‘বেকার’ থাকা মাইকেল ক্যারিক যেভাবে ফেরালেন ইউনাইটেডকে
ইউনাইটেড আর জয়—এই শব্দ দুটো গত দেড় বছর ধরে পাশাপাশি বসাতে হিমশিম খেতেন ফুটবলপ্রেমীরা। না জিততে জিততে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল ইউনাইটেড, যে এক সমর্থক তো বাজি লেগে বসেছিলেন, টানা পাঁচ ম্যাচ না জেতা পর্যন্ত তিনি আর চুলই কাটবেন না। সেই সমর্থকের স্বপ্ন বোধ হয় পূরণ হতে চলেছে। কারণ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড নিজেদের শেষ চার ম্যাচেই তুলে নিয়েছে জয়। আর এর পেছনে কারিগর হিসেবে আছেন ৪৪ বছর বয়সী কোচ মাইকেল ক্যারিক।
মাইকেল ক্যারিক ইউনাইটেডের চাকরিটা পেয়েছেন হুট করেই। অবশ্য এটা প্রথম নয়। আগেও দুইবার হুট করেই তাঁর ওপর এসে পড়েছিল ইউনাইটেডকে সামলানোর কঠিন দায়িত্ব। ২০১৮ সালে খেলা থেকে অবসরের পর ইউনাইটেডেই ছিলেন ক্যারিক। কাজ করতেন হোসে মরিনহোর সহযোগী হিসেবে। মরিনহো বরখাস্ত হওয়ার পর দিন দুয়েকের জন্য অনানুষ্ঠানিক কোচ ছিলেন ইউনাইটেডের। কোনো কোচ নিয়োগ না দেওয়ায় দলকে ট্রেনিং করাতেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কোচ ওলে গানার সুলশারের কোচিং প্যানেলে যোগ দেন তিনি। তিন বছর পর সুলশার যখন বরখাস্ত হলেন, তখন ইউনাইটেডের দায়িত্ব আবারও এসে পড়ল ক্যারিকের ওপর। সেবার সুযোগ হয়েছিল তিন ম্যাচ সামলানোর। দুই জয় আর এক ড্র করে দল তুলে দিয়েছিলেন রালফ রাগনারিকের হাতে। এরপর গিয়েছিলেন নিজেকে অভিজ্ঞ করতে, মিডলসবোরোর কোচ ছিলেন তিন মৌসুম।
একের পর এক কোচ এসেও যেন কোনোভবাবেই দলের ভেতরের অবস্থা ঠিকঠাক করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড ভরসা রেখেছিল রুবেন আমোরিমের ওপর।
গত মৌসুমের শেষে বরখাস্ত হন বোরো থেকে, এরপর কাটাচ্ছিলেন বেকার জীবন। তারপর আবারও উড়ে এসে জুড়ে বসল ইউনাইটেডের দায়িত্ব। ক্যারিককে বেছে নেওয়া ছাড়া খুব একটা উপায়ও ছিল না ইউনাইটেডের। গত কয়েক মৌসুম ধরেই ইউনাইটেডের যা অবস্থা, সেখান থেকে নতুন কোনো ভালো কোচ নিজে থেকে দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন না। কোচের সঙ্গে বোর্ডের রীতিমতো রেশারেশি অবস্থা।
একের পর এক কোচ এসেও যেন কোনোভবাবেই দলের ভেতরের অবস্থা ঠিকঠাক করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড ভরসা রেখেছিল রুবেন আমোরিমের ওপর। কিন্তু সেই আমোরিমও ব্যর্থ। দলকে নিয়ে লিগ শেষ করেছিলেন ষোলতম স্থানে থেকে। ইউরোপা লিগের ফাইনালে হেরেছিলেন টটেনহামের কাছে। এরপরেও তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখেছিল ইউনাইটেড বোর্ড। ভেবেছিল দলকে হয়তো নিজের মতো গুছিয়ে নেবেন। কিন্তু লিগ কাপ আর এফএ কাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই লজ্জাজনক বিদায় নিয়েছে ইউনাইটেড। প্রায় সাত দশক পর ইউনাইটেডের মৌসুম শেষ হবে মাত্র ৪০ ম্যাচ দিয়ে। প্রিমিয়ার লিগের কোনো দলের পক্ষে এক মৌসুমে এর চেয়ে কম ম্যাচ খেলা সম্ভব নয়। সেটাই করে দেখিয়েছে ইউনাইটেড। অবশেষে বোর্ডের বিপক্ষে কথা বলে চাকরি হারিয়েছেন আমোরিম।
এই অবস্থায় ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। তাই তো মাইকেল ক্যারিকের ওপর ভরসা রাখতে হয়েছে ইউনাইটেডকে। যে কারণে চুক্তিটাও করা হয়েছে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ যাকে বলে। কিন্তু সেই কোচই এত ভালো সামলাবেন তা কে ভেবেছিল?
পরের ম্যাচে পরীক্ষাটা আরও কঠিন, শীর্ষে থাকা আর্সেনালের মাঠে মুখোমুখি আর্সেনালের। পিছিয়ে পড়েও সেখান থেকে জয় তুলে আনলেন ক্যারিক।
ক্যারিক যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন সবাই ধরেই নিয়েছিলেন নির্ঘাত শনি অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। এক মাসের মধ্যে মুখোমুখি হবেন সিটি, আর্সেনাল, টটেনহামের মতো দলের সঙ্গে। এই ভঙ্গুর দল নিয়ে কীভাবে কী করবেন তিনি? ক্যারিক সেই ঝড়ের ঝাপটা সামলেছেন কড়া হাতে।
পেপ গার্দিওলার সিটিকে নিজেদের মাটিতে হারিয়েছেন ২-০ গোলে। ফর্মে থাকা ম্যান সিটি পাত্তাই পায়নি ক্যারিকের ইউনাইটেডের কাছে। পুরো ম্যাচে শুধু বলই পায়ে রাখতে পেরেছে তারা, আক্রমণ ছিল রীতিমতো নির্বিষ। পুরো ম্যাচে একটি শটও টার্গেটে রাখতে পারেনি সিটি। সেখানে ব্রায়ান এমবেউমো আর প্যাট্রিক ড্রোগুর গোলে তিন বছর পর ম্যানচেস্টার ডার্বি জিতে নিল ইউনাইটেড।
পরের ম্যাচে পরীক্ষাটা আরও কঠিন, শীর্ষে থাকা আর্সেনালের মাঠে মুখোমুখি আর্সেনালের। পিছিয়ে পড়েও সেখান থেকে জয় তুলে আনলেন ক্যারিক। বরাবরের মতোই ম্যাচে আধিপত্য ছিল আর্সেনালের, কিন্তু গোলমুখে ভয়ংকর ছিল ইউনাইটেড। ৩-২ গোলে জিতে ফিরে এল রেড ডেভিলরা।
ফুলহামের বিপক্ষে সহজ ম্যাচটাই বরং কঠিন করে জিতেছে ইউনাইটেড। ৫০ মিনিটে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের শেষ পাঁচ মিনিটে হজম করে দুই গোল। অতঃপর বেঞ্জামিন সেসকোর গোলে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে ইউনাইটেড।
টটেনহামের বিপক্ষে কোনো প্রশ্নই রাখেননি। নিজেদের মাঠে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা বলতে যেটা বোঝায়, ক্যারিকের ইউনাইটেড সেটাই করেছে। ৩০ মিনিটের মাথায় ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া টটেনহাম ইউনাইটেডের রক্ষণে কোনো ভয়ই দেখাতে পারেনি। ব্রায়ান এমবেউমো আর ব্রুনো ফার্নান্দেজের গোলে ২-০ গোলের সহজ জয় তুলে নেয় রেড ডেভিলরা।
ইউনাইটেডে নিজে ছিলেন মাঝমাঠের প্রাণ, ফলে মাঝমাঠ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, তা বোঝাতে একদমই সময় লাগেনি ক্যারিকের। সিটির মতো দলের বিপক্ষে সামলে রেখেছেন মাঝমাঠ।
এই জয়ের পর ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ টেবিলের চতুর্থ স্থানে উঠে এল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। শিরোপা জয়ের পথটা এখনো অনেক কঠিন, আর্সেনাল-সিটি বড়সড় স্লিপ না কাটলে ইউনাইটেডের কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলা এখন ইউনাইটেডের হাতের নাগালে। আর সেটা সম্ভব হয়েছে মাইকেল ক্যারিক ম্যাজিকে। কী আছে আসলে সেই ম্যাজিকে?
ক্যারিক আসলে বেছে নিয়েছেন স্যার অ্যালেক্সের দর্শন। তিনি জানেন, তাঁর হাতে সময় কম। এর মধ্যেই দলকে সম্মানজনক জায়গায় রেখে যেতে হবে। এখন বিশাল ‘ট্যাক্টিকাল জিনিয়াস’ হওয়ার সময় নয়। বরং দলের যে যে রকম, তাকে ঠিক সেভাবেই সামলাতে হবে। জিততে হলে যা দরকার, ক্যারিক সেটাই করেছেন। রক্ষণকে শক্ত করেছেন, চার ম্যাচে মাত্র ৪ গোল হজম করেছে তাঁর দল। এর মধ্যে একটি আত্মঘাতী, আরেকটি পেনাল্টি। ডিফেন্সে বড় বড় ভুল একেবারেই নেই বললে চলে।
ইউনাইটেডে নিজে ছিলেন মাঝমাঠের প্রাণ, ফলে মাঝমাঠ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, তা বোঝাতে একদমই সময় লাগেনি ক্যারিকের। সিটির মতো দলের বিপক্ষে সামলে রেখেছেন মাঝমাঠ। আর আক্রমণভাগকে করেছেন শাণিত। যত যাই হোক, দল যদি গোলমুখে শট নেয় পাঁচটি, তার চারটি যাতে গোলে পরিণত হয়। সেটা ঠিকঠাকই করতে পারছে দলের স্ট্রাইকাররা।
ফলাফল? ইউনাইটেড হেসেখেলেই জিতে নিয়েছে চার ম্যাচ। এক ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘স্যার অ্যালেক্স গত এক মাস ধরে হাসিমুখ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, এর থেকে আনন্দের কী হতে পারে।’ আসলেই তাই। জয়ের চেয়ে বেশি আনন্দ আর কিসে থাকতে পারে?