পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী কোনটি
স্তন্যপায়ী প্রাণী বললেই মাথায় আসে বিশালদেহী নীল তিমি কিংবা হাতির কথা। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যে যেমন অতিকায় দানব আছে, তেমনি আছে এমন সব খুদে বিস্ময়, যাদের দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন যে এরাও আমাদের মতো স্তন্যপায়ী! আজ তোমাদের যে ছোট্ট স্তন্যপায়ী প্রাণীর কথা বলব, তার নাম ‘বাম্বলবি ব্যাট’।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র বাদুড়ই কিন্তু সত্যিকারের ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারে। আর এই উড়ন্ত স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হওয়ার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডটি দখলে রেখেছে এই বাম্বলবি বাদুড়। কেন এর নাম বাম্বলবি? কারণ এর আকার! একটি পূর্ণবয়স্ক বাম্বলবি বাদুড়ের ওজন মাত্র ২ গ্রামের মতো। অর্থাৎ একটি দুই টাকার কয়েনের চেয়েও হালকা! এর মাথা থেকে শরীরের দৈর্ঘ্য মাত্র ১ দশমিক ১৪ থেকে ১ দশমিক ২৯ ইঞ্চি। ডানা মেললে এটি হয়তো তোমার হাতের তালুও পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না। এর বৈজ্ঞানিক নাম অবশ্য দেহের আকারের মতো ছোট নয়, Craseonycteris thonglongyai। অনেকে একে কিটির পিগমি ব্যাট নামেও ডাকে।
এই ছোট্ট বন্ধুদের দেখতে হলে তোমাকে ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি দিতে হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এদের প্রধান আবাসস্থল দক্ষিণ-পশ্চিম থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের খাওয়াই নোই নদীর তীরের চুনাপাথরের গুহাগুলোতে। এ ছাড়া মিয়ানমারের কিছু পাহাড়ি এলাকাতেও এদের দেখা মেলে। এরা মূলত গুহার একদম ভেতরের দিকের সিলিংয়ে ঝুলে থাকতে পছন্দ করে, যেখানে তাপমাত্রা বেশ আরামদায়ক থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এরা কিন্তু খুব বেশি সামাজিক নয়; একেকটি গুহায় বড়জোর ১০ থেকে ১০০টি বাদুড় একসঙ্গে থাকে।
পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর খেতাব নিয়ে বাম্বলবি ব্যাটের সঙ্গে কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে ইট্রুস্কান শ্রু নামে আরেক খুদে প্রাণীর। ইট্রুস্কান শ্রু ওজনে ১ দশমিক ৮ গ্রামের মতো হলেও লম্বায় বাম্বলবি ব্যাটের চেয়ে একটু বড়। তাই দৈর্ঘ্যের দিক থেকে বিচার করলে বাম্বলবি ব্যাটই পৃথিবীর সবচেয়ে খুদে স্তন্যপায়ী হিসেবে সেরার মুকুটটি পায়।
বাম্বলবি বাদুড়ের নাকটা দেখতে অনেকটা শূকরের নাকের মতো, তাই একে হগ-নোজড ব্যাট বলা হয়। এদের কানগুলো শরীরের তুলনায় বেশ বড়। এই কানগুলোই এদের শিকার করতে সাহায্য করে। এরা মূলত পোকাখাদক। গোধূলির সময় বা ভোরের আলো ফোটার আগে এরা গুহা থেকে বের হয় খাবারের খোঁজে। বাঁশবাগান বা সেগুনগাছের ওপর উড়তে উড়তে বাতাসের মধ্যেই ছোট ছোট মাছি, মশা বা মাকড়সা শিকার করে।
এদের প্রজননক্ষমতা খুব ধীর। সাধারণত বছরে মাত্র একটি বাচ্চা দেয় এই বাদুড়। মা বাদুড় তার বাচ্চাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখে, যতক্ষণ না বাচ্চাটি নিজে উড়তে বা শিকার করতে শেখে।
আকারে ছোট হলেও এদের বিপদ কিন্তু মোটেও ছোট নয়। পর্যটকদের উপদ্রব, গুহার ভেতর ধূপ জ্বালানো এবং চুনাপাথর উত্তোলনের ফলে এদের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বন উজাড় হওয়ার ফলে এদের খাবারের উৎসও কমে যাচ্ছে। বর্তমানে এই বিরল প্রজাতির বাদুড়কে বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রাখা হয়েছে।