৩০০ বছর বাঁচে যে মাছ
উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকগুলোয় ঘুরে বেড়ানো লেক স্টারজন নামের মাছগুলো ছয় ফুট লম্বা হয়। আর ওজনে প্রায় ৪৫ কেজির মতো। প্রকাণ্ড এই মাছগুলো ২০০ থেকে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকে। ‘জার্নাল অব ফিশ বায়োলজি’ নামের একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় এদের উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বয়স্ক মিঠে পানির মাছ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মাছগুলো সমুদ্রের গ্রিনল্যান্ড শার্কের মতোই দীর্ঘদিন বাঁচে।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক স্কট কোলবোর্ন। তিনি জানান, লেক স্টারজন যে অনেক বছর বাঁচে, তা বিজ্ঞানীরা আগেই জানতেন। তবে নতুন গবেষণা বলছে, এরা আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে। এককথায়, এই মাছগুলো অতীত ইতিহাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।
লেক স্টারজন মাছের এত দীর্ঘ জীবন সত্যিই অবাক করার মতো। আজ নদীতে যেসব স্টারজন সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে, সেগুলোর কোনোটাই হয়তো কয়েক শত বছর আগে জন্ম নিয়েছিল। ১৭৫৬ সালের সাত বছরের যুদ্ধ, ১৭৭৩ সালের বস্টন টি পার্টি কিংবা ১৮০৪ সালের লুইস ও ক্লার্কের অভিযানের সময়ও হয়তো এদের কেউ কেউ এই হ্রদে ছিল। এমনকি ১৮৫১ সালে আমেরিকার উইসকনসিনে প্রথম ট্রেন চলাচলের সময় বা ১৮৭১ সালের শিকাগোর আগুনে শহর পুড়ে ছাই হওয়ার সময়েও এই প্রাচীন মাছগুলো হয়তো এই পানিতে সাঁতার কাটছিল।
সাধারণত বিজ্ঞানীরা মাছের পাখার কাঁটায় থাকা বয়সের দাগ বা বলয় গুনে এদের বয়স বের করেন। কিন্তু স্টারজন মাছের বয়স যত বাড়ে, এই দাগগুলো তত ঝাপসা হতে থাকে। ফলে বিজ্ঞানীরা বুঝেছিলেন, সাধারণ নিয়মে হিসেব করায় এত দিন এদের আসল বয়স কম ধরা হতো।
এই ধারণা মেলাতে গবেষক স্কট কোলবোর্ন ও তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করা বিশাল ডেটা পরীক্ষা করেন। বহু বছর ধরে ট্যাগ লাগানো নির্দিষ্ট কিছু মাছের বাড়ার গতি পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা দেখতে পান, বয়স বাড়ার সঙ্গে এদের বড় হওয়ার গতি অনেকটাই ধীর হয়ে যায়। বয়স একদম সঠিকভাবে মাপতে বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ড হাঙরের বয়স বের করার বিশেষ গাণিতিক হিসাব ব্যবহার করেন। তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা নিশ্চিত হন এই লেক স্টারজনদের অনেকেই অনায়াসে ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। আর কেউ কেউ তো প্রায় ৩০০ বছর বেঁচে থাকে।
তবে এই আবিষ্কার কেবল এদের বয়স বের করার জন্য করেননি বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন, কীভাবে এরা এত বছর বেঁচে থাকে। এ জন্য এখন গবেষণা চলছে এই মাছ নিয়ে। কারণ লেক স্টারজন মাছ খুব ধীরে ধীরে বড় হয় এবং বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানে ডিম দেয়। ফলে কোনো কারণে এদের সংখ্যা কমে গেলে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক দশক লেগে যায়। এদের আয়ু সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেলে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন, এদের বাঁচিয়ে রাখার বা বাসস্থান সংরক্ষণের যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসলে কতটা কাজে আসছে।
গবেষকদের মতে, এই তথ্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কাজের গুরুত্ব তুলে ধরে। এই মাছগুলোকে বাঁচাতে, এদের শরীরে ট্যাগ লাগাতে এবং প্রতিনিয়ত নজরদারিতে রাখতে বহু বছর ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী, স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠী ও সরকারি প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করছেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ডেট্রয়েট নদী থেকে ২৪০ পাউন্ড ওজনের এবং ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি লম্বা একটি স্ত্রী লেক স্টারজন মাছ ধরা পড়েছিল। ধারণা করা হয়, এই বিশাল মাছটির বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরপরই মাছটিকে আবার অক্ষত অবস্থায় নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
গবেষণার কাজ চলাকালে স্থানীয় এক আদিবাসী সদস্যের সঙ্গে কথা বলার সময় স্কট কোলবোর্ন একটি দারুণ বিষয় জানতে পারেন। সেখানকার আদিবাসীরা বহু আগে থেকেই বিশ্বাস করতেন লেক স্টারজন মাছ প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
এই বিষয়ে কোলবোর্ন বলেন, কথাটা শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমরা আধুনিক গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যে সত্যে পৌঁছাচ্ছিলাম, আদিবাসীরা বহু আগে থেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে তা জানতেন। এই মাছগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য রকম দীর্ঘজীবী।
তবে এরা কীভাবে এত দিন বেঁচে থাকে, এর আসল বৈজ্ঞানিক কারণ জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে এই আবিষ্কার অন্য সব দীর্ঘজীবী মাছের বয়স মাপার পুরোনো নিয়মগুলোকেও নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করছে।
কোলবোর্ন আরও বলেন, শারীরিক গঠনের কারণেই স্টারজন মাছ যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। আমরা যদি এদের বেঁচে থাকার উপযুক্ত পরিবেশটুকু দিই, তবে এরা ঠিকই টিকে থাকবে। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে এরা যে আজও টিকে আছে, তার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো কারণ রয়েছে।