বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যাত্রাপথে চলতে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে রামনাথ জানতে চেষ্টা করতেন ওই দেশের ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে। তিনি যখন কোরিয়া ভ্রমণ করেছিলেন, তখন সেখানে জাপানের শাসন চলছে। তাই ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে নিজের ভ্রমণকাহিনি প্রকাশের উদ্যোগ নেন রামনাথ।

তবে সামান্য এই কয়েকটা দেশ ঘুরে যেন মন ভরে না রামনাথ বিশ্বাসের। কয়েক মাস পেরোতেই নিজের সাইকেলটা নিয়ে আবার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এবার যাত্রা শুরু হয় আফগানিস্তান থেকে। একে একে পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, বুলগেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স হয়ে তিনি ব্রিটেন পৌঁছান। এবারের যাত্রাপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তবু নিজের মনোবল অটুট রেখে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডও তিনি সাইকেলে পরিভ্রমণ করেন। এবার দুই বছরের মাথায় লন্ডন থেকে জাহাজে মুম্বাই ফিরে আসেন তিনি। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে যান রামনাথ বিশ্বাস। বিশ্বের নানা জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জমিয়ে নতুন মানুষ হয়ে ওঠেন রামনাথ।

তবে বিশ্বের আরও কিছু দেশ দেখার বাসনা যেন তখনো জেঁকে বসেছিল রামনাথের মনে। সাইকেলের প্যাডেল টেনে দেশের পর দেশ আর নতুন মানুষের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে যেন এক নতুন দুনিয়ার খোঁজ পেয়েছিলেন তিনি। রোমাঞ্চকর এই অনুভূতি উপভোগ করতে তিনি বারবার সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েছেন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। ১৯৩৮ সালের দিকে আবার সব গুছিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। এবার তাঁর যাত্রা শুরু হয় আফ্রিকা মহাদেশের দিকে। মুম্বাই থেকে জাহাজে মোম্বাসায় পৌঁছান তিনি। সেখান থেকেই বাকিটা পথ তাঁর শুরু হয় সাইকেলে চেপে। কেনিয়া, উগান্ডা, নায়াসাল্যান্ড, রোডেসিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান রামনাথ বিশ্বাস। ভারতীয় এক ভ্রমণপিপাসু বাঙালি এভাবে সাইকেলে চেপে গোটা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শুনে অনেকেই আলাপ জমাতে আসেন তাঁর সঙ্গে। আফ্রিকার পথে–প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে তিনি হিয়ে হাজির হন যুক্তরাষ্ট্র। সেখান থেকেই আবার নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৪০ সালে সাইকেলে চেপে বিশ্বভ্রমণের এই বিশাল যাত্রার সমাপ্তি ঘটে রামনাথ বিশ্বাসের।

default-image

যাত্রাপথে চলতে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে রামনাথ জানতে চেষ্টা করতেন ওই দেশের ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে। তিনি যখন কোরিয়া ভ্রমণ করেছিলেন, তখন সেখানে জাপানের শাসন চলছে। তাই ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে নিজের ভ্রমণকাহিনি প্রকাশের উদ্যোগ নেন রামনাথ। কিন্তু কোনো প্রকাশক তাঁর এই লেখা প্রকাশে আগ্রহ দেখায়নি। তাই নিজেই পর্যটক প্রকাশনা ভবন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। নিজের শেষ জীবনে কলকাতায় থাকাকালীন আনন্দবাজার পত্রিকায় তার এই ভ্রমণকাহিনিগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। এ ছাড়া এগুলো বই আকারেও বাজারে আসে। কলকাতায় বসবাসকালে রামনাথের ভ্রমণকাহিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো। পরে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের ওপর। এগুলো মধ্যে রয়েছে: অন্ধকারের আফ্রিকা, আজকের আমেরিকা, জুজুৎসু জাপান প্রভৃতি। তাঁর লেখা উপন্যাস আগুনের আলো বেশ কয়েকটি মহাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় গল্প শুরু হয়ে ব্রিটেন হয়ে এশিয়ার মালয়ে এসে কাহিনি শেষ হয়েছে।

সে যা–ই হোক, সাইকেলে চেপে এই সারা বিশ্ব ঘুরে দেখতে গিয়ে বাঙালিকে এক নতুন সম্ভাবনায় পৌঁছে দিয়েছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। গ্রামের মেঠো পথে খঁটখঁটিয়ে চালানো সাইকেলের চাকাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন আফ্রিকার গহিন জঙ্গলের পথে। রোমাঞ্চকর এসব অভিযান সম্পর্কে জানতে পড়ে ফেলতে পারো তাঁর বইগুলো। আর নিজেও সাইকেলে ঘুরে আসতে পারো দূরের কোনো শহরে, কোনো নতুন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে।

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন