ছেলে বাশারের চেয়ে বেশি ভয়ংকর ছিলেন বাবা হাফিজ আল–আসাদ
সিরিয়ায় টানা ৫৩ বছরের স্বৈরতন্ত্রের অবসান হলো। বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। স্বৈরশাসক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন তিনি। তবে তাঁকে নিয়ে আলেচনা করতে গেলে প্রথমে আলোচনায় আসে তাঁর বাবা জেনারেল হাফিজ আল-আসাদ। বাসার যে স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন সেটার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন হাফিজ। এখন দেখা যেতে পারে হাফিজের যাত্রা শুরু হয়েছিল কীভাবে?
১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া হাফিজ রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ ১৬ বছর বয়সেই বাথ পার্টির হাত ধরে রাজনীতি শুরু। বলা হয়ে থাকে, ১৯৪৬–৪৭ সালে বাথ পার্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল সিরিয়ার নাগরিক ও অর্থডক্স খ্রিষ্টান মিশেল আফলাক এবং সুন্নি মুসলিম সালাহ বিতারের হাত ধরে। সিরিয়ার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে এই দলের যাত্রা। উদার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা।
এদিকে রাজনীতির পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতেও যোগ দিয়েছিলেন হাফিজ। ১৯৫৫ সালে তিনি পাইলট পদ লাভ করেন।
এখানে একটি বিষয় মনে রখা দরকার, সিরিয়া আসলে কখনোই পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশ ছিল না। ফ্রান্সের কাছে ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পরই শুরু হয় দেশটির রাজনতিক সংকট। আর এই সংকট গভীর করার জন্য বরাবরই দায়ী দেশটির সামিরক বাহিনী। সিরিয়ার পরস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনওয়ের সেন্ট্রাল আরাকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিস্তারিত টাইমলাইন প্রকাশ করেছে। এই টাইমলাইন থেকে যাচ্ছে, স্বাধীনতা পাওয়ার ৫ বছরের মধ্যে সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। দেখা যাচ্ছে, ১৯৪৯ সাল থেকে সামরিক বাহিনী নিয়মিত সিরিয়ার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। এর পর থেকে বলা যায়, সামরিক বাহিনী দেশ চালিয়েছে নামমাত্র নির্বাচন দিয়ে।
সিরিয়ার রাজনীতিটাও ছিল সামরিক বাহিনীকেন্দ্রিক। এই যে এক সামরিক সরকারকে হটিয়ে অন্য সামরিক সরকার আসত, সেই পথটা তৈরি করে দিত রাজনৈতিক দলগুলো। ১৯৬৩ সালে হাফিজ কমান্ডার হন। এটা ছিল বাথ পার্টিকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করার পুরস্কার।
বলা যায়, ১৯৬৩ সাল ছিল হাফিজের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। কারণ, কমান্ডার হওয়ার পর তিনি ১৯৬৬ সালে অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তার জন্য দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন তিনি।
এবার ফেরা যাক রাজনীতিতে। ১৯৬৬ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাথ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা আফলাক ও বিতারকে সরিয়ে দেন বাশার আল-আসাদের বাবা জেনারেল হাফিজ আল-আসাদ। এরপর ১৯৭০ সালের নভেম্বরে এসে আরেকটি অভ্যুত্থান হয় দেশটিতে। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন হাফিজ আল-আসাদ। এরপরের বছর তিনি হন দেশটির প্রেসিডেন্ট।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার এই যাত্রায় হাফিজ ঠিক কত মানুষকে হত্যা করেছেনে এবং কত মানুষকে জেলে পাঠিয়েছেন, তার হিসাব নেই।
এখানে একটি বিষয় বলা দরকার, বাথ পার্টি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে ১৯৬৩ সালে। এর পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যেসব অভ্যুত্থান হয়েছে, সবই বাথ পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয়। আর ১৯৬৬ সাল থেকে এসব অভ্যুত্থানেরে নেতৃত্ব দিয়েছেন হাফিজ আল–আসাদ। তাঁর হাত বারবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে পার্টি ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের রক্তে। এমনকি তিনি তাঁর রাজনৈতিক গুরুর বিরুদ্ধেও অভ্যুত্থান করেছিলেন। ১৯৭০ বাথ পার্টির নেতা ও সামরিক কর্মকর্তা সালাহ আল জাদিদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেই ক্ষমতা নিয়েছিলেন হাফিজ।
হাফিজ ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হয় নির্যাতন ও নিপীড়ন। ১৯৮২ সালে হামা শহরে শুধু মুসলিম ব্রাদারহুড বিক্ষোভ শুরু করেছিল। এই বিক্ষোভ দমনে প্রথমে সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। এরপর সেখানে আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ চালান হাফিজ। এ জন্য তিনি বিমান হামলাও চালিয়েছিলেন সেখানে। দেশের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়ে বিরুদ্ধ মতকে দমনের ঘটনা নরিজবিহীন। ধারণা করা হয়, সে সময় ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আর অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়েছিল বিমান হামলায়।
এখানেই শেষ নেয়, এই সময় সামরিক বাহিনীর যাঁরা ওই হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তাদেরও কারাগারে নিয়েছিলেন হাফিজ। এমনই একজন রাগাদ আল-তাতারি। ১৯৮০–এর দশকে পাইলট ছিলেন তিনি। হামা শহরে হামলা চালাতে রাজি না হওয়ায় কারাবরণ করেছিলেন। আসাদ সরকারের পতনের পর তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
এভাবে ২০০০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন হাফিজ আল–আসাদ। এরপর শুরু হয় বাশার আল–আসাদ জামানা। তবে শুরুতেই গলদ। বাশার যখন প্রেসিডেন্ট হন তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হতে হলে বয়স হতে হয় ৪০ বছর। তবে স্বৈরতন্ত্রের কাছে তো আইন কোনো ইস্যু নয়। রাতারাতি আইন সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য বয়স ৩৪ করা হয়।
বলতে গেলে স্বৈরতন্ত্রের চামচ মুখে দিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন বাশার। বাবার মতোই স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন তিনি। এই চিত্র উঠে এসেছে বাশারের পতনের পর গত কয়েকদিনে। যেমন তাল আল-মালুহির কথা বলে যেতে পারে। ২০০৯ সালে বাশারকে সমালোচনা করে একটি ব্লগ পোস্ট লিখেছিলেন তিনি। তাঁকে সেই সময়ই কারাগারে নেওয়া হয়। বাশারের পতনের পর মুক্তি তিনি পেয়েছেন। তবে এত দিন কেউ জানতই না, তিনি বেঁচে আছেন কি না। আসলে বাশারের আমলে বিনা বিচারে কত মানুষ জেল খেটেছেন, তার হিসাব কারও কাছেই নেই।
এই দমনপীড়ন চরম মাত্রায় পৌঁছায় ২০১১ সালে। এর প্রেক্ষাপটটাও জানা দরকার। সিরিয়ার বর্তমান সংকটের সূচনা হয়েছিল আরব বসন্তের মাধ্যমে। ২০১০ ও ২০১১ সালে গণতন্ত্রকামীদের এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয়। এই আন্দোলনের ফলে বেশ কিছু দেশে স্বৈরশাসনের অবসান হয়।
আন্দোলন শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। পুলিশের দুর্নীতির প্রতিবাদে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায় শুরু হয় আন্দোলন। এর জেরে পদত্যাগে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বেন আলী। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। একই বছর লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছরের অক্টোবরে হত্যাও করা হয় তাঁকে।
তখন গণতন্ত্রকামীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সিরিয়াতেও। তবে বাশার সেই আন্দোলন থামাতে পেরেছিলেন। যদিও এই আন্দোলনের জেরে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পরে পুরো সিরিয়ায়। এরপর বিরোধীরাও অস্ত্র হাতে তুলে নেন বেশ ভালোভাবেই। আর এ কারণে সিরিয়ার ৭৫ শতাংশ চলে যায় বিদ্রোহীদের হাতে। যদিও ইরান এবং রাশিয়ার সহায়তায় এসব এলাকা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন বাশার। জাতিসংঘ বলছে, ২০১১ সালে থেকে এ গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ লাখ মানুষ। তবে শেষ রক্ষা হলো না। বাশার ক্ষমতা হারালেন, দেশ ছেড়ে পালিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন। এর মাধ্যমে বাবা হাফিজ আল-আসাদের ২৯ বছর আর ছেলে বাশার আল-আসাদের ২৪ বছরের স্বৈরতন্ত্রের অবসান হলো।
