যে কারণে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর ভারতের লোনি

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর ভারতের লোনিদীপক রাও, সিএনএন

লোনি শহরে যেতে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে এক ঘণ্টারও কম সময় লাগে। শহরটা খুব ছোট। তবু এই ছোট্ট শহরটির এক ভয়ংকর পরিচয় আছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর।

২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। দ্রুত বেড়ে ওঠা শিল্পনগরী লোনি। এখানে কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া আর নির্মাণকাজের ধুলা মিলেমিশে এমন বিষাক্ত বাতাস তৈরি করেছে, যেখানে ঠিকঠাক শ্বাস নেওয়াই কঠিন। প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস করে এই শহরে।

৪৫ বছর বয়সী ইলেকট্রিক রিকশাচালক মনোজ কুমার সারা জীবন এই শহরেই কাটিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘কাশি তো পরের বিষয়, এখানে শ্বাস নেওয়াই কঠিন।’ একই অভিজ্ঞতার কথা বললেন আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ মোহমিন খান। তিনি বলেন, ‘বাড়ির বাইরে বের হলেই মাস্ক পরতে হয়। দূষণ থেকে পালানোর কোনো জায়গা নেই। দিন–রাত একই অবস্থা।’

লোনির ভাঙাচোরা রাস্তা অনেকটা আমাদের ঢাকার মতো। আশপাশের নির্মাণকাজও দেখতে ঢাকার নির্মাণাধীন ভবনগুলোর মতো। এগুলো থেকে উড়তে থাকে ধুলা। এ কারণে দূষণ আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো অতিক্ষুদ্র কণা। এগুলো মানুষের ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন

গত বছর লোনিতে গড়ে এই সূক্ষ্ম কণার মাত্রা ছিল ১১২ দশমিক ৫। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে ২২ গুণ বেশি। এই কণাগুলো শুধু ফুসফুসে নয়, রক্তপ্রবাহেও ঢুকে পড়ে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাঁপানি, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসারসহ নানা শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এমনকি শিশুদের মানসিক বিকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

লোনির একজন চিকিৎসক ডা. অনিল সিং সিএনএনকে জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাঁর কাছে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যেই হাঁপানির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালের দূষিত শহরের তালিকায় লোনির পাশাপাশি রয়েছে চীনের হোটান, ভারতের বায়রনিহাট ও দিল্লি, পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ, রহিম ইয়ার খান, লাহোর, সুক্কুর এবং ভারতের গাজিয়াবাদ ও উলা। ঢাকা অবশ্য পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা ছিল ৪ নম্বরে। ঢাকার আগে ছিল কলকাতা, লাহোর ও দিল্লি।

আরও পড়ুন

বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং নির্মাণকাজের ধুলা। শীতকালে, বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত, উত্তর ভারতের শহরগুলোতে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়।

এই সময় একধরনের প্রাকৃতিক ঘটনার কারণে দূষণ আরও ভূমির কাছাকাছি বায়ুতে আটকে পড়ে। ঠান্ডা ভারী বাতাস ওপরে উঠতে না পেরে নিচেই জমে থাকে, যেন একটি ঢাকনা দূষণকে আটকে রাখছে।

দূষণ কমাতে ভারত ২০১৯ সালে একটি পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি চালু করে। লক্ষ্য ছিল ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে সূক্ষ্ম কণিকার মাত্রা ৪০ শতাংশ কমানো। এ জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, বায়ু পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালু এবং জৈব জ্বালানি পোড়ানো নিষিদ্ধ করার মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কিছু শহরে উন্নতি দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের অভাব আছে।

গত অক্টোবর মাসে দিল্লিতে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঘটিয়ে বায়ু পরিষ্কার করার একটি পরীক্ষাও চালানো হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। এরপর নভেম্বর মাসে যখন দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে শত শত মানুষ প্রতিবাদে নেমেছিল।

চীনে দীর্ঘমেয়াদি ও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে দূষণ কমানোর উদ্যোগ ভালো ফল দিয়েছে। সেখানে জাতীয় পর্যায়ে সূক্ষ্ম কণিকার মাত্রা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন