পিঁপড়ার পথ খোঁজার কৌশল গবেষণা করে বের করেছে ১৩ বছরের শিক্ষার্থী

মাঝেমধ্যে মাটির ওপর দিয়ে পিঁপড়াদের হেঁটে যেতে দেখি, তবে তা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। কিন্তু সিউংআ চুংয়ের চিন্তা ছিল অন্য রকম। একটা পিনের মাথার চেয়েও ছোট মস্তিষ্ক নিয়ে এই ছোট্ট প্রাণীরা কীভাবে খাবার খুঁজে পায়? আবার না হারিয়ে ঘরে ফিরে আসে, এ নিয়ে সে অবাক হয়ে ভাবত।

এই কৌতূহল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বেভারলি ভিস্তা মিডল স্কুলের অষ্টম গ্রেডের এই ছাত্রী একটি মজার পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। সে ২০০টি লাল হারভেস্টার পিঁপড়া ও একটি গোলকধাঁধা ব্যবহার করে পরীক্ষাটি সাজায়।

সোসাইটি ফর সায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, সিউংআ চুংয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, লাল হারভেস্টার পিঁপড়ারা শুধু এলোমেলোভাবে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায় না। বরং পথ খুঁজে পেতে এরা চোখের সামনে থাকা নানা চিহ্নের ওপর নির্ভর করে।

নিজের এই অনন্য গবেষণার জন্য সিউংআ বড় এক স্বীকৃতি পেয়েছে। সে যুক্তরাষ্ট্রের মিডল স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিখ্যাত স্টেম (STEM) প্রতিযোগিতা ২০২৫ থার্মো ফিশার সায়েন্টিফিক জুনিয়র ইনোভেটরস চ্যালেঞ্জে ফাইনালিস্ট হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

আরও পড়ুন

একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ যেভাবে বিজ্ঞানের বড় প্রজেক্ট হলো

দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ একটি ঘটনা দেখেই সিউংআ চুংয়ের কৌতূহল তৈরি হয়। পিঁপড়াদের সুন্দরভাবে সারিবদ্ধ হয়ে চলতে দেখে সে ভাবত, এর পেছনে আসল রহস্যটা কী? বিজ্ঞানীরা আগেই আবিষ্কার করেছেন যে পিঁপড়ারা পথ চলার সময় ফেরোমোন নামের একধরনের রাসায়নিক গন্ধ ছেড়ে যায়, যা শুঁকে অন্য পিঁপড়ারা পেছনে পেছনে চলে। তবে সিউংআ চুং জানতে চেয়েছিল, এটাই কি একমাত্র পথ চলার উপায় পিঁপড়াদের? নাকি পিঁপড়ারা চারপাশের বস্তু দেখেও পথ চিনতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে নিজেই নতুন একটি পরীক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলে।

২০০টি পিঁপড়ার জন্য একটি গোলকধাঁধা

নিজের গবেষণার জন্য সে ২০০টি লাল হারভেস্টার পিঁপড়া সংগ্রহ করে। এরপর সে টি (T) আকৃতির একটি গোলকধাঁধা তৈরি করে। আর ভেতরে খাবারের লোভনীয় পুরস্কার হিসেবে এক টুকরা কমলালেবু রেখে দেয়। সে একবারে ১৫টি করে পিঁপড়া সেই গোলকধাঁধায় ছেড়ে দিত।

গোলকধাঁধাটির পথ কিন্তু একেবারেই ফাঁকা ছিল না। পথের ধারে সে কিছু কৃত্রিম চিহ্ন বসিয়ে দিয়েছিল। প্লাস্টিকের পাতা, ছোট সামুদ্রিক পাথর ও রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা ব্লক। এই জিনিসগুলো ল্যান্ডমার্ক বা দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে কাজ করেছিল, যাতে পিঁপড়ারা এগুলো দেখে পথ চিনতে পারে।

পিঁপড়ারা যাতে গোলকধাঁধার পথটি চেনার ও ঘুরে দেখার সুযোগ পায়, সে জন্য সে এদের কিছুটা সময় দেয়। এরপর সে পর্যবেক্ষণ করে দেখে পিঁপড়ারা সঠিক পথটি মনে রাখতে পারছে কি না। কোনো ফলাফলই যেন ভুল না আসে, তাই সে বারবার অনেকগুলো পিঁপড়া নিয়ে একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করে।

আরও পড়ুন

চিহ্নগুলোই আসল পার্থক্য তৈরি করে দিল

পরীক্ষার সবচেয়ে মজার অংশটি সামনে এল যখন পিঁপড়ারা খাবারের জায়গা চিনে ফেলল। সিউংআ কিন্তু খাবারটি অন্য কোথাও সরাল না। বরং সে গোলকধাঁধার ভেতরে থাকা পাথর ও নকল পাতাগুলোর অবস্থান বদলে দিল। পিঁপড়ারা যদি শুধু ডানে বা বাঁয়ে যাওয়ার কথা মনে রেখে চলত, তবে এই চিহ্নগুলো বদলালে এদের তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ঠিক এর উল্টোটা।

চিহ্নগুলোর জায়গা বদলে দেওয়ার পর অনেক পিঁপড়া পথ হারিয়ে ফেলল। খাবার একই জায়গায় থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু পিঁপড়া ভুল পথে চলে গেল। এদের এমন আচরণ থেকে স্পষ্ট হলো, শুধু ডানে বা বাঁয়ে মোড় নেওয়ার কথা মনে রাখার বদলে এরা চারপাশের চিহ্নগুলো দেখেই এগোচ্ছিল।

তার এই পরীক্ষা প্রমাণ করল, লাল হারভেস্টার পিঁপড়াদের সঠিক পথ খুঁজে বের করতে দৃশ্যমান ল্যান্ডমার্ক বা চারপাশের চিহ্নগুলো দারুণ সহায়তা করে।

পিঁপড়ার পরীক্ষা যখন রোবটের কাজে আসবে

ছোট্ট এক পিঁপড়ার এই অনুসন্ধান প্রথমে সাধারণ মনে হলেও, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

পিনের মাথার মতো অতি ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক নিয়েও এসব পোকা কীভাবে জটিল কাজ সম্পন্ন করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সব সময় কৌতূহলী। পিঁপড়ার পথ চেনার কৌশল ভালোভাবে বুঝতে পারলে গবেষকেরা আরও নতুন ধাঁচের রোবট ও সংকেতনির্ভর চালকবিহীন যন্ত্র তৈরি করতে পারবেন। এতে কম তথ্য ব্যবহার করেই একটি রোবট অচেনা জায়গায় অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারবে।

কৌতূহল থেকেই বড় আবিষ্কারের শুরু

পড়াশোনার বাইরে সে ছবি আঁকতে পছন্দ করে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আরিয়ারি২১’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোর দেয়ালে সুন্দর ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র এঁকে দেয় সে। ভবিষ্যতে একজন অণুজীববিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই কিশোরী সেই গবেষকদের শ্রদ্ধা করে, যাঁদের আবিষ্কার মানুষের জীবনের মান বাড়াতে সাহায্য করেছে। দামি কোনো ল্যাবরেটরি বা জটিল যন্ত্রপাতি ছাড়াই কেবল ২০০টি পিঁপড়া, একটি গোলকধাঁধা আর গভীর পর্যবেক্ষণ দিয়ে সে প্রমাণ করল, বড় আবিষ্কারের পেছনে প্রধান জানার আগ্রহ।

সূত্র: সোসাইটি ফর সায়েন্স, ইকোনমিক টাইমস
আরও পড়ুন