সব মানুষের কণ্ঠস্বর আলাদা কেন
তুমি যখন ফোনে কোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলো, তখন কি তার নাম জিজ্ঞেস করতে হয়? মোটেও না! তুমি গলা শুনেই বুঝে ফেলো, ওপাশে কে কথা বলছে। অন্ধকারেও শুধু গলার স্বর শুনে মা, বাবা, ভাইবোন বা বন্ধুদের খুব সহজেই চিনে ফেলা যায়। এমনকি ফোনে শুধু ‘হ্যালো’ শব্দটা শুনেই তুমি বুঝতে পারো, অপর পাশের মানুষটির মন খারাপ নাকি ভালো। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষের মধ্যে তোমার গলার স্বরটা কেন একেবারেই তোমার মতো? কেন অন্য কারও কণ্ঠের সঙ্গে তোমার কণ্ঠের হুবহু মিল নেই?
মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের কণ্ঠস্বর অনেকটা আঙুলের ছাপের মতোই অনন্য। অর্থাৎ তোমার গলার স্বর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কারও নেই! এমনকি দেখতে হুবহু এক রকম যমজ ভাইবোনদের গলার স্বরেও খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। চলো, আজ জেনে নিই আমাদের গলার এই জাদুকরি রহস্যের পেছনের বিজ্ঞান।
কণ্ঠস্বরকে তুমি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে পারো। যেমন ধরো, গিটার বা বাঁশি। কোনো বাদ্যযন্ত্র থেকে কেমন আওয়াজ বেরোবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে ওই যন্ত্রের আকার, আকৃতি ও গঠনের ওপর। আমাদের শরীরও ঠিক একইভাবে কাজ করে। আমরা যখন কথা বলি, তখন আমাদের শরীরের ভেতরে থাকা জ্যান্ত বাদ্যযন্ত্রটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে।
তুমি যখন কথা বলতে চাও, তখন ফুসফুস থেকে বাতাস ওপরের দিকে উঠে আসে। আমাদের গলার ভেতর স্বরযন্ত্র নামের একটা অংশ আছে। এর ভেতর থাকে ভোকাল কর্ড। একে আমরা বাংলায় বলি স্বরতন্ত্রী। এগুলো দেখতে দুটো ছোট পর্দার মতো। ফুসফুস থেকে বাতাস যখন ভোকাল কর্ডের ভেতর ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন কর্ডগুলো কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনি থেকেই তৈরি হয় মূল আওয়াজ।
ভোকাল কর্ডের আকার ও দৈর্ঘ্য একেকজনের একেক রকম হয়। পুরুষের ভোকাল কর্ড সাধারণত একটু লম্বা ও মোটা হয়। তাই কাঁপুনির গতি কম থাকে এবং তাঁদের গলা ভারী শোনায়। তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে কৈশোরে ছেলেদের গলার স্বর হঠাৎ করে বদলে যায়। একে বয়ঃসন্ধিকালের ভয়েস ব্রেক বলে। এ সময় ভোকাল কর্ড হঠাৎ আকারে বড় হয়ে যায় বলেই গলার আওয়াজ ভারী হয়ে যায়। অন্যদিকে নারী ও শিশুদের ভোকাল কর্ড ছোট ও পাতলা হওয়ায় তাদের গলার স্বর চিকন থাকে।
ভোকাল কর্ড থেকে যে আওয়াজ তৈরি হয়, সেটা শুনতে কিন্তু খুব একটা শ্রুতিমধুর নয়; অনেকটা ভোঁ ভোঁ বা ভনভন আওয়াজের মতো। এই আদি আওয়াজ এরপর আমাদের গলা, নাক ও মুখের ফাঁকা জায়গার ভেতর দিয়ে যায়। গিটারের পেটের ভেতরের ফাঁকা জায়গাটা যেমন শব্দের প্রতিধ্বনি তৈরি করে শব্দকে সুন্দর করে, আমাদের নাক-মুখের ফাঁকা জায়গাগুলোও ঠিক সেই সাউন্ডবক্সের মতো কাজ করে। যেহেতু পৃথিবীতে কোনো দুজন মানুষের মুখমণ্ডল, গলার ভেতরের গঠন বা নাকের আকার একদম হুবহু এক নয়, তাই শব্দটা যখন ভোকাল কর্ড থেকে বের হয়, তখন সেটা প্রত্যেকের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট রূপ পায়।
তবে এখানেই কিন্তু শেষ নয়! শব্দ তৈরি হওয়ার পর সেটাকে কথায় রূপ দেওয়ার জন্য আমাদের ঠোঁট, জিব, দাঁত ও মুখের পেশিগুলো কাজ করে। তুমি যখন কোনো শব্দ উচ্চারণ করো, তখন তোমার মুখ, জিব, স্বরযন্ত্র ও ডায়াফ্রামের পেশিগুলো ঠিক কত মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানে সংকুচিত বা প্রসারিত হবে, তার টাইমিং প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা! এমনকি তুমি আর তোমার বন্ধু যদি ঠিক একই শব্দ উচ্চারণ করো, তবু তোমাদের পেশির নড়াচড়ার টাইমিংয়ে অতি সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকবেই। ব্যাপারটা অনেকটা একই গান দুজন ভিন্ন গায়কের গাওয়ার মতো।
আমাদের কণ্ঠস্বর শুধু শরীরের কাঠামোর ওপরই নির্ভর করে না, চারপাশের পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। ছোটবেলা থেকে আমরা যে পরিবেশ বা সংস্কৃতিতে বড় হই, আমাদের কথা বলার ধরন, টান বা উচ্চারণ সেভাবেই তৈরি হয়। আমরা অবচেতনভাবেই আমাদের চারপাশের মানুষদের অনুকরণ করে কথা বলতে শিখি।
সব মিলিয়ে তোমার ভোকাল কর্ডের দৈর্ঘ্য, তোমার নাক-মুখের ভেতরের গঠন, কথা বলার সময় পেশির নিখুঁত টাইমিং ও তোমার চারপাশের পরিবেশ—এই সবকিছু একসঙ্গে মিলে তোমার কণ্ঠকে পৃথিবীতে একেবারে অদ্বিতীয় করে তুলেছে। আর এ জন্যই আজকাল অনেক স্মার্টফোন, ঘরের দরজা বা ব্যাংকের লকারে পাসওয়ার্ড হিসেবে মানুষের গলার স্বর ব্যবহার করে!