একাধিক ভাষা জানলে জীবনের শেষ দিকে যে সুবিধা পাওয়া যায়

বহুভাষী হওয়ার সামাজিক ও মানসিক সুবিধা অনেকছবি: ফ্রিপিক

আমরা সবাই হয়তো তরুণ থাকতে চাই। এ জন্য অনেক কিছু করি। জিমে যাই, ডায়েট করি। কিন্তু যদি বলি, বার্ধক্য ঠেকানোর আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আপনার মুখের কথায়? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। একাধিক ভাষা জানা থাকলে বার্ধক্য ঠেকানো যায়। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত নেচার এজিং জার্নালে এ বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, যাঁরা দুই বা তার বেশি ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এটা কোনো ছোটখাটো জরিপ নয়। গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল ইউরোপের ২৭টি দেশের ৫১ থেকে ৯০ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ হাজার ১৪৯ জনের ওপর এ গবেষণা চালিয়েছে।

যাঁরা কেবল একটি ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে যাঁরা একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের এই ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে যায়। মজার ব্যাপার হলো, আপনি যত বেশি ভাষা জানবেন, বার্ধক্যের বিরুদ্ধে আপনার সুরক্ষার দেয়াল তত মজবুত হবে! কিন্তু কেন এমন হয়?

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা এর পেছনে একটি দারুণ যুক্তি দিয়েছেন। একে বলা হচ্ছে নিউরোলজিক্যাল নিম্বলনেস বা মস্তিষ্কের ক্ষিপ্রতা। আমরা যখন একাধিক ভাষা ব্যবহার করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় সুইচ করতে হয়। এই মানসিক কসরত আমাদের স্নায়ুগুলোকে সচল রাখে এবং মস্তিষ্ককে ঝিমিয়ে পড়া থেকে বাঁচায়। ঠিক যেমন নিয়মিত হাঁটাচলা করলে শরীর ভালো থাকে, তেমনি বহুভাষী হওয়া মস্তিষ্ককে সজীব রাখে।

অনেকে ভাবতে পারো, যাঁরা একাধিক ভাষা জানেন, তাঁরা হয়তো ধনী বা উচ্চশিক্ষিত। তাই তাঁরা এমনিতেই ভালো থাকেন। কিন্তু গবেষকেরা এই ফাঁকটাও বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁরা গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বয়স, শারীরিক স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক পরিবেশ আলাদাভাবে হিসাব–নিকাশ করেছেন। দেখা গেছে, এসব কিছু বাদ দিলেও শুধু একাধিক ভাষা জানা থাকলেই মানুষ বার্ধক্যকে পিছিয়ে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে হ্যাঁ, গবেষকেরা একটা পার্থক্যও খেয়াল করেছেন। ছোটবেলায় যাঁরা স্কুলে কোনো ভাষা শিখে পরে ভুলে গেছেন, তাঁদের চেয়ে যাঁরা দৈনন্দিন জীবনে একাধিক ভাষা নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাঁরা বেশি সুফল পান। এই গবেষণা বিশ্বের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষের জন্য সুখবর, তবে সবার জন্য নয়। যেমন আমাদের বাংলাদেশিরা বাংলা পুরোপুরি পারি এবং ইংরেজি বা হিন্দিও পারি কিছুটা। পুরোপুরি বলতে না পারলেও অনেকেই এই দুটি ভাষা ভালোভাবে বুঝতে পারি।

কিন্তু আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য এটা একটু চিন্তার বিষয়। কারণ, সেখানকার ৭৫ শতাংশ মানুষ কেবল ইংরেজিতে কথা বলেন। এসব দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মস্তিষ্কের অসুখ। ভাষাবিদ স্টিফেন মে বলছেন, ইংরেজিভাষী মানুষের জন্য এখন নতুন ভাষা শেখাটা শুধু শখ নয়, স্বাস্থ্যের প্রয়োজনেও জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ৮০ বছরের শিক্ষাবিষয়ক গবেষণাও একই কথা বলে আসছে। বহুভাষী হওয়ার সামাজিক ও মানসিক সুবিধা অনেক। আর এখন তো জানাই গেল, এটা আমাদের আয়ু ও তারুণ্যের চাবিকাঠি। তাই বয়স কোনো বাধা নয়। মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে নতুন কোনো ভাষা শেখা শুরু করে দিন। কে জানে, হয়তো কয়েকটি ভিনদেশি শব্দই আপনাকে বার্ধক্য থেকে দূরে রাখবে!

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন