শীতকালে আমার আর পল্টুর অভ্যাস হলো ছাদে গিয়ে তারা দেখা। তখন আকাশ থাকে পরিষ্কার, ঝকঝকে আকাশে মিট মিট করে শত শত তারা। সেদিনও তাই করছিলাম। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার, পরদিন ছুটি, তাই ঘুমানো বা অন্য কিছুরও তাড়া নেই।
এ গল্প সে গল্প করতে করতে পল্টু তুলল আলোর সেই পুরোনো গল্প। যেখানে আমরা থেমেছিলাম আগের দিন। প্রশ্ন করল পল্টুই, ‘এই যে নানান ধরনের আলো, এগুলো তো একই রকম। তাহলে এগুলো বানাতে আলাদা আলাদা যন্ত্র লাগে কেন?’
আমি প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম, ‘আলাদা আলাদা যন্ত্র মানে?’
‘দৃশমান আলোর জন্য মোমবাতি বা লাইট। এক্স-রের জন্য এক্স-রে মেশিন, রেডিও তরঙ্গের জন্য রেডিও ট্রান্সমিটার।’
বরাবরের মতো দেখা গেল, পল্টু আরও কিছু পড়াশোনা করেছে এ বিষয়ে। কিন্তু মজার একটা ব্যাপার খুঁজে পায়নি। আসলে নানা ধরনের আলো উত্পাদনের জন্য আলাদা মেশিন লাগে না। একটা বস্তু থেকেই বেরোতে পারে সব ধরনের আলো। পল্টু অবাক হয়, ‘কীভাবে?’
আমি শুরুতে উদাহরণ দিই বড় কিছুর। ‘সূর্যের কথা চিন্তা কর। খুবই উত্তপ্ত একটা গোলক। এখান থেকে কিন্তু সব ধরনের আলোই বেরোচ্ছে। কোনো আলো বেশি, কোনোটা কম।’
পল্টু দেখি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মানে বুঝতে পারেনি। তাই আবার অন্যভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। ‘কখনো লোহাকে গরম করতে দেখেছিস?’
‘হুম, গত বছর দাদুবাড়ি গিয়েই তো দেখলাম। কামারের দোকানে।’
‘টকটকে লাল হয়ে যায়। সেখান থেকে আলো বের হয়।’
‘হুম। ঠিক বলেছিস, উত্তপ্ত করলে আলো বের হয়। যেকোনো উত্তপ্ত বস্তু থেকেই আলো বের হয়। আলো বের হওয়ার সময় শুধু লাল আলো বা দৃশ্যমান আলো বের হয় না। সব ধরনের আলোই বের হয়।’
‘সব আলো মানে কি অতিবেগুনি রশ্মিও বের হয়?’
‘হ্যাঁ, অতিবেগুনি রশ্মিও।’
‘অতিবেগুনি রশ্মি বের হলে তো ভয়ংকর কথা। মোমবাতির আলোতেও আমাদের ক্ষতি হবে।’
আমি সাহস দিলাম, ‘না, তা হবে না। সব ধরনের আলো সমান পরিমাণে বের হয় না। কোন আলো কত বের হবে তা নির্ভর করে তাপমাত্রার ওপর। যে বস্তুর তাপমাত্রা যত বেশি তা থেকে তত বেশি শক্তির আলো বের হয়।’
কোন আলোর শক্তি বেশি তা পল্টুর মনে আছে কি না, জানতে চাইলাম। দেখা গেল পল্টুর মনে আছে, ‘যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বেশি তার শক্তি তত কম।’
‘লাল, নীল আর গামা আলোর মধ্যে কোনটার শক্তি সবচেয়ে বেশি?’
‘সবচেয়ে বেশি গামা আলোর, সবচেয়ে কম শক্তি লাল আলোর।’
এবার আবার পুরোনো কথায় ফিরলাম। ‘সূর্যের কথা চিন্তা কর। এর তাপমাত্রা অনেক অনেক বেশি। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই সূর্য থেকে বেশি শক্তির আলো বের হয় বেশি। কম শক্তির আলো কম বের হয়। আবার ধর আমার এই হাতের কথা। এর তাপমাত্রা অনেক কম, তাই খুব কম শক্তির আলো বের হয়।’
‘তোমার হাত দিয়েও আলো বের হয়?’
‘হ্যাঁ, বের হয়। সে কথায় পরে আসি। লোহার কথা একটু বলে নিই। লোহা যখন ঠান্ডা থাকে তখন তা থেকে কম শক্তির আলো বেশি বের হয়। কিন্তু যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন বেশি শক্তির আলো বেশি বের হয়। তাই বলে কিন্তু কম শক্তির আলো বের হওয়া একদম বন্ধ হয় যায় না।’
পল্টু এবার পুরোনো কথায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল, ‘তোমার হাত দিয়ে কীভাবে আলো বের হয়?’
‘শুধু আমার হাত দিয়ে না। অন্য সবকিছু দিয়েই আলো বের হয়। তবে এ আলোয় দৃশ্যমান আলো নেই বললেই চলে। তাই আমরা চোখে দেখতে পাই না। বেশির ভাগ অংশই হয় খুব কম শক্তির আলো। এ আলোর নাম আগে একদিন বলেছিলাম, অবলোহিত রশ্মি।’
‘হুম, অবলোহিত রশ্মি টিভি রিমোটের লাইট থেকেও বের হয়। ক্যামেরা দিয়ে ওই আলোর ছবি তোলা যায়। আমি তুলে দেখেছি।’
‘ঠিক বলেছিস। সব উত্তপ্ত বস্তু দিয়ে যেহেতু তাপের কারণে অবলোহিত রশ্মি বের হয় এটা কিন্তু নানান কাজে লাগানো যায়। বল তো, আমার শরীরের তাপমাত্রা বেশি নাকি বিল্ডিংটার?’
‘অবশ্যই তোমার শরীরের। বিল্ডিংয়ের তাপমাত্রা বড়জোর ২০ ডিগ্রি হবে, তোমার শরীরের তাপমাত্রা অন্তত ৩৭ ডিগ্রি।’
আমি পল্টুর উত্তরে খুশি হয়ে গেলাম। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা যে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তা ও জানে। আজ প্রশ্ন করতে ভালো লাগছিল। তাই আবার প্রশ্ন করলাম, ‘বিল্ডিং আর মানুষের মধ্যে কোনটা হতে অবলোহিত রশ্মি বেশি বের হবে?’
‘মানুষ। এই আলো দিয়ে তো খুব মজার একটা কাজ করা যাবে। কোনটা মানুষ আর কোনটা অন্য কিছু তা বোঝা যাবে।’
‘ঠিক বলেছিস। এখন ক্যামেরা পাওয়া যায়। যে ক্যামেরা দিয়ে অবলোহিত রশ্মির ছবি তোলা যায়। মুভিগুলোতে দেখবি এই ক্যামেরা দিয়ে সৈন্যরা চারপাশ দেখে।’
‘এই ক্যামেরাই কি ক্রিকেট খেলায় ব্যবহার করে?’
‘হ্যাঁ, ক্রিকেট ম্যাচে হটস্পট থাকে না? হটস্পট প্রযুক্তি আসলে এই অবলোহিত রশ্মি ধরার প্রযুক্তিই। ব্যাটে বল লাগলে ঘষা খেয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তখন হটস্পট ক্যামেরা দিয়ে ওই জায়গার অবলোহিত রশ্মির ছবি তোলা হয়। সেই ছবি দেখে থার্ড আম্পায়ার বুঝতে পারেন ব্যাটে বলের ছোঁয়া লেগেছিল কিনা। হালকা টাচ করলেও তাপ উত্পন্ন হবে। তাই ভিডিওতে এমনিতে না দেখা গেলেও হটস্পট দিয়ে বোঝা যাবে।’
পল্টু মনে হলো বেশ অবাক হয়েছে। ‘হটস্পটের মতো প্রযুক্তিতেও আলোর ব্যবহার আছে!’
‘আ রে, ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার কাজ তো আলো দিয়েই করা হয়।’
‘তাই তো!’ এবার পল্টু একটা প্রস্তাব দিল, ‘তাহলে আমরা এমন ক্যামেরা বানাই না কেন যেটা অবলোহিত রশ্মির ছবি তুলবে।’
‘এমন ক্যামেরা তো আছে। আজকাল যে সিসি ক্যামেরাগুলো আছে ওইগুলা অবলোহিত রশ্মির ছবি তুলতে পারে।’
পল্টু চঞ্চল হয়ে উঠল, ‘আমাদের বাসার গেটে তো সিসি ক্যামেরা আছে। ওইটা কি অবলোহিত আলোতে ছবি তুলতে পারে?’
আমি জানতাম না ঠিক ওই ক্যামেরাটাই পারে কিনা। পল্টু পরীক্ষা করে দেখতে চাইল। আমরা ছাদ থেকে নেমে নিচে গেলাম সিকিউরিটি রুমে। গিয়ে দেখি বাসার সামনের রাস্তা অন্ধকার হলেও মনিটরে দিব্যি সবকিছু দেখা যাচ্ছে। আমিও অবাক হলাম, এত পরিষ্কার তো দেখা যাওয়ার কথা না। পরে দেখি ক্যামেরার সঙ্গে ছোট ছোট কতগুলো এলইডি লাইট দেওয়া আছে। ক্যামেরা অন থাকলে লাল হয়ে জ্বলে থাকে। ওইগুলো থেকে অনেক পরিমাণ অবলোহিত রশ্মি বের হয়, যা চারপাশকে অবলোহিত আলোয় ভরে রাখে। আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। ক্যামেরা ঠিকই দেখতে পায়।
সিকিউরিটি রুম থেকে বেরিয়ে পল্টু সূর্যের কথা জানতে চাইল। কিন্তু তখন আমার ঘুম পাচ্ছিল। তাই সূর্যের গল্প ভবিষ্যতের জন্য রেখে ঘুমাতে গেলাম।