মুঠোফোনের জগতে অ্যাপল ও গুগলের গ্লোবাল ডুয়োপলি

অ্যাপল ও গুগলছবি: রয়টার্স

তোমার হাতের স্মার্টফোনটির দিকে একবার তাকাও তো! এটা কি আইফোন? নাকি স্যামসাং, শাওমি, রিয়েলমি বা পিক্সেল? ফোন যে কোম্পানিরই হোক না কেন, তুমি হয়তো ভাবছ তোমার হাতে অনেকগুলো অপশন আছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, তুমি আসলে মাত্র দুটি অদৃশ্য সুতার টানে বাঁধা আছ।

পুরো পৃথিবীতে শত শত ব্র্যান্ডের হাজারো মডেলের স্মার্টফোন চলছে ঠিকই, কিন্তু ডিজিটাল এই দুনিয়ায় রাজত্ব করছে মাত্র দুটি কোম্পানি—অ্যাপল ও গুগল!

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যত স্মার্টফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ৯৯ শতাংশের বেশি চলছে এই দুই কোম্পানির অপারেটিং সিস্টেমে। পৃথিবীতে প্রতিটি আইফোন চলে অ্যাপলের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম আইওএসে। অন্যদিকে স্যামসাং, গুগল পিক্সেল, শাওমি থেকে শুরু করে ওয়ানপ্লাসসহ অন্য সব ফোন চলছে গুগলের অ্যান্ড্রয়েডে।

তৃতীয় কোনো শক্তিশালী বিকল্প এখন আর পৃথিবীতেই টিকে নেই। এককথায়, প্রযুক্তির এই দুনিয়াকে বলা যায় গ্লোবাল ডুয়োপলি। মানে, মাত্র দুজনের রাজত্ব!

অ্যান্ড্রয়েড: পুরো বিশ্বের বাজার দখল

পুরো বিশ্বের স্মার্টফোন বাজারের দিকে তাকালে দেখবে, সেখানে একচেটিয়া দাপট দেখাচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড। গ্লোবাল স্মার্টফোন মার্কেটের প্রায় ৭০ শতাংশই এর দখলে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৩৯০ কোটি সক্রিয় অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস রয়েছে!

দেশ হিসেবে ধরলে সংখ্যাটা আরও চমকে দেওয়ার মতো। ভারতের মোট স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর ৯২ শতাংশ ও চীনের ৬৯ শতাংশই অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহার করেন। এর এত জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো, এটি একটি ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম। অর্থাৎ যেকোনো মোবাইল কোম্পানি চাইলে গুগলের এই সিস্টেম বিনা মূল্যে নিজেদের ফোনে ব্যবহার করতে পারে।

অ্যাপল: আভিজাত্য ও আয়ে সেরা

অ্যান্ড্রয়েড যদি পুরো বিশ্বের রাজা হয়, তবে অ্যাপল বা আইওএস হলো আমেরিকার বাজারে মুঠোফোনের ক্ষেত্রে সেরা সিস্টেম। যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশই অ্যাপলের দখলে।

মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে আইফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা অ্যান্ড্রয়েডের চেয়ে অনেক কম হলেও আয়ের দিক থেকে অ্যাপল যোজন যোজন এগিয়ে। কারণ, অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের তুলনায় আইফোন ব্যবহারকারীরা অ্যাপের পেছনে অনেক বেশি টাকা খরচ করেন। গ্লোবাল অ্যাপ স্পেন্ডিং বা পুরো বিশ্বের মানুষ অ্যাপের পেছনে যত টাকা খরচ করেন, তার ৬৮ শতাংশই যায় অ্যাপলের পকেটে! অর্থাৎ কম ফোন বেচেও অ্যাপল টাকা কামাচ্ছে বেশি।

যেভাবে তৈরি হলো এই বিশাল সাম্রাজ্য

আজ থেকে বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রযুক্তিবিশ্বকে চমকে দিয়ে স্টিভ জবস প্রথমবারের মতো আইফোন উন্মোচন করেন। ঠিক এর পরের বছর, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাজারে এল প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফোন।

এই দুটি ঘটনা পুরো মোবাইল দুনিয়ার হিসাব–নিকাশ পাল্টে দিল। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে একসময়ের দাপুটে সব অপারেটিং সিস্টেম রীতিমতো হাওয়া হয়ে গেল। এসবের মধ্যে ছিল ব্ল্যাকবেরি, সিম্বিয়ান (নকিয়া), পাম ওএস ও উইন্ডোজ মোবাইল। সব হারিয়ে যাওয়ায় এই দুই কোম্পানি প্রায় পুরোটা দখল করে নেয়।

২০০ বিলিয়ন ডলারের অ্যাপ ইকোনমি

পৃথিবীতে এখন শত শত বিলিয়ন ডলারের অ্যাপের ব্যবসা চলছে। আর এই বিশাল বাজারে ঢোকার দরজা মাত্র দুটি—অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর ও গুগলের প্লে স্টোর। তুমি যদি একজন অ্যাপ ডেভেলপার হও এবং তোমার অ্যাপটি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাও, তবে তোমাকে এই দুটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতেই হবে। অন্য কোনো উপায় নেই বললেই চলে।

২০২৫ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, শুধু অ্যাপ স্টোরই আয় করেছে ১৪২ বিলিয়ন ডলার! আর গুগল প্লে স্টোরের আয় ছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

অ্যাপল ও গুগল ট্যাক্স বিতর্ক

এই দুই কোম্পানির সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা হলো এদের ৩০ শতাংশ ট্যাক্স। অ্যাপ স্টোর বা প্লে স্টোর থেকে কোনো অ্যাপের ভেতর তুমি যখনই কোনো কিছু কেনাকাটা করো, তার ৩০ শতাংশ টাকা সোজা অ্যাপল বা গুগলের পকেটে চলে যায়!

সমালোচকেরা একে অ্যাপল ট্যাক্স বা গুগল ট্যাক্স বলে ডাকেন। স্পটিফাই, নেটফ্লিক্স ও বিখ্যাত সব গেম ডেভেলপার কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল ট্যাক্সের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। কারণ, শুধু এই ট্যাক্স থেকেই বছরে অ্যাপল ও গুগলের ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়!

পুরো পৃথিবী ওদের পকেটে

সব মিলিয়ে পৃথিবীতে এখন ৫৫০ কোটির বেশি সক্রিয় স্মার্টফোন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬৫ কোটি আইফোন ও ৩৯০ কোটি অ্যান্ড্রয়েড। একটু ভেবে দেখো তো, প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের পাঠানো প্রতিটি মেসেজ, ছবি, পেমেন্ট ও ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকশন কোনো না কোনোভাবে এই দুটি কোম্পানির হাত হয়েই যাচ্ছে।

মানব ইতিহাসে এর আগে কোনো রাজা, সম্রাট বা কোম্পানির হাতে এত বিপুল পরিমাণ ক্ষমতা ছিল না!

সূত্র: টেকনোলজি ডটকম