ্য খই থেকে।
নেই কাজ তো খই ভাজ—বলে একটা প্রবচন চালু আছে। তবে তা নিতান্তই কথার কথা। মানুষ প্রয়োজনেই খই ভাজে এবং সে জন্য বেশ আয়োজন করতে হয়। মুখ চওড়া হাঁড়িতে বালু তপ্ত করে সেই তপ্ত বালুতে ছেড়ে দেওয়া হয় খইয়ের জন্য প্রক্রিয়াকরণ করা বিশেষ ধান। তারপরই হাঁড়িতে বিচিত্রভাবে সশব্দে খই ফুটতে থাকে। খই ফোটার বিচিত্র দৃশ্যটাই কালক্রমে মুখের কথায় খই ফোটা বাগ্ধারায় পরিণত হয়েছে।
আদায় কাঁচকলায়
মানুষে মানুষের দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্ক প্রকাশের জন্য প্রায়ই উপমা প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। উপমা যদি ঠিকমতো মিলে যায়, তাহলে উপমাটা কিসের সঙ্গে কেন দেওয়া হলো, মানুষ তা আর মনে রাখে না। মানুষে মানুষের আদায় কাঁচকলায় সম্পর্কের আদা ও কাঁচকলার বেলায়ও তা-ই হয়েছে।
আয়ুর্বেদ ওষুধশাস্ত্রমতে আদার গুণ হলো রেচন আর কাঁচকলার গুণ হলো ধারণ। অর্থাত্ কোষ্ঠকাঠিন্য হলে খেতে হয় আদা কিন্তু উদরাময়ে খেতে হয় কাঁচকলা। এ ছাড়া আদা যদি কাঁচকলার তরকারিতে পড়ে, তাহলে কাঁচকলা আর সহজে সেদ্ধ হয় না। আদা ও কাঁচকলার এই পরস্পরবিরুদ্ধ গুণ থেকেই বাগ্ধারাটির জন্ম।