বজ্রপাতের সময় যে কাজগুলো করা একদম ঠিক নয়

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ শতাংশ বজ্রপাত এমন সময়ে ঘটে, যখন কোনো বৃষ্টিই হচ্ছে না!ছবি: উইকিপিডিয়া

আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায় আর মেঘের ডাক শুরু হয়, তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগলেও এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, মাত্র একটি বজ্রপাতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ থাকে, তা দিয়ে লাখ লাখ বাল্ব একসঙ্গে জ্বালানো সম্ভব।

আমরা মনে করি ঘরের ভেতরে থাকলেই হয়তো পুরোপুরি নিরাপদ। কিন্তু বজ্রপাতের সময় আমরা অজান্তেই এমন কিছু কাজ করি যা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এই সময়ে কোন কাজগুলো কখনোই করা উচিত নয়, তা আমাদের সবারই জেনে রাখা প্রয়োজন।

বজ্রপাতের সময় কেন গাছের নিচে দাঁড়াবে না

আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায়, তখন বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই বড় কোনো গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিশেষজ্ঞ জন জেনসেনিয়াসের মতে, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর কারণ, বজ্রপাত সাধারণত এলাকার সবচেয়ে উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত করে। উঁচু গাছটি হতে পারে সেই লক্ষ্য।

তবে বিপদের শেষ এখানেই নয়। গাছ থেকে সেই বিদ্যুৎ মুহূর্তেই শরীরে গিয়ে আঘাত করতে পারে। কারণ, গাছের চেয়ে মানুষের শরীর বেশি বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। তাই শুধু গাছ নয়, লম্বা কোনো কাঠের খুঁটি বা উঁচু কাঠের কাঠামোর পাশে দাঁড়ানোও প্রাণঘাতী হতে পারে।

আরও পড়ুন

খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কেন বিপজ্জনক

বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি কোনো খোলা জায়গায় অবস্থান করাও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় আমরা মনে করি, আশেপাশে কোনো উঁচু গাছ নেই মানেই আমরা নিরাপদ। কিন্তু সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুসারে, বারান্দা, পার্ক, খেলার মাঠের মতো খোলা জায়গাগুলো বজ্রপাতের সময় এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এর কারণ হলো, খোলা জায়গায় নিজেই হয়তো সেই এলাকার সবচেয়ে উঁচু বস্তু। ফলে বজ্রপাত সরাসরি আঘাত হানার সুযোগ পায়। বজ্রপাত সব সময় ভূমির সবচেয়ে কাছের ও পরিবাহী বস্তুকে খুঁজে নেয়। তাই আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একমুহূর্ত দেরি না করে কোনো দালান বা সুরক্ষিত আশ্রয়ের ভেতরে চলে যাওয়া উচিত।

বজ্রপাত

বিপদ এড়াতে মাটিতে শুয়ে পড়া কি ঠিক

বজ্রপাত সাধারণত এলাকার সবচেয়ে উঁচু বস্তুকে আগে আঘাত করে। সেই হিসেবে নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব নিচু করে রাখাটাই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? যুক্তিটি ঠিক মনে হলেও, বজ্রঝড়ের সময় মাটিতে শুয়ে পড়া মোটেও নিরাপদ নয়।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, বজ্রপাত সরাসরি শরীরে না পড়ে যদি ১০০ ফুট দূরেও আঘাত করে, তবু তা বিপদের কারণ হতে পারে। কেননা বজ্রপাতের বিদ্যুৎ মাটির ওপর দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

যদি কেউ মাটিতে শুয়ে থাকে তখন শরীরের অনেকটা অংশ মাটির সংস্পর্শে থাকে। ফলে সেই বিদ্যুৎ সহজেই হৃদ্‌যন্ত্র বা মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারে। একে বলা হয় গ্রাউন্ড কারেন্ট।

তাই এমন পরিস্থিতিতে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বসে, মাথা নিচু করে এবং দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে রাখা যেতে পারে। এতে মাটির সঙ্গে শরীরের যোগাযোগ যেমন কম থাকে, তেমনি বজ্রপাতের শব্দ থেকেও কান সুরক্ষিত থাকে।

আরও পড়ুন
কালবৈশাখী
ফাইল ছবি

ঝড় থেমে গেলেই কি বাইরে যাওয়া নিরাপদ

অনেকেই মনে করি মেঘের ডাকাডাকি বন্ধ হওয়া মানেই বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বের হওয়া ঠিক নয়। এই ঝুঁকি এড়াতে ৩০ থেকে ৩০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

নিয়মটি হলো, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখলে মনে মনে ৩০ পর্যন্ত গুনতে শুরু করুন। ৩০ শেষ হওয়ার আগেই যদি বজ্রের শব্দ পান, তবে বুঝবেন বিদ্যুৎ খুব কাছাকাছি চমকাচ্ছে। এমন অবস্থায় দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া উচিত। আর ঝড় পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পরও অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের ভেতরে অপেক্ষা করা। কারণ ঝড় থেমে গেলেও অনেক সময় মেঘের ভেতর স্থির তড়িৎ জমা থাকে, যা যেকোনো সময় মাটিতে আছড়ে পড়তে পারে। প্রাণ বাঁচাতে এই আধ ঘণ্টা সময় অপেক্ষা করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

ধাতব বস্তু সরাতে সময় নষ্ট করবে না

অনেকে মনে করে শরীরের ঘড়ি, বেল্ট বা গয়না খুলে ফেললে হয়তো বজ্রপাত থেকে বাঁচা যাবে। কিন্তু ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস বলছে, ধাতু বজ্রপাতকে সরাসরি আকর্ষণ করে না। তবে এটি বিদ্যুৎ পরিবহন করে। তাই ঝড়ের সময় শরীরের অলঙ্কার বা ঘড়ি খুলতে সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব কোনো দালানের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। তবে মনে রাখবে, ছাতা ধরে রাখা সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আরও পড়ুন
ছবি: পেক্সেলস

জানালার কাছে দাঁড়ানো

জানালার পাশে বসে বৃষ্টি বা বিদ্যুৎ চমকানো দেখা বেশ চমৎকার মনে হতে পারে, কিন্তু এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জানালার গ্রিল বা দরজার হাতল সাধারণত ধাতব হয়, যা সহজেই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। বজ্রপাতের সময় জানালার খুব কাছে থাকলে বা ধাতব অংশ স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার তীব্র ঝুঁকি থাকে। তাই ঝড়ের সময় জানালার গ্রিল থেকে দূরে ঘরের মাঝখানের অংশে থাকাই সবচেয়ে ভালো।

দলবদ্ধ হয়ে থাকা যাবে না

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় ঝড় শুরু হলে সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকবে না। দলবদ্ধ থাকলে গ্রাউন্ড কারেন্টের কারণে একসঙ্গে সবার আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অন্তত ১৫ থেকে ২০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আলাদা আলাদা হয়ে আশ্রয় নেওয়া উচিত। এতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে যায়।

পোষা প্রাণীকে বাইরে রাখবে না

ঝড় শুরু হলে পোষা কুকুর বা বিড়ালটিকে অবশ্যই ঘরের ভেতরে নিয়ে এসো। বাড়ির বাইরে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা বা কাঠের তৈরি কুকুরের ঘরে পোষা প্রাণীকে রাখা মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ, গাছ বা কাঠ বিদ্যুৎ পরিবহন করে সরাসরি এদের আঘাত করতে পারে।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন