বাস্তবে নেই, তবু মানুষ বাতিঘর দেখতে পায় কেন
পৃথিবীর যে যে অঞ্চলে বাতিঘর রয়েছে, সেখানেই এমন ভুতুড়ে দৃষ্টিবিভ্রমের কথা শোনা যায়। তবে এই রহস্য নিয়ে গবেষণা করার জন্য অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশেষ দ্বীপ সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বলে প্রমাণ করেছেন গবেষকেরা।
বাতিঘরের আশপাশে থাকা মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়। তাদের মনে হয়, বাতিঘরের আলোটি পেছনের স্থলভাগ থেকে আসছে না, বরং সমুদ্রের মাঝখানে কোথাও ভাসছে। অথচ তারা ভালো করেই জানে যে এটি অসম্ভব। এই অদ্ভুত ঘটনাকে বলা হয় ‘ফ্যান্টম লাইটহাউস’ বা ‘ভুতুড়ে লাইটহাউস’ বিভ্রম।
এই দৃষ্টিবিভ্রম নিয়ে সম্প্রতি নতুন গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এমন এক ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছেন, যা শুধু বাতিঘর নয়, আরও অনেক দৃষ্টিবিভ্রমের ক্ষেত্রেও সত্য। দিগন্তের কাছাকাছি এলে চাঁদকে কেন অনেক বড় দেখায়, তার পেছনেও একই কারণ কাজ করে।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ‘লেডি এলিয়ট’ দ্বীপে এই দৃষ্টিবিভ্রম এত প্রবল যে পর্যটকদের গাইডবইয়েও এর কথা লেখা আছে। সাধারণত দর্শনীয় কিছু না থাকলে এমন অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে পারে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রবালপ্রাচীর বা রিফ, যেখানে সুন্দর জিনিসের কোনো কমতি নেই। ১৯৩০-এর দশক থেকেই বিজ্ঞানীরা এই ভুতুড়ে বাতিঘর নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন।
এই গবেষণা করার সময় উইনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের সাইমন ক্রপার একটি অ্যানিমেটেড চিত্র বা জিআইএফ তৈরি করেছেন। সেখানে দেখানো হয়েছে, পেছনে থাকা কোনো বাতিঘরের দিকে পিঠ করে সমুদ্রের দিকে তাকালে একজন মানুষ ঠিক কী দেখেন। আমাদের মস্তিষ্ক যতই জানুক যে বাতিঘরটি পেছনে স্থির হয়ে আছে, তবু চোখের এই দৃষ্টিভ্রম এড়ানো যায় না।
কেন হয় এই ভুতুড়ে বাতিঘরের কাণ্ড
লেডি এলিয়ট দ্বীপে এই অদ্ভুত দৃষ্টিবিভ্রম নিজের চোখে দেখার পর অধ্যাপক চার্লস কেম্প ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর ব্যবহার করে হুবহু একই রকম একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষক ক্রপার, কেম্প এবং ওয়েলুন জু এই রহস্যের একটি সহজ সমাধান খুঁজে পান।
গবেষকদের মতে, এই দৃষ্টিবিভ্রম ঘটার মূল কারণ হলো, আমরা আলোর রশ্মির অনেক দূরের দূরত্বকে কম বলে ধরে নিই।
মজা করে গবেষকেরা বলেন, ‘আমাদের চোখ সাধারণত চারপাশের দুনিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিলেও মাঝেমধ্যে ভুল করে বসে। এই দৃষ্টিভ্রমগুলো আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে আমাদের দেখার প্রক্রিয়ায় কোথায় এবং কেন ভুল হচ্ছে। একই সঙ্গে এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের কাজের কৌশলগুলোও প্রকাশ করে।’
‘দ্য কনভারসেশন’ পত্রিকায় ক্রপার ও কেম্প লিখেছেন, আমাদের গবেষণা থেকে স্পষ্ট মানুষ বাস্তবে যা দেখে, তা হলো তার আশা এবং চোখের দেখা তথ্যের একটি মিশ্রণ। রাতের বেলা দূরত্ব বোঝার নানা উপায় বা সংকেত এমনিতেই অনেক কমে যায়। বিশেষ করে সমুদ্রের দিকে তাকালে সেগুলো প্রায় চোখেই পড়ে না। ফলে তখন আমাদের মনের প্রত্যাশাই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আধুনিক বাতিঘরগুলো খুব বড় ও শক্তিশালী হয়, যাতে সমুদ্রের দূরদূরান্ত থেকে জাহাজগুলো আলো দেখতে পায়। এর মানে হলো, এগুলো সাধারণ দূরত্বের চেয়ে অনেক বড় পরিসরে কাজ করে। আমরা যেহেতু সাধারণত কাছাকাছি জিনিস দেখতেই অভ্যস্ত, তাই আমাদের মস্তিষ্ক ধরে নেয় যে বাতিঘরের আলোটি আসলে যতটা দূরে আছে, তার চেয়ে অনেক কাছে রয়েছে।
যখন কেউ অনেক দূরের দ্রুত ঘুরতে থাকা আলোর রশ্মি দেখেন, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে কাছে থাকা কোনো বস্তু বলে ভুল করে। আর কাছে থাকা কোনো বস্তু চোখের সামনে দিয়ে গেলে তার গতি কম মনে হয়। অথচ মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া আলোর দূরত্ব মানুষ ঠিকঠাকই বুঝতে পারে।
ফলে আলোর দূরের অংশটি অনেক বড় জায়গা জুড়ে দ্রুত ঘুরলেও দর্শক ঠিক তার উল্টোটা দেখেন। অর্থাৎ তারা মনে করেন যে দূরের আলোটি খুব আস্তে আস্তে ঘুরছে। এই চমৎকার দৃষ্টিভ্রমটি ভালোমতো বুঝতে হলে অবশ্যই সমুদ্রের অনেক দূরে থাকা বাতিঘরের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
পরীক্ষা করে যা দেখা গেল
ফ্যান্টম বাতিঘরের এই দৃষ্টিবিভ্রম নিয়ে নাবিকরা অতীতে বহুবার নানা তথ্য জানিয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তারা বাতিঘর বা প্রবালপ্রাচীর থেকে এক কিলোমিটার বা তার চেয়েও বেশি দূরে অবস্থান করছিলেন।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যাখ্যা যদি সত্যি হয়, তবে ৩০ মিটার বা ১০০ ফুট উঁচু কোনো বাতিঘর থেকে অন্তত ৬৭ মিটার বা ২২০ ফুট দূরে থাকা মানুষই কেবল এই বিভ্রম দেখতে পাবেন। অর্থাৎ বাতিঘর যত লম্বাই হোক না কেন, এই ভুতুড়ে কাণ্ড দেখতে হলে দর্শকদের তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকতে হবে।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, বাতিঘর থেকে ঠিক ৬৭ মিটার দূরে দাঁড়ালে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তাদের মনে হবে আলোটি সামনে থেকে আসছে, নাকি পেছন থেকে। আর তার চেয়েও দূরে গেলে, বাতিঘরের আসল অবস্থান জানা থাকলেও সমুদ্রের মাঝখানে আলো ভাসার সেই ভুল অনুভূতি কাটবে না।
এই ভবিষ্যদ্বাণীটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অন্য অনেক তত্ত্বে বলা হয়েছিল যে দর্শক বাতিঘর থেকে কত দূরে আছে, তাতে কিছু যায় আসে না; বিভ্রম সব সময়ই দেখা উচিত।
ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর ব্যবহার করে বাতিঘরের বিভিন্ন দূরত্বের আলোর যে রূপ দেখা গেছে, তা বিজ্ঞানীদের এই অনুমানের সঙ্গে মিলে গেছে। লেডি এলিয়ট দ্বীপে গবেষকদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও এর সঙ্গে মিলেছে, যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অন্য কোনো মানুষের ওপর এর পরীক্ষা চালাননি। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কেউ স্বেচ্ছায় ওই দ্বীপে গিয়ে এই পরীক্ষাটি করে দেখতে পারেন।
বাতিঘর নিয়ে আরেকটি অদ্ভুত কথা প্রচলিত আছে। অনেকের মনে হয়, বাতিঘরের আলোটি সমুদ্রের পানির সমান্তরালে চলার বদলে কেমন যেন নিচের দিকে বেঁকে যাচ্ছে। গবেষকদের ধারণা, আলোর এই বেঁকে যাওয়ার রহস্যও একই নিয়মে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
লেডি এলিয়ট দ্বীপটি বেশ মজার একটি জায়গা, কারণ সেখানে আসলে দুটি বাতিঘর রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো বাতিঘরটি প্রায় ১২০ বছর সেবা দেওয়ার পর ১৯৯৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সেটিকে ভেঙে ফেলা হয়নি। এই দ্বীপটিতে পাশাপাশি দুটি বাতিঘর থাকলেও, পুরোনো বাতিঘরটি চালু থাকলেও আজকের এই দৃষ্টিভ্রমের জন্য সেটি দায়ী হতো না। পুরো গবেষণাটি ‘ওপেন মাইন্ড’ জার্নালে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যাতে যে কেউ চাইলে এটি পড়তে পারেন।