সকালে স্কুল শুরু করতে হয় কেন
সকাল সাতটা। অ্যালার্ম বাজছে। তোমার মনে হবে, কাঁথাটা টেনে আরেকটু ঘুমিয়ে নেই। একই সময়ে কেউ আবার চোখ খুলেই ভাবছে, আর মাত্র পাঁচ মিনিট! কিন্তু পাঁচ মিনিট করে ঘুমাতে থাকলে তো আর স্কুলে যাওয়া হবে না। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে, স্কুলের জন্য তৈরি হতে হবে, নাশতা খেতে হবে। তারপর স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রওনা দিতে হবে। ঘুমঘুম চোখে স্কুলে যাওয়ার এই অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষার্থীরই আছে। ছুটির দিনে যেখানে সকাল আটটা-নয়টা পর্যন্ত ঘুমানো যায়, স্কুলের দিনে সেখানে এত সকালে ওঠার কী দরকার?
স্কুলটা আরেকটু দেরিতে শুরু হলে কী এমন ক্ষতি হতো
প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের অনেক স্কুলেই সকাল আটটা বা তার কাছাকাছি সময়ে ক্লাস শুরু হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচিও সাধারণত সকালকে কেন্দ্র করেই সাজানো। ২০২৬ সালের সময়সূচি অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয় সকাল নয়টায়। ঢাকার বিদ্যালয়গুলোতে শীতকালীন সময়ে সকাল আটটা এবং গ্রীষ্মকালীন সময়ে সকাল সাড়ে সাতটায় কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময়সূচি রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে একক কোনো সময়সূচি নেই। কোনো স্কুলে সকালে ক্লাস শুরু হয়, আবার কোনো স্কুলে রয়েছে প্রভাতি ও দিবা শাখা। অর্থাৎ স্কুলভেদে সময় আলাদা হলেও দিনের প্রথম ভাগেই পড়াশোনা শুরু করার চল বেশ পরিচিত।
কিন্তু স্কুলের সময়সূচি এমন কেন? এর পেছনে কি শুধু পড়াশোনার ব্যাপারই আছে? নাকি জড়িয়ে আছে শিক্ষক, অভিভাবক, স্কুলের পরিবহনব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের সারা দিনের নানা কাজের হিসাবও।
মা-বাবার অফিস আছে না!
ধরা যাক, একজন অভিভাবককে সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাতে হবে। তাঁর সন্তান পড়ে কাছের একটি স্কুলে। স্কুল শুরু হয় সকাল আটটায়। সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর অফিসের পথে রওনা দেওয়া তাঁর জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু স্কুল শুরু হয় সকাল ১০টায়, অথচ অফিসে যেতে হবে তার আগেই। তখন সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। পরিবারের অন্য কেউ সাহায্য না করলে অভিভাবককে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের তো আর একা স্কুলে পাঠানো সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক শিশুকে মা-বাবা বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য স্কুলে পৌঁছে দেন। আবার স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও থাকে। স্কুলের সময়সূচি তাই অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আমাদের দেশের শহরগুলোর যানজটের কথাও ভাবতে হবে। বাসা থেকে স্কুলে যেতে যদি আধা ঘণ্টা লাগে, যানজটের কারণে সেটি এক ঘণ্টাও হয়ে যেতে পারে। সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে শিক্ষার্থীকে আরও আগে বাসা থেকে বের হতে হয়। আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিভাবককেও দিনের কাজ শুরু করতে হয়। ফলে স্কুলের ক্লাস শুরু হওয়ার সময়টি শুধু শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে ঠিক করা যায় না। পরিবারের অন্য সদস্যদের সময়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষকদেরও তো স্কুলে যেতে হয়
স্কুলে গিয়ে শুধু শিক্ষার্থীরাই পড়াশোনা করে না। শিক্ষকও সেখানে কাজ করতে যান। ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা, পাঠ পরিকল্পনা করা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেন তাঁরা। সব মিলিয়ে শিক্ষকদেরও ব্যস্ত দিন কাটে। স্কুলের নির্ধারিত সময়ে তাঁদের উপস্থিত থাকতে হয়। ক্লাস শুরুর আগে প্রস্তুতি নেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।
তাই স্কুলের সময়সূচি এমনভাবে ঠিক করা হয়, যাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে পারেন এবং দিনের কাজ ঠিকঠাক চলে। স্কুল যদি অনেক দেরিতে শুরু হয়, তাহলে ছুটিও দেরিতে হতে পারে। এতে শিক্ষকদের পরের কাজের সময়েও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে শিক্ষকদের কাজের সুবিধার জন্যই যে স্কুল সকালে শুরু করতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ, যাতায়াত, পরিবারের সময়সূচি, সবকিছুই বিবেচনায় রাখা দরকার। স্কুলের সময়সূচি ঠিক করার সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, দুই পক্ষের সুবিধাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল ছুটির পরও তো একটা জীবন আছে
স্কুলে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হতে পারে স্কুল ছুটির পরের সময়টা। স্কুল থেকে ফিরে অনেক শিক্ষার্থী খেলাধুলা করে, ছবি আঁকে, গান শেখে, বই পড়ে, সাইকেল চালায় কিংবা কোনো বিজ্ঞান বা গণিত ক্লাবের কার্যক্রমে অংশ নেয়। কেউ আবার সাঁতার শেখে, কেউ ফুটবল খেলে, কেউ নাচ বা সংগীতের ক্লাসে যায়। পড়াশোনার বাইরের এসব কাজও শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল যদি সকালে শুরু হয়, তাহলে দুপুর বা বিকেলের দিকে ছুটি হওয়ার সুযোগ থাকে। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দের কাজে সময় দিতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার চেষ্টা করতে পারে। স্কুলের পড়া শেষ করেই যে দিনের সব কাজ শেষ, তা তো নয়!
এমনকি স্কুলের হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজ শেষ করার জন্যও সময় দরকার। স্কুল থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে পড়তে বসা, পরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নেওয়া, এসবের পাশাপাশি নিজের পছন্দের কাজ করার সুযোগ থাকলে দিনটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে না। সকালবেলা স্কুল শুরু করার পক্ষে এটি একটি যুক্তি।
অবশ্য স্কুল দেরিতে শুরু হলেই যে এসব কাজের সময় একেবারে থাকবে না, তা নয়। স্কুলের ছুটির সময়, যাতায়াতে কতক্ষণ লাগছে, বাড়ির কাজের চাপ কেমন, এসবের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করে। স্কুল দেরিতে শুরু হলে যেমন সকালে ঘুমানোর বাড়তি সময় পাওয়া যায়, তেমনি ছুটি দেরিতে হলে বিকেলের কিছু কাজের সময় কমেও যেতে পারে। তাই দুই দিকের হিসাবই জরুরি।
স্কুলবাস বা পরিবহন
অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বাস থাকে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে একই স্কুলবাসকে বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষার্থী তুলতে হয়। একেক এলাকায় শিক্ষার্থীদের বাসা, স্কুলের দূরত্ব এবং যানজটের পরিস্থিতি একেক রকম। তাই সবাইকে একই সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে হলে বাসের যাত্রাপথও পরিকল্পনা করে নিতে হয়।
কিছু জায়গায় একই পরিবহনব্যবস্থা একাধিক স্কুল বা বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়। কোথাও প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সময়ে বাস চালাতে হয়। একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দিয়ে সেই বাস অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিতে গেলে সময়ের হিসাব মেলাতে হয়। এ কারণে কোনো কোনো এলাকায় বিভিন্ন স্তরের স্কুলের ক্লাস শুরুর সময়েও পার্থক্য থাকে।
তবে সব স্কুলের ক্ষেত্রে এই কারণ প্রযোজ্য নয়। অনেক শিক্ষার্থী হেঁটে, রিকশায় বা পরিবারের সঙ্গে স্কুলে যায়। কোথাও স্কুলবাসের ব্যবস্থা নেই। অনেকে স্কুল ভ্যানে যায়। সেটা সাধারণত স্কুলের বাইরের কেউ পরিচালনা করে। তাই বাসের সময়সূচি বা স্কুলভ্যানের কারণেও স্কুলের সময় নির্ধারিত হতে পারে।
সকালে উঠলেই কি মন বসে পড়ায়
এতক্ষণে সকালের স্কুলের পক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি পাওয়া গেল। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। খুব সকালে স্কুল শুরু হলেই কি শিক্ষার্থীরা বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারে? নাকি ঘুম থেকে ঠিকমতো না উঠেই ক্লাসে বসে থাকলে পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে?
এখানে ঘুমের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিশোর বয়সে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দে পরিবর্তন আসে। ফলে অনেক কিশোর-কিশোরীর রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায়। সকালে ঘুম ভাঙতেও তাদের বেশি সময় লাগে। অথচ পরদিন স্কুল থাকলে খুব ভোরে উঠতে হয়। রাতে দেরিতে ঘুমিয়ে সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে উঠতে তাদের ঘুমের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের সুপারিশ অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমায়। মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের ক্লাস শুরুর সময় কিছুটা পিছিয়ে দিলে কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের সময় বাড়তে পারে। এর সঙ্গে ভালো মেজাজ, স্কুলে উপস্থিতি, পড়াশোনার ফলাফল এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সকালে স্কুল শুরু করার সুবিধা থাকলেও সময়টা খুব বেশি এগিয়ে আনলে শিক্ষার্থীদের ঘুমের ওপর চাপ পড়তে পারে।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। সকালে ওঠার অভ্যাস তৈরি করা ভালো, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কম ঘুমিয়েও প্রতিদিন ঠিকঠাক পড়াশোনা করা সম্ভব। শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম দরকার। শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন ক্লান্ত থাকে, ক্লাসে ঘুম পায় কিংবা পড়ায় মনোযোগ দিতে না পারে, তাহলে শুধু সময়মতো স্কুলে উপস্থিত হওয়াটাই যথেষ্ট নয়।
তাহলে স্কুল কখন শুরু হওয়া উচিত
স্কুল কখন শুরু হবে, তার কোনো একক উত্তর নেই। একটি সময়সূচি অভিভাবকদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হতে পারে। আবার স্কুল দেরিতে শুরু হলে শিক্ষার্থীরা সকালে বেশি ঘুমানোর সুযোগ পেলেও ছুটির পর খেলাধুলা, কোচিং বা অন্যান্য কাজের সময় কমে যেতে পারে। শহরের যানজট, স্কুলের দূরত্ব, শিক্ষকদের সময়, পরিবহনব্যবস্থা এবং পরিবারের দৈনন্দিন রুটিন, সব মিলিয়েই সময়সূচি ঠিক করতে হয়।
তবে স্কুলের সময় ঠিক করার সময় শিক্ষার্থীদের বয়স ও ঘুমের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে খুব সকালে ক্লাস শুরু করার প্রয়োজন আছে কি না, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। স্কুলের সময় কিছুটা পিছিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পাবে কি না, আবার স্কুল ছুটির পর তাদের খেলাধুলা ও অন্যান্য কাজের সময় থাকবে কি না, সেটিও হিসাব করা দরকার।