২৭ বছরের গৃহযুদ্ধের পর দুর্গম পাহাড়ি অভিযানে মিলল অদ্ভুত সব প্রাণী

এখন সেই এলাকাটি ধীরে ধীরে রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছেকাসাই লাইফ অ্যাটলাস

সারা বিশ্বে যখন নানা প্রজাতির জীব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। আগের চেয়ে অনেক দ্রুত নতুন নতুন জীব খুঁজে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি একদল গবেষক দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ পূর্ব অ্যাঙ্গোলায় অভিযান চালিয়ে এমন বেশ কিছু নতুন প্রজাতি খুঁজে পেয়েছেন, যা আগে বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। অভিযাত্রীদের মতে, আফ্রিকার এই অঞ্চলটি জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে সবচেয়ে কম জানা জায়গাগুলোর একটি।

অ্যাঙ্গোলার উঁচুতে অবস্থিত এই দুর্গম লিসিমা মালভূমিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি কঙ্গো, ওকাভাঙ্গো, জাম্বেজি ও কুয়ানজা নদীর পানির প্রধান উৎস। কিন্তু এখানকার জলাভূমি, ঘাসবন আর বনাঞ্চল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে তেমন কোনো তথ্য ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও ২০০২ সাল পর্যন্ত চলা দীর্ঘ ২৭ বছরের গৃহযুদ্ধের কারণে গবেষকেরা এতদিন সেখানে যেতে পারেননি। তবে এখন সেই এলাকাটি ধীরে ধীরে রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছে।

এসব নতুন প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হলো ‘ক্রাউনড ক্র্যাব স্পাইডার’ নামের একধরনের মাকড়সা
কাসাই লাইফ অ্যাটলাস

২০২৪ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকান অভিযাত্রী স্টিভ বয়েসের নেতৃত্বে একদল গবেষক ক্যামেরায় এক বিশেষ ধরনের হাতির ছবি তুলতে সক্ষম হন। এটি বিশাল আকৃতির হাতি এমন এক জিনগত প্রজাতি, যা অন্যান্য হাতি থেকে পুরোপুরি আলাদা এবং এই অঞ্চলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে একা একাই টিকে আছে।

আরও পড়ুন

‘দ্য ওয়াইল্ডারনেস প্রজেক্ট’ নামের একটি সংস্থা গত ফেব্রুয়ারিতে ‘কাসাই লাইফ অ্যাটলাস’ নামের একটি নতুন সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষাটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের আগের করা গবেষণাগুলোর তথ্যকে আরও সমর্থন করে। আফ্রিকান ও আন্তর্জাতিক ১৬ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল এই মালভূমির ওপর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। বিজ্ঞানীরা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন জীবগুলোর বর্ণনা দেওয়া শুরু করবেন, তখন আরও অনেক নতুন প্রজাতির নাম জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সমীক্ষাটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের আগের করা গবেষণাগুলোর তথ্যকে আরও সমর্থন করে
কাসাই লাইফ অ্যাটলাস

এসব নতুন প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হলো ‘ক্রাউনড ক্র্যাব স্পাইডার’ নামের একধরনের মাকড়সা। এটি অতিবেগুনি আলোর নিচে নীল রঙের আভা ছড়ায়। তবে কেন এমন আলো ছড়ায় তা বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। এই অভিযানে ‘লেডিবার্ড অরবি-ওয়েব’ নামের একধরনের মাকড়সা পাওয়া গেছে। এটি দেখতে বিষাক্ত লেডিবার্ড পোকার মতো, যার ফলে শিকারি প্রাণীরা ভয়ে একে আক্রমণ করে না।

গবেষকেরা এই এলাকায় ১০৩টি ড্রাগনফ্লাই ও ড্যামসেলফ্লাই প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। যার মধ্যে আটটি প্রজাতি বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। এ ছাড়া আটটি নতুন প্রজাতির মথও খুঁজে পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তিনটি নতুন প্রজাতির ঘাসফড়িং ও ঝিঁঝিঁপোকার তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই নমুনাগুলো ভালো করে পরীক্ষা করার পর আরও নতুন নতুন প্রজাতি শনাক্ত হতে পারে বলে ধারণা করছে দ্য ওয়াইল্ডারনেস প্রজেক্ট।

শুধু নতুন প্রজাতিই নয়, এই এলাকায় আগে থেকে পরিচিত চমৎকার কিছু প্রাণীরও দেখা মিলেছে। গ্যাবন অ্যাডার নামের এক বিষধর সাপ, যার বিষদাঁত সাপেদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হয়। আরও পাওয়া গেছে ডানা ছাড়া একধরনের মাছি, যা বাদুড়ের পশমের ভেতর থাকে। রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। এ ছাড়া দেখা মিলেছে বহু-পালকযুক্ত মথের, যার ডানার পর্দাগুলো সাধারণ মথের মতো মসৃণ নয়, বরং পাখির পালকের গুচ্ছের মতো দেখতে।

আরও পড়ুন

অভিযান দলের নেতা রব টেলর এই মাঠপর্যায়ের কাজটিকে একটি চমৎকার ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, আগের গবেষণাগুলোর চেয়ে এবারের মূল তফাত ও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভরা বর্ষা মৌসুমে কাজ করা।

গবেষকেরা এই এলাকায় ১০৩টি ড্রাগনফ্লাই ও ড্যামসেলফ্লাই প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন
কাসাই লাইফ অ্যাটলাস

বর্ষার কারণে পুরো দলটিকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একাধিকবার তাঁদের সব গাড়ি সারা দিনের জন্য কাদায় আটকে যায়। এর পাশাপাশি গাড়ির স্টার্টার-মোটর নষ্ট হওয়া, অল্টারনেটরের ত্রুটি, ব্রেক প্যাড ক্ষয়ে যাওয়া এবং দলের কয়েকজন সদস্যের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়।

তবে গাড়ি আটকে গিয়ে কাজ দেরি হলেও বিজ্ঞানীরা দমে যাননি। যখনই গাড়ি আটকে যেত, তাঁরা সেই সুযোগে চারপাশের মৌসুমি জলাভূমি, ঘাসবন আর বনাঞ্চলে নতুন প্রজাতির সন্ধান ও জরিপের কাজ চালিয়ে যেতেন। এই গবেষণার পুরো ফলাফল প্রকাশ করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। আর এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই মালভূমিতে খুঁজে পাওয়া নতুন ও পুরোনো সব প্রজাতির প্রাণীদের রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় কী হতে পারে।

শুধু নতুন প্রজাতিই নয়, এই এলাকায় আগে থেকে পরিচিত চমৎকার কিছু প্রাণীরও দেখা মিলেছে
কাসাই লাইফ অ্যাটলাস

অভিযান দলের নেতার মতে, যেসব প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য খুব নির্দিষ্ট পরিবেশের প্রয়োজন বা যারা খুব ছোট এলাকায় বাস করে, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে। পানির মান একটু খারাপ হলেই ফড়িং মারা যেতে পারে। আর খনি খননের কারণে পানি সহজেই দূষিত হয়। আবার কিছু প্রজাপতির বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ কিছু গাছের প্রয়োজন হয়, যা দাবানল, বন উজাড় বা ঝুমচাষের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

লিসিমা মালভূমিটি অত্যন্ত দুর্গম এবং সেখানে গৃহযুদ্ধের সময়কার পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন রয়েছে। এই ভয়ের কারণে পর্যটকেরা সেখানে যান না। আর এ কারণেই গত কয়েক দশকে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ মানুষের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই মালভূমিকে সরকারিভাবে সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করাই দ্য ওয়াইল্ডারনেস প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য। তারা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলে ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের মধ্যে মালভূমিটির ৫৪ লাখ হেক্টর এলাকাকে সুরক্ষিত অঞ্চলের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন