সায়েন্স ফিকশনের দুনিয়া

অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

সামনের সেপ্টেম্বরে আমার বয়স হয়ে যাবে চল্লিশ। অর্থাৎ মোটেও কচি খোকা নই, দিব্যি বড় মানুষ, ‘বড়লোক’ নই যদিও! কিন্তু মুশকিল হলো আমার কাছাকাছি বয়সের যারা, তাদের সঙ্গে বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠতে পারি না আমি। ‘রাজনীতির হালচাল কেমন বুঝছেন?’ কিংবা, ‘পদ্মার ইলিশের জোড়া কত করে যাচ্ছে আজকাল?’—এমনতর সব প্রশ্ন কিংবা আলোচনায় বেকুবের মতো হাসা কিংবা মাথা চুলকানো ছাড়া কিছুই করার থাকে না আমার। লোকে বলে, বয়সটাই যা হয়েছে, ‘আক্কেল’ হয়নি!

তাই আমার ভরসা যারা এখনো স্কুল পেরোয়নি, তাদের ওপর, বড়জোর ওদের কথাই বুঝতে পারি আমি; কিংবা বলা ভালো, ওরা বুঝতে পারে আমার কথা। চাকরির নামে একটা অফিসে সকাল থেকে সন্ধে অব্দি মাথা গুঁজে হিসাবপত্তর করি। ছুটির দিনে আমাদের বিল্ডিংয়ের ক্লাস সিক্সের রিপনের সঙ্গে দাবা খেলে কিংবা ক্লাস ফোরের ফারিজার সঙ্গে ডোরেমন দেখে কিংবা ক্লাস এইটের মামুনের সঙ্গে ব্যর্থ সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সময় কাটে আমার। তবে পারতপক্ষে কাছে যাই না রায়হানের। ব্যাটা পড়ে ক্লাস সেভেনে মাত্র, অথচ এর মধ্যেই বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছে! পত্রিকায় লেখে, সভা–সমিতিতেও নাকি যায়; আর সবচেয়ে মুশকিল হলো, সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেয়!

মুশকিলটা হয়ে গেল গত সপ্তাহে। রায়হানের ঘরভর্তি বই। ভেবেছিলাম ওর কাছ থেকে একটা বই এনে পড়ে কাটাব বৃহস্পতিবার সন্ধেটা। গিয়ে দেখি বুদ্ধিজীবী রায়হান যথারীতি একটা বই পড়ছে, আর ডায়েরিতে কী জানি সব টুকে রাখছে।

আমি গিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘একটা বই বেছে দাও না, রায়হান।’

ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুদিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে কিন্তু; তা কী ধরনের বই পড়তে চান?’

‘যা খুশি, তুমি বেছে দাও!’

একটু ভেবে রায়হান বলল, ‘সায়েন্স ফিকশন পড়বেন?’

‘ভালো লাগবে পড়তে?’ জিজ্ঞেস করি আমি।

‘মানে?’ হাঁ করে জিজ্ঞেস করে রায়হান, ‘কেমন লাগবে জিজ্ঞেস করছেন, তার মানে এর আগে কখনো সায়েন্স ফিকশন পড়েননি আপনি?’

ঢোঁক গিলে উত্তর দিই, ‘মানে, পড়া হয়নি এর আগে!’

এক শ বছর আগের একটা ঘটনার কত শক্তি! কী জাদুকরি ক্ষমতা এই সায়েন্স ফিকশনের! আরেকটা ঘটনার কথাও খুব শোনা যায়।

‘অন্যায়, মহা অন্যায়’, চিৎকার করে বলে রায়হান, ‘এ যুগের মানুষ হয়ে সায়েন্স ফিকশন পড়েননি, বলতে লজ্জা হয় না আপনার? জানেন, সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কত হট্টগোল পর্যন্ত বেধে গিয়েছিল এই দুনিয়ায়? ১৯১৭ সালে এইচ জি ওয়েলসের সায়েন্স ফিকশন দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে অরসন ওয়েলস একটা রেডিও নাটক প্রচার করেন। নাটকটাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন সত্যি সত্যি মঙ্গল গ্রহ থেকে আক্রমণ করা হয়েছে পৃথিবীতে। এই নিয়ে মহা হুলুস্থুল! লোকে নাকি ভয়ে–আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে! এ নিয়ে মহা বিতর্ক! যদিও যতটা বলা হয়েছে, ততটুকু আতঙ্কিত হয়নি লোকে, কিন্তু এই গল্পটা আজও ফেরে লোকের মুখে মুখে। ইউটিউবে গিয়ে সার্চ করলে পুরো রেডিও অনুষ্ঠানটি শোনা যাবে। বুঝুন, এক শ বছর আগের একটা ঘটনার কত শক্তি! কী জাদুকরি ক্ষমতা এই সায়েন্স ফিকশনের! আরেকটা ঘটনার কথাও খুব শোনা যায়। আসস্টাউন্ডিং নামের এক সায়েন্স ফিকশন পত্রিকায় লিও কার্টমিল লেখেন “ডেডলাইন” নামের একটা গল্প। ওই গল্পে ছিল পারমাণবিক বোমা বানানোর কাল্পনিক এক কাহিনি। কিন্তু সেটা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল যে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা রীতিমতো ওই পত্রিকা অফিসে হানা দিয়ে খোঁজখবর নেয়! তবেই বুঝুন!’

‘এত কাণ্ড!’ অবাক হয়ে বলি আমি।

‘এত কাণ্ডের পরও কাকে যে বলে সায়েন্স ফিকশন, সে নিয়ে রয়েছে বিস্তর তর্ক। কতটুকু বিজ্ঞান থাকলে গল্পটাকে সায়েন্স ফিকশন বলা যাবে, উদ্ভট সব কথা বিজ্ঞানের নাম চালিয়ে দিলেই সেটা সায়েন্স ফিকশন হবে কি না, সায়েন্স ফিকশন আর সায়েন্স ফ্যান্টাসির সীমারেখা কোথায় টানা হবে, এমনতর নানা বিষয়ে তর্ক চলছেই! তবে একটা বিষয়ে সবাই মোটাদাগে একমত যে বিজ্ঞানের মূলসূত্র কিংবা বিজ্ঞানের পেছনে যে দর্শন, তাকে অক্ষুণ্ন রেখে এবং তাকেই কেন্দ্র করে যে আখ্যান বা গল্প তৈরি হয়—সেটাই সায়েন্স ফিকশন, বাংলায় যাকে আমরা অনেকেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বলি।’

আমি একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘আচ্ছা, যদি খুব অবৈজ্ঞানিক কিছু না থাকে, রূপকথাকেও তো তাহলে সায়েন্স ফিকশন বলা যায়; ওখানেও তো কল্পনার ডানা মেলে দেওয়া হয়!’

বিজ্ঞের মতো একটু হাসে রায়হান, ‘এমন কথাও অনেকে বলেন। কেউ কেউ তো সেই প্রায় ৪ হাজার ১০০ বছর আগের মহাকাব্য গিলগামেশকেও বলতে চান প্রাচীনতম সায়েন্স ফিকশন, তার ওই ফ্যান্টাসি চরিত্রের কারণে। আবার ফ্রান্সিস বেকন, যাকে বলা হয় আধুনিক বিজ্ঞানের জনক, তাঁর ১৬২৬ সালে লেখা “নিউ অ্যাটলান্টিস”কেও অভিহিত করা হয় সায়েন্স ফিকশন হিসেবে। আবার অনেকে জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলারের ১৬৩৪ সালের চন্দ্রাভিযানবিষয়ক লেখা “সোমনিয়াম”কেও আখ্যায়িত করতে চান সায়েন্স ফিকশন হিসেবে। এ রকম আরও অনেক প্রাচীন সাহিত্যকেই সায়েন্স ফিকশন দাবি করেছেন অনেকে।’

‘তাহলে, এই যে তাঁরা বলছেন, তাঁদের কথা কি ভুল?’ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করি আমি।

‘ভুল বলা যায় না পুরোপুরি; আসলে, একেকজনের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন রকম, আর এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে সত্যিকারের আধুনিক সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি হিসেবে একটা বইকে প্রায় সবাই মেনে নেয়, বইটা হলো মেরি শেলির লেখা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, বেরোয় ১৮১৮ সালে।’

এতক্ষণে একটা কমন পড়ার আনন্দে রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠি আমি, ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন! এই সিনেমা তো দেখেছি আমি টেলিভিশনে! এক লোক একটা দানব তৈরি করে, সেটা নিয়ে জমজমাট একটা সিনেমা।’

‘তা দেখতেই পারেন। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন রীতিমতো কিংবদন্তি এক চরিত্র। অসংখ্য নাটক, সিনেমা তৈরি হয়েছে এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে। তো, বইটা পড়েছেন? নাকি সিনেমাটি দেখেছেন শুধু?’

আমতা আমতা করে উত্তর দিই, ‘না, এই নামে যে বই আছে, সেটাই তো জানতাম না আমি। তবে এখন যখন জানলাম, পড়ে ফেলব নির্ঘাত।’

‘আমার কাছে আসল ইংরেজি বইটা আছে’, অহংকারী একটা হাসি হেসে বলে রায়হান, ‘আপনি তো সেটা পড়ে বুঝবেন না; তবে, বাজারে কিশোরোপযোগী অনুবাদ আছে বাংলায়, কিনে ফেলুন একটা।’

খোঁচাটা দিব্যি পরিষ্কার। ভেবেছিলাম তেড়েফুঁড়ে উঠব, কিন্তু নিজেকে দমালাম দুটি কারণে: এক, বিষয়টি খুব একটা মিথ্যা নয়। আর দুই, সায়েন্স ফিকশন নিয়ে রায়হানের এই বকবকানি মন্দ লাগছে না আমার, বরঞ্চ ভালোই লাগছে শুনতে।

তাই নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনই প্রথম সার্থক সায়েন্স ফিকশন?’

মাথা দুদিকে ঝাঁকিয়ে রায়হান বলে, ‘তা বলা যায়। তবে এ নিয়েও দ্বিমত আছে। যেমন সায়েন্স ফিকশনের গ্র্যান্ডমাস্টার বলা হয় যাঁকে, সেই আইজাক আসিমভের মতে, ১৮৬৩ সালে জুল ভার্নের লেখা ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন হলো প্রথম সত্যিকারের সায়েন্স ফিকশন। তবে আসিমভ নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে আদি এবং অকৃত্রিম বিজ্ঞান কল্পকাহিনি যে কোনটি, সেটি নিয়ে আসলে কখনোই ঐক্যমতে পৌঁছানো যাবে না।’

‘বলো কী! এত বড় বড় মানুষেরাও ঠিক করতে পারছেন না? কেন এত মুশকিল সায়েন্স ফিকশন নিয়ে?’

একটু হেসে রায়হান বলে, ‘ঠিক মুশকিল নয়। এমন হয়। কোনো একটা বিষয় নিয়ে দ্বিমত থাকাটাই স্বাভাবিক। আসলে ফ্যান্টাসি বা কল্পকাহিনির একটা ধারাই তো সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। নিছক ফ্যান্টাসি গল্প বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে অত মাথা ঘামায় না; সায়েন্স ফিকশনে গল্পগুলো বিজ্ঞানের স্বাভাবিক সূত্র আর সম্ভাবনাগুলো মাথায় রেখে এগোয়—এটুকুই যা পার্থক্য। তাই ফারাকটুকু আসলে ভারি সূক্ষ্ম—বোঝা মুশকিল। তা ছাড়া গত ৫০-৬০ বছরে সায়েন্স ফিকশনের বিষয়-বৈচিত্র্য এত বিস্তার লাভ করেছে যে কোনো একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে একে বেঁধে ফেলা ভীষণ মুশকিল। কেউ লিখেছেন সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে, কেউ অতীত নিয়ে; কেউ রোবট নিয়ে, কেউ জীবাণু নিয়ে; কেউ মানবসভ্যতার ধ্বংস নিয়ে, কেউবা মানবিকতার জয়গান নিয়ে; কেউ ভিনগ্রহের প্রাণী নিয়ে, কেউবা অন্য মাত্রার কাহিনি নিয়ে। একটা কথা বলা হয় যে বিজ্ঞানের মূল সুরটা না মানলে সায়েন্স ফিকশন হয় না, সেই কথাটাও মুশকিলে পড়ে যায়—যখন কেউ দূর ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প লেখেন: প্রযুক্তির এমন কোনো বিষয়, যেটা হয়তো আজকের সময়ে কল্পনাও করা যায় না; কিন্তু ওই সময়ে হলেও হতে পারে। যেমন রে ব্র্যাডবেরির লেখা খুব বিখ্যাত একটা গল্প আছে, নাম “আ সাউন্ড অব থান্ডার”। ওই গল্পে দেখা যায় “টাইম সাফারি ইনকরপোরেটেড” নামের একটা কোম্পানি সময়ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। এক লোক ওই কোম্পানির টিকিট কেটে পাড়ি জমায় অতীতে। সেই যাত্রায় একমুহূর্তের ভুলে ওই লোকের পায়ের চাপায় মারা পড়ে কোটি বছর আগের এক প্রজাপতি। দেখা যায় ওই সামান্য ঘটনার অসামান্য পরম্পরায় বা চেন ইফেক্টে পাল্টে গেছে রীতিমতো অনেক ইতিহাস; এমনকি পাল্টে গেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল! দুর্দান্ত এক সায়েন্স ফিকশন! কিন্তু, মুশকিল হলো টাইম মেশিনের মাধ্যমে সময়-পরিক্রমার এই পুরো ধারণাটাই কিন্তু বিজ্ঞান স্বীকৃতি দেয় না। তাহলে এই গল্পটাকে কি আমরা সায়েন্স ফিকশন বলব, নাকি বলব না—এ রকম তর্ক চলছেই!’

‘একটু একটু বুঝতে পারছি মনে হয়’, মাথা চুলকে বলি আমি, ‘আচ্ছা, তোমার কথায় তিনটা নাম পেলাম—আজিমপুর, জলভল আর ক্যাডবেরি—ওনারাও কি খুব নামকরা লেখক?’

‘কী? কী বললেন আপনি?’ এক্ষুনি যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে, এমন মুখভঙ্গি করে রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠল রায়হান।

আমি ওর ওই আচমকা চিৎকারে রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আমি? আমি আবার কী বললাম?’

‘কেন? তিনটি নাম বললেন না?’

‘নাম? হ্যাঁ, বললাম তো—আজিমপুর, জলভল আর ক্যাডবেরি; কিন্তু এতে মুশকিলটা বাধল কোথায়, সেটা তো বুঝতে পারছি না,’ মিনমিন করে বললাম আমি।

তারপর? তারপর যেটা করল রায়হান, সেটা রীতিমতো অপমানজনক, টানা ১ মিনিট ১০ সেকেন্ড হাসল রায়হান। তা–ও যেমন-তেমন হাসি নয়, রীতিমতো ‘হা হা হি হি হি হি হি হি’ করে ঘরদোর ভেঙে ফেলবার মতো করে অট্টহাসি! হাসির সঠিক হেতুটা বুঝতে না পারলেও এটা ভালোই বুঝতে পারছিলাম যে হাসির কারণটা আমার কথা।

ওর হাসি থামলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাসির কারণটা একটু বলবে?’

‘আরে, আপনি যে তিনটা নাম উচ্চারণ করলেন, ওই নাম শুনলে দুনিয়ার যে কেউ এর চেয়ে বেশি হাসবে!’ হাসি এখনো থামাতে পারছে না রায়হান। কোনোমতে বলল, ‘আপনি তিনটা নাম বললেন—আজিমপুর, জলভল, ক্যাডবেরি! হা! হা! হা! ওই নাম তিনটা হবে: আসিমভ, জুল ভার্ন আর ব্র্যাডবেরি; আর আপনি, কী বললেন আপনি? হি! হি! হি!’

আচ্ছা, যদি খুব অবৈজ্ঞানিক কিছু না থাকে, রূপকথাকেও তো তাহলে সায়েন্স ফিকশন বলা যায়; ওখানেও তো কল্পনার ডানা মেলে দেওয়া হয়!

আমি ভারি লজ্জা পেয়ে বললাম, ‘মানুষের ভুল হতেই পারে, তাই বলে এভাবে হাসাটা ঠিক নয়; শত হলেও আমি তোমার গুরুজন, আমার একটা সম্মান আছে।’

এই অপমান সহ্য করার মতো নয়, আমি ঠিকঠিক রাগ করে বেরিয়ে আসতাম ওর বাসা থেকে; কিন্তু ভাগ্যের কী খেলা, ঠিক তক্ষুনি রায়হানের মা আমাদের জন্য নাশতা নিয়ে এলেন: ঘরে তৈরি গরম গরম চিকেন রোল, ব্ল্যাকফরেস্ট পেস্ট্রি, আর ঠান্ডা শরবত! এমন নাশতা দেখলে রাগ, অপমান যা–ই হোক না কেন, উঠে আসা অসম্ভব!

ততক্ষণে রায়হানও নিজেকে সামলে নিয়েছে, বলল, ‘সরি’, তারপর গরম চিকেন রোলে ফুঁ দিতে দিতে বলে, ‘যদি সময়কাল অনুযায়ী সাজাই, তাহলে জুল ভার্ন সবচেয়ে আগের, তাঁর জন্ম ১৮২৮ সালে; তাঁর প্রায় এক শ বছর পর, একই সাল ১৯২০-এ জন্ম নেন আইজাক আসিমভ আর রে ব্র্যাডবেরি। ২০১২ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন ব্র্যাডবেরি, কিন্তু এক সালে জন্ম হলেও, অনেক আগেই, ১৯৯২ সালে মারা যান আসিমভ। তবে এই তিনজনের সঙ্গে আরও একজনের কথাও বলেছি ওই রেডিও প্রোগ্রামের গল্পটা বলতে গিয়ে—এইচ জি ওয়েলস। ওয়েলসের জন্ম ১৮৬৬ সালে। ওনার কথা না বললে অন্যায় হবে। ওই যে যাঁর লেখা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে বলা যায় আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের সৃষ্টিকার, সেই মেরি শেলির (১৭৯৭-১৮৫১) পরের অধ্যায়ে যাঁরা সায়েন্স ফিকশনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেক দূর, তাঁদের মধ্যে জুল ভার্ন (১৮২৮-১৯০৫) এবং এইচ জি ওয়েলসের (১৮৬৬-১৯৪৬) কথা না বললেই নয়। ফরাসি লেখক জুল ভার্নের কল্পনা আর বিজ্ঞানে মোড়া অসামান্য গল্পরাজির নাম তিনি নিজেই দিয়েছিলেন “ফ্যান্টাস্টিক ভয়েজেস”! দেবেন নাই–বা কেন, তাঁর লেখায় এমন এমন সব “যাত্রা” বা “ভয়েজ”-এর কথা এসেছে, সেগুলোকে অতুলনীয় বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাঁর ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন, দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড, আ জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ, ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন, টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি—এই বইগুলোর নামই বলে দেয় কী সব ভ্রমণেই না তিনি সঙ্গী করেছেন পাঠককে! জুল ভার্নের সমসাময়িক এইচ জি ওয়েলস তাঁর অমর সব সায়েন্স ফিকশনে কল্পনার ডানা মেলেছেন বিজ্ঞানের কারিগরি দিকটুকুর ভেতরে খুব বেশি প্রবেশ না করেই। তবে ইতিহাসে বিজ্ঞানের ভূমিকার বিষয়ে সচেতন ছিলেন ওয়েলস। ওয়েলসের যে বইগুলোর আবেদন একবিন্দু কমেনি আজ পর্যন্ত, তাঁর মধ্যে আছে: দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড, দ্য আইল্যান্ড অব ডাক্তার মারিয়ু, দ্য টাইম মেশিন, দ্য ইনভিসিবল ম্যান। তাঁর লেখা দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে তৈরি রেডিও নাটক নিয়ে হুলুস্থুলের গল্প তো আপনাকে আগেই বলেছি। একটা মজার কথা বলি, ওয়েলস এমনকি বিদ্রূপও করেছিলেন ভার্নকে নিয়ে এই বলে: ‘আমি কাজে লাগাই পদার্থবিজ্ঞান। আর তিনি (জুল ভার্ন) বিশেষ কোনো ধাতুতে তৈরি উড়োজাহাজকে পাঠান মঙ্গল গ্রহে! আমাকে ওই বিশেষ ধাতুটি দেখান তো?’

‘বলো কী’, অবাক হয়ে বলি আমি, ‘এত বড় বড় লেখকের মাঝেও এমন ছেলেমানুষি রেষারেষি থাকে নাকি!’

‘থাকে না মানে, এমন কত মজার মজার কাণ্ড আছে—শোনাব আপনাকে আরেক দিন; আজ সায়েন্স ফিকশন নিয়েই থাকি’, চিকেন রোল শেষ করে জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলে রায়হান, ‘আইজ্যাক আসিমভের গল্পের গুরুত্বই আলাদা। তাঁর “ফাউন্ডেশন”কে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সায়েন্স ফিকশন সিরিজ। রোবট নিয়ে তাঁর গল্পগুলো তো অনবদ্য, রোবটিকসের তিন সূত্র নিয়ে লেখা তাঁর গল্পগুলো রীতিমতো ক্ল্যাসিক! সোভিয়েত রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া এই লেখক শৈশবেই চলে এসেছিলেন আমেরিকায়। ১৯৪১ সালে বেরোনো “নাইটফল” গল্প দিয়েই সবার নজরে আসেন তিনি; এমনকি পরবর্তীকালে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের ভোটে এই গল্পটি নির্বাচিত হয় সর্বযুগের সেরা সায়েন্স ফিকশন গল্প হিসেবে। সারা জীবন বিস্তর লিখেছেন এই লেখক, সব মিলিয়ে ৫০০-এর বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। তবে, পুরো গ্যালাক্সি শাসনের অনবদ্য গল্প নিয়ে গড়ে ওঠা “ফাউন্ডেশন” সিরিজ একাই তাঁকে অমর করে রাখবার জন্য যথেষ্ট...’

রায়হানকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করি আমি, ‘আচ্ছা, রোবটিকসের তিনটি সূত্রের বিষয়টা কী?’

‘এটা আসিমভের এক অনবদ্য সৃষ্টি। তিনটি সূত্র হলো: ১) রোবট কোনো মানুষকে আহত করতে পারবে না, অথবা কিছু না করে থেকে একজন মানুষকে ক্ষতির মুখেও ফেলে দিতে পারবে না; ২) একজন রোবট মানুষের আদেশ শুনতে বাধ্য থাকবে, যতক্ষণ না তা প্রথম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে; ৩) একজন রোবট তার নিজেকে অবশ্যই রক্ষা করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার এই নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা প্রথম কিংবা দ্বিতীয় সূত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।’

‘বাহ্! ভারি মজার আইন তো! তো, আসলেই এমন কোনো আইন আছে নাকি?’

‘আরে না, এটা আসিমভের মাথা থেকে বের হওয়া সূত্র, তার গল্পের জন্য। তবে আমার কী মনে হয় জানেন, যদি ভবিষ্যতে আসলেই রোবটিকসের এতটাই উন্নতি হয় যে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মানুষের মতোই কাজ করা শুরু করে, তখন এ ধরনের আইন-কানুন করাই লাগবে। আর হ্যাঁ, একটা নাম বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম প্রায়: আর্থার সি ক্লার্ক। উনিও আসিমভের সমসাময়িক; জন্ম ১৯১৭ সালে, মৃত্যু ২০০৮ সালে। কিংবদন্তি সিনেমা ২০০১: আ স্পেস অডিসির কাহিনিকার হিসেবে অমর হয়ে আছেন এই লেখক। তবে এর বাইরেও বিস্তর দুরন্ত সব সায়েন্স ফিকশনের জনক এই লেখক।’

রায়হানের কথার ফাঁকে ফাঁকে আমার ভাগের রোল, পেস্ট্রি, জুস—সব চেটেপুটে সাবাড় করে দিয়েছি আমি। বড় করে তৃপ্তির একটা ঢেকুর তুলে বললাম, ‘বোঝাই যাচ্ছে, এই খাবারগুলোর মতোই মনোহর হবে এই সায়েন্স ফিকশনগুলো।’

রায়হান দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘উঁহু, মনোহর শব্দটার প্রয়োগটা ঠিক হবে না এই ক্ষেত্রে। মনোহর বলতে এমনিতে “মন হরণ করা” বোঝালেও সাধারণভাবে হালকা চালের স্বাদু রচনা বোঝায় এই শব্দের মাধ্যমে, অন্তত সাহিত্যের ক্ষেত্রে। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের গভীরতা আরও ব্যাপক। যেমন ধরুন রে ব্র্যাডবেরির কথাই। মোটাদাগে, সায়েন্স ফিকশন ঘরানার লেখক নন উনি; অথচ কী দুরন্ত সব, রীতিমতো স্তম্ভিত করা সায়েন্স ফিকশন গল্পের জন্ম দিয়ে গেছেন এই লেখক। দ্য মার্শিয়ান ক্রনিকলস, দ্য ইলাস্ট্রেটেড ম্যান—এই গল্প সংকলনগুলোর গল্পগুলো নিছক “মনোহর” সায়েন্স ফিকশন নয়, আরও অনেক গভীর চিন্তার উদ্রেক করে এই গল্পগুলো। তবে, ব্র্যাডবেরির সবচেয়ে নামডাক তার ফারেনহাইট ৪৫১ বইটির জন্য।’

‘ফারেনহাইট ৪৫১? আজব নাম তো!’ অবাক হয়ে বলি আমি।

‘ফারেনহাইট ৪৫১ হচ্ছে সেই তাপমাত্রা, যে তাপমাত্রায় কাগজ বা বই পুড়তে আরম্ভ করে।’

‘এই তাপমাত্রার সঙ্গে বইয়ের নামকরণের সম্পর্ক কী?’ তীব্র কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করি আমি।

ভিলেনের মতো বদখত মিচকে হাসি মুখের কোনায় ঝুলিয়ে রায়হান বলে, ‘সেটা আমি বলে দেব না। আপনার নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।’

বুঝলাম যে পনিরের লোভ দিয়ে টম অ্যান্ড জেরির মতো আমাকে ফাঁদে ফেলেছে রায়হান, বইটা না পড়া পর্যন্ত যে শান্তি পাব না, সেটা বুঝতেই পারছি। একটু থেমে বললাম, ‘বোঝাই যাচ্ছে আমার অগোচরেই সায়েন্স ফিকশন নিয়ে মেতেছে পুরো জগৎ।’

‘সে তো বটেই। সায়েন্স ফিকশন বই, গ্রাফিক নভেল, কমিকসের এক অবিশ্বাস্য বড় দুনিয়া আজ বিরাজ করছে বিশ্বজুড়ে। তার সঙ্গে আছে সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। সায়েন্স ফিকশন গল্পের বিভিন্ন চরিত্র-উপকরণ নিয়ে তৈরি হয় অগুনতি সব খেলনা, মার্চেন্ডাইজ—কত কী! সায়েন্স ফিকশনকে কেন্দ্র করে হয় বিশাল সব মেলা, প্রদর্শনী, কনভেনশন’, একটু দম নিয়ে বলতে থাকে রায়হান, ‘তবে ধারা হিসেবে সায়েন্স ফিকশন বেশ নতুন। হিউগো গার্নসব্যাকের সম্পাদনায় এই ঘরানার প্রথম পত্রিকা বেরোয় ১৯২৬ সালের ৫ এপ্রিল তারিখে, আমেরিকায়। পত্রিকাটার নাম অ্যামেজিং স্টোরিজ। তবে তখন কিন্তু “সায়েন্স ফিকশন” শব্দগুচ্ছের জন্ম হয়নি। সম্পাদক গার্নসব্যাকের হাত ধরেই বছর তিনেক পরে ১৯২৯ সালে জন্ম নেয় “সায়েন্স ফিকশন”—এই জোড়া শব্দ। বলা যায়, এই অ্যামেজিং স্টোরিজ পত্রিকাটার হাত ধরেই সাহিত্যের একটি ঘরানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে সায়েন্স ফিকশন। তবে সায়েন্স ফিকশনের চলবার পথটি সুগম ছিল না, সমালোচকেরা সায়েন্স ফিকশনকে সাহিত্যের ধারা হিসেবে মানতেই রাজি হননি বহুদিন। বলা হতো এলিয়েন, লেজার বন্দুক, মহাকাশযাত্রা, সময়ভ্রমণ—এমন কিছু অবাস্তব ছেলেভোলানো কাণ্ডকারখানা চমকপ্রদ ভাষায় তুলে ধরা ছাড়া আর কোনো কৃতিত্ব নেই এই সায়েন্স ফিকশনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সায়েন্স ফিকশনের প্রতি এমন ধারণা বজায় ছিল; তারপর অসামান্য প্রতিভাবান লেখকদের হাত ধরে সায়েন্স ফিকশন এসে দাঁড়াতে থাকে একটা শক্ত জায়গায়। বিশ্বের প্রায় সব দেশ আর ভাষার সাহিত্যেই এসে লাগে সায়েন্স ফিকশনের ছোঁয়া! সায়েন্স ফিকশন ধারার লেখকদের জন্য চালু হয়েছে “হুগো” ও “নেবুলা” নামের পৃথক দুটি সম্মানজনক পুরস্কার।

তবে শুধু আমেরিকা কিংবা ইউরোপেই যে সায়েন্স ফিকশনের জয়যাত্রা এমন কিন্তু নয়, রাশিয়া, অর্থাৎ আগেকার সোভিয়েত ইউনিয়নের লেখকেরা সায়েন্স ফিকশনের দুনিয়ায় রেখেছেন অনবদ্য অবদান। বিশেষ করে মনে পড়ছে লেখক আলেক্সান্দর বেলায়েভ (১৮৮৪-১৯৪২)-এর কথা। বেলায়েভের বয়স যখন তিরিশ বছর, তখন তিনি আক্রান্ত হন যক্ষা রোগে। তখনকার সময়ে যক্ষা দুরারোগ্য রোগ, রীতিমতো চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েন তিনি। তারপর টানা ছ’বছর রোগে ভুগে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। তখনকার সময়ে রীতিমতো অলোকিক ঘটনা এটা। তখন তার মাথায় লেখক হবার দুর্নিবার স্বপ্ন। কী লিখবেন ঠিক করতে পারছিলেননা, তারপর লিখে ফেলেন একদম ভিন্ন ঘরানার বিজ্ঞান কল্পকাহিনী উপন্যাস “প্রফেসর ডয়েলের মাথা”; রুশ পাঠকেরা লুফে নেয় উপন্যাসটি। ১৯২৮ সালে বেরোয় তাঁর অমর বিজ্ঞান কল্পকাহিনী “শেলোভেক আমফিবিয়া” বা “উভচর মানব”। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর তালিকায় এই বইটি রীতিমতো--অবশ্যপাঠ্য!’

‘দারুণ লাগছে শুনতে। আচ্ছা, আমাদের বাংলায় সায়েন্স ফিকশন লেখা হয় না?’

‘লেখা হয় না মানে?’ রীতিমতো হতাশা ঝরে যেন রায়হানের কণ্ঠে, ‘আমাদের বইমেলায় যে যান, ওখানেও কি চোখে পড়েনি আপনার অগুনতি সায়েন্স ফিকশন?’

একটু লজ্জা পাই আমি, ‘না মানে, ওভাবে খেয়াল করিনি আরকি!’

‘শুনুন, বাংলায় সায়েন্স ফিকশন নতুন কিছু নয়। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত সচিত্র বিজ্ঞান দর্পণ পত্রিকায় দুই সংখ্যা মিলিয়ে বেরোনো হেমলাল দত্তের লেখা “রহস্য” গল্পটিকেই ধরা যায় বাংলা ভাষার প্রথম সায়েন্স ফিকশন। এ ছাড়া বাংলায় পপুলার সায়েন্স গ্রন্থমেলার প্রবর্তক, শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ও লিখেছিলেন সায়েন্স ফিকশন গল্প “শুক্র-ভ্রম”। এই গল্পের মধ্য দিয়েই বাঙালি পাঠকের প্রথম অভিজ্ঞতা ঘটে ভিনগ্রহে ভ্রমণ এবং বুদ্ধিমান ভিনগ্রহবাসীদের সঙ্গে সাক্ষাতের। তবে ১৮৯৬ সালে বেরোনো বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা “নিরুদ্দেশের কাহিনি”-কেই অনেকে বিবেচনা করেন বাংলায় লেখা প্রথম সার্থক সায়েন্স ফিকশন হিসেবে। কীভাবে মাথায় মাখা তেল দিয়ে সমুদ্রের ঝড়কে কাবু করা হয়েছিল, তার এক অনবদ্য গল্প এটি। তারপর বাংলা ভাষার নানান লেখক নানান সময়ে যত্ন নিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন সায়েন্স ফিকশনের ভান্ডারটিকে। আমাদের এখানে ১৯৬৯ সালে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) লেখক কাজী আব্দুল হালিমের লেখায় বেরোয় মহাশূন্যের কান্না নামে একটি উপন্যাস; যেটিকেই বিবেচনা করা হয় এ অঞ্চলের প্রথম সায়েন্স ফিকশন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মৌলিক সায়েন্স ফিকশনটি জন্ম দেওয়ার কৃতিত্বটি কার, বলতে পারবেন?’

‘কার?’ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করি আমি।

‘আমাদের এক ও অদ্বিতীয় হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২)! ১৯৭৩ সালে তাঁরই লেখায় বেরোয় বাংলাদেশের প্রথম মৌলিক সায়েন্স ফিকশন তোমাদের জন্য ভালোবাসা।’

আমি অবাক হয়ে বলি, ‘হুমায়ূন আহমেদ? তিনিই লিখেছেন আমাদের প্রথম সায়েন্স ফিকশন?’

‘হ্যাঁ, কলমের জাদুকর এই লেখকের কৃতিত্ব আছে সাহিত্যের নানান ধারাতেই। তাঁর বেশ কিছু অসাধারণ সায়েন্স ফিকশনের মধ্যে রয়েছে তারা তিনজন, অনন্ত নক্ষত্রবীথি, শূন্য, ওমেগা পয়েন্ট, ফিহা সমীকরণ—এমন অনেকগুলো বই। তাঁর লেখা সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলোও দুর্দান্ত। হুমায়ূন আহমেদের মতোই নিখুঁত দক্ষতায় বাংলা ভাষার সায়েন্স ফিকশনকে এক হাতেই অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন আরেকজন যে লেখক, তিনি হুমায়ূন আহমেদেরই সহোদর মুহম্মদ জাফর ইকবাল (জন্ম ১৯৫২)। তাঁর সায়েন্স ফিকশনের সংখ্যা অনেক; উল্লেখ করতেই হয়: কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ, মহাকাশে মহাত্রাস, ক্রোমিয়াম অরণ্য, নিঃসঙ্গ গ্রহচারী, অনুরণ গোলক, সিস্টেম এডিফাস, ত্রাতুলের জগৎ—এমন আরও অনেক বইয়ের নাম। খুব কম লেখেন আরেকজন লেখক দীপেন ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৫৯), কিন্তু উপহার দিয়ে চলেছেন অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো, নিস্তার মোল্লার মহাভারত, নক্ষত্রের ঝড়, দিতার ঘড়ির মতো অসামান্য সব সায়েন্স ফিকশন। দীপেন ভট্টাচার্যের সায়েন্স ফিকশন পাঠের অভিজ্ঞতা অন্য রকম, তাঁর লেখা একদম আলাদা।

‘ভুলে যাওয়ার আগেই বলে ফেলা ভালো অনীশ দেব (জন্ম ১৯৫১) আর অদ্রীশ বর্ধনের (১৯৩২-২০১৯) কথা। এই দুজনের বাংলা সায়েন্স ফিকশনে অবদান অনেক। বিশেষ করে স্মরণ করতেই হয় অদ্রীশ বর্ধনের কথা। “আকাশ সেন” ছদ্মনামে তাঁর সম্পাদনাতেই বেরোয় প্রথম বাংলা সায়েন্স ফিকশন পত্রিকা আশ্চর্য—বাংলা ভাষায় সায়েন্স ফিকশনকে শক্ত একটা অবস্থানে দাঁড় করানোর পেছনে এর অবদান অনেক। এখানে উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের প্রথম সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন মৌলিক বেরোয় ১৯৯৯ সালে, আহসান হাবীব আর হাসান খুরশিদ রুমির হাত ধরে। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবালের আরেক কৃতী সহোদর আহসান হাবীব (জন্ম ১৯৫৭), দেশের একমাত্র রম্য ম্যাগাজিন উন্মাদ দিয়ে আমরা তাঁকে চিনলেও তিনি লিখে চলছেন নানান স্বাদের সায়েন্স ফিকশনও। হাসান খুরশিদ রুমি (জন্ম ১৯৬৯) মূলত অনুবাদক; সায়েন্স ফিকশনের প্রতি গভীর মমতায় তিনি অনুবাদ আর সম্পাদনার মাধ্যমে সায়েন্স ফিকশনকে জনপ্রিয় করবার ক্ষেত্রে রেখে চলছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আর একজন লেখক, শিবব্রত বর্মন (১৯৭৩। লেখেন খুবই কম, কিন্তু যেটুকু লেখেন—সেটুকুতেই ছোঁয়া থাকে ওস্তাদের। তাঁর সায়েন্স ফিকশন বানিয়ালুলু বইটির কথা মনে পড়ছে। যদ্দুর মনে পরে, মোটমাট ১১ খানা বিস্ময়কর গল্প আছে এই বইটায়। তিনি যে কেন এতো কম লেখেন, ভেবে আফসোস হয় আমার।’

একটু থেমে আবার শুরু করে রায়হান, ‘স্মরণ করতেই হবে প্রেমেন্দ্র মিত্রর (১৯০৪-১৯৮৮) কথা। এই লেখকের সরাসরি সায়েন্স ফিকশন যেমন আছে, তেমনি তাঁর সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র “ঘনাদা”-কে কেন্দ্র করে লেখা অবিস্মণীয় গল্পগুলোয় রয়েছে বিজ্ঞানের নিবিড় ছোঁয়া। যাঁর কথা না বললেই নয়, তিনি সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)। অসামান্য প্রতিভাধর এক মানুষ তিনি। চলচ্চিত্রে যেমন অস্কারজয়ী, তেমনি তাঁর সব গল্প-উপন্যাসে তিনি বুঁদ করে রেখেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। তাঁর তৈরি চরিত্র “প্রফেসর শংকু”-কে নিয়ে লেখা সায়েন্স ফিকশন ঘরানার গল্পগুলো আজও সবার প্রিয়।’

‘আরও যে কত গল্প আছে, বলতে থাকলে কয়েক দিনেও ফুরাবে না’, বলে রায়হান। তারপর তার সেই অসহ্য বুদ্ধিজীবী ভাবটা মুখে এনে বলে, ‘ওই যে একটা পত্রিকা আছে না, কিশোর আলো—ওটার সম্পাদক সাহেব তো অনেক দিন ধরেই “সায়েন্স ফিকশনের একটা ইতিহাস লিখে দাও” বলে বলে জ্বালিয়ে মারছেন আমাকে! আমার চেয়ে জানা-বোঝা লোক নাকি খুঁজে পাচ্ছেন না ওনারা!’

রায়হানের বলবার ভঙ্গিতে গা রীতিমতো জ্বলে গেল আমার। কোনোমতে নিজেকে শান্ত রেখে বললাম, ‘অনেক কিছু জানা হলো তোমার কাছ থেকে। তো কটা বই দাও না সায়েন্স ফিকশনের; তুমি যেগুলোর নাম বলেছ, ওই বইগুলো না পড়া পর্যন্ত শান্তি পাব না। আগামীকাল তো শুক্রবার, আজ সন্ধ্যা থেকে পড়া শুরু হয়ে যাবে, কাল পড়া চলবে দিনভর।’

রায়হান বই দিতে চাইছিল না বেশি, গাঁইগুঁই করছিল; লোকে নাকি বই নিয়ে আর ফেরত দেয় না। আমি রীতিমতো অনুনয়–বিনয় করে ওর বইয়ের তাক ঘেঁটে ঘেঁটে বের করতে লাগলাম ফ্রাঙ্কেনস্টাইন–এর মূল ইংরেজি, টাইম মেশিন–এর অনুবাদ, শংকু সমগ্র, জুল ভার্নের ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন, হুমায়ূন আহমেদের তোমাদের জন্য ভালোবাসাসহ আরও আরও বই। হায় হায় করে উঠল রায়হান, ‘এত্ত বই নিচ্ছেন কী জন্য? ফেরত দেবেন কবে?’

‘তুমি চিন্তা কোরো না, এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে ফেলব’, বললাম আমি। আর ভেতরে ভেতরে বললাম, ‘হুঁ হুঁ বাবা, তুমিই খালি বুদ্ধিজীবী হয়ে থাকবে? তা হবে না, তা হবে না! সায়েন্স ফিকশন নিয়ে দরকার হলে পিএইচডি ডিগ্রি করব; কিন্তু তোমার মুখের ওই গা জ্বালানো হাসি আমি বন্ধ করবই করব! তুমি লেখবার আগেই দেখবে কিশোর আলোতে ছাপা হয়ে গেছে সায়েন্স ফিকশন নিয়ে আমার লেখা!’

বগলে একগাদা সায়েন্স ফিকশন বই নিয়ে বাসায় রওনা দিই, আর মনে মনে বলি, ‘কিশোর আলোর সম্পাদক সাহেব, হিয়ার আই কাম! সায়েন্স ফিকশনের জগৎ কাঁপাতে আমি হাজির হলাম বলে!’