পৃথিবীতে কেন নীল রঙের গরু দেখা যায় না

নীলগাই

প্রকৃতির রঙের দিকে তাকালে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যায়। নদীর ধারে বসে থাকা মাছরাঙা পাখির পালকের জাদুকরি নীল রং কিংবা ফুলের ওপর উড়ে বসা প্রজাপতির ডানার উজ্জ্বল নীল নকশা আমাদের সব সময়ই মুগ্ধ করে। চারপাশের কীটপতঙ্গ ও পাখিদের জগতেও এই চমৎকার নীল রঙের ছড়াছড়ি দেখা যায়। কিন্তু এবার একটু অন্যদিকে নজর দেওয়া যাক। আমাদের চারপাশের বড় বড় প্রাণীর কথা খেয়াল করে দেখো তো! কুকুর, বিড়াল, গরু, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ কিংবা বানর কি নীল রঙের দেখা যায়? কিংবা মাছরাঙার মতো উজ্জ্বল নীল পশমওয়ালা কোনো কুকুর বা বিড়াল কি তুমি কখনো দেখেছ? নিশ্চয়ই দেখোনি। কিন্তু এমনটা কেন হয়? কেন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দেহে এই নীল আভা থাকে না?

প্রাণিজগতে রং মূলত দুটি উপায়ে তৈরি হয়। প্রথম উপায়টি হলো রঞ্জক পদার্থ বা পিগমেন্ট। আমাদের ত্বক, চুল, পশম বা পাখির পালকে এই পিগমেন্ট থাকে। এই পিগমেন্টের কারণেই নির্দিষ্ট রং তৈরি করে। যেমন ধরো, মেলানিন নামে একটি পিগমেন্টের কারণে কালো রং তৈরি হয়। আবার কারও শরীরে যদি এই পিগমেন্ট একেবারেই না থাকে, তখন তাকে অ্যালবিনিজম বলে। এই পিগমেন্ট না থাকলে সেই প্রাণী সম্পূর্ণ সাদা রঙের হয়।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে মূলত দুই ধরনের সাধারণ পিগমেন্ট থাকে। ইউমেলানিন ও ফিওমেলানিন। ইউমেলানিনের কারণে প্রাণীদের পশমে কালো ও বাদামি রং দেখা যায়। অন্যদিকে ফিওমেলানিনের কারণে তৈরি হয় লালচে-বাদামি আভা, যা আমরা লাল বা হলুদ পশমে দেখতে পাই। এই পিগমেন্টগুলোর নানা রকম মিশ্রণের কারণেই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে বিভিন্ন শেড, ডোরাকাটা দাগ বা রঙের বৈচিত্র্য তৈরি হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রং বদলাতেও পারে। কিন্তু খেয়াল করে দেখো, এই পিগমেন্টগুলোর তালিকায় কোনো নীল পিগমেন্ট নেই!

আরও পড়ুন

রং তৈরির দ্বিতীয় উপায়টি হলো কাঠামোগত রং। এখানে কোনো পিগমেন্ট থাকে না; বরং পশম বা পালকের ভেতরের গঠন বা কাঠামোর ওপর যখন আলো এসে পড়ে, তখন তা এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যে একটি নির্দিষ্ট রঙের মতো দেখায়। প্রজাপতির মতো কীটপতঙ্গ বা ফ্ল্যামিঙ্গোর মতো পাখিদের ক্ষেত্রে এই কাঠামোগত রঙের ব্যবহার খুব বেশি দেখা যায়।

ম্যান্ড্রিল নামে একধরনের বানরের মুখে খুব সুন্দর নীল রঙের ছোঁয়া দেখা যায়

এখন তোমার মনে হতে পারে, বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে তো রঙের অনেক বৈচিত্র্য দেখা যায়। এমনকি ব্লু মাঙ্কি, ব্লু হোয়েল, ব্লু ওয়াইল্ডবিস্টের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীও তো আছে! তাহলে এদের নাম এমন কেন? আসলে এদের গায়ের রং সত্যিকারের নীল নয়। এদের শরীরের রং মূলত স্লেট পাথরের মতো ধূসর। এই রঙের কারণে নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশে প্রাণীকে দূর থেকে দেখলে কিছুটা নীলাভ মনে হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের জেডএসএল লন্ডন চিড়িয়াখানার সিনিয়র কিপার শ্যানন ফারিংটন এ বিষয়ে বলেছেন, মানুষের মতোই অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীরাও তাদের পরিবর্তনের ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রাণীদের নীল বা সবুজ ত্বক কিংবা গোলাপি চোখ থাকাটা কি তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব জরুরি? তারা বর্তমানে যেমন আছে, নীল রং কি তার চেয়েও ভালোভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করবে? আসলে হাজার হাজার বছরের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাণীরা ঠিক ততটুকুই পেয়েছে, যতটুকু তাদের প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন। অর্থাৎ নীল রং তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কোনো বাড়তি সুবিধা দেয় না বলেই প্রকৃতি তাদের নীল রং দেয়নি।

আরও পড়ুন

তবে এর মধ্যেও কিছু চমক আছে! ম্যান্ড্রিল নামে একধরনের বানরের মুখে খুব সুন্দর নীল রঙের ছোঁয়া দেখা যায়। এখানেও কিন্তু কোনো নীল পিগমেন্ট নেই। ম্যান্ড্রিলের ত্বকের ভেতরের কোষে কোলাজেন প্রোটিনের তন্তুগুলো এমন নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে যে সেখানে আলো পড়লেই তা নীল রং প্রতিফলিত করে। শ্যানন ফারিংটনের মতে, পুরুষ ম্যান্ড্রিলদের মুখ এবং শরীরের পেছনের অংশে নীল ও লালের এই অসাধারণ মিশ্রণ তৈরি হয়েছে মূলত সঙ্গীকে আকর্ষণ করার জন্য এবং নিজেদের আধিপত্য দেখানোর জন্য।

হোয়েল

একই ঘটনা দেখা যায় ভারভেট বানরের ক্ষেত্রেও। এদের শরীরেও কাঠামোগত কারণে নীল রং দেখা যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় আলোর এই ছড়িয়ে পড়ার নিয়মটিকে বলে টিন্ডাল ইফেক্ট। আকাশ কেন নীল দেখায়, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন; তাঁর নামেই এই ইফেক্টের নাম রাখা হয়েছে। যদিও পরে লর্ড র‍্যালে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করেন। তাই এটি র‍্যালে স্ক্যাটারিং নামেও পরিচিত। মানুষের চোখের মণি যে নীল হয়, তার পেছনেও এই টিন্ডাল ইফেক্টই কাজ করে। মানুষের নীল চোখে কিন্তু কোনো নীল পিগমেন্ট থাকে না!

অর্থাৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে নীল রং তৈরির মতো কোনো পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ নেই। তাই এই পৃথিবীতে সত্যিই সম্পূর্ণ নীল রঙের কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব নেই।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন