বৃষ্টির দিনে মাগুর কেন ধানখেতে যায়

মাগুর মাছছবি: শাটারস্টোক

বর্ষাকাল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে। উঠানে হাঁটুসমান পানি জমেছে। এই বৃষ্টিতে মানুষ জানালা বন্ধ করে বসে থাকে। কিন্তু কিছু প্রাণী আছে, এমন বৃষ্টির অপেক্ষা করে। মাগুর এমনই এক প্রাণী। সারা বছর এই বৃষ্টির অপেক্ষাতেই থাকে।

মাছ না সাপ?

মাগুরকে দেখলে প্রথমবার একটু থমকে যেতে হয়। শরীরটা লম্বা, গায়ে আঁশ নেই, মুখের চারপাশে গোঁফের মতো চারজোড়া শুঁড়। রংটা কালচে-বাদামি, কাদার সঙ্গে মিলিয়ে যায় সহজেই। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে যখন দেখো এটা ডাঙায় হাঁটছে।

হাঁটা মানে পায়ে হাঁটা না। বুকের পাখনা দুটো মাটিতে ঠেকিয়ে পুরো শরীরটাকে সাপের মতো এঁকেবেঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া। দেখতে সাপের মতোই, শুধু একটু ধীর। এভাবে এটা একবারে ১০০ মিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা তাই এই মাছের নাম রেখেছেন ওয়াকিং ক্যাটফিশ।

কোন বৃষ্টিতে বের হয়?

যেকোনো বৃষ্টিতে মাগুর বের হয় না। হালকা বৃষ্টিতে এটি চুপচাপ থাকে।

বের হওয়ার জন্য দরকার এমন বৃষ্টি, যেটা খালের পানি উপচে দেয়। আলের গা বেয়ে পানি যখন মাঠে নামে, মাটির ওপর একটা পাতলা পানির চাদর তৈরি হয়। ওটুকুই যথেষ্ট। এর আগে মাগুর নড়ে না।

আরেকটা ব্যাপার আছে। মাগুর প্রায় সব সময় রাতে বের হয়। দিনের বেলা রোদে শরীর শুকিয়ে যায়, রাতে সেই ঝুঁকি নেই। বৃষ্টি থামার পরপরই ঘুটঘুটে অন্ধকারে যাত্রা শুরু হয়। পথে বিপদ আছে। খেচর, সাপ, গ্রামের রাস্তায় মানুষের পা। তবু এরা থামে না।

আরও পড়ুন
ছবি: সাজেদুল আলম

ধানখেত কেন?

মাগুর ডিম পাড়ে অগভীর আগাছাভরা জায়গায়। গভীর পুকুর ওদের পছন্দ না। নদীর মাঝখানে তো একদমই না। ধানখেতের কাদাপানি, ধানের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে আশ্রয় পায় ডিম। পচা পাতার নিচে পোকামাকড়—মাগুরের ডিম পাড়ার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। ডিম পাড়ার পরে বাবা মাগুর বাসার পাশে পাহারায় বসে থাকে, যতক্ষণ না বাচ্চা ফোটে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাগুরের প্রজনন মৌসুম। এটা বর্ষার মৌসুম। এটা কাকতাল না। হাজার হাজার বছর ধরে মাগুর ডিম পাড়ার সময়টাকে বর্ষার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। বৃষ্টি এলে মাঠে পানি আসে। পানি এলে মাগুর আসে। মাগুর বৃষ্টি এলে পুরোনো আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।

মাগুর পানির বাইরে বাঁচে কীভাবে?

মাগুরের ফুলকার পাশে একটা আলাদা অঙ্গ আছে, যেটা দিয়ে সে সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে। ফুসফুস না, কিন্তু কাজ অনেকটা সে রকম। শরীর আর্দ্র থাকলে এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডাঙায় থাকতে পারে। ভারী বৃষ্টির পরে মাটি ভেজা, বাতাসে জলীয় বাষ্প ভরা। শরীর শুকিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। মাগুর এই সুযোগটাই চায়।

আরেকটা ব্যাপার হলো ঘ্রাণ। অন্ধকারে ভেজা মাটির ওপর দিয়ে চলার সময় নাক দিয়ে কাছের জলাশয়ের গন্ধ টের পায় এরা। ভুল পথে যায় না সহজে।

পৃথিবীর বেশির ভাগ মাছ যেখানে পানির বাইরে কয়েক মিনিটেই মরে যায়। মাগুর সেই দলে নেই।

আরও পড়ুন

বর্ষার রাতে মাগুর ধরা

যারা গ্রামে বড় হয়েছ, এই দৃশ্যটা চেনা থাকার কথা। ভোররাতে ভারী বৃষ্টির পরে মাঠে গেলে মাছ পাওয়া যায়। কোনো কোনো জায়গায় বর্ষার রাতে মশাল জ্বালিয়ে, হাতে খালুই নিয়ে মাঠে নামার রেওয়াজ আছে এখনো। গ্রামের বুড়ো মানুষেরা এই বৃষ্টি চেনেন। তাঁরা বলেন, ‘আজ মাছ পাওয়া যাবে।’

ধানখেতে মাগুর ঢুকলে কৃষকের সুবিধা হয়। বড় মাগুর ছোট মাছ খেয়ে ফেলে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় মাগুর ব্যস্ত থাকে পোকামাকড় আর কেঁচো নিয়ে। পোকা খেয়ে ধানের উপকার করে মাগুর। অনেক কৃষক তাই মাগুরকে খেতের বন্ধু মনে করেন।

সারা বছর খালে–বিলে, মাটির নিচে থাকে মাগুর। তারপর বর্ষায় একটা রাত আসে। যেদিন থাকে ভারী বৃষ্টি। মাটি ভেজা থাকে। খাল উপচে যায় পানিতে। তখন মাগুর বেরিয়ে পড়ে। পথে সাপ আছে, পাখি আছে, মানুষের পা আছে। তবু এরা থামে না। ধানখেতে পৌঁছাতে পারলে এরা ডিম পাড়বে। সঙ্গী পাহারায় বসবে। বাচ্চা ফুটবে। এটাই হয়তো এই মাছের চাওয়া।

সূত্র: গ্লোবাল সিফুড অ্যালায়েন্স
আরও পড়ুন