ইরানের যেসব ড্রোনে কুপোকাত হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছেফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে সংঘাত ছড়িয়েছিল তাতে খানিকটা স্বস্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে যুদ্ধবিরতির কারণে। মূলত ইরানের হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ থামানোর চাপ বাড়তে থাকে। এরপরই যুদ্ধবিরতি। ইরান যেসব অস্ত্র এই যুদ্ধে ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো ড্রোন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দ্য আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত জার্নাল ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব ইরানিয়ান ড্রোন প্রোগ্রাম’ তথ্য অনুসারে, ৪০ বছরের চেষ্টায় অন্তত ১৫ ধরনের ড্রোন বানাতে সক্ষম হয়েছে ইরান। এসব ড্রোনের আছে নানা ভেরিয়েন্ট। সব মিলিয়ে প্রায় এক শ ধরনের ড্রোন বানিয়েছে ইরান। এর মধ্যে কিছু ড্রোন আছে যেগুলো বেশ ভয়ংকর। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর হামলা চালাতে পারে ড্রোনগুলো।

শাহেদ-১২৯ ড্রোন

ইরান এবারের যুদ্ধে যে ড্রোনগুলো বেশি ব্যবহার করেছে সেগুলো অন্যতম শাহেদ-১২৯ ড্রোন। এটি টানা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে। পাড়ি দিতে পারে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ। শাহেদ-১২৯ হামলা চালানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যও পাঠাতে পারে। একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারটি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে এই ড্রোন।

শাহেদ-১২৯ ড্রোনটি রিমোর্ট কন্ট্রোলচালিত। আবার কোথাও নেটওয়ার্ক জ্যামার ব্যবহার করা হলে সেখানেও এই ড্রোন কাজ করবে। এই যুদ্ধের আগেই সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় এটা ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করে, ইরান এটাকে আরও উন্নত করছে ভবিষ্যতের জন্য।

ইউক্রেনের আকাশে সম্প্রতি ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন উড়তে দেখা যায়
ছবি: রয়টার্স

শাহেদ-১৩৬

ইরানের তৈরি আরেকটি ভয়ংকর ড্রোন হলো শাহেদ-১৩৬। এবারের যুদ্ধের ময়দানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এই ড্রোন। দামে কম মানে ভালো বলতে যা বোঝায় সেটা হলো শাহেদ ১৩৬।

শাহেদ-১৩৬ আত্মঘাতী ড্রোন। ড্রোনটি ২০ থেকে ৫০ কেজি ওয়ারহেড বা বোমা বহন করে। গতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে শাহেদ-১৩৬।

এই ড্রোনে আছে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম। একে বলা যায় ভাড়াটে সন্ত্রাসীর মতো। সিনেমায় হয়তো দেখেছ, সন্ত্রাসীকে ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘ওকে মেরে আয়।’ এটাও অনেকটা এমন। সুনির্দিষ্ট টার্গেট সেট করে দিলে সেখানেই গিয়ে হামলা চালাবে শাহেদ-১৩৬। কারণ, এই ড্রোনে লোকেশনের ছবি সেট করে দেওয়া হয়। এরপর ড্রোনটা নিজের ক্যামেরা দিয়ে ওই ইমেজ মেলাতে থাকে। এরপর করে আক্রমণ। বাড়তি সুবিধা হলো, নিচুতে ওড়ার কারণে ড্রোনটি রাডার ফাঁকি দিতে পারে। সমরবিদেরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম ব্যবহার হয় এই ড্রোন। রাশিয়াও এই ড্রোন ব্যবহার করে।

শাহেদ-২৩৮

আরেকটি ভয়ংকর ড্রোন হলো শাহেদ-২৩৮। এটা শাহেদ-১৩৬-এর চেয়েও ভয়ংকর। ১৩৬-এ ব্যবহার করা হয়েছে প্রপেলার ইঞ্জিন। আর ২৩৮-এ ব্যবহার করা হয়েছে জেট ইঞ্জিন। এতে করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গতি বেড়ে গেছে তিন গুণ। অনেকটা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গতির কাছাকাছি। ফলে এটা ঠেকাতে খরচও হয় বেশি। আবার এই ড্রোনের রাডার ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতাও বেশি। এটি তৈরিতে খরচ শাহেদ-১৩৬-এর চেয়ে কম। ড্রোনটি বানাতে ইরানকে সাহায্য করছে চীন। এটার ইঞ্জিন চীন থেকে আনা। তবে শাহেদ-১৩৬ এর মতো এটা অনেক দূরে আঘাত হানতে পারে না। তবে এটার যে রেঞ্জ, সেটা ইসরায়েলে আঘাত আনার জন্য যথেষ্ট। এটাও প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে ইউক্রেনে।

ইরানের নতুন ড্রোন মোহাজের-১০
ছবি: এএফপি

কুদস মোহাজের ১০

ইরানের ড্রোনশিল্প এগিয়ে যাওয়ার পেছনে যেসব ড্রোনের বড় ভূমিকা আছে সেগুলোর অন্যতম কুদস মোহাজের-১০। ইরানের অন্যতম বহুমুখী দূরপাল্লার ড্রোন এটি। ড্রোনটির কার্যক্ষমতার পরিধি প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে এই ড্রোন। ৩০০ কেজি পর্যন্ত বোমা ও ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বহন করতে সক্ষম। ২০২৩ সালে এই ড্রোন প্রকাশ্যে আনে ইরান। ড্রোনটির বাহ্যিক গঠন মার্কিন সামরিক বাহিনীর এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মতো। এটি ৭ হাজার মিটার উচ্চতায় উড়তে পারে।

কিয়েভের সেন্ট মাইকেল ক্যাথেড্রালের সামনে রাখা একটি রুশ-ইরানি ‘শাহেদ-১৩৬’ (গেরান-২) কামিকাজে ড্রোন ছুঁয়ে দেখছেন এক বাসিন্দা
ছবি: রয়টার্স

হাদিদ-১১০

হাদিদ-১১০ ড্রোনটি দালাহু নামেও পরিচিত। এটি আত্মঘাতী ড্রোন। আইআরজিসি ২০২৫ সালে এটি প্রকাশ্যে আনে। এটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তৈরি। ড্রোনটি উৎক্ষেপণের সময় রকেটের সাহায্য নেয়। জেট ইঞ্জিন থাকায় ড্রোনটির গতিও বেশি। গতি ঘণ্টায় ৫১০ কিলোমিটার। আবার পাখার বিশেষ নকশার কারণে রাডার ফাঁকি দিতে পারে হাদিদ-১১০। যদিও ড্র্রোনটি বেশি দূর যেতে পারে না। ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে এই ড্রোন। তবে উড়তে পারে ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায়। হাদিদ-১১০ ড্রোনটি ৩০ কেজি বোমা বহন করে এবং এটি এক ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।

পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোন

ইরানের সব ড্রোন যে হামলার জন্য ব্যবহার হয় তা নয়। ইরানের ড্রোন কর্মসূচির একটা বড় কারণ হলো নজরদারি। দেশটা অনেক বড় এবং পাহাড়ি এলাকায় ভরা। ইসরায়েলে সঙ্গে তুলনা করলে ইরান ৭৫ থেকে ৮০ গুণ বড়। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে তারা আমাদের চেয়ে ১১ থেকে ১২ ‍গুণ বড়। এশিয়ার ষষ্ঠ বৃহৎ দেশ ইরান। এত বড় এলাকা নজরদারি করার জন্য আসলে ড্রোন তাদের দরকার ছিল। ইরানের মোটামুটি চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে। একটা দেশ চারপাশ থেকে শত্রু দিয়ে ঘেরা থাকলে সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়া তো কোনো উপায় নেই। ড্রোন তাদের নজরদারির অন্যতম শক্তি। এই নজরদারির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ই তারা শত্রুদের চিহ্নিত করেছে এবং এরপর হামলাও চালিয়েছে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেকে কিন্তু এমন ড্রোন নজরদারিতে ধরাও পড়েছেন।

তথ্য সূত্র: বিবিসি, ইউপিআই, সিএনএন, আটলান্টিক কাউন্সিল, মিলিটারি ডটকম, দ্য আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট, জার্নাল: এ শর্ট হিস্ট্রি অব ইরানিয়ান ড্রোন প্রোগ্রাম