জন্মদিনে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভানোর প্রথা এল কোথা থেকে
টেবিলে দারুণ সুন্দর একটা কেক রাখা। হঠাৎ ঘরময় অন্ধকার হয়ে গেল। কেকের ওপর মোমবাতিতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। তুমি গাল ফুলিয়ে ফুঁউউউ দিয়ে সেই আগুন নেভালে। তারপর সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’।
একটু লজিক দিয়ে চিন্তা করলে পুরো ব্যাপারটা চরম হাস্যকর ও অদ্ভুত মনে হয় না? একটা দারুণ সুস্বাদু খাবারের ওপর আমরা আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছি, আবার পরক্ষণেই নিজের মুখের বাতাস দিয়ে সেটা নেভানোর চেষ্টা করছি। কেন এমন অদ্ভুত কাজ করছি আমরা? হয়তো বলবে, ছোটবেলা থেকেই তো এভাবে করে আসছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আজব প্রথা কে শুরু করেছিল? খাবার জিনিসের ওপর আগুন দিয়ে এই খেলা দেখানোর আইডিয়াটাই কার মাথা থেকে এসেছিল? এর পেছনে নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তির কোনো যুক্তি ছিল। কী সেই যুক্তি?
মজার ব্যাপার হলো, এর একটা নিখুঁত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে। এই মোমবাতি নেভানোর প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন দেব-দেবী, জার্মান শিশুদের উৎসব, সুইস ফোকলোর জার্নাল এবং মিকি মাউস! চলো, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই আজ এই অদ্ভুত ইতিহাসের রহস্যটা ভেদ করা যাক।
জন্মদিনের কেকে কি সব সময় মোমবাতি থাকত
এককথায় উত্তর হলো, না। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে জন্মদিনের কেকে মোমবাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ব্যাপারটা একটু অবাক করার মতো। কারণ, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে ধর্মীয় বা দরকারি কাজে মোমবাতি জ্বালিয়ে আসছে। কিন্তু এতগুলো বছর ধরে কারও মাথাতেই আসেনি যে এই মোমবাতিটাকে তুলে নিয়ে কেকের ওপর গুঁজে দেওয়া যায়!
তাহলে কেক আর মোমবাতি আসার আগে মানুষ জন্মদিন কীভাবে উদ্যাপন করত? ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়ে জন্মদিন পালনের ব্যাপারটা কোনো পার্টির মতো ছিল না, বরং এটি ছিল অনেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো। যেমন ধরো, প্রাচীন রোমানরা অভিজাতদের জন্য রীতিমতো জন্মদিনের আয়োজন করত ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোনো হইহুল্লোড় হতো না। সেই আয়োজন ছিল মূলত একজন মানুষের রক্ষাকারী আত্মার প্রতি উৎসর্গ। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, এই আত্মা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের ছায়ার মতো পাশে থাকে। অর্থাৎ সেখানে কোনো হ্যাপি বার্থডে গান ছিল না, ছিল শুধুই প্রার্থনা।
মোমবাতির ইতিহাস
প্রাচীনকালের ওই প্রার্থনা থেকে আজকের দিনের এই কেক-মোমবাতি পর্যন্ত আসার রাস্তাটা বুঝতে হলে তোমাকে একদম পুরোনো একটা ধারণায় ফিরে যেতে হবে। প্রাচীন মানুষের কাছে আগুন মানেই ছিল পবিত্র কিছু, দেবতার রূপ!
বেদান্ত আমল থেকে শুরু করে পারস্য, গ্রিস এবং রোম—সব প্রাচীন সংস্কৃতিতেই আগুনকে পবিত্র কিছু হিসেবে মানা হতো। মানুষ যখন সুরেলা গলায় কেক কাটার গান গাইতে শেখেনি, তারও বহু আগে থেকে তারা নিজেদের প্রার্থনালয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে আগুন ব্যবহার করত।
জন্মদিনের মোমবাতি নিয়ে ইন্টারনেটে বা অনেক বইয়ে তুমি খুব জনপ্রিয় একটা গল্প পাবে। বলা হয়, প্রাচীন গ্রিসে চাঁদের দেবী আর্টেমিসকে উৎসর্গ করে একধরনের চিজকেক (যাতে মধু আর ময়দা থাকত) বানানো হতো। চাঁদের আলোর মতো বোঝাতে সেই কেকের ওপর মশাল বা ছোট আগুন জ্বেলে দেওয়া হতো। গল্পটা শুনতে দারুণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘মুন কেক’-এর সঙ্গে আমাদের আধুনিক জন্মদিনের মোমবাতির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটা পুরোটাই একটা লোককথা বা মিথ।
খ্রিষ্টধর্মের আগমনে পাল্টে গেল জন্মদিনের ধারণা
গ্রিকদের পর দৃশ্যপটে হাজির হলো শুরুর দিকের খ্রিষ্টানরা। তারা এসে জন্মদিনের উৎসবের একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিল! শুরুর দিকের চার্চের নেতারা জন্মদিন পালন করার ঘোরবিরোধী ছিলেন। তাঁদের মতে, জন্মদিন পালন করাটা চরম স্বার্থপরতা এবং এটা অনেকটা বিধর্মীদের মতো আচরণ। এর বদলে তাঁরা যিশুর ব্যাপটিজম, ইস্টার এবং শহীদদের মৃত্যুর দিন পালন করা শুরু করলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর দিনটিই হলো স্বর্গে ‘জন্ম’নেওয়ার আসল দিন।
তবে মোমবাতি কিন্তু হারিয়ে যায়নি। চার্চের বিভিন্ন পবিত্র মুহূর্তে ঠিকই মোমবাতি জ্বলত। শুধু কেক বেচারা ওই পার্টি থেকে অনেক লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে পড়ে।
কেকের ফিরে আসা
মধ্যযুগের শেষের দিকে এসে কেক আবার উৎসবের খাবারে পরিণত হতে শুরু করে। তবে সেটা শুধু বড়লোকদের বাড়িতে। এরপর ১৬০০ শতকের দিকে মানুষ জন্মদিন বা বিয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনের মাইলফলকগুলো উদ্যাপন করতে শুরু করে।
এখান থেকেই জার্মানির মঞ্চ প্রস্তুত হলো। ১৬৯১ সালে জোহান ক্রিস্টোফ ওয়াগেনসাইল নামে এক জার্মান পণ্ডিত নুরেমবার্গ শহরের শিশুদের জন্মদিনের কেক নিয়ে প্রথমবারের মতো লেখালেখি করেন। তখনো মোমবাতির দেখা মেলেনি ঠিকই, তবে জন্মদিনের কেকের একেবারে প্রথম লিখিত প্রমাণ এটিই!
তাহলে মোমবাতি নেভানোর চল শুরু হলো কবে
মোমবাতি, কেক আর জন্মদিন—এই তিনের জাদুকরি মিলন ঘটেছিল ১৮ শতকের জার্মানিতে। সেখানে শিশুদের জন্য কিন্ডারফেস্ট নামে একটি উৎসব হতো। পপ কালচার ইতিহাসবিদ মারি নিকোলা বলেন, ‘১৬৯১ থেকে ১৭৪০ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময়ে মানুষের লজিক ও প্রতীকী চিন্তার দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটে। কেক তো আগে থেকেই উৎসবের অংশ ছিল, মোমবাতি মানে ছিল পবিত্র জীবন, আর শিশু মানেই হলো দারুণ এক সম্ভাবনা। এই তিন জিনিসকে এক করে দেওয়া হলো।’
বিখ্যাত লেখক জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে ১৭৪০-এর দশকে একটি জন্মদিনের কেকের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘কেকের চারপাশটা আলো দিয়ে এমনভাবে ঘেরা ছিল, যেন সেটা একটা বেদি বা প্রার্থনার জায়গা!’
কিন্ডারফেস্টের এই উৎসব মূলত শুরু হয়েছিল জার্মানির পায়েটিজম আন্দোলন থেকে। এই প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মূল কথা ছিল, ঘরই হলো মানুষের নৈতিকতা শেখার আসল জায়গা। মোমবাতিগুলো ছিল শিশুর ভেতরের সুন্দর বিকাশের প্রতীক। শিশুর যত বছর বয়স, কেকে ঠিক ততগুলো মোমবাতি বসানো হতো। তার সঙ্গে যোগ করা হতো বাড়তি একটি মোমবাতি, যার মানে হলো ‘আগামী দিনের বেড়ে ওঠা’।
১৮৮১ সাল নাগাদ এই প্রথা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে যায়। সুইস ফোকলোর জার্নালে সে দেশের মধ্যবিত্তদের এই কেক ও মোমবাতি প্রথার কথা রেকর্ড করা হয়। আর সেখানেই প্রথম লেখা হয়, কেক খাওয়ার আগে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভানো হতো!
ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল
পৃথিবীর বহু প্রাচীন ধর্মে এবং বিশ্বাসে মানুষের মুখের বাতাস বা শ্বাসকে তার আত্মা বা জীবনীশক্তির প্রতীক ধরা হতো। মোমবাতি নেভানোর সময় মনে মনে কোনো ইচ্ছা বা প্রার্থনা করাটা আসলে সেই পুরোনো বিশ্বাসের আধুনিক রূপ। তুমি যখন চোখ বন্ধ করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাও, তুমি আসলে শুধু এক টুকরা মোমের আগুন নেভাচ্ছ না; তুমি একটা ছোট্ট, ব্যক্তিগত প্রার্থনা করছ। শুধু চার্চের বদলে সেটা হচ্ছে তোমার ড্রয়িংরুমে, আর সঙ্গে ফ্রি পাচ্ছো দারুণ স্বাদের খাবার!
কীভাবে এটা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল
জার্মানির এই কিন্ডারফেস্ট প্রথাকে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল জার্মান অভিবাসীরা। ১৮০০ শতকের দিকে ফিলাডেলফিয়া বা মিলওয়াকির মতো শহরের জার্মান ভাষার পত্রিকাগুলোয় কিন্ডারফেস্টের খবর ছাপা হতো।
১৯০০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনে কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালানোটা মধ্যবিত্তদের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো জন্মদিনের বয়স অনুযায়ী বক্সে ভরে মোমবাতি বিক্রি করা শুরু করে।
কিন্তু পুরো দুনিয়াকে এই নিয়মটা পাকাপাকিভাবে কে শেখাল জানো? ১৯৩১ সালে ডিজনির বানানো একটি শর্ট ফিল্ম! সেই ফিল্মে ঠিক আজকের মতো করে একটি জন্মদিনের পার্টি দেখানো হয়েছিল—প্রথমে কেক, তারপর মোমবাতি, তারপর গান, এবং শেষে উইশ করে ফুঁ দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার এই পপ কালচার, মিডিয়া ও সিনেমা পুরো বিশ্বকে এই একই স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করিয়ে দিল।
সবাই কি একই নিয়মে জন্মদিন পালন করে
না, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আমাদের মতো ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভায় না! অনেক দেশের নিজস্ব প্রাচীন প্রথা ছিল। কিন্তু ডিজনির কল্যাণে এই জার্মান-আমেরিকান স্টাইলটা এতই জনপ্রিয় হলো যে ১৯৫০-এর দশকে জাপানও এই প্রথা আপন করে নিল।
তবে এখনো অনেক দেশে ভিন্ন নিয়ম আছে। যেমন ঘানাতে জন্মদিনের সকালে মিষ্টি আলুর তৈরি ওতো (oto) নামে একটি খাবার খাওয়া হয়। রুশরা জন্মদিনে কেকের বদলে বিশেষ একধরনের পাই কাটে। আর চীনারা তো কেক বাদ দিয়ে লম্বা আয়ুর আশায় লংজিভিটি নুডলস খায়!
জার্মানিতেও এখনো একটা নিজস্ব পুরোনো স্টাইল টিকে আছে। অনেক জার্মান পরিবার কেকের মোমবাতি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁ দিয়ে নেভায় না। তারা কাঠের তৈরি একটা গোলাকার রিংয়ে মোমবাতি বসিয়ে সারা দিন সেটা জ্বালিয়ে রাখে। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য তারা এটা করে।
শেষ কথা
তাহলে কী বুঝলে? এরপর যখন ঘর অন্ধকার করে, বন্ধুদের হাততালির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেকের ওপর ফুঁ দেওয়ার জন্য গাল ফোলাবে, তখন মনে রেখো, তুমি শুধু একটা সাধারণ কাজ করছ না। তুমি একটা বিশাল ঐতিহাসিক শেকলের অংশ। প্রাচীন রোমানদের প্রার্থনা, খ্রিষ্টানদের রীতি, জার্মানদের উৎসব আর ডিজনির সিনেমা—সবকিছু পার হয়ে ওই মোমবাতিটা আজ তোমার কেকের ওপর এসে বসেছে।
তাই চোখ বন্ধ করো, মনের সবচেয়ে সুন্দর উইশটা করো। আর হ্যাঁ, একটু সাবধানে ফুঁ দিয়ো, যাতে কেকের ওপর থুথু ছিটে না যায়!