শব্দের রহস্যের কূলকিনারা নেই

অভিধানের গল্প তো শুধু নামেই, আমাদের গল্প তো আসলে শব্দের, শব্দের ভাবগতিকের, শব্দের অর্থের চালচলনের, শব্দে অর্থ-অনর্থের। শব্দের রহস্যের কূলকিনারা নেই। একটানা শব্দ হয়তো অনেক দিন চলল—অনেক দিন কেন, দেড় শ-দুই শ বছর ধরেও হয়তো চলল, এমনকি চার-পাঁচ শ বছরও, তারপর গেল হারিয়ে কিংবা শব্দটার আসল অর্থটাই গেল পাল্টে—পরে এমন ভাবচক্কর হরহামেশাই দেখা যায়। আমাদের প্রধান শিক্ষক অত্যন্ত ধুরন্ধর—এমন কথা এক-দেড় শ বছর আগে বললে বাহবা পেতে। কিন্তু এখন ভুলেও এমন কথা বলতে যেয়ো না—বললে স্কুল থেকে পত্রপাঠ বিদায়। এমনকি তোমার শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটতে পারে। আশকথা-পাশকথা অনেক হলো। এবার তাহলে শুরু করা যাক অভিধান, অর্থাৎ শব্দের গল্প—

জমজমাট

জমজমাট অবশ্যই অতিশয় ইতিবাচক একটা শব্দ, যা আমরা আনন্দের সঙ্গে ব্যবহার করি।

জমজমাট গানের অনুষ্ঠান হতে পারে। জমজমাট সভা হতে পারে। বিয়ের অনুষ্ঠানও জমজমাট হয়ে উঠতে পারে। জমজমাট শব্দের সঙ্গে নঞর্থক কোনো ব্যাপারের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। জমজমাটের সবটাই সদর্থক। বন্ধুদের একটা ছোট্ট আড্ডাও জমজমাট হতে পারে। কিন্তু জুয়ার আসর জমজমাট হয় না। বাংলা ভাষায় এখনো অন্তত জমজমাট শব্দটার এতটা অধঃপতন ঘটেনি। জমজমাট শব্দের সাধারণ বাংলা অর্থ হলো জমাট, সরগরম, পূর্ণ সংহত রূপ ইত্যাদি।

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

আরবি জমজমা এবং ফারসি জামেদ মিলে তৈরি হয়েছে বাংলা ভাষার শব্দ জমজমাট। ব্যাংকে টাকা জমা হওয়া কিংবা দেহে চর্বি জমা—এই জমাও আরবি শব্দ, কিন্তু জমজমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। আরবি জমজমা শব্দের অর্থ সাংগীতিক সংহত রূপ। অন্যদিকে ফারসি জামেদ শব্দের অর্থ জমে শক্ত হওয়া—যেভাবে বালু, সিমেন্ট, খোয়া জমে শক্ত হয়। এই জামেদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত প্রচলিত একটি বাগ্ধারা—অনুদান জমে ক্ষীর। মোট কথা, সুন্দর যা কিছু সংহত রূপ নেয়, বাংলাতে তা-ই হয় জমজমাট।

কোলাব্যাঙ

এবার নিরীহ এক জলজ প্রাণী এবং তার নামের ইতিহাস বলি। কোলাব্যাঙ জাতে ওঠা একটা প্রাণী। গানে, ছড়ায়,

রূপকথায় কোলাব্যাঙের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

মহার্ঘ রেস্তোরাঁয় অতিথিদের পাতেও কোলাব্যাঙ দুর্লক্ষ্য নয়। ওই সব রেস্তোরাঁয় বাংলা নামের কোনো খাবার পাওয়া যায় না। কোলাব্যাঙের খাদ্যাংশ হলো তার পা। ব্যাঙের পা দাও—এমন কথা তো বলা যায় না। তাই অর্ডারের তালিকায় থাকে ফ্রগ লেগস।

তো, এই ফ্রগ লেগস এখন ঢাকার অনেক জায়গায় স্ট্রিটফুড হিসেবেও পাওয়া যায়।

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

ধান ভানতে শিবের গীত কিংবা মহীপালের গীত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এক কথা বলতে গিয়ে অন্য কথায় চলে যাচ্ছি। যে উদাহরণটা টানলাম, সেটি কিন্তু বিখ্যাত এক প্রবাদ। বাংলাদেশের গদ্য প্রবাদ-প্রবচনে উপস্থিতি বেশ কম। তাই প্রবাদটা তেমন দেখা যায় না। প্রবাদের শিব হিন্দু পুরাণের বিখ্যাত চরিত্র আর মহীপাল প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র। প্রবাদটা প্রয়োজন হলে যে যাঁর ইচ্ছেমাফিক ব্যবহার করতে পারেন।

আসল কথায় আসি এবার। কোলাব্যাঙ নিয়ে এত কথা কেন—এমন প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। আমার কারবার ব্যাঙ নিয়ে নয়—শব্দ নিয়ে। কোলাব্যাঙ নামটা কীভাবে তৈরি হলো, সেটাই বলি। ফারসি কোলা আর বাংলা ব্যাঙ নিয়ে তৈরি হয়েছে কোলাব্যাঙ নাম বা শব্দ। ফারসি কোলা শব্দের অর্থ ডোবা, পুকুর, জলাশয়। বিখ্যাত এই ব্যাঙটা এসব জায়গাতেই থাকে।

জটিল

সংসার বড় জটিল জায়গা। সমস্যা জটিল। সমাধান করাটাও অনেক সময় জটিল। জটিল মানুষ, জটিল চরিত্র, জটিল মনস্তত্ত্ব—অনেক রকম জটিলতার মধ্যে আমাদের বসবাস। মানুষের মনে জটিল প্রশ্ন জাগে। তার উত্তর পাওয়া যায় না। কারও কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্নের মধ্যে জটিল রহস্য খোঁজেন। জটিলতা যে কত রকমের হতে পারে, তার ইয়ত্তা নেই। সাধারণ জটিলতা যেমন জটিল অঙ্ক, জটিল হিসাব—এসব কথা তো বাদই দিলাম।

মোট কথা, যা কিছু দুর্বোধ্য তা-ই জটিল। জটিলতার মধ্যে অনেক প্যাঁচ, অনেক গোলমেলে ব্যাপার। অথচ অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার থেকে জটিল শব্দটা তৈরি।

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

পথেঘাটে জমাধারী বাউল ফকির অহরহ দেখতে পাওয়া যায়। চুলে জট পাকানো পাগলির দেখা পাওয়াও বিরল ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন চুলের পরিচর্যা না করলে, চুলে ঠিকমতো তেল না দিলে দীর্ঘ চুলে জটা ধরে। জটিল শব্দের সাধারণ অর্থ জটাবিশিষ্ট। আর চুলের এই জটাই জটিল রূপ ধরে আমাদের জ্বালিয়ে মারে। একটা শব্দের অর্থেরও যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে, জটিল শব্দটা তার বড় একটা প্রমাণ।

দুঁদে

সত্তর-আশি বছর আগে মানুষের মুখের কথায় শুধু নয়, গল্প-উপন্যাসেও শব্দটা বেশ চলত। দোর্দণ্ড প্রতাপ জমিদারকে মানুষ আড়ালে বলত—দুঁদে জমিদার।

মামলা-মোকদ্দমায় প্রতিপক্ষের উকিল-ব্যারিস্টারকে কথার মারপ্যাঁচে ঘায়েল করে মামলা জেতা উকিল-ব্যারিস্টারকে লোকে বলত দুঁদে। ন্যায় বা অন্যায় হোক, যেকোনো মামলা জেতার জন্য লোকে ছুটত দুঁদে উকিল কিংবা দুঁদে ব্যারিস্টারের পেছনে। পরবর্তীকালে, রাজনীতিবিদদেরও বিশেষণ হয়েছিল দুঁদে। তবে ব্যাপারটার অনেকখানিই ছিল নেতিবাচক। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে অভ্যস্ত রাজনীতিবিদকেই বলা হতো দুঁদে রাজনীতিবিদ।

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

দুঁদে শব্দটার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটোই আছে। আসলে শব্দের তো নিজের কোনো অর্থ নেই। আছে ব্যবহার। মানুষ কোন অর্থে শব্দটা ব্যবহার করছে—সেটাই আসল ব্যাপার। দুঁদে চরিত্রের মধ্যে দক্ষতা ও ধূর্ততা—দুটোই রয়েছে। যাহোক, দুঁদে শব্দটা এখন প্রায় অচল।

সংস্কৃত দ্বন্দ্ব থেকে বাংলা দুঁদে শব্দের জন্ম। দ্বন্দ্ব প্রথমে হয় দোঁদ, তারপর হয় দুঁদে—যার সাধারণ অর্থ দ্বন্দ্বপ্রিয়, ঝগড়াটে, বিবাদকারী, মামলাবাজ, দুর্দান্ত ইত্যাদি।

কথা উঠতে পারে, অচল হতে বসা শব্দের অর্থ বা ইতিহাস জেনে লাভ কী? সত্যিই তো। তাই বলে মাতৃভাষার সম্পত্তির হদিস রাখব না, তা-ও কি কখনো হয়?

স্বপ্ন

বিশ্বের সব ভাষাতেই স্বপ্ন বলতে রহস্যময়, রোমান্টিক, রোমাঞ্চকর একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। দুঃস্বপ্নের কথা অবশ্য আলাদা।

বাংলা ভাষায়ও স্বপ্ন শব্দটার সঙ্গে নানান বিষয়ের মাত্রা জড়িয়ে রয়েছে। তবে তা সম্পূর্ণ স্বপ্নের ব্যাপার। স্বপ্নের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তা ছাড়া আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরে কাজ কী?

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

তাই ফিরে আসি স্বপ্ন শব্দটার বেলায়। উত্স থেকে বেরিয়ে নদী যখন সাগরপানে ধায়, তখন রেখে যায় অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। শব্দের বেলায়ও তাই। প্রথমে থাকে একটি অর্থ—যেটিকে মূল অর্থ বলা যেতে পারে, তারপর অর্থের পরিবর্তন ঘটতে থাকে বিচিত্র সব কারণে।

স্বপ্ন সংস্কৃত শব্দ। মূল অর্থ হলো নিদ্রা বা ঘুম। বাংলা ভাষায় প্রবেশের পর স্বপ্ন শব্দের অর্থ দাঁড়ায় স্বপ্নে দেবতার আদেশ। আর এখন বাংলায় স্বপ্ন বলতে যা বোঝায় তার কথা ভাবলে ঘুম ছুটে যাবে। অতি সংক্ষেপে, অর্থাৎ এককথায় বলতে গেলে স্বপ্ন হলো নিদ্রাকালে অনুভূত ব্যাপার বা বিষয়—নিদ্রা নয়।