হ্যারি পটারের পেছনের গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৯০ সাল। ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনের ট্রেন চার ঘণ্টা লেট। ম্যানচেস্টারে বসে ট্রেনের অপেক্ষা করতে করতে ২৫ বছর বয়সী জোয়্যান রাওলিংয়ের মাথায় এল অদ্ভুত এক গল্পের ভাবনা। একটা ছেলের জাদু শেখা, জাদুর স্কুলে পড়ার গল্প—এই ভাবনাটুকু নিয়েই ট্রেনে ওঠার পর লিখতে শুরু করলেন তিনি। এর পরের ৫ বছরে রাওলিং চরিত্রগুলোকে দাঁড় করালেন, সাজালেন ৭টি বইয়ে ভাগ করা পুরো গল্পের প্লট। 

জাদু শেখার এই স্কুলের আইডিয়া রাওলিংয়ের মাথায় চেপে বসেছিল শক্তভাবে। তিনি পুরোদমে লিখতে শুরু করেছিলেন তাঁর কল্পনার স্কুলটির কথা, জাদুর পৃথিবী অর্থাৎ উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ডের কথা। সে বছরের ডিসেম্বরে মাকে হারান রাওলিং। অনাথ হয়ে যান তিনি। হঠাৎ মায়ের মৃত্যু গভীর প্রভাব ফেলে তাঁর ভেতর। সে সময় তিনি নিজের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করলেন গল্পের মূল চরিত্র হ্যারি পটারকে। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, অনাথ হ্যারি থাকে সিঁড়ির নিচে ছোট্ট এক ঘরে। হ্যারির জগৎ কাটে একা একা। মায়ের মৃত্যুর পর রাওলিংয়েরও সময় কাটত একা একা। 

default-image

মায়ের মৃত্যুর পর লন্ডন ছেড়ে দেন রাওলিং। পাড়ি জমান পর্তুগালে। দিনের বেলায় হ্যারি পটার আর রাতের বেলা ইংরেজি ক্লাস নেওয়া, রাওলিংয়ের হাতে এভাবেই এগোচ্ছিল হ্যারি পটারের গল্প। ১৮ মাস কেটে গেল। বিয়ে করলেন রাওলিং। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে মা হন তিনি। একই বছর রাওলিংয়ের বিবাহবিচ্ছেদও হয়। এবার একদম মুষড়ে পড়েন তিনি।

সে সময় নিজেকে ব্যর্থ ভেবে হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন রাওলিং। তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন, পুরোপুরি আনন্দহীন হয়ে গেছে তাঁর জীবন। এই কঠিন সময়ে তিনি লিখেছেন হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অব আজকাবান বইয়ে প্রথম আবির্ভূত ডিমেন্টরদের চরিত্র। হ্যারি পটার সিরিজের জেলখানা আজকাবানের প্রহরী এই ডিমেন্টররা। তারা বন্দীদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস শুষে নিয়েই বেঁচে থাকে। যেকোনো জায়গায় তাদের উপস্থিতি তাই ভীষণ ভীত ও মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে মানুষকে। 

default-image

নিজের অর্থনৈতিক ও মানসিক সংগ্রামের মধ্যেও রাওলিং এগিয়ে নিয়েছিলেন হ্যারি পটার-এর কাজ। লেখার জন্য একটা নিরিবিলি জায়গা তাঁর প্রয়োজন ছিল, কিন্তু ক্যাফেটেরিয়াতে বসলে কিছু না কিছু অর্ডার করতেই হবে। তাই অর্থকষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করেও ছোট্ট সন্তানকে পাশে ঘুম পাড়িয়ে, এক কাপ কফি কিনে সারা দিন ক্যাফেতে বসে পুরোনো এক টাইপরাইটারে লিখতেন তিনি। অবশেষে ১৯৯৫ সালে তিনি হ্যারি পটার-এর প্রথম বইটি লেখা শেষ করেন। 

default-image

প্রথম বইটি বারবার বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার গল্পটি আমাদের সবারই জানা। অবশেষে ব্লুমসবারি প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করতে রাজি হয়। এর পেছনেও রয়েছে এক অদ্ভুত কাহিনি। রাওলিং পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পর ব্লুমসবারি প্রকাশনীর চেয়ারম্যানের মেয়ের হাতে পড়ে সেটি। প্রথম অধ্যায় পড়ে আগ্রহ তৈরি হয় মেয়েটির। বাবার কাছে বারবার পরের অধ্যায়টি চাইতে থাকে সে। এ কারণেই হয়তো শেষ পর্যন্ত হ্যারি পটারের বই প্রকাশে আগ্রহী হয়েছিল ব্লুমসবারি প্রকাশনী। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় জে কে রাওলিংয়ের ও হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফারস স্টোন।

রাওলিংকে এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথম বই প্রকাশের পরই পাঠক-সমালোচকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পায় হ্যারি পটার। হ্যারি ও তাঁর বন্ধুরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হয়ে ওঠে দারুণ জনপ্রিয়। দ্রুতই সর্বাধিক বিক্রি হওয়া বইগুলোর তালিকায় জায়গা করে নেয় হ্যারি পটার সিরিজ। হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন বইটি এখন পর্যন্ত সর্বাধিক বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। 

default-image

১৯৯৯ সালে হ্যারি পটার সিনেমা বানানোর জন্য ওয়ার্নার ব্রাদার্স ১ মিলিয়ন ডলার মূল্যে প্রথম চারটি বইয়ের স্বত্ব কিনে নেয়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাওলিং একে একে হ্যারি পটার সিরিজের আরও পাঁচটি বই প্রকাশ করেন। শেষ বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। হোটেলে বসে বইটি লেখা শেষ করেন তিনি। তবে হ্যারি পটারের শেষটা রাওলিংয়ের জানা ছিল সেই ১৯৯০ সালেই। সিরিজের শেষ বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় এখনো প্রথম স্থানে রয়েছে। যে দিন বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেদিনই ২৪ ঘণ্টায় বইটির ৮ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হওয়ায় এ রেকর্ড তৈরি হয়। 

default-image

হ্যারি পটার-এর বিভিন্ন চরিত্রের নাম এসেছে রাওলিংয়ের জীবন থেকেই। তাঁর বয়স যখন চার বছর, তখন তিনি স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলের নাম সেন্ট মাইকেলস প্রাইমারি স্কুল। সেই স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন আলফ্রেড ডান। অ্যালবাস ডাম্বেলডোরে চরিত্রটি রাওলিং তৈরি করেছেন তাঁর প্রথম প্রিন্সিপাল আলফ্রেড ডানকে ঘিরেই। ১১ বছর বয়সের রাওলিং প্রচুর বই পড়তেন। তাই সেই বয়সে নিজের বই পড়ার অভ্যাস ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়েই তিনি তৈরি করেন হারমায়োনি চরিত্রটি। জাদুর স্কুল হগওয়ার্টসের নাম রাওলিংয়ের মাথায় আসে হগওর্ট নামের একটি গাছ থেকে। হ্যারি পটার লেখার আগে গাছটি তিনি দেখতে পান দ্য রয়্যাল বোটানিকাল গার্ডেনে। এ ছাড়া হ্যারি পটার নামটি এসেছে রাওলিংয়ের ছোটবেলার বন্ধু ও প্রতিবেশী দুই ভাই পটারের থেকে। আর হ্যারি নামটি হুট করে তাঁর মাথায় আসে। নাম দুটি জোড়া দিয়ে বইয়ের নাম হয় হ্যারি পটার।

হ্যারি পটার-এর মতো কালজয়ী বই লিখতে গিয়ে জে কে রাওলিংকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ কঠিন এক পথ। শেষ পর্যন্ত এত পরিশ্রমের ফল হিসেবে পেয়েছেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও অসংখ্য পাঠকের ভালোবাসা। 

তথ্যসূত্র: ট্রিভিয়া ও পটারমোর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন