গানের তালে কি সত্যিই মন নাচে
হেডফোনে প্রিয় কোনো রক গান বাজছে। গিটারের কড়া আওয়াজ আর ড্রামের ধুমধাম শব্দ কান দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। একটু মন দিয়ে খেয়াল করলেই দেখবে, তোমার বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটাও যেন গানের তালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত লাফাচ্ছে। শুধু হৃৎপিণ্ড নয়, তোমার শরীরের রক্ত চলাচল বেড়ে গেছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের গতিও আগের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়ে গেছে। আবার রাতে ঘুমানোর আগে যখন খুব শান্ত বা ধীরলয়ের কোনো সুর শোনো, তখন তোমার শরীরও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। চোখের পাতায় একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে।
গান শুনলে আমাদের মনের ওপর প্রভাব পড়ে, এটা তো আমরা সবাই জানি। মন খারাপ থাকলে আমরা একধরনের গান শুনি, আবার আনন্দে থাকলে আরেক ধরনের। কিন্তু গানের সুর যে সরাসরি আমাদের শরীরের ভেতরের একটি যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা কি কখনো ভেবেছ? হ্যাঁ, কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা না পড়লেও আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি, উদ্দীপনা জাগানো কোনো সুর আমাদের রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। তবে বিজ্ঞানীরা এখানেই থেমে থাকেননি। তাঁরা রীতিমতো গবেষণা করে দেখেছেন, গানের সুরের সঙ্গে আমাদের হৃৎপিণ্ডের ওঠানামার সম্পর্কটা পুরোপুরি শারীরবৃত্তীয়।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, যখন আমরা খুব শান্ত কোনো ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক শুনি, তখন আমাদের শরীরের ভেতরে জাদুকরি একটা ব্যাপার ঘটে। আমাদের রক্তচাপ ধীরে ধীরে কমে যায়। সেই সঙ্গে আমাদের হার্টবিটও স্বাভাবিকের চেয়ে কমে আসে। শরীর একটা আরামদায়ক ও নিরাপদ অবস্থায় চলে যায়। অন্যদিকে যখন আমরা খুব উচ্চ শব্দে রক গান শুনি, তখন আমাদের রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যায়। হার্ট রেট বেড়ে গিয়ে শরীরকে উত্তেজিত করে তোলে। এ সময় আমাদের শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত অনেক দ্রুত ছুটতে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, গানের এই প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে কাজ করে না। যাঁরা পেশাদার সংগীতশিল্পী, তাঁদের ওপর এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ, তাঁদের মস্তিষ্ক সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে গানের সুরকে অনুভব করতে পারে। শব্দের সামান্য ওঠানামাও তাঁদের স্নায়ুকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। তবে তুমি যদি পেশাদার মিউজিশিয়ান না-ও হও, তাহলেও গান তোমার হৃৎপিণ্ডকে প্রভাবিত করবেই। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, তুমি যদি এমন কোনো গান শোনো, যেটা তোমার একদমই পছন্দ নয়, তার পরও সেই গানের তাল তোমার হার্ট রেটকে প্রভাবিত করবে! অর্থাৎ তোমার পছন্দ-অপছন্দের তোয়াক্কা না করেই গানের সুর তোমার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কিন্তু এমনটা কেন হয়? গানের সুরের সঙ্গে আমাদের হৃৎপিণ্ডের এত গভীর সম্পর্ক তৈরি হলো কীভাবে? কেন একটি জড় পদার্থের তৈরি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ আমাদের শরীরের ভেতরের জ্যান্ত রক্তমাংসের যন্ত্রটাকে এভাবে নাচাতে পারে?
এর সঠিক ও চূড়ান্ত কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে তাঁদের কাছে একটা দারুণ তত্ত্ব আছে। তাঁরা মনে করেন, গানের সুরের প্রতি আমাদের শরীরের এই অদ্ভুত আচরণের বীজ বোনা হয়ে যায় আমাদের জন্মের অনেক আগে! যখন আমরা মাতৃগর্ভে থাকি, তখনই এই ব্যাপারটি আমাদের মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
একটি শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের শেষ দিক থেকে সে বাইরের শব্দ শুনতে পায়। অর্থাৎ গর্ভাবস্থার ছয় মাস বয়স থেকেই শিশুটি শব্দ শোনার ক্ষমতা অর্জন করে। মাতৃগর্ভের ওই ছোট্ট, উষ্ণ ও অন্ধকার জায়গায় শিশুটি সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে স্পষ্ট যে শব্দটা শুনতে পায়, তা হলো তার মায়ের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন। মায়ের বুকের ওই একটানা ধুকপুক শব্দটাই হলো পৃথিবীর বুকে আমাদের শোনা প্রথম কোনো মিউজিক।
মায়ের হৃৎপিণ্ডের এই শব্দের সঙ্গে আমাদের আবেগের একটা সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়। যখন কোনো কারণে মা ভয় পান বা মানসিক চাপে থাকেন, তখন মায়ের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। গর্ভের শিশুটি তখন সেই দ্রুত স্পন্দনের শব্দ শুনতে পায়। সে বুঝতে পারে, দ্রুত স্পন্দন মানেই কোনো মানসিক চাপ, ভয় বা উত্তেজনার মুহূর্ত। আবার মা যখন শান্ত থাকেন, তখন তাঁর হৃৎপিণ্ডের ধীর স্পন্দন শুনে শিশুটিও নিরাপদ ও শান্ত বোধ করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, গান শোনার পর আমাদের হৃৎপিণ্ডের যে প্রতিক্রিয়া হয়, তা আসলে মাতৃগর্ভের সেই পুরোনো স্মৃতিরই একটা রূপ। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে এম্প্যাথিক মেমোরি বা সহমর্মিতার স্মৃতি। অর্থাৎ যখন আমরা দ্রুত লয়ের কোনো গান শুনি, তখন আমাদের অবচেতন মন মাতৃগর্ভের সেই উত্তেজনার সময়টাতে ফিরে যায়। আর যখন শান্ত সুর শুনি, তখন মায়ের গর্ভের সেই নিরাপদ ও শান্ত সময়ের স্মৃতি আমাদের শরীরকে প্রশান্ত করে দেয়।