সারা দিন গেম খেললে রাতে চোখ বন্ধ করলে কেন সেই গেম দেখা যায়
তুমি কি সারা দিন গেম খেলো? এমনকি রাতে ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করলে কি সেই গেমের দৃশ্যগুলোই চোখের সামনে ভেসে ওঠে? টেট্রিসের মতো পাজল গেম বা অন্য যেকোনো গেম বেশি খেললে এমনটা হতে পারে। তবে আশির দশকের জনপ্রিয় গেম টেট্রিস যারা খেলত, তাদের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যেত।
বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই দেখা যায় আকাশ থেকে রঙিন সব ব্লক নিচে পড়ছে এবং অবচেতন মনেই মানুষ সেগুলো সাজানোর চেষ্টা করছে। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ মানসিক অবস্থা নিয়ে গবেষণাও করেছেন। তাঁরা এটাকে নাম দিয়েছেন ‘টেট্রিস ইফেক্ট’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা ঠিক কখন তৈরি হয়?
যখন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই কাজের একটি স্থায়ী ছাপ তৈরি করে ফেলে।
১৯৮৪ সালে বাজারে আসা টেট্রিস বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও গেম। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এটি অন্য যেকোনো গেমের চেয়ে সবচেয়ে বেশি ধরনের ডিভাইসে খেলা যায়। এই গেম খেলার পদ্ধতি খুবই সাধারণ। গেম চলাকালীন সময় পর্দার ওপর থেকে বিভিন্ন আকৃতির ও রঙের কিছু ব্লক নিচে পড়ে, যেগুলোকে বলা হয় ‘টেট্রোমিনো’। খেলোয়াড়কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এই ব্লকগুলোকে ঘুরিয়ে এমনভাবে সাজাতে হয়, যেন নিচের দিকে একটি সোজা বা অনুভূমিক সারি তৈরি হয়।
যখনই একটি সারি পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে যায়, সেটি পর্দা থেকে মুছে যায়, খেলোয়াড় পয়েন্ট পায়। গেমটি যত সামনের দিকে এগোতে থাকে, ব্লকগুলো তত দ্রুত নিচে পড়তে শুরু করে। এই দ্রুতগতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে খেলোয়াড়কে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা মূলত মস্তিষ্কের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।
গেমটি মানুষের মস্তিষ্কে এত গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে এটি পরবর্তী সময়ে নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময় টেট্রিস খেলার পর মানুষের চিন্তাভাবনা ও দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে একধরনের পরিবর্তন আসে। একেই বিজ্ঞানীরা টেট্রিস ইফেক্ট বা টেট্রিস সিনড্রোম বলেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, যখন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই কাজের একটি স্থায়ী ছাপ তৈরি করে ফেলে। এর ফলে গেম না খেললেও আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো সেই একই উদ্দীপনা অনুভব করতে থাকে। এমনকি গেমের বাইরে বাস্তব জগতের বিভিন্ন বস্তু দেখলেও মস্তিষ্ক সেগুলোকে গেমের ব্লকের মতো সাজানোর চেষ্টা করে।
ভিডিও গেম নিয়ে অনেক গবেষণাই হয়েছে, যার বেশির ভাগই সহিংসতা বা বুদ্ধিমত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে। তবে টেট্রিস ইফেক্ট নিয়ে গবেষণাটি ভিন্নধর্মী।
এই অবস্থায় একজন ব্যক্তি গেম না খেললেও বাস্তবে কোনো বস্তু দেখলে সেটি কীভাবে অন্য একটির সঙ্গে খাপে খাপে বসানো যায়, তা নিয়ে অবচেতন মনে চিন্তা করতে থাকে। এমনকি ঘুমানোর আগে চোখ বন্ধ করলে অনেকে রঙিন ব্লকগুলো নিচে পড়তে দেখে। সেগুলো সাজানোর উপায় কল্পনা করে। এই মানসিক অবস্থাটি সাধারণত ঘুমের ঠিক আগে বা পরের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বেশি অনুভূত হয়।
টেট্রিস ইফেক্ট কেবল ভিডিও গেম খললেই হয়, এমন নয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজের সঙ্গেও যুক্ত। কেউ যদি সারা দিন নৌকায় ভ্রমণ করে, তবে রাতে বিছানায় শুয়েও তার মনে হতে পারে যে শরীর নৌকার মতো দুলছে। আবার নতুন কোনো চাকরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর অনেকে ঘুমানোর সময় নিজেকে সেই একই কাজ করতে দেখেন।
এটি আসলে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। যখন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজ বারবার করি, তখন সেই কাজের স্মৃতি আমাদের অবচেতন মনে থেকে যায়। এর ফলে কাজ বন্ধ করার পরও মস্তিষ্ক সেই একই অনুভূতি বা স্মৃতি বারবার ফিরিয়ে আনে। সহজ কথায়, মস্তিষ্ক যখন কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা কাজের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখনই এ ধরনের প্রভাব দেখা দেয়।
ভিডিও গেম নিয়ে অনেক গবেষণাই হয়েছে, যার বেশির ভাগই সহিংসতা বা বুদ্ধিমত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে। তবে টেট্রিস ইফেক্ট নিয়ে গবেষণাটি ভিন্নধর্মী। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা কাজে দীর্ঘ সময় মগ্ন থাকে, তখন মস্তিষ্ক সেই উদ্দীপনাটি ধরে রাখে। এটি ভিডিও গেম ও নিউরোসায়েন্সের এক চমৎকার মেলবন্ধন। সস্তা বা সহজ প্রযুক্তির গেমও যে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, টেট্রিস তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
দি একটি সাধারণ কম্পিউটার গেমের মাধ্যমে মানুষের এই মানসিক যন্ত্রণা কমানো যায় এবং তাঁদের ভয়ংকর সব স্মৃতি থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়। তবে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশাল পরিবর্তন আনবে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টেট্রিস খেলার এই বিশেষ প্রভাবটি ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ বা পিটিএসডি এর লক্ষণগুলো কমাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। টেট্রিসের মতো গেমগুলো মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থায় এমনভাবে কাজ করে, যা কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর মনের ভেতর বারবার ফিরে আসা যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিগুলোকে কমিয়ে দেয়। গবেষণার দলটি দেখেছে, কোনো আঘাতমূলক ঘটনার পর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে সেই ঘটনার প্রভাব অনেকটা কমে আসে।
গবেষণার লেখক অধ্যাপক এমিলি হোমস জানান, যেকোনো মানুষই জীবনে কোনো না কোনো সময় বড় ধরনের মানসিক আঘাত পেতে পারেন। যদি একটি সাধারণ কম্পিউটার গেমের মাধ্যমে মানুষের এই মানসিক যন্ত্রণা কমানো যায় এবং তাঁদের ভয়ংকর সব স্মৃতি থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়। তবে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশাল পরিবর্তন আনবে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনো প্রাথমিক স্তরের কাজ চলছে এবং আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।