অতিরিক্ত বই পড়লে কি কোনো অসুবিধা আছে
বই পড়া যে মানুষের জন্য ভালো, তা আমরা সবাই জানি। তবে জ্ঞান বাড়ানো বা পড়াশোনায় ভালো করার বাইরেও বইয়ের আরও বড় ভূমিকা আছে। বই মানুষের মন ভালো করতে, কষ্ট কমাতে ও মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে দারুণ সাহায্য করে। বিশেষ করে গল্প বা উপন্যাসের বই মনের জন্য ওষুধের মতো কাজ করে। এগুলো মানুষের একাকিত্ব, মনের ভয় ও মানসিক আঘাত দূর করতে বেশ সাহায্য করে।
বই পড়ে মনের চিকিৎসা
গত কয়েক বছরে পড়ুয়াদের মধ্যে ‘বিবলিওথেরাপি’ নামের একটি চর্চার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিবলিওথেরাপি মানে হলো, বই পড়ার মাধ্যমে মনের চিকিৎসা করা। এর মূলকথাই হলো বই পড়া মানুষের জন্য সব সময়ই উপকারী। লাইব্রেরিয়ানরা নিজেরাও বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসেন, তাই এই ধারণায় তাঁরা আরও বেশি বিশ্বাস করেন।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বই পড়া কীভাবে মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে? মাথাব্যথার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ খেলে যেমন উপকার পাওয়া যায়, তেমনই সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা উল্টো ক্ষতি হতে পারে। বই পড়ার বিষয়টিকেও যদি আমরা মনের ওষুধ হিসেবে দেখি, তবে এর মধ্যেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
সমস্যা হলো, বই পড়ুয়ারা বইকে এত ভালোবাসেন যে তাঁরা কেবল বইয়ের ভালো দিকগুলোই দেখতে পান। এর ফলে বই পড়ার মাধ্যমে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা অনেক সময় তাঁদের চোখে পড়ে না। অথচ এই ক্ষতি কিন্তু একদম সত্যি হতে পারে। তা হতে পারে চিন্তাধারায়, মনের ওপর, সমাজে মেলামেশায় কিংবা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে।
পড়াশোনার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
যারা কম পড়তে চায়, তারা প্রায়ই অজুহাত দিয়ে বলে, বেশি পড়াশোনা করলে নাকি নানা ধরনের সমস্যা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে কী বলে? সত্যিই কি বেশি পড়াশোনা করলে মানুষের কোনো সমস্যা হতে পারে?
সহজ কথায় উত্তর হলো—না, কেবল পড়াশোনা করার কারণে মানুষের কোনো বড় ক্ষতি হয় না।
তবে হ্যাঁ, অতিরিক্ত পড়াশোনা তীব্র মানসিক ও আবেগীয় চাপের কারণ হতে পারে। ফলে চরম উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্লান্তি বা ‘কগনিটিভ বার্নআউট’ এবং ঘুমের অভাবের মতো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর এই বিষয়গুলোর পেছনে কিছু ভিন্ন কারণ কাজ করে, যা সবার স্পষ্ট করে জানা প্রয়োজন।
দেখা যায়, অনেক সময় একজন মানুষের ভেতর হয়তো আগে থেকেই কোনো মানসিক জটিলতা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়। পড়াশোনা বা পরীক্ষার সময়ের তীব্র মানসিক চাপ সেই সুপ্ত সমস্যাটিকে হঠাৎ বাইরে নিয়ে আসে। সাধারণ মানুষ তখন মনে করে পড়াশোনার জন্যই এমনটা হয়েছে, অথচ মূল কারণ ছিল তার ভেতরের আগের কোনো মানসিক চাপ বা সমস্যা।
আবার টানা পড়াশোনা করতে গিয়ে যদি কেউ ঠিকমতো না ঘুমায়, পুষ্টিকর খাবার না খায় এবং নিজেকে সমাজ থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেয়, তবে মস্তিষ্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। দীর্ঘদিনের ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ ও বিভ্রান্ত করে তুলতে পারে।
আর কেউ যদি বই বা পড়ার জগতে অতিরিক্ত বুঁদ হয়ে থাকেন, তবে অনেক সময় তাঁরা কাল্পনিক জগৎকে বাস্তব ভেবে ভুল করতে শুরু করেন। এটিও একধরনের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা।
কাজেই পড়াশোনা করা বা বই পড়া মোটেও ক্ষতিকর কিছু নয়। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বজায় রাখা জরুরি। জীবনের সবকিছুর মতোই পড়াশোনাতেও প্রয়োজন একটি সুন্দর ভারসাম্য।