হৃৎপিণ্ড কি একসময় সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে
টিক...টিক...টিক...
না, এটি কোনো ঘড়ির কাঁটার শব্দ নয়। এটি তোমার বুকের বাঁ পাশে টানা বেজে চলা এক অদ্ভুত যন্ত্রের শব্দ। জন্মের আগে থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই হৃৎপিণ্ড নামের যন্ত্রটি এক সেকেন্ডের জন্যও থামে না। এর কোনো বিশ্রাম নেই, কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। কিন্তু এই টানা কাজ করতে থাকা যন্ত্রটি নিয়ে তোমার মনে কি কখনো একটি অদ্ভুত প্রশ্ন জেগেছে? আমাদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের কি কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে? অর্থাৎ, হৃৎপিণ্ড কি আগে থেকেই ঠিক করা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যকবার স্পন্দিত হওয়ার পর চিরতরে থেমে যায়?
শুনে হয়তো তুমি একটু অবাক হতে পারো, তবে হ্যাঁ, অঙ্কের হিসাবে আমাদের জীবনের মোট হার্টবিটের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ৮০ বার স্পন্দিত হয়। এই হিসাব অনুযায়ী, আমাদের জীবনের পুরো সময়ে বেশির ভাগ মানুষের হৃৎপিণ্ড সব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ কোটির চেয়ে কিছুটা কমবার স্পন্দিত হওয়ার সুযোগ পায়।
তুমি যদি ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসাব করো, তবে দেখবে, মিনিটে ৮০ বার স্পন্দিত হলে এক ঘণ্টায় তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮০০ বার, আর এক দিনে ১ লাখ ১৫ হাজার ২০০ বার স্পন্দিত হয়। এভাবে একজন মানুষের গড় আয়ু হিসাব করলে জীবনের মোট স্পন্দন সংখ্যা ওই ৪০০ কোটির কাছাকাছি গিয়েই পৌঁছায়।
সংখ্যাটা শোনার পর তোমার মনে হতে পারে, ও আচ্ছা! তার মানে, হৃৎপিণ্ড ৪০০ কোটিবার স্পন্দিত হওয়ার পরপরই মানুষ মারা যায়!
এখানেই একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাপার বোঝার আছে। মানুষ এই কারণে মারা যায় না যে হৃৎপিণ্ডের জন্য বরাদ্দ স্পন্দনের সংখ্যা শেষ হয়ে যায়। বরং মানুষ মারা যায় বলেই হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন শেষ হয়ে যায়! অর্থাৎ তোমার শরীরের হৃৎপিণ্ড কোনো আগে থেকে সেট করা টাইমার বা অ্যালার্ম ঘড়ি নয় যে নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা কাজ করা বন্ধ করে দেবে।
এবার চলো, মানুষ বাদে প্রাণিজগতের অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। বিজ্ঞানীদের মতে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জীবনকালের সঙ্গে তাদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের এক অদ্ভুত ও মজাদার সম্পর্ক রয়েছে। বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পুরো জীবনের মোট হার্টবিটের সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি থাকে। ব্যাপারটা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটিই সত্য!
উদাহরণ হিসেবে একটি ছোট হ্যামস্টারের কথা ধরা যাক। একটি হ্যামস্টারের হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে প্রায় ৪০০ বার স্পন্দিত হয়! তাদের হৃৎপিণ্ড চলে রীতিমতো রেসিং কারের গতিতে। কিন্তু এই ছোট্ট প্রাণীটি বাঁচে মাত্র চার বছরের মতো। এই চার বছরে তার হৃৎপিণ্ড মোট স্পন্দিত হয় প্রায় ৮৪ কোটিবার।
এবার ছোট্ট হ্যামস্টারের সঙ্গে বিশাল আকৃতির একটি প্রাণী; অর্থাৎ হাতির তুলনা করা যাক। হাতির শরীর যেমন বিশাল, তার হৃৎপিণ্ডও তেমনি ধীরস্থিরভাবে কাজ করে। হাতির হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে মাত্র ৩৫ বার স্পন্দিত হয়। গড়ে একটি হাতি যদি ৩৫ বছর বাঁচে, তবে তার পুরো জীবনে হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হয় প্রায় ৬৪ কোটি বার।
খেয়াল করে দেখো, এত ছোট একটি হ্যামস্টার এবং বিশাল একটি হাতির জীবনকালের মোট হার্টবিটের সংখ্যা কিন্তু বেশ কাছাকাছি!
হাতি এবং হ্যামস্টারের হার্টবিটের এই অদ্ভুত মিলের পেছনের কারণটা কিন্তু খুব চমকপ্রদ। প্রাণিজগতে যেসব প্রাণীর হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হয়, তারা সাধারণত আকারে বেশ ছোট হয়। আর ছোট হওয়ার কারণে বনে-জঙ্গলে তাদের বেঁচে থাকাটা অনেক বেশি কঠিন। পদে পদে শিকারি প্রাণীর হাতে মারা পড়ার বা খাদ্যাভাবে না খেয়ে মরার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে তাদের জীবনে।
এই বিশাল ঝুঁকির সঙ্গে মানিয়ে নিতেই পরিবর্তনের মাধ্যমে ছোট প্রাণীদের জীবনচক্র এমনভাবে তৈরি হয়েছে। তারা খুব দ্রুত বড় হয় এবং খুব অল্প বয়সেই বাচ্চা জন্ম দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। ছোট প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলে, তারা দ্রুত বড় হয় এবং তাদের জীবনকালও ছোট হয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, হৃৎপিণ্ড কি তবে একসময় সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ। আমাদের শরীরের অন্যান্য পেশির তুলনায় হৃৎপিণ্ডের পেশি খুব ধীরে ধীরে নিজেকে মেরামত করতে পারে। এ কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা জীবন টানা কাজ করতে করতে যেকোনো হৃৎপিণ্ডই একসময় ক্ষয়ে যায় বা দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে মনে রাখার মতো সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হলো, এই ক্ষয়ে যাওয়া বা থেমে যাওয়ার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার হাত নেই। একটি নির্দিষ্টসংখ্যক স্পন্দনের কোটা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণেই হৃৎপিণ্ড ঠিক ওই মুহূর্তে থেমে যায়, এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাই হৃৎপিণ্ড কতবার স্পন্দিত হলো, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনোই কারণ নেই। হৃৎপিণ্ড তার নিজের নিয়মেই চলবে!