ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খিটখিটে হয় কেন

ক্ষুধা লাগলে পেট জ্বালা করে বা পেটব্যথার মতো কষ্টদায়ক কোনো অনুভূতি হয়ছবি: পেক্সেলস

খুব ক্ষুধা পেয়েছে, আর হঠাৎই তোমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। তুমি হুট করে বাসার সবার ওপর রাগ ঝাড়তে শুরু করলে। তোমার সঙ্গে কি কখনো এমনটা হয়েছে? অথবা ক্ষুধার্ত অবস্থায় অন্য কেউ কি হুট করে তোমার ওপর রেগে গেছে?

যদি এমনটা হয়ে থাকে, তবে তুমি আসলে ‘হ্যাংরি’ (Hangry) অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছ। ইংরেজি ‘হাংরি’ অর্থ ক্ষুধার্ত। ‘অ্যাংরি’ মানে রাগান্বিত। শব্দ দুটির মধ্যে মিল আছে। সহজ কথায়, ঠিক সময়ে খাবার না পেলে মেজাজ খিটখিটে ও বদমেজাজি হয়ে ওঠার স্বভাবকেই হ্যাংরি বলা হয়।

কিন্তু ক্ষুধা লাগার সঙ্গে এই রাগের সম্পর্কটা কোথায়? আর কেনই–বা সবার এমন হয় না, কেবল কারও কারও ক্ষেত্রে এমন দেখা যায়? তাহলে চলো জেনে নিই আসল কারণ। যাতে পরেরবার ক্ষুধা পেলে রাগ করার আগেই তোমার মনে পড়ে যায় কেন আসলে এমনটা হচ্ছে।

প্রতিদিন যাই খাওয়া হয় পেট তা প্রথমে হজম করে। হজমের পর খাবারগুলো ভেঙে গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো ছোট ছোট উপাদানে পরিণত হয়। এই পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তের সঙ্গে মিশে আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে কাজ করার শক্তি জোগায়।

আরও পড়ুন

কিন্তু খাবার খাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেলে রক্তে থাকা এই পুষ্টি উপাদানগুলোর পরিমাণ আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে রক্তে যখন গ্লুকোজের মাত্রা অনেক বেশি কমে যায়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক বেশ বিপদে পড়ে যায়। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ বেঁচে থাকার জন্য চর্বি বা প্রোটিন থেকে শক্তি নিতে পারলেও, মস্তিস্ক কিন্তু গ্লুকোজ ছাড়া একদম চলতে পারে না। মস্তিষ্কের সচল থাকার জন্য সারাক্ষণ গ্লুকোজ দরকার হয়। রক্তে এর কমতি হলে মস্তিষ্ক পুরো ব্যাপারটিকে একটি জরুরি ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি হিসেবে ধরে নেয়।

গবেষকদের মতে, বার্ধক্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত

রক্তে গ্লুকোজ কমে গেলে মস্তিষ্কের এই ছটফটানি তুমিও হয়তো খেয়াল করেছ। পেট খালি থাকলে খুব সহজ কাজগুলোও তখন কঠিন মনে হয়। কোনো জিনিসে সহজে মনোযোগ দেওয়া যায় না, ছোটখাটো কাজেও ভুল হয়ে যায়। কিংবা কথা বলতে গেলে কথা জড়িয়ে যায়। মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত গ্লুকোজ না পৌঁছানোর কারণেই মূলত এমনটা ঘটে।

তবে রক্তে কেবল গ্লুকোজ কমে যাওয়া মেজাজ খিটখিটে হওয়ার একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে শরীরের আরেকটি বিশেষ আত্মরক্ষাব্যবস্থা কাজ করে। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘গ্লুকোজ কাউন্টার-রেগুলেটরি রেসপন্স’।

সহজ কথায়, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ যখন অতিরিক্ত মাত্রায় নেমে যায়, তখন মস্তিষ্ক বুঝতে পারে শরীর আর চলতে পারছে না। তখন মস্তিষ্ক তড়িঘড়ি করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে এমন কিছু হরমোন তৈরি করার নির্দেশ দেয়, যা রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে পারে।

আরও পড়ুন
রক্তে গ্লুকোজ বাড়াতে আমাদের শরীর চারটি হরমোন তৈরি করে
ছবি: রয়টার্স

রক্তে গ্লুকোজ বাড়াতে আমাদের শরীর চারটি হরমোন তৈরি করে। গ্রোথ হরমোন, গ্লুকাগন, অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল। এর মধ্যে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হলো স্ট্রেস বা মানসিক চাপের হরমোন, যা যেকোনো বিপদে বা খালি পেটে শরীর রক্তে ছেড়ে দেয়। বিশেষ করে অ্যাড্রেনালিন হরমোন আমাদের ভেতর ‘লড়াই করো নয়তো পালাও’ পরিস্থিতি তৈরি করে। হঠাৎ সামনে সাপ দেখলে আমরা যেভাবে ভয় বা মারমুখী হয়ে উঠি, পেটে খাবার না থাকলেও এই হরমোনের কারণে সামান্যতে তেমন রাগ উঠে যায়।

এর পাশাপাশি মস্তিষ্কে নিউরোপেপটাইড ওয়াই নামের একটি রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা একসঙ্গে ক্ষুধা ও রাগ নিয়ন্ত্রণ করে। যাঁদের মস্তিষ্কে এটি বেশি থাকে, তাঁরা একটু বেশিই রাগী স্বভাবের হন। ক্ষুধার চোটে মাথা গরম হওয়া বন্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগার আগে বাদাম, ফল বা ওটসের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। চিপস বা চকলেটের মতো জাঙ্ক ফুড খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হুট করে বেড়ে আবার দ্রুত নেমে যায়, যা মেজাজ আরও খিটখিটে করে তোলে।

তবে ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলেও ভয়ের কিছু নেই। কিছু সময় পর শরীরের নিজস্ব ব্যবস্থা সচল হয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক করে আনে। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা ঝামেলার কাজ খালি পেটে না করে, সব সময় ভরপেট খাওয়ার পর করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: দ্য কনভার্সেশন
আরও পড়ুন