পানিসমৃদ্ধ নতুন গ্রহের সন্ধান

পৃথিবীর বাইরে কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এককথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, পৃথিবীরে বাইরে প্রাণ থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে। এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা। আসলেই পৃথিবীর বাইরে প্রাণ আছে কি না, তা সব সময় খুঁজেই চলেছেন তাঁরা। পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকতে হলে প্রথমত প্রাণধারণের উপযোগী একটা গ্রহ থাকতে হবে। সেই গ্রহকে আবার মানতে হবে কিছু শর্ত। যেমন, গ্রহটি হতে হবে পাথুরে। অর্থাৎ গ্যাসীয় বা শুধু পানিতে পূর্ণ থাকলে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, সেখানে বেঁচে থাকার জন্য থাকতে হবে পানি। তৃতীয়ত, অক্সিজেন থাকা জরুরি। এ ছাড়া বিজ্ঞানের আরও কিছু কঠিন শর্ত আছে। সেগুলো তোমরা একটু বড়ো হলেই জানতে পারবে। আজ সেগুলো নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে চলো জানা যাক, প্রাণের অস্তিত্ব থাকার মতো গ্রহের বর্ণনা দেওয়ার কারণটা কী।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের বাইরে এমন একটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে আছে বিশাল পানির সমুদ্র। তাহলে কি সেই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও এখনই সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা এখনো এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানাননি। আরও গবেষণা করতে হবে বলে মনে করছেন তাঁরা। কিন্তু গ্রহটি দেখতে কেমন? আমাদের পৃথিবীর চেয়ে বড় নাকি ছোট? আমরা চাইলে কি সেখানে যেতে পারব? গ্রহটির নামই বা কী? চলো, এসব প্রশ্নের উত্তর এবার একটা একটা করে দেওয়া যাক।

নতুন আবিষ্কৃত এই গ্রহের নাম টিওআই-১৪৫২বি। নামটা একটু কাঠখোট্টা, তাই না? তবে সহজে তুমি একে সুপার আর্থ বলে ডাকতে পারো। কানাডার মন্ট্রিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এই গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা কীভাবে খুঁজে পেলেন এই গ্রহ? মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ট্রানজিট এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টেস) থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে এই গ্রহের সন্ধান পেয়েছে ওই গবেষক দল। এটি একটি পাথুরে গ্রহ। অর্থাৎ, আমাদের পৃথিবীর মতো সেই গ্রহেও আছে পাথর বা মাটি। তাহলে কি আমরা সেখানে গিয়ে বসবাস করতে পারব? উত্তর, না। এই মূহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ, গ্রহটি আমাদের থেকে ১০০ আলোকবর্ষ দূরে। আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। এক সেকেন্ডে আলো তিন লাখ কিলোমিটার অতিক্রম করে। এবার নিজেই হিসাব করে বের করো, এক বছরে কত সেকেন্ড। তারপর, সেই সেকেন্ডকে গুণ করো তিন লাখ দিয়ে। তাহলে পাবে এক আলোকবর্ষের হিসাব। সে রকম ১০০ আলোকবর্ষ দূরে এই গ্রহ আছে। বর্তমানে আমাদের কাছে যে প্রযুক্তি আছে, তা ব্যবহার করে এই দূরত্বে যাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো ভবিষ্যতে প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে যাওয়া যাবে এ রকম দূরের গ্রহে। কিন্তু গ্রহটি আসলে কত বড়?

সাধারণত সমুদ্রবেষ্টিত গ্রহ আকারে বড় হয়। তবে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বড়। ভর পৃথিবীর প্রায় পাঁচ গুণ। ধারণা করা হচ্ছে, এই গ্রহে বিশালাকার সমুদ্র আছে। তবে এটা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা করতে হবে বিজ্ঞানীদের। গ্রহটিতে হয়তো হালকা বায়ুমণ্ডল আছে অথবা একেবারেই নেই। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাথুরে এই গ্রহে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের হালকা বায়ুমণ্ডল আছে।

এই গ্রহে সমুদ্র থাকলে সেটা হবে অনেক গভীর। তোমরা নিশ্চই জানো, আমাদের পৃথিবীর তিন ভাগের দুই ভাগ পানি। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ পানিতে পূর্ণ। তবে সুপার আর্থের মাত্র ৩০ শতাংশজুড়ে রয়েছে সমুদ্র। আমাদের পৃথিবীতে যত পানি আছে, তা সুপার আর্থের মাত্র ১ ভাগ ভরের সমান। এবার চিন্তা করে দেখো, সুপার আর্থটি কত বড়!

নাসার বিজ্ঞানীরা গ্রহটিকে আমাদের সৌরজগতের কয়েকটি উপগ্রহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন, বৃহস্পতির উপগ্রহ গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো এবং শনির উপগ্রহ টাইটান বা এনসিলাডাস। এই উপগ্রহ চারটির ওপরে আছে কঠিন বরফ। বরফের নিচে আছে টলমলে পানির ধারা। যেমনটা অ্যান্টার্কটিকা মহাসাগরে দেখা যায়। তোমরা নিশ্চয়ই টিভিতে এ রকম বরফের নিচে পানি থাকার ব্যাপারটি খেয়াল করেছ। ঠিক তেমনি ওই সুপার আর্থেও বরফের নিচে আছে পানি।

এবার আরেকটা মজার তথ্য দিই। সুপার আর্থটিতে এক বছর হয় মাত্র ১১ দিনে। কারণ, ওই গ্রহ তার সূর্যকে ১১ দিনে একবার ঘুরে আসে। পৃথিবীর যেমন ১ বছরে ৩৬৫ দিন। অর্থাৎ, সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরে আসতে পৃথিবীর লাগে ৩৬৫ দিন। সুপার আর্থের নক্ষত্রটি একটি লাল বামন নক্ষত্র। আমাদের সূর্যের চেয়ে ওই নক্ষত্র অনেক ছোট এবং শীতল। যেহেতু সুপার আর্থের নক্ষত্রের তেজ অনেক কম, তাই ওই গ্রহে পানি থাকার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। সূর্য থেকে শুক্র গ্রহ যেমন আলো পায়, গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে সে রকম হালকা আলো পায়। দূরত্বও প্রায় একই রকম। অর্থাৎ প্রায় ১১ কোটি কিলোমিটার। এ ছাড়া গ্রহটি একই সঙ্গে আরও একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে। সেই নক্ষত্র অবশ্য অনেক দূরে। সেই নক্ষত্রের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সুপার আর্থের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর সময় লাগে।

এই সুপার আর্থ এবং এর নক্ষত্র সম্পর্কে ভবিষ্যতে আরও জানার সুযোগ আছে আমাদের। কিছুদিন আগেই নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এই টেলিস্কোপের কাছে ১০০ আলোকবর্ষ দূরত্ব কমই বলতে হয়। কারণ, এই দূরত্বের গ্রহের ছবি তোলার মতো সক্ষমতা আছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের। কয়েক মাসের মধ্যেই ওই টেলিস্কোপের চোখ পড়বে সুপার আর্থের দিকে। তাহলে তোমরাও অপেক্ষায় থাকো। অল্প দিনের মধ্যেই এই গ্রহের ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। আদৌ সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নাহয় তখনকার জন্যই তোলা থাক।

সূত্র: নাসা